যখন ফের দেখা হয়

Send
আরিফ মজুমদার
প্রকাশিত : ১৪:৩৫, মে ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩০, মে ০৫, ২০২০

প্রেমে পড়ার কোনো বয়স নেই। এ কথা হয়তো অসত্য নয়। তবে এ বয়সের প্রেম আর একুশে প্রেমে পড়ার অনুভূতিটা নিশ্চয় এক নয়। একুশের প্রেমে সুড়সুড়ি ভরা যে আবেগটা ঝরে পড়বে সেটা কি আর এ বয়সে হবে! যেন ভাবলেশহীন গলায় কথাগুলো বলল জাভেদ।

এমন সুন্দর একটা বিকালে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে হঠাৎ জাভেদের মুখে এমন অপ্রাসঙ্গিক কথায় লীমা বিরক্ত হচ্ছে বৈকি! গভীর চোখে জাভেদের দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে এখন তোমার অনুভূতিটা কেমন শুনি?

জাভেদ লেকের স্বচ্ছ জলধারার দিকে তাকিয়ে উদাস গলায় বলল, আমার আবার কীসের অনুভূতি! আমি কি আদৌ কারো প্রেমে মজেছি!

জাভেদের এমন কথায় লীমা খুব অপমান বোধ করল। কী কারণে যে গত ছয় মাস ধরে তাকে অবহেলা করছে জাভেদ—লীমা তা বুঝতে পারছে না। বিয়ে নিয়ে লীমা জাভেদকে পীড়াপীড়ি করছে—এটা কি জাভেদের অবহেলার কারণ হতে পারে? জাভেদ এখন যে জব করছে সেটা নিয়েও তার অসন্তুষ্টি রয়েছে। নাকি জাভেদ অন্য কোনো কারণে ইদানিং চিন্তায় পড়ে আছে। লীমা কী করে জানবে তা! জাভেদও কিছু বলছে না লীমাকে। সে যাই হোক, বাসায় মিথ্যে বলে জাভেদের এমন অবহেলা সহ্য করতে নিশ্চয়ই আসেনি লীমা। অকারণে হাত ঘড়িটা দেখে জাভেদের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লীমা বলল, আমি এখন আসি।

জাভেদ কোনো কথা বলছে না দেখে লীমা কিছুদূর হেঁটে গিয়ে একটা রিকশা ডেকে চলে যায়। লীমা চলে যাওয়ার পর জাভেদ আরও ঘণ্টাখানিক বসে থাকল ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসছে। লীমা ফের এসে জাভেদকে আগের জায়গায় বসা দেখে রাগী গলায় বলল, কী ব্যাপার! তুমি আমার কল রিসিভ করছো না কেন!

জাভেদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে পনেরটা মিসড কল দেখে বলল, সরি মোবাইলটা সাইলেন্ট মুডে ছিল।

লীমা তখন বলল, আর তুমি এখানে কার অপেক্ষায় এখনো বসে আছো?

জাভেদ নিরস গলায় বলল, কারো অপেক্ষা করার যোগ্যতা কি হয়েছে? একটা কবিতা নিয়ে ভাবছিলাম। প্রেমের কবিতা।

লীমা বলল, প্রেমের কবিতা! কীসের প্রেমের কবিতা!

জাভেদ নিচু স্বরে বলল, স্বরচিত প্রেমের কবিতা।

একটা ছেলে এ সময় বাদাম নিয়ে এদিকে আসে। জাভেদ বিশ টাকার বাদাম কিনে তার পাশে বসতে বলে লীমাকে।

জাভেদের গা ঘেঁষে বসে লীমা বাদাম খেতে খেতে বলল, কোথায় তোমার স্বরচিত প্রেমের কবিতা!

মাথায় আছে। এখনো কাগজে লেখা হয়নি। কারণ কবিতা এখনো পূর্ণতা পায়নি। আরও ক’দিন টানা ভাবতে হবে বোধহয়। যখন পূর্ণতা পাবে তখন ডাইরির পাতায় লিখে নেবো। এ কথা বলে জাভেদ খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভান করল যেন বাংলা সাহিত্যের কোনো একজন বিখ্যাত কবি তার ওপর ভর করেছে।

লীমা হেয়ালি গলায় বলল, হুম। তোমাকে যে আর কত বছর ধরে ভাবতে হবে সেটা আজও বুঝতে পারছি না। এনিওয়ে এখন তোমার মাথায় কী আছে তা জানতে পারি?

