X
মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
১১ আশ্বিন ১৪২৯
পর্ব—এক

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

মুহম্মদ মুহসিন
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬

[এই পরিক্রমায় বিধৃত আলোচনাগুলো পুরোপুরি মৌলিকভাবে আমার নয়। এ আলোচনার সর্বোচ্চ ঋণ রয়েছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, কানপুর—এর ডিপার্টমেন্ট অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশাল সাইন্সেস-এর শিক্ষক সায়ন চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক সাহিত্যতত্ত্বের ওপর প্রদত্ত লেকচার সিরিজের প্রতি। এছাড়া যে সকল পুস্তকের প্রতি সরাসরি ঋণ স্বীকার করছি তাদের মধ্যে রয়েছে প্রমোদ কে. নায়ারের ‘কন্টেম্পোরারি লিটারারি এন্ড কালচারাল থিয়রি’, পিটার বেরির ‘বিগিনিং থিয়রি’, সাইমন মালপাস সম্পাদিত ‘দি রুতলেজ কম্প্যানিয়ন টু ক্রিটিকাল থিয়রি’, লোইস টাইসনের ‘ক্রিটিকাল থিয়রি টুডে’ এবং খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘বাঙালির দ্বিধা ও রবীন্দ্রনাথ এবং বিবিধ তত্ত্বতালাশ’। এই পরিক্রমা সাহিত্যতত্ত্বে শুধু হাতেখড়ি দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত। এটি মোটেই কোনো একাডেমিকভাবে উদ্ধৃতিযোগ্য আলোচনা নয়। তাই সাধারণ একাডেমিক রীতিতে এখানে তথ্যসূত্র উল্লিখিত হয়নি বিধায় শুরুতে সার্বিকভাবে এই ঋণ স্বীকার করা হলো।]


সাহিত্যতত্ত্বের কোনো বৈশ্বিক ও সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই। এ সম্পর্কে চলনসই একটি ধারণা পেতে হলে আমরা চেষ্টা করতে পারি এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এক সুতায় গেঁথে একটি পরিচিতি দাঁড় করাতে। পরিচয়ের চেষ্টাটা আভিধানিক বিশ্লেষণ থেকে শুরু করা যাক। আভিধানিকভাবে তত্ত্ব হলো কোনো অধ্যয়নযোগ্য বিষয়ের ধারণাগত ভিত্তি (the conceptual basis of a subject or an area of study)। বিষয়টি ধারণাগত কারণ এটি ব্যাবহারিক চর্চার বিপরীতে দাঁড় করানো। বিষয়টি ধারণাগত মানে হলো বিপরীতে এর একটি অনুশীলন বা চর্চাগত দিক রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় সাহিত্যতত্ত্ব হলো সাহিত্য হিসেবে আমরা যা অধ্যয়ন করি তার ধারণাগত দিক। এর উল্টোদিকে রয়েছে উক্ত ধারণাসমূহের চর্চাগত দিক যার মাধ্যমে সাধিত হয় সাহিত্যের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ। ব্যাপারগুলো এক সুতায় গেঁথে এভাবে বলা যায় যে, সাহিত্যতত্ত্ব হলো সাহিত্যবিষয়ক সেই সকল ধারণা যা সাহিত্যের ওপর প্রয়োগ করলে সৃষ্টি হয় সাহিত্য সমালোচনা। অর্থাৎ সাহিত্যতত্ত্বের ব্যাবহারিক দিক হলো সাহিত্যসমালোচনা। সাহিত্যতত্ত্ব সাহিত্যের গঠন ও প্রকৃতির সামগ্রিক ধারণা দেয়। পক্ষান্তরে সাহিত্য সমালোচনা সেই গঠন ও প্রকৃতির বিমূর্ত ধারণা থেকে মূর্ত কৌশল বের করে এনে তা দ্বারা সাহিত্যের নির্দিষ্ট এক একটি টেক্সটকে ব্যবচ্ছেদ করে।  
