X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

মলিন জগতের প্রাণ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ১৮:৪০

হঠাৎ করেই প্রভাটা মরে গেল। বিষণপুরের বটতলার নির্মম ঝড়ের রাতটাতে তার কিছু হলো না, অথচ এই স্বাভাবিক রোদ্দুরমাখা দুপুরে সবটুকু নিয়া সে চলে গেল। চলে যাক, এরকম একটা মানুষের দুনিয়া, তেমন কারো কিছু হয় না। হওয়ারই-বা কি আছে। কিন্তু এই সময়ের মানুষের জন্য রেখে গেল সে অনেককিছু। কতোই-বা বয়স? বয়স তো কোনো বিষয় নয়। বয়সে কি এসে যায়? যৌবন ছিল তার শরীরজুড়ে। কালো শরীরে কারো সেটা তেমন চোখ পড়ে না কিন্তু শরীরমনে ছিল তার প্রেম। প্রেম? দূর হ!! শালার প্রেম। ওগুলার এখন কি দাম আছে ক! কোত্থাও দাম নাই। গ্রামেশহরে কুনখানেই দাম নাই। সব জায়গায় ঝলমলা করা তামশা নৃত্যাভিনয়। অভিনয় বলাটা ভুল। সবাই তো করে। এ জাউরাকাম ধনীগরিব সবাই করে। চুবালে তার একই রঙ। প্রভাটা তাই একধরনের বেঁচেই গেল। সে রঙটা নিয়েই চলে যায়। কিন্তু সেটা কথা নয়। এখন চৈত্রমাস। পাতাঝরার কাল। নিঃসন্তান প্রভার নিজের বলে কেউ ছিল না। কবেই না মা মরে গেছিল, মনে নাই। বাপ যে কে? থাকা না-থাকাটা ঠিক গল্প বানানো গল্পের মতো। কিছু লাগালেই হলো। লাগিয়ে লাগিয়ে যেথায় যায়। তারপর যা হয় শেষ, তাই তো সব গল্প। গল্পে যা রটে তা সত্য নয় আবার অসত্যও তা নয়। ধম্মপুত্র অযোদ্ধার সত্যের মতো বিশ্বাসে পরিণত হলেই তা শিল্প। প্রভা একা। মরে গিয়েও একা। সবার মুখে সে একা।
এসব প্রতিপাদ্যের বাস্তবিক কারণ, প্রভার গল্পের ওপারে গল্প আছে। কাইয়ূম চৌকিদার বিষণপুরের অন্য মানুষ। বিরাট বটতলার তলে অনেককাল পড়ে থাকা চৌকিদার কোনো এক কারণে পশ্চিম থেকে এ এলাকায় আসছিলেন। তারপর এখানে সেখানে থেকে একদিন দাঁড়ান এই জায়গায়। জায়গাটার কোনো নাম নাই। সক্কলেই এটারে কয় এন্দুরের টং। এই এন্দুরের টঙে যখন দাঁড়ায় তখন সন্ধ্যা কামানো রাত। রাতের গাঢ়তা তখনও নামে নাই। বটগাছের ঝুরিতে ছোপ ছোপ ঠান্ডা অন্ধকার ঝুলতে শুরু করে নাই। চৌকিদার গফুর বিড়ি টানে। কতোই আর বয়স, চব্বিশ। খুকখুকানি কাশির ভেতর চপচপা বিড়ির টান আর কীসের এক কটকটানি আওয়াজ। জনমানুষ কেউ ছিল না। একটু আগেই কসাইয়ের দোকানের বাতি নিভে গেছে। ওপারে দানাদানা ল্যম্পের আলো একে একে নাই হয়া যায়। চিক্কন ছোট রাস্তাটা দমে দমে খালি হয়। খালির পর খালি। উঠনি কিছু লোক এদিক ওদিক তারার আগুনের মতো চাটচাটি করে—তাও