জাভেদ বলল, সিউর। অসম্পূর্ণ কবিতা আবৃত্তি করছে জাভেদ—

তোমার সাথে আমার কি কখনো কিছু হবে!

আমি কি তোমার মনটা ছুঁয়ে যেতে পারব!

তুমি কি আমার পাশে বসে কোনো একদিন বলবে—

দেখো ওই আকাশটা কতো নীল,

গাছের আড়ালে বসে পাখিটা কত মায়া করে ডাকছে,

দেখো জলের উপর কত চমকপ্রদ মৃদু ঢেউ,

আর এইসব তুচ্ছ বিষয়ও খুব ভালো লাগছে

শুধু তুমি পাশে আছো বলে।

আমি তোমাকে ভালোবাসি

বনলতা সেনের চেয়েও বেশি!

দুদিন পর। জাভেদ আর লীমা শ্যামলীর একটা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতেই বড়-বড় ফোঁটায় খুব করে বৃষ্টি শুরু হলো। লীমা উৎফুল্ল গলায় বলল, একসেলেন্টে। খুব ভালো হয়েছে। আজ যতক্ষণ না বৃষ্টি থামবে ততক্ষণ রেস্টুরেন্ট থেকে বের হব না। এমন বৃষ্টিতে রেস্টুরেন্টে লোকজনের সমাগমও কম থাকবে। আমাদের বের হতে তাড়া দেখাতে হবে না নিশ্চয়।

কারণ ছাড়া রেস্টুরেন্টে বসে থাকার মধ্যে এতো আনন্দের কী আছে জাভেদ তা বুঝতে পারল না। তবুও বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, হুম। মনে হচ্ছে এক কাপ কফিতেই আজ রেস্টুরেন্টের কেবিন রুমে এক সাথে বসে নিরিবিলি পরিবেশে অনেকটা সময় কাটাতে পারব।

কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে লীমা যখন বলল, শুনেছি কাল আমাকে দেখতে আসবে।

লীমার কথায় জাভেদের তখন কোনো আগ্রহ দেখা গেল না। কফি শেষ হতেই বৃষ্টিও থেমে গেল। লীমার উৎফুল্লও আর বেশিক্ষণ থাকল না। বরং লীমার মনটা কিছুটা খারাপ হলো। বৃষ্টিও তার সঙ্গে নিষ্ঠুরতা করল! রেস্টুরেন্টের কেবিন রুমে বসে নিরিবিলি পরিবেশে জাভেদের সঙ্গে জরুরি বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করা গেল না। দুজন বেরিয়ে বৃষ্টি ভেজা পথে হাঁটছে। বিকেলের ভেজা রাস্তা তখন চিকমিক করছে। একটা রিকশা ডাকল লীমা। দুজন রিকশায় উঠে বসল। লীমার বিয়ের কথা শুনে জাভেদের মনটা খারাপ হয়ে আছে। লীমাকে তা বুঝতে দেয়নি জাভেদ। তবে লীমা জানে—মন খারাপ হলে জাভেদ একটার পর একটা সিগারেট টানে। রিকশায় উঠেই একটি সিগারেট ধরাল জাভেদ। মেঘলা দিনের এই বিকেলে হঠাৎ খুব করে দমকা বাতাস বইছিল তখন। জাভেদকে খুব কায়দা করে সিগারেট ধরাতে হয়েছে। জাভেদ ধূমপান করে এটা লীমা একদম পছন্দ করে না। এটা জাভেদও জানে। ধূমপান ছাড়তে লীমার কাছে জাভেদ একাধিক বার শপথও করেছে। তবুও কোনো কারণে মন খাপার হলে নির্দ্বিধায় লীমার সামনেই সিগারেট ধরায় জাভেদ। লীমা বলল, তুমি আজ এই নিয়ে কয়টি সিগারেট টানলে?

