বিস্ফোরণের আলোয় গাজা স্ট্রিপ-১

Send
মোস্তাক আহমেদ আসিফ
প্রকাশিত : ০৯:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যবিস্ফোরণের তীব্র ঝলকানিতে আমার ডানদিকের এলাকা মুহূর্তের জন্য দিনের মতো আলোকিত হয়ে উঠল। কয়েক কিলোমিটার এলাকা, কমলা রঙের আলোয় উজ্জ্বল হয়েই আবার গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল। দেখতে অনেকটা রাতের আঁধারে জলে ওঠা ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো। ১২ থেকে ১৫ সেকেন্ড পরে বিস্ফোরণের একটা গম্ভীর শব্দ শুনতে পেলাম। থেমে থেমে কিছুক্ষণ পরপর গাজার সব এলাকা থেকেই বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছে। গাজার অধিবাসীদের ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে ইসরাইল। এখানকার যেকোনো অধিবাসীই যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক আঘাত বা মৃত্যুর সম্মুখীন হতে পারে। যে বোমাটা ৫ কিলোমিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়েছে, তেমন বোমা যেকোনো সময় আমার ওপরও আছড়ে পড়তে পারে। এমন আশঙ্কায় সারারাত, সারাদিন কাটবে সবার। যুদ্ধ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলে তাহলেলম্বা সময় ধরেই সবাইকে এই মারাত্মক আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে। শুধু আমার মতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোদ্ধাকেই নয়, দুর্বল চিত্তের নারী-শিশু, অসুস্থ অসহায় বৃদ্ধের ওপরেও সমানভাবে চাপানো হয়েছে বিভীষিকাটা।

জোনাকি পোকামতো আলো জ্বলছে নিভছে গাজা উপত্যকা প্রত্যেক এলাকায়। বাকি নেই ফাঁকা মরুপ্রান্তর বা ফসলের মাঠগুলোও। কয়েক কিলোমিটার উপর থেকে গাজা এলাকাটা নিশ্চয়ই ক্রিস্টমাস ট্রির মতো দেখাচ্ছে। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বাগদাদ শহরের ওপর বৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণ করা হয়েছিল। রাতের বেলায় বিমান থেকে তোলা ভিডিও চিত্রের আলোর ঝলকানিকে খুব গর্বের সঙ্গে ‘ক্রিস্টমাস ট্রি’ আখ্যা দিয়েছিল আমেরিকানরা। ইসরাইলি পাইলটরাও এমন ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে আমাদের সামরিক সামর্থ্যকে উপহাস করে।

কিন্তু গর্ব করার মতো আসলে কি কিছু আছে ইসরাইলিদের? ওদের অস্ত্রভাণ্ডারের কোন অস্ত্রটা নিজের টাকায় কেনা? সবই আমেরিকা বা অন্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র সাহায্য দিয়েছে। কয়টা অস্ত্র নিজেরা বানায়? যে অস্ত্র নিজেরা বানায় বলে দাবি করে, সেগুলো সবই মূলত আমেরিকার প্রযুক্তিগত সাহায্যের ওপর দাঁড়িয়ে। শুধু তাই না, অস্ত্র গবেষণার, তৈরি এমনকি অস্ত্র পরীক্ষার প্রায় সব অর্থও ‘মিত্রদের’ দান। অর্থ ও প্রযুক্তি সবই যদি অন্যের হয় তাহলে কৃতিত্বটা আসে কীভাবে? এতটা সাহায্য পেলে ভুটান এশিয়ার পরাশক্তি হয়ে যেত। অন্যদিকে সিরিয়া, ইরান এমনকি গাজার ক্ষুদ্র গেরিলা সংগঠনগুলো যেন নিজের টাকায়ও অস্ত্র কিনতে বা বানাতে না পারে তার জন্য কত নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। আসলে ওদের একমাত্র শক্তি হচ্ছে মিডিয়া। নির্লজ্জ মিথ্যাচার, কাপুরুষতা এবং নৃশংস বর্বরতাই ওদের যোগ্যতা।