এই পরিচয় অবশ্য একশোভাগ নির্ভরযোগ্য নয়। এর দৃশ্যমান অনির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ হলো আমরা যাঁদেরকে সাহিত্যতত্ত্বের গুরু হিসেবে পাঠ করি তাঁদের বেশিরভাগই সাহিত্যের সমালোচক ছিলেন না এবং তাঁদের উদ্ভাবিত ঐ সব ধারণা সাহিত্য মূল্যায়নে ব্যবহৃত হতে যাবে এমনটা তাঁরা ভাবেনওনি। জ্যাক দেরিদা বর্তমান সাহিত্যতত্ত্বে এক অবশ্য পাঠ্য নাম। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন দর্শনের অধ্যাপক। একইভাবে আজকের নমস্য সাহিত্যতাত্ত্বিক জ্যাক লাকাঁ ছিলেন একজন মনোচিকিৎসক। স্ট্রাকচারালিজমের যাঁকে জনক বলা যায় সেই ক্লদ লেভি স্ট্রসের ক্ষেত্রও সাহিত্য ছিল না, ছিল সমাজবিজ্ঞানের অন্তর্গত নৃবিজ্ঞান। এসব দৃষ্টান্তের দিকে তাকিয়ে এ কথা বেশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, আজ সাহিত্য বীক্ষণের যে তত্ত্বসমূহ দাঁড়িয়েছে তার বেশিরভাগই সাহিত্যবিষয়ক ধারণার জগতে জন্ম নিয়েছিল না, বরং জন্ম নিয়েছিল অন্যত্র। সেগুলো জন্ম নিয়েছিল সমাজবিজ্ঞানে, মনোবিজ্ঞানে, দর্শনে, ইতিহাসে এবং এমনসব অসাহিত্যিক ক্ষেত্রে। এসব দেখে আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জোনাথান কালার বলেছেন ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ শব্দটিই ভুল। শব্দটি হবে শুধু ‘তত্ত্ব’, ‘সাহিত্যতত্ত্ব’ নয়। কারণ, এই ‘তত্ত্ব’গুলো মূলত সাহিত্যজগতের তত্ত্ব নয়, বরং অন্যসব জগতের তত্ত্ব। তাঁর ‘লিটারারি থিয়রি : এ শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’ গ্রন্থে তিনি একটু রাগতভাবেই বলেছেন যে, সাহিত্যতত্ত্ব নামক এই বস্তুগুলো এই দুনিয়ার যেকোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে, কিন্তু এগুলো কখনোই সাহিত্যের গঠন বা তার পাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে না। 
সাহিত্যতত্ত্বের আগাগোড়া ইতিহাস অবশ্য এমনটা না। ১৯৬০ এর দশকের আগে পুরো ইতিহাসজুড়ে সাধারণত এই তত্ত্বের বিষয়াদি সাহিত্যের আঙ্গিনায়ই বড় হয়েছে। ১৯৬০ এর দশক আর তারপর থেকেই মূলত সাহিত্যের তত্ত্ব সাহিত্যের বাইরের জগতের তত্ত্বের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তবে একদল আছেন তাঁরা মনেই করতে চান না যে ১৯৬০ এর দশকের আগে সাহিত্যতত্ত্ব বলতে কিছু ছিল। তাঁরা বলতে চান আমরা আজ যাকে সাহিত্যতত্ত্ব বলতে বুঝি দুনিয়ায় তার জন্মই হয়েছে ১৯৬০ এর দশকে। তাঁরা আরো স্পষ্ট করে বলতে চান যে, এর জন্মসাল মোটামুটি ১৯৬০ এর দশক, আর এর জন্মস্থান ফ্রান্স এবং ফ্রান্সের পার্শ্ববর্তী এলাকা। এর জন্মস্থান ফ্রান্স বলার ভিত্তিমূলে রয়েছে এর একগুচ্ছ ফরাসি জন্মদাতাদের নাম, যেমন : ক্লদ লেভি স্ট্রস, জাক লাকাঁ, সিমোন দে বেভোয়ার, জ্যাক দেরিদা, লুই আলথুসের, মিশেল ফুকো, জুলিয়ান ক্রিস্তেভা, হেলেন সিক্সু এবং এমন আরো অনেক। 
১৯৬০ এর আগের সাহিত্যতত্ত্ব সাহিত্যের অঙ্গনে জন্ম নিলেও সে তত্ত্বের খুব মাতামাতি ছিল না। ১৯৬০ এর দশকে বিশেষ করে প্যারিসে জন্ম নেয়া সাহিত্যতত্ত্বের মাতামাতিটা খুব বেশি ছিল, কারণ তার জন্মের পিছনে একটা আন্দোলনশক্তির তীব্রতা ছিল। আন্দোলনটা ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার আন্দোলন। আন্দোলনটি দানা বাঁধার পিছনে কিছু ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেমন দুনিয়ার সব উল্টেপাল্টে দিয়েছিল তেমনি যুদ্ধের পরবর্তী সময়েও সামগ্রিক আর্থসামাজিক জীবনে উল্টোপাল্টা অনেক কিছু ঘটতে থাকল। ১৯৪৫ সালের পর থেকেই কম্যুনিস্ট ও ননকম্যুনিস্ট উভয় ব্লকের দেশগুলোতে অর্থনীতির জোর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে লাগল। এই প্রবৃদ্ধিতে  কম্যুনিস্ট দেশগুলোর তুলনায় ননকম্যুনিস্ট দেশগুলো আরো বেশি ভালো করে যাচ্ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে জনসংখ্যার হারও দ্রুত গতিতে বেড়ে চলছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও খাদ্যশস্য উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে কোথাও খুব একটা মানুষের উপবাস-অনাহার যাচ্ছিল না। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে মানুষের গড় আয়ু পর্যন্ত ৭ বছর বেড়ে গেল। খাদ্যশস্য উৎপাদন অভূতপূর্বভাবে বেড়ে গেলেও আশ্চর্যজনকভাবে এই সময়ে কৃষিক্ষেত্র থেকে মানুষ ব্যাপকভাবে পেশা বদল করে অন্য পেশায় ব্রতী হতে লাগল। 
