আমি খুবই শোকাহত | সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

Send
শ্রুতিলিখন : ফখরুল হোসেন
প্রকাশিত : ১৯:১৮, মে ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২০, মে ১৪, ২০২০

আনিসুজ্জামানের মৃত্যুর খবর শুনে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। কেননা তিনি আমাদের সমসাময়িক এবং বন্ধু ছিলেন, সহকর্মী ছিলেন। বলতে গেলে, আমরা একসঙ্গেই বেড়ে উঠেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে এবং পরবর্তী শিক্ষকতা জীবনে।

আনিসুজ্জামানের প্রসঙ্গে কথা উঠলেই যে ব্যপারটা সামনে আসে তা হলো, তিনি প্রচণ্ড মেধাবী ছিলেন এবং সেই সঙ্গে মেধার অনুশীলন করতেন। সেজন্য আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিতে তার যে অবদান সেটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা দেখেছি, আমাদের কালে, আমাদের সময়ে যারা সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করতেন তাদের মধ্যে আনিসুজ্জামান বিশিষ্ট ছিলেন। কেবল বিশিষ্ট নয়, অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিলেন। গবেষণাতেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়, শিক্ষক হিসেবেও অত্যন্ত সফল ছিলেন, এবং যেটা আরও গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো যে, এই শিক্ষক হন যারা, বা যারা গবেষক হন, অনেকসময় তারা একটা গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেন, কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভিন্ন। আনিসুজ্জামানের সামাজিক যে গণ্ডি সেটা অত্যন্ত বিস্তৃত, অত্যন্ত দৃঢ় ছিলো। সেজন্য বিভিন্ন সময়ে নানা আন্দোলনের সময় তাকে আমরা পেয়েছি, দেখেছি, বিভিন্ন জাতীয় সংকটে তিনি ভূমিকা নিয়েছেন। তিনি অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতেন, আর তার লেখার মধ্যে নিজস্বতা ছিলো, তার লেখার যে রীতি তার মধ্যে ছিলো হৃদয়ানুভূতি এবং সংযম, এই দুয়ের সংমিশ্রণ। হৃদয়ানুভূতি এবং সংযম কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না, কিন্তু তার লেখায় আমরা সেটা লক্ষ্য করেছি। এ কারণে তার লেখা যে কোনো পাঠক পড়লে সহজেই আকৃষ্ট হতো। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, একটা সময় বাংলা সাহিত্যে মুসলিমদের অবদান বেশ অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো, অবদানের দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছিলো, সাহিত্যের ইতিহাসের লেখকরা এই বিষয়টি সেভাবে খোঁজ করে দেখতেন না, তো এক্ষেত্রে আহমদ শরীফ যেমন মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন, সেরকম আনিসুজ্জামানও এই আধুনিককালে বাঙালি মুসলমানরা যে লিখেছে, সাহিত্যচর্চা করেছে এটা নিয়েই তার প্রচুর গবেষণা ছিলো, এটা নিয়েই তার পিএইচডি ডিগ্রি, এবং সেটা খুব একটা জরুরি কাজ ছিলো। আর বাংলা গদ্যের যে প্রাচীন নিদর্শন যেটা ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির চিঠি-পত্রের মধ্যে ছিলো, সেগুলো উনি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি থেকে প্রয়োজন অনুধাবন করে প্রকাশ করার ব্যবস্থা নিয়েছেন এবং প্রকাশ করেছেন, সেটাও একটা বড় কাজ।

যা হোক, প্রতিভাবান মানুষেরা কখনো কেউ একজন আরেকজনের মতো নয়, হয় না, তিনি তার মতোই ছিলেন। আনিসুজ্জামান তার সময়ে অনন্য ছিলেন, তার মতো আরেকজনকে আমরা পাবো না।

আজ তার সঙ্গে অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। আমরা একই সমসাময়িক, তবে আমি তার একবছর আগে পড়েছি, কিন্তু বড় হয়েছি তো একই সঙ্গে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন এবং আমাদের কর্মের জীবন একসঙ্গেই কেটেছে, সে কারণে তার সঙ্গে অনেক ঘটনা আছে, সেগুলো বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে।

আমি খুবই শোকার্ত, আগে থেকেই জানতাম তিনি অসুস্থ, সবসময় আশা করতাম হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।

কিছুদিন আগে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর চলে গেলেন, জামিলুর রেজা চৌধুরী চলে গেলেন। জামিলুর রেজা চৌধুরী তো অত্যন্ত সুস্থ এবং স্বাস্থ্যবান মানুষ ছিলেন, তারপরও তাকে আমরা হারালাম। এই শোকের মধ্যে আনিসুজ্জামান চলে গেলেন, আর এমন একটা সময়ে তাকে আমরা হারালাম যখন আমরা একটা কঠিন সময় পার করছি, মানুষ যে একসঙ্গে সামাজিকভাবে মিলিত হয়ে যথাযথভাবে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবে সেই উপায় নেই। খুবই দুঃসময়ের মধ্যে একটা খারাপ খবর পেলাম। আনিসুজ্জামানের আত্মার শান্তি কামনা করছি।  

//জেডএস//

লাইভ

টপ