জাবেদ বলল, একটাই।

লীমা অভিমানী গলায় বলল, সিগারেট আমার অসহ্য লাগে। ফেলে দাও।

মাত্র তো ধরালাম। আরও দুটা টান দেই।

লীমা মুখ বেজার করে রিকশায় বসে আছে।

জাবেদ বড় করে একটা সুখটান দিয়ে সিগারেট ফেলে দিয়ে ভনিতা করে বলল, ভাবছি আজ থেকে আর ধূমপান করব না। অর্থের অপচয়। এক টানের জন্য পনের টাকা ব্যয় করা ঠিক না।

লীমা ফের বলল, আমার বড়খালা কাল সন্ধ্যায় আমার জন্য পাত্র নিয়ে বাসায় আসবেন।

জাভেদ নিরস গলায় বলল, পাত্র নিয়ে কেন আসবেন?

জাভেদ যেন ইচ্ছা করেই প্রায় সময় লীমার সাথে বোকা বোকা কথা বলে। যা শুনে লীমার গা জ্বালা করে খুব। তবুও লীমা জবাব দেয়, আমার বিয়ের কথা হচ্ছে। পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে।

জাভেদ পকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে মুখে দিল। সিগারেটে আগুন দিয়ে বড় করে টান দিয়ে বলল, দেখতে আসলে আসুক। এতে চিন্তার এমন কী আছে! লীমা মুখ বেঁকিয়ে আঙুল তুলে বলল, জাভেদ, তুমি কী বলতে চাও? পাত্রপক্ষ যদি আমাকে পছন্দ করে ফেলে!

জাভেদ খেয়ালি গলায় বলল, তুমি সুন্দরী মেয়ে। ঢাকা শহরে প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে আর কয়টা আছে! পাত্রপক্ষ পছন্দ করবে নিশ্চয়! না করে তো উপায় নেই!

লীমা বলল, তুমি কি আমাকে রাগাতে চাচ্ছো! পাত্রপক্ষ যদি আমাকে পছন্দ করে ফেলে! তাহলে! তাহলে কী হবে? বাসায় আমি কী জবাব দিবো? সেটা কি একবার ভেবে দেখেছো? জাভেদ কোনো কথা বলছে না। বড় বড় নিঃশ্বাসে সিগারেট টেনে যাচ্ছে। ফের গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। লীমা রিকশার হুক টেনে দিতে বলল। চালক সাইড করে রিকশা থামিয়ে হুক টেনে নিল।

সন্ধ্যা বেলা। এখন বৃষ্টি নেই। দুজন ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে মেইন রাস্তার দিকে আসছে। কী কথা বলে জাভেদ আর লীমা দুজনে একত্রে হেসে উঠল। আর কী ভেবে অত্যন্ত উৎফুল্ল ভঙ্গিতে আরেকটি সিগারেট ধরালো জাবেদ। সেটা বুঝা গেল না। লীমা অভিমানী গলায় বলল, এই তোমার সিগারেট ছেড়ে দেয়া? ফেলো এক্ষুণি।

এটাই লাস্ট ওয়ান। আজকের পর আর ধূমপান করব না। ধূমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। ক্যান্সার হয়।

লীমা মুখটা অদ্ভূত ভঙ্গি করে বলল, হুঁ। জানো তো অনেক কিছু। মানো কিছু!

জাভেদ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বলল, রিকশা করে তোমাকে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

তা কি ঠিক হবে? এখন আবার কার চোখে পড়ি কে জানে! এমনিতেই বাসায় বিয়ে নিয়ে চাপে আছি।

জাভেদ বলল, এই সন্ধ্যাবেলা কে আর দেখবে? ভদ্র লোকজন এ সময় রাস্তায় থাকে না। রিকশা ডাকব?

লীমা কিছু বলল না।

দুজন রিকশায় কিছু দূর যেতেই জাভেদ দেখল লীমার চোখভরা পানি।

কী ব্যাপার! অবাক গলায় জানতে চাইল জাভেদ।

লীমা চোখ মুছে বলল, মনটা অস্থির লাগছে। খুব অস্থির লাগছে। কাল যদি পাত্রপক্ষ পছন্দ আমাকে করে ফেলে? তুমি তো বিষয়টি মোটেও সিরিয়াসলি নিচ্ছো না।

জাভেদ যেন অত্যন্ত উৎফুল্ল ভঙ্গিতে আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে টানছে।

লীমা এমন সময় সিগারেট প্রসঙ্গে কিছু না বলে ভেজা গলায় বলল, তোমার সাথে যদি আর কোনদিন আমার দেখা না হয়।

জাভেদ নরম গলায় বলল, আর কোনদিন যদি দেখা না হয় তবুও তোমার কথা মনে থাকবে।

লীমা বলল, ধরো, আমি যদি মরে যাই!

