X
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
১৯ মাঘ ১৪২৯
পথে নেমে পথ খোঁজা

সাহিত্যের চেয়ে জীবন বড় ।। পর্ব—২

মঞ্জু সরকার
১৯ আগস্ট ২০২২, ১০:৫৬আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২২, ১০:৫৮

একসময় অগ্রজপ্রতিম লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বাসায় আড্ডা দিতে যেতাম প্রায়ই। অসময়ে গেলে ভদ্রতা করে বলেছি, উপন্যাস লেখার ক্ষতি করছি না তো? হেসে অভ্যর্থনা জানাতেন, সাহিত্যের চেয়ে জীবন বড়। কথাটা তিনি লেখালিখি প্রসঙ্গে একাধিকবার আমাকে শুনিয়েছেন। জীবনবাদী লেখকের সাহিত্যবোধ বোঝাতে কিংবা আড্ডাকেও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাবতেন বলেই হয়তো কথাটা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু আমার সিরিয়াসলি মনে পড়েছে অনেকবার লেখক হওয়ার জন্য নিজের নানা পাগলামির কথা স্মরণ করে।

জীবনের অনেক মৌলিক চাহিদা ও মানুষ হওয়ার প্রচলিত ধারণাগুলো তুচ্ছ করে, স্বাধীন হওয়ার পরপরই লেখক হওয়ার পথ খুঁজতে ছুটে এসেছিলাম রাজধানী ঢাকায়। স্বাধীন দেশের মালিকানা জনগণকে দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও আদর্শ তখন সংবিধানেও পোক্ত হয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন ও বাস্তবে আকাশপাতাল ব্যবধান। পাকিস্তানি শত্রুবাহিনীর ভয় কাটলেও নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসেনি মানুষের জীবনে। স্বাধীন দেশ ও সমাজ নিত্যনতুন আতঙ্ক ছড়ায়। ভাবতে অবাক লাগে, একাত্তরে পাকিস্তানি কারাগারে নেতা বন্দি থাকার পরও গোটা জাতি স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু কারামুক্ত নেতা দলবল নিয়ে স্বাধীন দেশের হাল ধরার পরও অধিকাংশ বাঙালির মনে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আনন্দ নেই। হতাশ হয়ে পড়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্রসমাজের একটা বড় অংশ। স্বাধীনতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক, চৈনিক কিংবা রুশ ধরনের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম চলছিল রাজনীতিতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমি যেহেতু বিপ্লবী কলমযোদ্ধা হওয়ার জন্য ঢাকা এসেছি, দলবল প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু নিরিবিলি কোথাও বসে লিখে যাওয়ার জন্য নিজস্ব একটু আশ্রয় দরকার প্রথমে। শুধু লেখক পরিচয়ে পরিচিত হব বলে সুবিধা-সম্মান প্রসবিনী নানা পেশার স্বপ্নকে তুচ্ছ করেছি। কিন্তু লেখক হওয়ার জন্য পথে নেমে ঠেকে শিখলাম, লেখার চেয়ে জীবন অনেক বড় এবং বাঁচার নিশ্চিত ব্যবস্থাই করতে হবে সবার আগে। অতএব পকেটের শেষ সম্বলটুকু পকেটছাড়া হওয়ার আগে যেকোনো একটা চাকরি বা কাজ চাই।

রুমমেটদের সঙ্গে যেমন হয়, তেমনি কমলাপুর স্টেশনের প্লাটফরমে, ফুটপাতে কিংবা বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত শয্যাসঙ্গী কয়েক জনের সঙ্গেও আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। এদের একজন ছিল রিকশাওয়ালা। সে আমাকে মাগনা রিকশা চালানোর ট্রেনিং ও পরিচিত মহাজনের কাছে রিকশা ভাড়া নিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কাজটা পছন্দ হয়নি আমার। অন্যদিকে সংবাদপত্রে কর্মখালি বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা অচেনা ভদ্রলোকদের সঙ্গে খাতিরের সম্পর্ক স্থাপন করে কোনো কাজ জোগাড় করতে পারছিলাম না। একজনের পরামর্শে লুঙ্গি ও কমদামি জামা পরে বাসাবাড়ির তুচ্ছ কাজ খুঁজতে শুরু করেছিলাম।