আমি রাতের অন্ধকারে বাঙ্কার থেকে বের হয়ে খোলা অনাবাদী জমির ভেতর দিয়ে পশ্চিমদিকে খান-ইউনিস শহরে যাচ্ছি, সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সেন্টারে। একটা খুব পরিচিত শব্দ শুনে গাজার উত্তর-পূর্ব সীমান্তের দিকে তাকালাম। একটা লম্বা আলোর রেখা উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে ইসরাইলের ভেতরে চলে গেছে, এরপরে আরও একটা, তারপরে আরও একটা আলোর রেখা মাটি থেকে প্রায় ৪০ ডিগ্রি এঙ্গেলে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। এরপরে আরও অনেকগুলো। শব্দ ও আলোর রেখার ধরন থেকে বুঝতে পারছি এগুলো দূরপাল্লার ভারী M-302 রকেট। M-302 রকেটগুলো প্রায় ১৫০ কিলোগ্রাম উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহন করে ১৬৫ কিলোমিটারের মধ্যে যেকোনো লক্ষবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ইসরাইলের সব বড় শহর এবং অধিকাংশ সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানতে পারে এই রকেটটি।

গতিপথ দেখে বুঝতে পারলাম তেল-আবিব বা তার কাছাকাছি কোনো স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছে রকেটগুলো। গতকাল রাতে গাজার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী দুটি গেরিলা সংগঠন হামাস ও ইসলামিক জিহাদ ঐক্যবদ্ধভাবে তেল-আবিবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পালমাচিন ও অধিকৃত জেরুজালেমের সবচেয়ে বড় অবৈধ বসতিতে, M-302 রকেট হামলা চালায়। প্রতিটি হামলায় ৪টি পৃথক স্থান থেকে প্রায় একই সময় সব মিলিয়ে ৪৮টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়। ইসরাইলি আয়রন ডোম ১০ থেকে ১২টি রকেট আকাশে ধ্বংস করতে পেরেছিল। বাকি ৩৫ থেকে ৪০টি রকেট বিমানঘাঁটিতে আঘাত করেছে, মারাত্মক ক্ষতি না হবার কোনো কারণ দেখি না। জেরুজালেমের অবৈধ বসতিতেও একই রকম ঘটনা ঘটেছে। অনেকগুলো বহুতল ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবাসিক এলাকায় ভারী রকেট হামলা চালানোর জন্য একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে। কিন্তু সন্ত্রাসী তো তারাই যারা অন্যের জমি অস্ত্রের জোরে দখল করে বসবাস করছে।

অন্ধকারে খুব সতর্ক দৃষ্টি রেখে হাঁটছি, হঠাৎ আমার চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠছে দেখে সঙ্গে সঙ্গেই মাটিতে শুয়ে পড়লাম। আমি মাটিতে শুয়ে পড়ার আগেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে আমার শ্রবণশক্তি ক্ষীণ হয়ে এলো। আমার প্রায় ২০০ মিটার পেছনে একটি বোমা ফেলা হয়েছে। ২০০ মিটার দূরের শব্দ প্রায় ০.৫ সেকেন্ড পরে শোনা যায় তাই শব্দ কানে আসার আগেই আলোর ঝলক নজরে এসেছিল। কয়েক সেকেন্ড পরে আরও কাছে একটা বোমা বিস্ফোরিত হলো। আমার ১২৫ মিটারের মধ্যেই। এই অবস্থায় উঠে দৌড় দেয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ দাঁড়ানো অবস্থায় বোমার আঘাত লাগার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। আবার পরে যদি আরেকটা বোমা আমার ১৫ মিটারের মধ্যে পড়ে? আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিনা কী করব, কিন্তু নিজের অজান্তেই AK-103টা হাতে নিয়ে মেরুদণ্ড সামনের দিকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে তীব্র গতিতে পশ্চিম দিকে দৌড় দিলাম।

/জেড-এস/

লাইভ

টপ