আর নাই। একটু সিমসিমা ঠান্ডা আছে। ঠান্ডার ওপারে মৃদুমন্দ ছেঁচড়া ধুলাটানা বাতাস। বাতাসের ওপারে বাতাস। সিক্ত বাতাস ক্যরম্যার করে। ধুরমুর করি এটা ওটা উড়ি যায়। চ্যাগার পড়ি যায়। ইন্দারার পাড়ের ছেঁড়া লুঙি উড়ি আসে। বাঁশের ডাবের শাড়ির মাথা সরাৎ করি পড়ি যায়। আর দড়ি ধরা গরু হামলায়। হাওয়া খোলা গায়ের চামড়া তখন সিউরি ওঠে। ফুলিফুলি ওঠে গায়ের রোম। আর তাতে চৌকিদারের বিড়ির টানে ওই শীত একটু উষ্ণতায় ধরে। সে সুখ টানে চারআনার বিড়ির বিনাশ সাধন হয়। তারপর ওঠার আগেই দেখে কোনার দিকে পড়ি থাকে এক বেজন্মা রক্তাক্ত বাচ্চা। এইডা কি? আন্ধারে পাও দোলায়। আর ঘুরায়। ভারক্যা করে কে যখন শীতবাতাস তাড়ায়া হুঁকা হাতে পুবে যায়—তখন নদীও নাই, নাকি আছে, না স্বর পড়া ছিল নদীর পানি—তাই চিনা যায় নাই, তাতে হুড়হুড়ানি আওয়াজ আসে। আওয়াজের ভেতর হুমহুম বাতাসের মধ্যে একপ্রকার শিরশির রাগী ধ্বনি বেগে বয়। নদীর পানির তাতে কিচ্ছু হয় না। সেই স্বর নিয়া ভেতরে ঢেউ পারানি করে। ঠিক ঢেঁকিতে পা ফেলার মতন। ঢেঁকি যেমন ওঠে-নামে তেমন তা করে। করতে করতে দূরে তার ছন্দ বাড়ে। আরও দোলায়। ঢেঁকির মাথার মতো ঢেউ নীল ডাউন করে না। তাতে বুঝি তরঙ্গের বেগ তৈরি হয়। ঠেলতে ঠেলতে সেই ঢেউ ঢেঁকির তুলনা ছাড়িয়ে দ্রুততর হয়ে দক্ষিণে গমনে ব্যস্ত হয়। কেন হয়? বাতাসের বেগ আর হাহাকার যেমন বাড়ে কিংবা হাহাকারের ভেতরে যে বেগধ্বনি সেটিও বাড়ে আরও বাড়ে কিছু বাইরের শব্দ—সেও শ্মশানের দিকে এগুলে কীসব পাওয়া যায়। বুঝি কালকের মরা পোড়ানোর কিছু কালছে পোড়া দণ্ড, আরও কালো কিছু ভাসে। সে ভাসুক কিন্তু বাতাসে ঠান্ডা বাড়ে। অনুভূত ঠান্ডার বিস্তার ঘটে যখন তখন নিঃসহায় বাচ্চাটা আরও কাঁদে, ঠান্ডায় বা ঠিকানায় বা হতে পারে আশ্রয়ের-প্রশ্রয়ের জন্য। কী করবে সে? পুঁটলির দানা যেন। পুত্তলির পাঙ্খা ওড়ে। জানভরা সে পুত্তলি। বাত্তি নাই কিন্তু সেই বাত্তির দাবি নিয়া অন্ধকারে হাতড়ায়। তড়পায়। অস্বীকার করে পানির ঢেউ বা আন্ধার অচল জনপদের শ্মশানকে। চৌকিদারের বিড়ির আগুন নেভে নাই। কতোক্ষণ চলে তা, কে জানে। দেশ-কাল-সময় ছায়া মাড়ায়। সময় সময় গতি টকটক ক্ষণগণনা দুদ্দাড় গত হয়। কিন্তু পোড়া গফুর বিড়ির ছবিটায় আগুন পৌঁছে না। শুক টানে সুখ আসে কিন্তু আগুন আগায় নাই—নাহ—এইডা তো তিন নম্বর বিড়ি—এরপর চার নম্বর—টানে মনে আসে জোবেদার কথা। কবে ছাড়ছে, সেই বউটা