যেকোনো একটা কাজ নিয়ে নগরীর বড় কোনো সচ্ছল বাড়িতে ঢুকতে পেলে দুবেলা ফ্রি খাওয়া পাব। ঘুমানোর জায়গা পেলে রাত জেগে সেখানে নিজের লেখাপড়া করতেও পারব। তারপর মনিবরা যখন জানতে পারবে, তাদের কাজের ছেলেটি শিক্ষিত ও মেধাবী আসলে, বাংলা সিনেমার মতো একটা কাণ্ড হবে না! এরকম কল্পনায় উৎসাহিত হয়ে আবাসিক এলাকায় বহুতল বাড়ি ও ভবনের দারোয়ান-ড্রাইভার শ্রেণির লোকদের কাছে আবেদন জানাতে লাগলাম। দুজন দয়াপরবশ হয়ে বাড়ির মনিবগিন্নিকে ডেকে আনলেন। ইন্টারভিউ দিয়ে ফেল করলাম। অন্য একজন মাস খানেক পরে ডাকলেন। তার আগেই নরসিংদি জুটমিলে সম্ভাব্য লেবারের চাকরিটা পছন্দ হলো আমার।

কমালাপুর স্টেশনের প্লাটফরমেই আলাপ হয়েছিল লোকটির সঙ্গে। লেবারদের সর্দার, ফোরম্যান না কী পদে যেন নরসিংদি জুটমিলে চাকরি করে। থাকে মিলের কলোনিতে। রোজগারপাতি ভালো। তারচেয়েও বড়কথা, কথাবার্তা শুনে মনে হলো, ভালো মনের মানুষ। আমার দুরবস্থা দেখে মিলে লেবারের চাকরি নিয়ে দিতে চাইল। আমি তো শ্রমিকশ্রণির স্বার্থে কলমযোদ্ধা হিসেবে শ্রেণিসংগ্রাম করার জন্য অনেকটাই প্রস্তুত ছিলাম। নরসিংদিতে চাকরি করেও অবসরে লিখতে পারব, আর লেখা নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাঝেমধ্যে ঢাকায় আসতেও পারব। অতএব ট্রেনে চেপে সঙ্গী হলাম লেবার-সর্দার লোকটার।

মিলের কলোনি মানে লম্বা একটা টিনের ঘর। সারি সারি বিছানা। সেখানে চাকরিদাতার মেহমান হিসেবে তার বিছানা ও খানায় ভাগ বসিয়ে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমাকে খাতিরযত্ন করা ও চাকরি দেওয়ার আন্তরিকতায় কোনো খাদ নেই মানুষটার। কিন্তু রাতে ঘুমানোর জন্য তার শয্যাসঙ্গী হয়ে বুঝলাম, লোকটার শোয়া বিশ্রী। ঘুমের ঘোরে নাক ডাকলে কিংবা শরীরে পা তুলে দিলেও ব্যাপারটা হয়তো ক্ষমা করা যেত। কিন্তু তার মতলব বুঝতে বিলম্ব হলো না। অল্প বয়সে একজন আত্মীয় পুরুষ আমার শরীর নিয়ে অসভ্য খেলা খেলতে চেয়েছিল। দগদগে ঘা হয়ে আছে সেই কষ্টদায়ক স্মৃতি। শিশু ছিলাম বলে, প্রতিবাদ করতে পারিনি। কিন্তু এখন তো আমি মহাবিদ্রোহী বেপরোয়া যুবক। রাতেই কলোনির অনেকের ঘুম ভাঙিয়ে আশ্রয়দাতার অসভ্য আচরণের কড়া প্রতিবাদ জানালাম। নিঃশব্দে পাশ ফিরে ঘুমাল সে। ভোরে তার কাছে বিদায় না নিয়েই, ব্যাগটিসহ আবার ঢাকাগামী ট্রেনে উঠে বসলাম।

