অনুবাদের কৈফিয়ত

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ০৮:৫১, অক্টোবর ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৫৩, অক্টোবর ২৬, ২০২০

অনুবাদ করছি অনেক দিন ধরেই। সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি শুরু করেছিলাম। প্রথম অনুবাদটি ছিল মেক্সিকোর কবি অক্তাভিয়ো পাজের একটি প্রবন্ধ। অনুবাদটিতে মাঝখানে এক জায়গায় গোটা দুই লাইনের বক্তব্য আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। ফলে কথাটা ঘুরিয়ে প্রাসঙ্গিক হয় এমন একটা কথা নিজ থেকে বলে দিয়েছিলাম। অনুবাদটা একটা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ছাপা হওয়ার কারণে এ নিয়ে নিজের কাছে পরে অনেক লজ্জিত বোধ করেছি। এই লজ্জা উত্তরণের চেষ্টায় আর সাহিত্য সম্পাদক শামীম রেজার বিভিন্ন সময়ের ফরমায়েসেই মূলত আমার অনুবাদে আসা। আর সেই এসে পড়ার পর থেকে সরে আর যাইনি। খুব বেশি কাজ করিনি, তবে অনেকদিন ধরে করছি।

আমার বেশির ভাগ কাজই আফ্রিকান আর লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ইংরেজি থেকে অনুবাদ, অথবা আফ্রিকান আর লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের ওপর ইংরজিতে লেখা সমালোচনার অনুবাদ। তার মধ্যে প্রবন্ধই বেশি। বাকিটা প্রায় সবই গল্প। কবিতা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করিনি, তবে উর্দু থেকে কিছু করেছি। জীবনে প্রথম অনুবাদ করেছিলাম ইকবালের ‘শিকওয়াহ’ ও ‘জওয়াবে শিকওয়াহ’। তখন ছাত্র। ইকবাল বোঝার মোটেই বয়স না। পরে যখন কিছুটা বুঝতে পেরেছি তখন লজ্জায় পাণ্ডুলিপিটা নষ্ট করে ফেলেছি। এরপরে পরিণত বয়সে গালিব থেকে কিছু অনুবাদ করেছি বরিশালের আঞ্চলিক বাংলায়। সম্প্রতি বরিশালের আঞ্চলিক বাংলায় আমি শেক্সপিয়ারের কিছু নাটক অনুবাদ শুরু করেছি। ‘ম্যাকবেথ’ ও ‘টেমপেস্ট’ শেষ করেছি। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার একটি পত্রিকা ‘ভিনভাংড়া’য় নাটকদুটো ছাপাও হয়েছে। এবার ‘মিডসামার নাইটস ড্রিমস’ ধরেছি।

অনুবাদে আমি মূল লেখকের কথা অক্ষরে অক্ষরে রাখার চেষ্টা করি বিশেষ করে প্রবন্ধ অনুবাদের ক্ষেত্রে। প্রবন্ধ অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনো স্বাধীনতা আমি নিতে চাই না। তবে একটা কাজ করি। ইংরেজি ভাষা প্রিপজিশন নির্ভর বলে এবং বিভক্তিনির্ভর নয় বলে ইংরেজি বাক্যের শব্দ ধারণ ক্ষমতা প্রায় অন্তহীন। অনুসর্গ বাংলায় অল্পবিস্তর থাকলেও, ভাষা হিসেবে বাংলা অনেকটাই বিভক্তিনির্ভর বলে এভাষা বাক্যে খুব বেশি শব্দ ধারণ করতে পারে না। বেশি শব্দ বাংলা বাক্যের ওপর চাপিয়ে দিলে তার অর্থ পেঁচিয়ে যায়, সরল থাকে না। তাই আমি ইংরেজি দীর্ঘ বাক্যকে বাংলায় ভেঙে ভেঙে লিখি। আরও একটা কাজ প্রবন্ধ অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি করি। অনেক সময়ই দেখা যায় বিভিন্ন ধারণাজ্ঞাপক পারিভাষিক শব্দ ইংরেজিতে থাকে যার সরাসরি বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। কিংবা পাওয়া গেলেও এমন একটা পাওয়া যায় যা সাধারণের বোধগম্য নয়। সেক্ষেত্রে আমি প্রতিশব্দ ব্যবহার না করে শব্দটিতে ধৃত ধারণাটি প্রায় সংজ্ঞারূপে বিবৃত করে বাক্যের অন্য শব্দের অনুবাদের সাথে মিলিয়ে দিতে চেষ্টা করি। এতে করে আমার মনে হয় অনুবাদের মধ্য দিয়ে জটিল ধারণাগুলোর একধরণের ব্যাখ্যা তৈরি হয়ে যায় এবং পাঠকের কাছে ডিসকোর্সটি জটিল ঠেকে না। টীকা-টিপ্পনীরও খুব দরকার হয় না।

কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি সৃষ্টিশীল রচনার ক্ষেত্রে আমার অনুবাদের ধারণা ভিন্ন। এসব ক্ষেত্রে আমি অনেক স্বাধীনতা নিয়ে থাকি। আমি মনে করি এই ধারার কর্ম অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য হবে এই যে, অনূদিত হওয়ার পরেও যেন বস্তুটি সঠিকভাবে কবিতা, গল্প বা নাটক থাকে। অর্থাৎ অনুবাদটিকেও সঠিকভাবে কবিতা, গল্প বা নাটক হতে হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য শব্দের অর্থ অভিধানে না খুঁজে সংস্কৃতির মধ্যে খুঁজতে হবে। কালচারাল ইকুইভ্যালেন্স খুঁজে পেতে হবে। এতে একধরণের লস (loss) ঘটবে। তবে সে লস সাহিত্যের লস নয়। বরং সাহিত্যের লস হবে তখন যখন অনুবাদে মূল টেক্সটের শব্দ ও অভিব্যক্তিকে সাংস্কৃতিক সমতায় না এনে ভাষাগত সমতায় উপস্থাপন করা হবে। তখন যে লস ঘটবে সে লসের কারণে কবিতাটি অনুবাদের ভাষায় আর কবিতা হয়ে উঠবে না, কিংবা গল্পটি হারাবে পাঠের আবেদন। 

কালচারাল ইকুইভ্যালেন্সের ভিত্তিতে সম্পাদিত অনুবাদ কখনো কখনো অনুবাদকের সৃষ্টিশীলতার শক্তিতে মূলকেও ছাপিয়ে যেতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। নজরুলের রুবাইয়াত সে ধরণেরই এক অনুবাদ বলা যেতে পারে। মূলকে ছাপিয়ে না গেলেও এ ধরনের অনুবাদ নিঃসন্দেহে এক নতুন সৃষ্টি। এ অনুবাদকে ট্রান্সলেশন না বলে অনেকে ট্রান্সক্রিয়েশনও বলে থাকেন। তবে ট্রান্সক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে অনুবাদক মূলের টেক্সটের দিকেই তাকান না। এমে সেজেয়ারের ‘উনে তেমপেতে’কে বলা যেতে পারে শেক্সপিয়ারের টেমপেস্টের ট্রান্সক্রিয়েশন। ট্রান্সক্রিয়েশন জঘন্য হতে পারে যদি যিনি ট্রান্সক্রিয়েট করলেন তাঁর সৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়।      

আমি শেক্সপিয়ারের নাটক বরিশালের ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রে ট্রান্সলেশন আর ট্রান্সক্রিয়েশনের মাঝামাঝি এক জায়গায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। নাটকদুটোর স্থান ও ব্যক্তিনামগুলো আমি দক্ষিণবঙ্গের ইংরেজ-আগমনপূর্ব সংস্কৃতির সাথে যায় এমন নামে রূপান্তর করেছি। গ্রিক ও রোমান মিথের রেফারেন্সগুলোকে যতটা সম্ভব স্থানীয় লোককাহিনির বিভিন্ন চরিত্রের সাথে মেলাতে চেষ্টা করেছি। যেখানে একেবারে পারা যায়নি সেখানে মিথের চরিত্রের নামের মধ্যেই তার পরিচয় বলে দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিংবা ভারতীয় মিথের চরিত্রের সাথে তুলনীয় হয় এমন নামে প্রকাশ করেছি। ধর্মীয় রেফারেন্সগুলো এবং শব্দগুলো সুবিধামতভাবে কখনো ইসলামি রেফারেন্সে আবার কখনো হিন্দু রেফারেন্সে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। তবে মূল টেক্সটের বক্তব্য মূলানুগ রাখার চেষ্টা করেছি। শুধু প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শব্দের প্রতিশব্দ না খুঁজে কালচারাল ইকুইভ্যালেন্স খুঁজেছি। শেক্সপিয়ার অনুবাদের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো শেক্সপিয়ারের শব্দখেল (pun)। এই শব্দখেল আমি অনেক চেষ্টা করেও বজায় রাখতে পারিনি। তাই অনেক ক্ষেত্রেই শব্দখেলগুলো মার খেয়েছে। তবে আঞ্চলিক ভাষার শব্দখেলগুলো যতটা পারা যায় শেক্সপিয়ারের কথার ধারে কাছে নিয়ে বাঁধার চেষ্টা করেছি।

আমার অনুবাদের মোদ্দাকথা মোটামুটি এই। আমি এ কাজে অবশ্য থিয়রি দ্বারা চালিত হই না। ট্রান্সলেশনের থিয়রি এখন ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। একাডেমিক আয়োজনের অংশ হিসেবে সেগুলোর কিছু কিছু আমাকে পড়তে ও পড়াতে হয়। তবে সেগুলো আমি নিজে অনুবাদের সময় মোটেই মাথায় রাখি না। আমার মনে হয় থিয়রি মাথায় নিয়ে অনুবাদ করলে অনুবাদ ক্ষতিগ্রস্ত ছাড়া খুব একটা লাভবান হয় না। 

//জেডএস//

লাইভ

টপ