লক্ষ্মণরেখা

Send
অনামিকা আহমেদ
প্রকাশিত : ১৩:৩৪, এপ্রিল ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৬, এপ্রিল ৩০, ২০২০

রিয়ার অবস্থা হয়েছে নিজ গৃহে পরবাসীর মতো। তিন দিন হলো তার নিজের ঘরে ঢোকা বারণ। মা যেন লক্ষ্মণরেখা এঁকে দিয়েছে একটা, দাগের বাইরে ভেতরে গেলেই রাক্ষসের কবলে পড়তে হবে। তাই সে সারাক্ষণ ঘরের দরজার বাইরেই ঘুরঘুর করছে। রিয়ার ঘরে তার বোন দিয়াকে থাকতে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক বছর পর এই বাড়িতে প্রবেশাধিকার পেল দিয়া। বাড়িতে ঢুকতে দেওয়ার পরই মা রিয়ার ঘরে আইসোলেশনে রেখেছে দিয়াকে৷ মা নিজে আইসোলেশনের বিধি-নিষেধ ঠিকঠাক না মানলেও রিয়াকে মানতে বাধ্য করছে। শুধু তাই নয়, তাদের ছোট ভাইটিকে পাঠিয়ে দিয়েছে ছোট ফুপির বাসায়।

মা বলেছে, 'করোনা ভাইরাস পরীক্ষার রিপোর্ট আসুক আগে।' সদর হাসপাতাল থেকে লোকজন বাড়িতে এসে ভাইরাস সংক্রমণ আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য নমুনা নিয়ে গেছেন। রিয়াদের ছোট্ট এই শহরটিতে কোভিট-১৯ পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। বলা হয়েছিল, একটি নম্বরে ফোন করলেই বাড়ি এসে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এই রিপোর্ট আসতে সময় লাগে কমপক্ষে দুদিন। তবে ব্যাপারটা যে একটা ফোন করলেই হয়ে যায় না, ঠেকে পড়ে বুঝতে পেরেছে রিয়া। বারবার ফোন করেও সাড়া পাচ্ছিল না নমুনা সংগ্রহকারীদের। অবশেষে তাদের প্রতিবেশী এক ডাক্তারের প্রভাবে নমুনা পাঠানো সম্ভব হয়েছে এবং এখন তারা অপেক্ষা করছে ওই রিপোর্ট পাওয়ার। অবশ্য এরই মধ্যে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে দিয়ার। মা শুরু থেকেই ড. বিজন শীলের দেওয়া পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। ভিটামিন সি বেশি বেশি খেতে দিতে হবে জানার পর প্রায় এক বস্তা লেবু কিনিয়ে এনেছে এবং একটু পরপর লেবুর রস খেতে বাধ্য করছে মেয়েকে। রিয়ার মনে হচ্ছে, মা পারলে লেবু গাছসহ মেয়েকে খাইয়ে দিত। বাবার লাগিয়ে রেখে যাওয়া নিম গাছ দুটি যেন তার বড় মেয়ের কাজে লেগে এতদিনে ধন্য হলো। দিনে অন্তত চারবার নিম পাতার রস খাওয়ানো হচ্ছে। আদা-লবঙ্গ পেস্ট দিয়ে চা বানিয়ে গার্গল করে খেতে দিচ্ছে একটু পরপর। দিয়ার সঙ্গে কথা না বললেও এই সব ঠিকঠাক খাচ্ছে কিনা দেখার জন্য নিজের এঁকে দেওয়া লক্ষ্মণরেখা নিজেই ভাঙছে মা।

মা দিয়াকে খাইয়ে দিয়ে গেছে অনেকক্ষণ হলো। তারপর থেকে তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রিয়া উৎকণ্ঠিত বোধ করে। কিন্তু সে উৎকণ্ঠা বুঝতে না দিয়ে ডাকে—'কীরে আপু, তুই তো খুব আরামে আছিস?'