কমলাপুর স্টেশন প্লাটফরম ছাড়াও বায়তুল মোকাররাম মসজিদ হয়ে উঠেছিল আমার দ্বিতীয় ঠিকানা। ওই সময়ে মসজিদ সম্প্রসারণের কাজ চলছিল বলে মসজিদের একটা উন্মুক্ত ছাদ খালি পড়ে ছিল। কিন্তু সেখানেও রাতে ঘুমাতে না দেওয়ার জন্য টুপিঅলা পাহারাদার তৎপর থাকত। সেই সত্তর সাল থেকে টুপিঅলা লোকদের সাথে এমন একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, আমাকে দেখামাত্রই যেন বেধার্মিক শত্রু  হিসেবে শনাক্ত করত সহজে। আমি মসজিদের টুপিধারী খাদেমের হাতে বহিষ্কৃত হওয়ার ভয়ে, তাকে দেখলেই ঘুমানোর বদলে ব্যাগের ভিতর থেকে পুজোসংখ্যা পুরোনো পত্রিকাটি বের করে পড়তাম। কিন্তু কোরানের বদলে এসব পড়তে দেখেও খাদেম আরো ক্ষেপে যেত। নাপাক শরীরে ঘুমানো কি ফাজলামি করার জায়গা নয় আল্লার ঘর। শতভাগ বিশ্বাস নিয়ে কথাটা বুঝিয়ে দিত।

মসজিদের নামাজি মেঝেতে ঘুমাতে না পারলেও প্রাঙ্গণে তৈরি বিছানা খুঁজে পেয়েছিলাম এক মধ্যরাতে। ওই সময়ে মসজিদের নিচে একটি মার্কেট ছিল। চৌকিতে টুপি, তসবি, আতর এবং ইসলামি বইপত্র সাজিয়ে বিক্রি করত টুপিধারী ব্যবসায়ীরা। রাতে খালি পড়ে থাকত চৌকিগুলো। আমি এরকম একটা চৌকি দখল করে আকাশের তারাদের প্রতি চোখ রেখে আরামেই ঘুমাতে পেরেছিলাম কয়েকদিন। কিন্তু একদিন ঘুম ভাঙার পর দেখি, আমার ব্যাগের চেন খোলা। চোর নেওয়ার মতো তেমন কিছু পায়নি। ব্যাগের সাইড পকেটে থাকা নোটবুক এবং সেই নোটবুকের ভিতরে যেকয়টি টাকা অবশিষ্ট ছিল, সেই টাকা কয়টি মারার জন্যই যেন তক্কে তক্কে ছিল পরিচিত কেউ। অবশিষ্ট টাকা কয়টি হারিয়ে তেমন কষ্ট পাইনি। আজ হোক কাল হোক, পকেট তো খালি হতোই। কিন্তু অসামান্য লেখক হওয়ার আশীর্বাদযুক্ত নোটবুকটি চুরি হয়ে যাওয়ায় খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।

স্বাধীন দেশে মুসলমানদের জন্য প্রথম বিশেষ ফজিলতের রাত তথা শবেবরাতের রাতে আমার ভাগ্যে কী নির্ধারিত হবে? ভেবে বায়তুল মোকাররম মসজিদে উদ্বিগ্ন ও বিনিদ্র কেটেছে। কারণ পবিত্র সেই রজনিতে এক ওক্ত নামাজ দূরে থাক, সচেতনভাবে ভদ্রলোক, ভিখিরি ও প্রতারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। ওইদিন আমার রাতের আশ্রয় চৌকিটিও বেদখল হয়েছিল। এই শহরে যে শারীরিক ও মানসিকভাবে অচল-অসহায় এত বেশি মানুষ আছে, দেখে বিস্মিত হয়েছি। কোত্থেকে সব হাজার হাজার ভিখিরি জড়ো হয়েছিল মসজিদের সব গেটে। অন্যদিকে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও স্বাধীনতার পর দেশে টুপিঅলা-নামাজির সংখ্যাও বেড়েছে যেন। গাড়িতে চেপেও আসছে তারা, অনেকের সঙ্গে বালকপুত্র। মসজিদে ঢোকার আগে নামাজিরা ভিখারির হাতে দান-খয়রাত করে বাড়তি সওয়ার হাসিল করে। এছাড়াও অনেকে গাড়িতে করে রুটি-হালুয়া এনেছে ভিখিরিদের মাঝে বিতরণের জন্য। এসব গাড়ি ঘিরে ভিখিরি হাতের কাড়াকাড়ি ঠেলাঠেলি দেখার মতো লড়াই বটে।