রোগা, কোনো তাল আছিল না। শরীরটা ছিল দায়সারা মতন। ঠিক চিলের ছায়া যেন। চিলচিল করে না তাই বেশিদিন তার ভাল্লাগেনাই। পরে সে ছাইড়া আসে। গোঙানিমার্কা মাইয়া দিয়া সে কি করে। মাইয়া যদি ফড়িং না হয়, তবে কীয়ের কি? জানে নাই আর কিছু। পড়ন্ত দুফুরে সে একহাতে চইলে আসে। তবে কী এক নরম নাদুস শরীরের গন্ধ বুকে করি নিয়া আসে। আসতে আসতে পথে একটা কীয়ের মোড় পড়ে সেহানে যখন দাঁড়ায় তহন দেখে একটা মরা কুত্তা। মরা কুত্তার মুখে রক্ত আর চক্ষু নিমীলিত। কুচকুচা কালা কুত্তার এ মরণ তার মনটাকে হতাশ করে। তখন সে মোড়ের দোকানটায় রেজকি ফালায়া কয়, দুইডা মলা দেও। সে মলা কেনে আর কয়, কুত্তা মারলো কেডা? দোকানি কোনো প্রতিউত্তর করে না। ষাইতের সময় এইটা কী রেজকি দেন? কিন্তু চৌকিদারের তা কানে যায় না। কুত্তার রক্ত তারে কামড়ায়। হঠাৎ সে কুত্তাটার কথা কানে ঢুকলে ঘেউ ঘেউ রবে কী একটা ভয় তার মনের ভেতরে ঢুকে যায়। তখন মৃদু ক্রন্দনরত শিশুটির ছায়া চোখের আগায় নাচে। দূরের কোনো হ্যাজাগ নাকি অন্য কিছু প্রভা সৃষ্টি করে চোখের আগায়। আরও আগায় দুলদুল ঘোড়ার পায়ের লাল রক্ত। লাল রক্তের ভেতর কুত্তার মুখ নাকি কুত্তার মুখে গড়ানো রাস্তায় সেই রক্ত স্রোতে এখানে আসে। আসতেই একপলকে তা দুলে দানা বাঁধে। আরও রক্তের ভেতর সাঁতার দেয় সেই পা দোলানো শিশু। এইটা এত রক্তে কেন পঙ্গর দেয়। পঙ্গর দেওয়া মানুষ এইহানে ক্যা? গফুর বিড়ির ধোঁয়াটা আর আঁশটে রক্তের গন্ধ মিলে কীসব কালছা, গেরুয়া নাকি খয়েরি রঙ দোলায়। হাহাহা—করে চৌকিদার পড়ন্ত শিশুটিকে বাজায়। সে কি নিভন্ত না প্রজ্বলময়? সে কি কোন্ জেন্ডারের? কার পয়দা? এইহানে কেন? একলা মাথায় আউলায়। এন্দুরের টং দোলে। আর হেই শিশু কোলে হাসে। হাসে হাঃহাঃহাঃ—পরিহাসের হাসি। হাসিস ক্যান। আমি তরে লমু না তো! রক্তমোছা শিশুর জন্ম—এই তো জন্ম সেই জন্ম—রক্তমাখা জন্ম, জন্মেছি এই জন্মানো দ্যাশে। জন্মসুখের গন্ধে গন্ধে সুখের সুখটান আর এন্দুরের টং যুৎজাত হয়া তাকে ধরে রাখে। কান্না কানে আসে কিন্তু ঠিক বাজে না। হয়রানি যে করে তাও নয়। তারপর এই বটতালায় তার ঘর হয়। কিন্তু কি জানি অজানা কারণে চৌকিদার আর তার প্রতিবেশীর লগে ছাড়াছাড়ি হইছিলো। বেহুদ্দা চৌকিদার খালি গতর নিয়া চলে আর গফুর বিড়ির ইজ্জত বাঁচায়। প্রভা সেই বটতলার কন্যা আছিল।