দিয়া ‌'হুঁ' বলে চুপ মেরে যায়। তাতে অবশ্য রিয়ার উৎকণ্ঠা দূর হয় না—'বুঝলাম তুই অসুস্থ্। কিন্তু আমিও তো কতদিন পর ক্যাম্পাস থেকে এসেছি। মা তো আমারও কিছু পছন্দের খাবার করতে পারত। তুই আসার আগ পর্যন্ত ভালোমন্দ কিছু কপালে জোটেনি আমার।'

এবার দিয়া স্পষ্ট করে উত্তর দেয়—‌'সত্যি আমার খুব লজ্জা লাগছে। তোদের কত বিপদেই না ফেললাম।'

'আপু এটা তোরও বাড়ি। আমার যেমন, রিফাতের যেমন, তেমনই তোরও।'

'হুঁ। আব্বু তো ফয়সালকে একেবারেই পছন্দ করত না। আর আমি কিনা আব্বু মারা না যেতেই ওই ফয়সালের জন্য বাড়ি ছেড়ে পালালাম।'

রিয়া বলে, 'না ফয়সাল ভাইকে খুব একটা অপছন্দ করত না, ওদের পরিবারটাকে ভীষণ অপছন্দ ছিল আব্বুর।'

'কী যে একটা ব্যক্তিত্বহীন সে। জানিস আম্মু যদি তাড়িয়ে দেয়, তাহলে আমি কোথায় যাব, ভেবেই পাচ্ছি না।'

রিয়া বলে, 'উদ্ভট চিন্তা তোর আপু। আম্মু তোকে তাড়াবে কেন?'

একটুখানি চুপ করে থেকে দিয়া ডাকে, 'রিয়া আছিস তুই?'

'বল আপু।'

'বড় মামাকে বলে আমার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবি?'

'আপু আগে সুস্থ হয়ে নে তুই। তারপর না হয় নিজেই মামাকে বলিস। ছোট ফুপিকেও বলতে পারিস।'

'না রে আমি কাউকে বলতে পারব না। কী লজ্জায় সবাইকে ফেলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ফয়সালের কাছেও আর ফিরে যেতে পারব না।'

দিয়াদের বাবা মারা যাওয়ার পর ওদের ছোট ফুপি দিয়ার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। মায়েরও ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়ে যায়। দিয়া প্রথমে 'এখনই বিয়ে করব না আমি' বলে আপত্তি জানায়। তখন মাত্রই অনার্সের ক্লাস শুরু হয়েছে দিয়ার। রিয়া নিশ্চিত আরেকটু জোর দিয়ে বললেই বিয়ের আলোচনাটা ভেঙে দিত মা। দিয়া তা না করে পালালো ফয়সালের সঙ্গে।

ফয়সালের মা-বাবা ওকে বের করে না দিলেও সাদরে গ্রহণও করেনি। দিয়াকে তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে চলেছেন প্রথম দিন থেকেই।

ফয়সালদের একটা ফ্যামিলি বিজনেস আছে। ব্যবসাটা পড়তির দিকে হলেও এখনো নেহায়েত মন্দ বলা যাবে না। নিজে টেনেটুনে যেটুকু পড়াশোনা করেছে, তা সম্বল করে চাকরি-বাকরি পাওয়া সম্ভব নয় ফয়সালের। আর সে তার এই আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে বাইরে যেতে নারাজ, সেটা দিয়াকে কোনো কথা না বলে আচরণেই বুঝিয়ে দিয়েছে।

দরজার ওপার থেকে রিয়াকে নিজের দুর্বিসহ জীবনের এই গল্প শোনায় দিয়া। অথচ গত কয়েক বছর যখনই রিয়া বোনের খবর জানতে ফোন করেছে, তখনই দিয়া একটা সুখের সংসারের গল্প শুনিয়েছে। ওদের পরিবারের একমাত্র রিয়াই দিয়ার খোঁজখবর নিয়েছে এতদিন। ছোট শহর। তাই বোন আর দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখাও হয়েছে অনেকবার। ফয়সালও দেখা হলে এমন ভান করেছে যেন তারা মহাসুখে আছে। সেই রাতে হঠাৎ দিয়ার ফোনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে রিয়ার সেই ধারণা। দিয়া কাঁদছিল, 'রিয়া আমার বোধ হয় করোনা হয়েছে।'

রিয়া জানতে চেয়েছিল কেন তার বোন এমন ভাবছে? কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়েছে কিনা, চিকিৎসা কি চলছে? দিয়া সেই সব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানতে চেয়েছিল, 'আম্মু কি আমাকে কয়েকটা দিন থাকতে দেবে বুনু?'