রুটির লোভে ভিখিরিদের ভিড়ে মিশে নামপরিচয়হীন হয়ে দু-একবার হাত বাড়িয়েছিলাম আমি। কারণ পেটের খিদে। কিন্তু আমার হাতে কিছুই পড়েনি। ভিক্ষা করার চেয়ে চুরি করা কিংবা লুটপাট করা যে বুদ্ধিমান ও সাহসী ভদ্রলোকদের জন্য সহজ কাজ, সেটাও পবিত্র রাতে প্রমাণ করেছিলাম আমি। বিশেষ রাত বলেই হয়তো বায়তুল মোকাররামসংলগ্ন স্টেডিয়ামের হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো খোলা ছিল। খদ্দেরদের ভিড় দেখে আমিও ভদ্রলোক কাস্টমার সেজে এক টেবিলে গিয়ে বসলাম। জোরালো কণ্ঠে পরোটা-ডালের অর্ডার দিলাম। তারিয়ে তারিয়ে খাওয়ার পর চাও খেলাম একটা। এই ফাঁকে নিজের নিরুপায় খিদে ও পকেটের শূন্যতাকে গোপন করার কৌশল ঠাওরেছি। আমাকে সেবাদাতা বেয়ারাটি যখন নতুন অর্ডার নিয়ে কিচেনমুখো হয়েছে, এবং ক্যাশ-কাউন্টারেও যখন কয়েকজন বিল পরিশোধকারীর ভিড়, আমি ব্যাগটি হাতে নিয়ে কাউন্টারের কাছে গিয়ে বাইরের অচেনা বন্ধুকে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতে হাত তুললাম এবং দ্রুত বেরিয়ে গেলাম রেস্টুরেন্ট থেকে। অদৃশ্য বন্ধুকে ধরার জন্য ছুটে চলা শুরু করার পরও মনে হতে লাগল, এই বুঝি রেস্টুরেন্টের লোকজন ছুটে এসে আমার কলারটি ধরে আটকায়। এরকম ধুঁকপুকে ভয়টা ছিল বলে বহুদিন ওই রেস্টুরেন্টের কাছে ঘেঁষিনি।

ব্যাগে পড়ার জন্য পুরোনো শারদীয় পত্রিকা ও বই ছিল। ফুটপাতের পত্রিকার দোকানে বেচে দিয়ে কয়েকটা পয়সা পেলাম। ফুটপাতের হকাররা পত্রিকার ভাঁজ নষ্ট হবে কিংবা ময়লা লাগবে বলে মাগনা পড়তে দেয় না সাধারণত। কিন্তু ওই হকারটিকে আধামাগনায় নিজের পুরোনো বইপত্র বিক্রি করেছি বলে সে তার দোকানের নতুন ম্যাগাজিন নেড়েচেড়ে দেখতে দিলো। তার দোকানে দাঁড়িয়ে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকাটি খুললে রাহাত খানের গল্প ও গল্পের নিচে ছবিটিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কৈশোরে মাসুদ রানা সিরিজ পড়তে গিয়ে রাহাত খান নামটি পরিচিত ও প্রিয় হয়ে উঠেছিল। তারওপর রেডিয়োতে নিয়মিত অনুষ্ঠানে রাহাত খানের কণ্ঠও শুনেছি। পত্রপত্রিকায় কিছু গল্পও পড়েছি। গল্পের শেষে লেখক পরিচিতিতে লেখা সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক। ততদিনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি পত্রিকা অফিস চেনা হয়ে গেছে। ইত্তেফাক অফিসের দেয়ালে সাঁটানো আজকের ইত্তেফাকও বেশ কয়েকদিন পড়েছি। পরিচিত কেউ নেই, এমনকি সাহিত্য সম্পাদকের নামটাও জানি না বলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করিনি। কিন্তু একজন চেনা লেখকের সন্ধান পেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব করলাম না আর। গেলাম ইত্তেফাক ভবনে। চেনা স্বজনের কাছে যাচ্ছি যেন, দারোয়ান-পিয়নকে তাঁর নাম পদবি বলতে দেখিয়ে দিলো অফিসকক্ষ। দোতলার একটি রুমে কাঁধের ব্যাগসহ বেশকিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দেখা হলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সঙ্গে।