পেশা বদলের এই ব্যাপারটির সাথে আরেকটি ভিন্ন প্রসঙ্গ জড়িয়ে গেল। মানুষ কৃষি থেকে সরে যে পেশাগুলোয় ভিড় জমাচ্ছিল সে পেশাগুলোর কর্ম নির্বাহে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রয়োজন দেখা দিলো। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে ঐ পেশাগুলোয় গিয়ে জীবনের কাঙিক্ষত সাফল্য অর্জনের প্রতি মানুষের মাঝে তীব্র আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জোর থাকায় বেশিরভাগ মানুষের নিকট তাদের ছেলেমেয়েদেরকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়ে সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগও সাধ্যের মধ্যে ছিল। ফলত দেখা গেল ১৯৫০ এর দশক থেকে ১৯৮০ এর দশকের মধ্যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা পূর্বের তুলনায় ৩ থেকে ৯ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেল। ফ্রান্সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে যেখানে স্কুল কলেজের মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল এক লক্ষ মাত্র, সেখানে ১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে ছাত্রসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল সাড়ে ছয় লাখ। এই বৃদ্ধির বড় অংশই ঘটেছিল কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিভাগগুলোয়। 
স্কুল-কলেজে ব্যাপক শিক্ষার্থী বৃদ্ধির এ ঘটনা সমাজে এক বড় প্রভাব বয়ে আনল। এই শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই ছিল শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের বংশের প্রথম প্রজন্ম। তাদের বাপ-দাদারা ছিলেন সমাজের বিভিন্ন পেশার খেটে খাওয়া মানুষ যাঁরা স্কুল কলেজে খুব একটা যাননি। খেটে খাওয়া মানুষের কাতার থেকে উঠো আসা এই শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজের কর্তৃপক্ষের সাথে কোনোভাবে একাত্ম হতে পারছিল না কারণ এই কর্তৃপক্ষ ছিল অনেক আগে থেকে শিক্ষিত ও সমাজের অভিজাত শ্রেণির অংশ। তাঁরা একদিকে নিজেরা ছিলেন অভিজাত, অন্যদিকে শত শত বছর ধরে তাঁরা পাঠদানও করে আসছিলেন অভিজাত শ্রেণির ছেলেমেয়েদেরকে। তাই তাঁরাও এই খেটেখাওয়া মানুষের কাতারের শিক্ষার্থীদের সাথে একাত্ম হতে পারছিলেন না। এই নতুন প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের একাত্মতা বরং ছিল সমাজের খেটে খাওয়া মানুষদের সাথে যাঁরাই সত্যিকার অর্থে তাঁদের আপনজন। এই একাত্মতার ফল হিসেবেই প্যারিসে ১৯৬৮ সালের মে মাসে ঘটে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার (anti-establishment movement) প্রথম বিস্ফোরণ। ছাত্ররা আর শ্রমিকশ্রেণির মানুষেরা একত্রে কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যারিকেড নিয়ে নেমে পড়েন রাস্তায়। ছাত্রদের এই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার সংগ্রাম অতি দ্রুত সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। আমেরিকায় এই সংগ্রাম ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করল।