দিয়া আদর করে ওকে বুনু ডাকত। অনেক দিন পর সেই ডাক শুনে কান্না পায় রিয়ার। কিন্তু বোনকে কী বলবে ভেবে পায় না। মাকে যে রাজি করানো যাবে, তখনো সে তা কল্পনাও করতে পারছিল না।

দিয়া ওই রাতে ফোনে ফয়সালদের পরিবার নিয়ে এমন সব কথা বলছিল, তাতে রিয়া বুঝতে পারছিল করোনায় সংক্রমিত হওয়ার আতঙ্কে ফয়সাল ভাইও নিজেদের ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও আছে। তা থাকতেই পারে, সতর্কতার জন্য। তাই বলে নিজের বউকে এমন বিপদে বাপের বাড়ি চলে যেতে বলবে, যে মেয়েটি সব ছেড়ে তার কাছে চলে এসেছে, যার নাম পর্যন্ত মুখে নেয় না মেয়েটির বাপের বাড়ির লোকজন, তাকে এমন প্রস্তাব দেওয়া যায়?

দিয়া বলে, 'আমার শ্বশুর-শাশুড়ির রাগ। আচ্ছা, মেয়ে না-হয় পালিয়ে এসেছে ঠিক আছে, কিন্তু মেয়ের পরিবার এসে ক্ষমা চাইবে না কেন? কোনো অনুষ্ঠান করতে চাইল না কেন, কীসের এত অহঙ্কার তাদের?'

রিয়া জানল, শাশুড়ি দিয়ার সব কাজে খুঁত ধরতে ধরছেন শুরু থেকেই। সারাক্ষণ খোঁচাতে থাকেন, মা কী কিছু শিখায়নি বলে বলে। দিয়ার ক্লাসে যাওয়াও বন্ধ করে দেন তাঁরা। ফয়সালকে কিছু বললে সে বলে, মা বাবা যে তোমাকে বাড়িতে থাকতে দিয়েছে এটাই বেশি। এখন ওদেরকে খুশি রাখাই তোমার কাজ। এই বাড়ির কোনো মেয়েই এত পড়াশোনা করেনি। আমার বোনদের দেখ না। বড় ভাবিকে দেখ না। বিয়ে হওয়ার পর ভাবিও পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে।

দিয়া বুঝতে পারে ফয়সালকে বলে কোন লাভ নেই। তারপরও দিয়া খুব কষ্টে শুধু পরীক্ষাগুলো দিয়ে তার পড়াশোনা চালিয়ে রেখেছে।

রিয়াকে ডাকে দিয়া, 'বুনু আছিস?'

'হ্যাঁ বল।'

'আব্বু চেয়েছিল আমাকে কোনো একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে। দেখ আমি তো এত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও কোথাও চান্স পাইনি। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে

অনার্সে ভর্তি হওয়া লাগল। তুই কেমন একা একা সব করে দেখিয়ে দিলি। আব্বু নিশ্চয়ই ওপর থেকে তোকে দেখে খুশি হয়েছে।'

রিয়া বিব্রত বোধ করে, কী বলবে ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞেস করে, 'আপু ফয়সাল ভাই কি ফোন করেছিল?'

দিয়া জানায়, 'দিয়েছিল। বলছিল ও কখনো ভুল কিছু বলে না। এমন অসুখের মধ্যে না পাঠালে আম্মু তো আমাকে ঘরেই ঢুকতে দিত না।'

দিয়ার হাত থেকে কিছু একটা পডার শব্দ হলে রিয়া ডাকে, 'আপু?'

দিয়া খুব শীতল কণ্ঠে বলে, 'জানিস ফয়সালের মতো হিপোক্রেট আমি আর একটাও দেখিনি।'

রিয়া প্রসঙ্গটা হালকা করার চেষ্টা করে বলে, 'ফয়সাল ভাই তো ঠিকই বলেছে। এই অসুস্থ অবস্থায় না এলে তো আম্মু তোমাকে ঢুকতে দিত না।'

দিয়া বলে, 'সত্যি বুনু তুই অনেক বড় হয়েছিস। আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছিস। কিন্তু ভেবে দেখ এমন বরের কাছে আর ফেরা যায় কিনা?'