রাহাত খান খুব জোরালো কণ্ঠে নিজেকে একজন সম্ভাব্য বড় লেখক দাবি করে ঢাকায় আগমনের উদ্দেশ্য ও চলতি ভাসমান অবস্থানের কথা অকপটে বললাম। অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, বাড়ি কোথায়, কী লিখি, কে পাঠিয়েছে ইত্যাদি। সত্য জবাব দিলাম। তখন একই কক্ষে বসা ছিলেন তাঁর অন্য দুই সহকর্মী, আখতার-উল-আলম ও হাবিবুর রহমান মিলন। কথাবার্তা শুনে তারাও আমার দিকে তাকালেন। একজন মুখ টিপে হাসলেনও মনে হলো। কিন্তু রাহাত খান আমাকে রাস্তার পাগল-ছাগল ভাবলেন না। দরদি কণ্ঠে বললেন, ‘স্ট্রাগল করো একটা পথ পেয়ে যাবে। আমিও দেখব তোমার জন্য কী করা যায়।’ নিউজপ্রিন্টের প্যাডের কাগজে বাসার ঠিকানা ‘৩৪৫, সেগুনবাগিচা’ লিখে দিয়ে বললেন, ‘খুব খিদে লাগলে আপাতত আমার বাসায় গিয়ে খেও। আমি আমার ওয়াইফকে বলে রাখব।’

রাহাত খানই প্রথম মানুষ, লেখক ও সাংবাদিক, যিনি আমার লেখক হওয়ার স্বপ্ন ও স্ট্রাগল করার দুঃসাহসকে স্বীকৃতি দেননি শুধু, খিদের পেটে অন্ন জোগানোর আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতার আবেগে চোখে পানি এসেছিল।

পরদিন তার বাসায় গেলে রাহাত ভাই নীলা ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। চমৎকার হাসিখুশি মমত্বময় মহিলা। ডাইনিং টেবিলে রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে খেতে দিয়েছিলেন। ব্যাগটি রাহাত ভাইয়ের বাসায় রেখে নতুন উদ্যমে পথ খুঁজতে পথে ও নিকটবর্তী রমনা পার্কে ঘোরাঘুরি শুরু করেছিলাম আবার।

দুঃসময়ে রাহাত খানের সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতি নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে একটা লেখা লিখেছিলাম। ভবিষ্যতে সংবাদপত্র জগৎ সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা লিখতে চাইলেও হয়তো তাঁর কথা আবারও আসবে। আপাতত এ লেখাটায় নিজের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাওয়ার স্মৃতিতেই সীমিত থাকি।

রাহাত ভাইয়ের বাসায় দু-চার দিনের বেশি খেতে যাইনি। সেসময়ে তার বৃদ্ধ পিতা ছিলেন ওই বাসায়। তিনি একদিন বিরক্ত হয়ে বলে দিয়েছিলেন, ‘বাসায় অসুবিধা, তুমি রাহাতকে বইলা বাইরে খাওয়ার ব্যবস্থা কইরো।’ এ কথা তো আর রাহাত ভাইকে বলা যায় না। তবে দিনে প্রতিদিনই একবার করে ইত্তেফাকে গিয়ে তার টেবিলের সামনে বসে থাকি। তিনি ফোনে দাদাভাই ও অন্য আরো কাউকে যেন আমার জন্য একটা ব্যবস্থা করার কথা বলেন। পিয়নকে চা দিতে বলেন।