কালে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার এই আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল মানবিকী বিদ্যাসহ সামাজিক বিজ্ঞানের ব্যাপক অঙ্গনে। সাহিত্যের অর্থ এতদিন যাঁদের বিদ্যায় ও নির্দেশনায় তৈরি হতো বা প্রযুক্ত হতো, প্রতিষ্ঠানবিরোধী এই নতুন শিক্ষার্থীসমাজ সেই কর্তৃপক্ষকে এবং সেই কর্তৃপক্ষের অর্থপ্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী চেতনায় চ্যালেঞ্জ করে বসলেন। এই চ্যালেঞ্জের মুখে পূর্ববর্তী অর্থপ্রক্রিয়া ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করল এবং পাল্টে যেতে বাধ্য হলো। পূর্ববর্তী অর্থপ্রক্রিয়ার বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক দুর্গটি যাঁর আঘাতে প্রথম ভেঙে পড়তে শুরু করল তিনি হলেন জ্যাক দেরিদা (১৯৩০-২০০৪)। আঘাতটি এসেছিল ১৯৬৬ সালে তাঁর ‘Structure, Sign and Play ib the Discourse of the Human Sciences’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে। এই প্রবন্ধেই তিনি প্রথম বললেন টেক্সটের অর্থ নির্মাণে কোনো কেন্দ্রীয় একক কর্তৃপক্ষ থাকতে পারে না, কোনো কর্তৃপক্ষীয় হাত কোনো টেক্সটের অর্থ নির্মাণ বা নির্দেশনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। দেরিদার এই প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষবিরোধী ঘোষণা ১৯৬৭ সালে রোলাঁ বার্থ আরো একধাপ এগিয়ে নিলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Death of the Auhor’ এর মাধ্যমে। অন্য কর্তৃপক্ষ দূরে থাক, এই প্রবন্ধ টেক্সটের অর্থ নির্দেশনায় এমনকি সেই টেক্সটের লেখকের অধিকারও অস্বীকার করে দিলো। এই প্রবন্ধ বলল যে লেখক তাঁর লেখাকে নির্দিষ্ট শব্দে আটকে দিতে পারেন ঠিকই, কিন্তু সেই লেখার শব্দগুলোকে নির্দিষ্ট অর্থে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। ফলে লেখার অর্থের ওপরে লেখকেরও আর কোনো কর্তৃপক্ষীয় হাত থাকল না। 
আমরা দেখি এই কথাগুলো যাঁরা বললেন তাঁরা সাহিত্যের লোকই নন। সাহিত্যের বাইরের লোকেরা এসে সাহিত্যের অর্থ বিষয়ে এইসব কথা বললেন মানে এই না যে, তাঁরা সাহিত্যের অর্থ নির্মাণের নতুন কর্তৃপক্ষ হয়ে ওঠার দাবিদার হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁরা বরং কথাগুলো তাঁদের দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইহিতাস এই সবক্ষেত্রেই বলে গেলেন। কিন্তু সেকথা সারা দুনিয়ার বড় বড় মাথার মানুষকে এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেল যে, সবক্ষেত্রের পুরনো কর্তৃপক্ষই নড়ে সরে গেল। সেই ঝড়ে সাহিত্যের পূর্বতন কর্তৃপক্ষও নড়ে গেল। নড়ে গেল পুরনো সাহিত্যতত্ত্ব। তখন সাহিত্যের লোকেরাই ধীরে ধীরে তাঁদের সাহিত্যজগতের পুরনো কর্তৃপক্ষ থেকে সরে গিয়ে, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি ক্ষেত্রের এইসব বড়মাথার মানুষদের বক্তব্য অনুসারে গড়ে তুলতে শুরু করলেন তাঁদের নতুন তত্ত্ব। এভাবেই ১৯৬০ এর দশকের পর থেকে সাহিত্যজগতের বাইরের মানুষদের মস্তিষ্কপ্রসূত ধারণা ধার করে দুনিয়াজুড়ে উদ্ভূত হতে শুরু করল নতুন সাহিত্যতত্ত্ব। 