রিয়া সত্যি ভেবে পায় না। দিয়ার সর্দিকাশি তো নতুন কিছু নয়। গলা ব্যথাও হতো ঋতু পরিবর্তনের সময়। এই সব তো ফয়সালের জানা আছে। এগুলো দেখেই ওর শ্বশুর-শাশুড়ি ফয়সালকে বলে বউকে অন্য কোথাও রেখে আসতে। ফয়সালও মা-বাবার কথায় সায় দিয়ে বোঝাতে থাকে, 'দেখ আমার মা-বাবার অনেক বয়স হয়েছে। বড় ভাবির ইমিউন বলে কিচ্ছু নেই। কিছুদিন তুমি তোমার মায়ের বাসায় থেকে আস। এটাই সময়, এই অবস্থায় তোমার মা তোমাকে ফেরাবে না।'

দিয়া খুব অসহায় বোধ করে। অনেক ইতস্তত করে রিয়াকে ফোন দেয়। রিয়া ভয় পায়। তবু বলে, 'আম্মু কী বলবে তা পরে দেখা যাবে। আগে তুমি বাড়িতে আস।'

রিয়া ভেবেছিল সকালে মাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি। সকালে ঘুম ভাঙল দিয়ার ডাকাডাকিতে। জানলা দিয়ে দেখে দিয়া বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। নিজের ঘর থেকে মায়ের ঘরে এসে দেখে মা মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। ছোট ভাই রিফাত দরজার সামনে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রিয়া বলে, 'আম্মু আপু রাতে ফোন করেছিল। ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলছে ওর নাকি করোনা হয়েছে।'

মায়ের শরীরে বিদ্যুৎ চমক হয়। চট করে ওঠে দাঁড়ায়। দরজা খুলে দিয়াকে নিয়ে যায় রিয়ার ঘরে। মাত্র কয়েক বছর আগে এই ঘরে দুবোন একসঙ্গে থাকত। কিন্তু এবার দিয়া আসার পর রিয়ার আশ্রয় হয়েছে রিফাতের ঘরে। মায়ের কাছেও ভিড়তে দেওয়া হচ্ছে না ওকে। রিফাতকে মা রীতিমতন বাড়ি-ছাড়া করেছে।

এরপর থেকে মা একাই সব সামলাচ্ছে। রিয়া মাকে অনেকবার বলতে চেয়েছে, তোমারও তো বয়েস হয়েছে। যদি আপুর করোনা হয়ে থাকে আর সেটা তোমারও হয়। বলার সাহস পায়নি। হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়েছে মা। প্রথমে মাত্র একবার বলেছিল, 'আম্মু তুমি থাক। আমি ওর কাছে আমি যাই বরং...'। শুনে মা এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন এই সব কথার কোনো অর্থই সে বুঝতে পারছে না। তাই কথাটা আর শেষ করতে পারেনি রিয়া।

দিয়ার করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে—এই খবর নিয়ে দিয়াদের উঠোনে এসে দাঁড়ায় ফয়সাল। এই প্রথম শ্বশুরবাড়ির আঙ্গিনায় এল সে। খবর জেনে মা-মেয়ে জড়াজড়ি করে কাঁদছে। রিয়া তখনো লক্ষ্মণরেখার বাইরে দাঁড়িয়ে। রিয়া বুঝতে পারছে, মায়ের এঁকে দেওয়া এই রেখা ডিঙ্গিয়ে ফয়সাল আর কোনোদিনই দিয়ার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। তবু সে দিয়াকে ডাকে, 'আপু ফয়সাল ভাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।'

'ওকে এখন যেতে বল।' দিয়ার কথা ফয়সালও শুনতে পেয়েছে। রিয়া বোনের কাছে যেতে যেতে ফিরে তাকিয়ে দেখে ফয়সাল মাথা নিচু করে ফিরে যাচ্ছে।

//জেডএস//

লাইভ

টপ