দিন কয়েক রাহাত ভাইয়ের টেবিলের সামনে আমাকে বসা ও আমার কথাবার্তা শুনে, একদিন আখতার-উল-আলম তার টেবিলে ডেকে নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন। তিনিও রংপুরের মানুষ। বললেন, তার লালবাগ আমলিগোলার ভাড়া বাসায় একটি রুম খালি আছে। কিন্তু আমি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়া তার দুই ছেলেমেয়েকে পড়াতে পারব কি না? আমি শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। কারণ বখে যাওয়ার আগে মেধাবী ছাত্র হিসেবে নিজের সুনাম ছিল, তাছাড়া ছাত্রজীবনে একাধিক বাসায় লজিং থেকে, লজিংমাস্টার হিসেবে ছোট-বড় ছাত্র পড়ানোর অভিজ্ঞতাও আছে। জোরগলায় নিজের সক্ষমতা দাবি করলাম। উপরন্তু আমার যোগ্যতাকে আলম ভাইয়ের সহকর্মীরা জোর সমর্থন জোগালেন। রাহাত ভাইয়ের বাসা থেকে ব্যাগটি নিয়ে, ওইদিন সন্ধ্যাতেই চললাম আলম ভাইয়ের সঙ্গে তার বাসায়। প্রায় মাসখানেকের অনিশ্চিত ভাসমান জীবন শেষে আমার প্রথম নিরাপদ আশ্রয়।

পুরোনো ঢাকায় ঘিঞ্জি গলির ধারে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের তিন রুমের ভাড়াবাসা। ছোট ঘরটি মূল বাসা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। বাচ্চাদের পড়ার ঘর ও বসার ঘরের পরিচয় হারিয়ে আমার ঘর হয়ে উঠল সেটি। ক্লাস টু-থ্রিতে পড়া দুই ছাত্র-ছাত্রী, রিজু ও বীথুন মায়ার বাঁধনে জড়াল। সকাল-সন্ধ্যা ওদের নিয়ে পড়াতে বসি, স্কুলে দিয়ে আসা ও নিয়ে আসার দায়িত্বও পালন করি প্রায়ই। এ ছাড়া সাপ্তাহিক রেশন তোলা কি কাঁচাবাজার করতে বাজারে যাওয়া। বাজার করার কাজটিতে আমার উৎসাহ ছিল বেশি। কারণ মাছঅলা ও সবজিঅলারদের কম দাম দিয়ে দু-একটা সিকি বাঁচাতে পারলে নিজের রোজগার হিসেবে পকেটে রাখতে পারতাম। একটু অপরাধবোধ জাগত অবশ্যই, কিন্তু কী করব? ফ্রি থাকা-খাওয়ার পরও পকেটখরচ তো কিছু লাগেই।

পারিবারিক পরিবেশে বাস করে নিজের ছেড়ে আসা পরিবারের কথাও মনে পড়ে। পিতা কঠিন মানুষ। কিন্তু বাড়ি ছাড়ার সময় মা ও ক্লাস এইটে পড়া ছোটভাইটি কেঁদেছিল। ভাসমান জীবনে ওদের কথা মনে হলে আমারও কান্না পেত। কিন্তু কাঁদিনি কখনো। মাথা গোঁজার ঠাঁই হওয়ায় ভাইটিকে চিঠি লিখলাম। দিন কয়েক পর তার জবাবও পেলাম। পিতাকে না জানিয়েই সে নিজে পোস্ট অফিসে গিয়ে আমাকে কিছু টাকা মানিঅর্ডার করেছে। একমাত্র মা এবং অনুজ সঞ্জু আমৃত্যু আমাকে লেখক হওয়ার জন্য সমর্থন ও উৎসাহ যুগিয়ে গেছে।