জাভেদ সিগারেটে একটা বড় টান দিয়ে বুক ভরে ধোঁয়া নিয়ে বলল, তাহলে তুমি অমর হয়ে থাকবে।

জাভেদের এমন অবহেলা মাখা কথায় লীমা অভিমানী করে বলল, ঠিক আছে। তুমি ভালো থেকো। আমার সাথে আর রিকশায় করে যেতে হবে না। রিকশা চালককে বলল, এই মামা দাঁড়াও। জাভেদকে রিকশা থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় লীমা। জাভেদ বাকি সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কিছু দূর হাঁটতে থাকল।

পরদিন বিকেল বেলা লীমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসে। লীমার বড় খালা পাত্রপক্ষ নিয়ে আসেন। বড়খালা সুপ্রিম কোর্টের উকিল। জেদি মহিলা। তবুও ধৈর্য্য নিয়ে অনেকবার লীমাকে বুঝালেন পাত্রপক্ষের সামনে কী করে চা নিয়ে যেতে হবে। কী করে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

লীমা যখন পাত্রপক্ষের সামনে যায় তখন ছেলের বাবা দুই-তিনটা প্রশ্ন করলেন। বড়খালা সামনে বসে আছেন। বড়খালার সম্মান রক্ষার্থে বা ভয়ে লীমা ঠিকভাবে প্রশ্নের জবাব দেয়। পাত্র নিজেও এসেছে। নাম মৃদুল। বুয়েট থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে। লীমা পাত্রের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। চা-পর্ব শেষ হবার পর লীমা যখন চলে আসছে তখন তার কাছে খবর আসে উনাদের কেউ একজন বলেছেন পাত্রী পছন্দ হয়েছে।

বিয়ের পর। মৃদুলের সঙ্গে লীমার পরিচয় এখনো তেমন গাঢ় হয়নি। হবার কথাও নয়। বিয়ে হয়েছে পনের দিন আগে। মৃদুলকে এখনো তুমি বলা রপ্ত করতে পারেনি লীমা। লীমা আর মৃদুলের বয়সের পার্থক্য চার বছর। তাছাড়া অ্যারেঞ্জ ম্যারেজির পর স্বামীকে সহজে তুমি বলাটা অবিশ্যি খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে মৃদুলকে নিয়ে লীমার মনে কোনো দুঃখ নেই। মানুষটা অত্যন্ত ভালো এবং বুদ্ধিমান। যদিও বিয়ের রাতে নানা কিছু ভেবে লীমা অজানা আতঙ্কে অস্থির হয়েছিল। একটু আধটু বুকও কাঁপছিল লীমার। মৃদুল যখন লীমাকে আদুরে গলায় বিয়ের রাতে বলল, ভয়ের কিছু নেই। তুমি এখন ঘুমিয়ে পড়। তখন মৃদুলের কথায় লীমার ভয় কেটে যায়। লীমা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। সেদিন অনেক রাতে একবার ঘুম ভেঙে দেখে মৃদুলও ঘুমিয়ে আছে। খানিকক্ষণ জেগে থেকে লীমা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙল পরের দিন সকাল নয়টার পর। মৃদুল তখন লীমার পাশে নেই। আরও সকাল সকাল উঠে ফজর নামাজ আদায় করে নিয়েছে মৃদুল। এখন পাশের ঘরে আজকের পত্রিকা হাতে নিয়ে বসে আছে।

কয়েকদিন ধরে লীমার কোনো খবর নেই। দুজনের পরিচয় হবার পর জাভেদের মোবাইলে আগে কখনো এতদিন কল না করে থাকেনি লীমা। লীমাকে না দেখে একটা অস্থিরতা বোধ নিয়ে এটা-ওটা ভাবতে হচ্ছে জাভেদকে। লীমাকে নিয়ে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে আজ বিকেলে বসতে খুব ইচ্ছেও করছে। দুপুরের পর লীমার মোবাইলে কল দেয় জাভেদ। লীমার ছোটভাই নিলয় মোবাইল ধরে বলল, আপু আমাদের বাসায় নেই। শশুর বাড়ি গেছে।