১৯৬০ এর দশকের পরের তত্ত্বপ্রপঞ্চ নিয়ে এত কথা বলা হলো মানে এই না যে, এর আগে সাহিত্যতত্ত্ব ছিল না। আলবত ছিল। এর আগের সাহিত্যতত্ত্ব বরং সাহিত্যের অঙ্গনে জন্ম নেওয়া তত্ত্ব ছিল। তার শুরু হয়েছিল অন্যসব জ্ঞানবিজ্ঞানের মতোই প্লেটো-এরস্টিটলের হাতে। গ্রিক রোমান সেই যুগে অনেক তত্ত্বই সাহিত্যকে ঘিরে জন্ম নিয়েছিল। পরে নিওক্লাসিকাল যুগে সেসব তত্ত্ব আবার নতুন ফরমে ফিরে এসেছিল। পরে রোম্যান্টিকরা সেসব থেকে সরে গিয়ে নতুন তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন। রোম্যান্টিকদের পরে নিউক্রিটিক ও ফরমালিস্টরাও সাহিত্যকে সাহিত্যের মধ্যে রেখেই বিচারে ব্রতী ছিলেন। এসবই ছিল সাহিত্যজগতের বড়মাথাদের দান। এরপর ধীরে ধীরে সাহিত্যের তত্ত্বে একটু একটু করে প্রবেশ করতে শুরু করল সাহিত্যের বাইরের জগতের জিনিসপত্র। প্রথমে দর্শনের হাত ধরে মার্টিন হাইডেগার ও হুসার্ল ঢুকলেন দর্শনের তাত্ত্বিকতায় সাহিত্যকে বিচারের দিশা নিয়ে। পরে সস্যুর নামে এক ভাষাবিজ্ঞানী আসলেন ভাষার গঠন কাঠামোর তত্ত্ব নিয়ে। সেই আধা দর্শন আর আধা সাহিত্যের বিষয়ও সাহিত্যের ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের তত্ত্ব অনেক নাড়িয়ে দিলো। এরপর মার্কসের সমাজতাত্ত্বিক ভাবনা আসলো সাহিত্যের নতুন ব্যাখ্যায়। ফ্রয়েড আসলেন মনোবিজ্ঞানের আলোকে সাহিত্যের নতুন ব্যাখ্যায়। তারপর সব ধূলিসাৎ করে দিয়ে আসলেন ১৯৬০ এর দশকের পরের প্রতিষ্ঠানবিরোধী বিনির্মাণবাদীরা, যাঁদের কথা শুরুতেই বলেছি। সাহিত্য সমালোচনার জগতে তাঁদের তত্ত্ব এত বড় হয়ে উঠল যে অনেকে পুরনোগুলোকে তত্ত্ব বলতেই অনাগ্রহী হয়ে উঠলেন।
তবে আমরা সাহিত্যের শিক্ষার্থীরা অধিকাংশেই মনে করি সাহিত্যতত্ত্বের যাত্রা ১৯৬০ এর দশকে নয়। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই খ্রিষ্টপূর্ব যুগে প্লেটো-এরিস্টটলের হাত ধরে। তবে তার যাত্রার এই দীর্ঘ ইতিহাস বিষয়ে আমাদের অনেক অনুসন্ধিৎসা রয়েছে, অনেক প্রশ্ন রয়েছে। প্লেটো-এরিস্টটলের হাত ধরে শুরু হওয়া এই তত্ত্ব কালের পরিক্রমায় কখন কী রূপ পরিগ্রহ করেছিল? কেন ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাকে বিকাশের পথে আগাতে হয়েছিল? তার ক্রমবিকাশের সেই যাত্রায় কাদের কী অবদান ছিল? এইসব প্রশ্নের মোটামুটি কিছু জবাব অন্বেষণই এই লেখার উদ্দেশ্য। ফলত এর শুরুটা করতে হচ্ছে প্লেটোকে দিয়েই।
চলবে

/জেডএস/
সম্পর্কিত
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
আদিতির হত্যাকারীর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিবিআই’র চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
শিল্পকলায় নাট্যকেন্দ্রের ১৫তম প্রযোজনা
সীতাকুণ্ডের অগ্নিদগ্ধরা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষত
সীতাকুণ্ডের অগ্নিদগ্ধরা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষত
এ বিভাগের সর্বশেষ
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
হিলারি মেন্টেলের মৃত্যু
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ 
চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে সমুদ্রের সাহসআশ্রিত মানুষ 
‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ ও আহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ ।। পর্ব—সাত
পথে নেমে পথ খোঁজাআহমদ ছফা : এক ক্ষ্যাপা বাউলের প্রাণ
সাড়ে তিন আনা
সাদত হাসান মান্টোর ‘শিকারি আওরত’ থেকেসাড়ে তিন আনা
আকাশটা জুম করে দেখি
আকাশটা জুম করে দেখি