লজিংবাড়িতে অবসর ছিল অনেক। অবসরে বাইরে বেরুলেই বুড়িগঙ্গাতীরের আদি অকৃত্রিম ঢাকাইয়া জীবনপ্রবাহ। পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখি লালবাগ, আমলিগোলা ও নওয়াবগঞ্জের চালচিত্র। এসব দেখেশুনে সময় কাটানো ছাড়াও লেখক-পাঠক সত্তার ক্ষুধা মেটাতে গ্রন্থবিতান নামে একটা পাবলিক লাইব্রেরিও খুঁজে পেলাম। বাসার কাছেই হরনাথ রায় স্ট্রিটে। বেসরকারি হলেও পাঠাগারটি বেশ বড়ই। ভিতরে অনেক বইপত্র। বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রিডিং টেবিলে বসে পত্রপত্রিকা ও বই পড়া যায়। আবার মেম্বার হলে বাসাতেও নেওয়া যায় বই।

সব মিলিয়ে আলম ভাইয়ের বাসার আশ্রয় দীর্ঘমেয়াদি হলে আমার জন্য ক্ষতিকর ছিল না। কিন্তু ওই সময়ে টানাপড়েন ছিল চাকরিজীবী ভদ্রলোকের সংসারেও। মাস ছয়েক না কাটতেই তিনিও আমার অকৃত্রিম স্বজনশুভার্থীর মতো আবারো দেশে ফিরে ডিগ্রি অর্জনের লেখাপড়া করে চাকরির জন্য নিজের যোগ্যতা বাড়াবার চাপ দিতে লাগলেন। কিন্তু সজ্ঞানে যে পথ বেছে নিয়েছি, বছর না ঘুরতেই পথভ্রষ্ট হব? অসম্ভব, মরে গেলেও ব্যর্থতার হতাশা ও পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে বাড়িতে ফিরব না আর। জন্মগত অধিকার সত্ত্বেও পিতার হোটেলের ফ্রিবোর্ডার হয়ে লেখক হতে পারিনি, লজিংবাড়ির আশ্রয়ে থেকে তেমন আশা করাই ভুল। বুঝলাম স্বনির্ভর হওয়ার অলিগলি কিংবা যেকোনো চোরাপথ একটা খুঁজে বের করতেই হবে অচিরে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম, তারপর লেখক নাম। অতঃপর পথ খুঁজতে পথে নামলাম আবার। চলবে

লেখক হওয়ার জন্য জন্ম যার ।। পর্ব—১

/জেডএস/
সর্বশেষ খবর
সবাইকে হিসাব করে চলার জন্য অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
সবাইকে হিসাব করে চলার জন্য অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ
প্রধানমন্ত্রীর আগমনে রূপগঞ্জে আনন্দ-উল্লাস
প্রধানমন্ত্রীর আগমনে রূপগঞ্জে আনন্দ-উল্লাস
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চাকরির সুযোগ
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চাকরির সুযোগ
সর্বাধিক পঠিত
বগুড়া-৪ আসনের উপনির্বাচনে ৬৩ কেন্দ্রে এগিয়ে হিরো আলম
বগুড়া-৪ আসনের উপনির্বাচনে ৬৩ কেন্দ্রে এগিয়ে হিরো আলম
২৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দিচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক
২৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দিচ্ছে ইস্টার্ন ব্যাংক
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রে এগিয়ে নৌকার প্রার্থী, হিরো আলম তৃতীয়
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রে এগিয়ে নৌকার প্রার্থী, হিরো আলম তৃতীয়
সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও এমপি হলেন সাত্তার ভূঁইয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে উপনির্বাচনসংসদ থেকে পদত্যাগ করে আবারও এমপি হলেন সাত্তার ভূঁইয়া
‘এবারের জয় ছিল স্মরণকালের, সরকারের প্রতি সমর্থন থাকবে’
‘এবারের জয় ছিল স্মরণকালের, সরকারের প্রতি সমর্থন থাকবে’