জাভেদ কিছু না বলে মোবাইল কেটে দেয়। শেষ বিকেলের দিকে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে গিয়ে বসে জাভেদ। একা বসে লীমাকে নিয়ে বিগত দিনগুলো কল্পনা করছে হয়তো। সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় এক জোড়া নব দম্পত্তি ধানমন্ডি লেকের পাড়ের কফি স্টলের সামনে এসে বসল। এক পেয়ালা কফি পান করবে ভেবে জাভেদও লেকের পাড় থেকে উঠে গিয়ে কফি স্টলের সামনে রাখা একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে। নব-দম্পত্তি তখন এক পাশের প্লাস্টিকের গোল টেবিলে সামনাসমনি বসে কফি পান করছিল। হঠাৎ জাভেদের চোখে পড়ল নব দম্পত্তির নারীটি আড় চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। নব দম্পত্তির পুরুষ সঙ্গী মৃদুলের মোবাইলে তখন কল আসে। ব্যাবসায়িক জরুরি প্রয়োজনে এক পার্টনার কল করেছে। মৃদুল নববধূর সামনে এখনো ব্যবসায়িক আলাপে অভ্যস্থ হয়ে উঠেনি। কল রিসিভ করে জাস্ট ওয়ান মিনিট বলে উঠে গিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছে মৃদূল। লীমার চোখ ভিজে আসছে দেখে জাভেদ উঠে চলে যেতে চায়। লীমা দেখল মৃদুল কথা বলতে বলতে একটু দূরে সরে যাচ্ছে। লীমা উঠে গিয়ে জাভেদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি আজ এখানে কফি খেতে আসবে এটা আমি জানতাম। গত দু’বছর ধরে তুমি তাই করেছো। তোমাকে এক নজর দেখতে আমার হাজবেন্ডকে রিকোয়েস্ট করে এখানে এসেছি। তিন বছর আগে আজকের এদিন তোমার সাথে প্রথম এখানে বসে আলাপ হয়েছিল। সেদিন এক সাথে কফি পান করেছি দু’জন। তরপর বছরের এই দিনটায় এক কাপ কফি পান করতে তুমি এখানে আমাকে নিয়ে আসতে নানা ছুতোয়। কথা শেষে লীমা টিসু পেপার দিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়। লীমার কথায় জাভেদ কোনো জবাব না দিয়ে চলে যায়। এরপর কোনো প্রকার যোগাযোগ ছাড়াই তাদের পাঁচটি বছর কেটে যায়।

পাঁচ বছর পর জাভেদ আর লীমার ফের দেখা হয়। বৈশ্বিক করোনা মাহামারিতে লন্ডন থেকে দেশে ফেরে জাভেদ। আজ বিকেলের দিকে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে ঘুরতে বের হয় জাভেদ। লীমার সাথে প্রথম কফি পানের বছরের বিশেষ দিনটিও আজ। সন্ধ্যার পর কফি স্টলের সামনে লীমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় জাভেদের। দুজন ভদ্রতাসূচক বাক্য ‌‘হাই-হ্যালো’ সেরে এক টেবিলে বসে দুটি কফির অর্ডার দেয়। ধূমায়িত কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে করোনাকালীন ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে তাদের মধ্যে আলাপ হয়। জাভেদ আর লীমার আলাপের সারসংক্ষেপ হলো—লীমা এবং তার হাজবেন্ড দুজনই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। লীমা করোনা জয় করতে পারলে মৃদুল হেরে যায়। লীমার পেটে মৃদুলের সন্তান। লীমা এখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এর আগে আরেকটি বাচ্চা হয়েছিল লীমার। দুর্ভাগ্যবশত জন্মের তিন মাস পর মারা যায়। আর জাভেদ লন্ডন যাওয়ার পর সেখানে বিয়ে করে। করোনা মহামারিতে জাবেদের স্ত্রী মারা যায়। রেখে যায় তার দুই বছর বয়সী শিশু পুত্রটি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কফির পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে জাভেদ আর লীমা দু’জন দুজনের মোবাইল নাম্বারটা সেভ করে নেয়।

//জেডএস//

লাইভ

টপ