প্রভার মৃত্যুতে পাড়ার কেউ যদি না কান্দে সেটা নিয়া কথা নাই। কারণ, তার তো সামাজিক পরিচয় নাই। বরঞ্চ একপ্রকার মুক্তি সে পাইয়াছে। এই মুক্তিতে পৃথিবীর শান্তি-অশান্তির শোধ বা পরিশোধ কিছু নাই। তবে এন্দুরের টং এলাকায় প্রভা সমস্ত মায়া পুষিয়া রাখিয়াছে। যতো মানুষ আসে সকলেই একদিন পুণ্য প্রভার আলোতে চলমান নদী দেখিয়াছে, পাহাড় দেখিয়া স্বপ্নাপ্লুত হইয়াছে, হ্রদ-সমুদ্র-পাখালির মমত্বে ভরিয়া দিয়াছে। কার না আপন আছিল না সে? সুর করিয়া জীবনের জয়গান গাহিয়াছে। অপার সম্ভাবনা নিয়া সকলের সে কাছের আছিল। দায়িত্বে ছিল পূর্ণা। কথায় ছিল নম্র। পরোপকারে সেবায় সকলের হয়া একজন হয়। কতোবার কতোজন কইছে, তর বাপ আহে না? ছুড়িটার মায়ে ক্যা? প্রভা হাসিতে সুর আনিয়াছে। ধরার একজন হয়ে সৃষ্টির সত্যটুকু আওড়াইয়াছে। উপরে উপরে ট্যাংক চলিয়া গেছে, হানাদাররা সবটুকু ধ্বংস করিয়াছে, জনমের সাধ মিটাইয়া শরীরের ক্ষত ক্ষতাক্ত করিয়াছে—তবুও সে একই সত্যে একমানুষের কথা কহিয়া গিয়াছে। হ, মনে আছে, তার জন্মও হইছিল তুমুল প্রেমের ভেতর। কিন্তু আছিল অনেক কষ্ট। যে সমাজে তার নিষিদ্ধ জন্ম কত্তোবচ্ছর প্রচারিত ছিল, কিচ্ছু কেউ মানে নাই, মিলিত হইতে দেয় নাই, মনের আছিল না দাম, প্রেমের আছিল না সুখ—কিন্তু কোন নির্ধারিত সময় বিধির নিয়মে ঘনাইয়া আসে। হঠাৎ সমস্ত সুখে আপ্লুত হইয়া, সমস্ত দেহমন জড়াইয়া তুমুল বৃষ্টিভেজা সুখের দাপটে নামিয়া আসিয়াছিল গর্ভের জীবন। আনচান করা মন। আয়েশে জড়ানো সুখ। বিন্দুমাত্র তিলধারণের কোনো অপবাদ তাহাতে ছিল না। কেন থাকিবে? এ যে সমস্ত পৃথিবীর দাবি। মর্ত্যরে মুখাগ্নি। খচিয়া-পাড়িয়া তাহা বিনষ্ট করিবে কে? তাই তো সকলের দর সে মাপিয়াছিল। বহুদূরের জীবনকে সে দেখিয়াছিল। স্বাধীনতা আর মানবিকতার অনিঃশেষ বিন্দুটি সে আহরণ করিতে চাহিয়াছিল। প্রভার জন্ম হোক যথা তথা সে সবটুকুকেই তুচ্ছ করিয়া দিয়া নিজেই নিজের নাম রাখিয়াছিল। অন্ধকার শরীরকে সর্বদাই আলো করিয়া রাখিয়াছিল। আলো তো অন্ধকার তাড়ায়? অন্ধকার তো সকলকে পেছনে ঠেলে। সে ঠেলাকে সে সংগ্রামে শক্তিতে সম্মুখে আনিয়া ফেলিল। সকলকে সে কালা শরীরের ডাকে কালামেঘের বর্ষণের সংকেত দিয়াছিল। এই সংকেতে কী থাকে? কাহার তর্জনীর বার্তা থাকে? আর সেই বার্তা কী এই বিষণপুরের কারো একার—তাহা নয়। এক একটি বিষণপুর বহুদূর ছাড়াইয়া যায়। ছড়িয়ে পড়ে। সে হানা দিয়া কয়, হে বস্তির পুত তুই বাহির হ, হে স্তন্যবতী তুই শক্ত হইয়া তর নিরাপত্তা ল, হে পুরুষ তুই সাহসী হ, হে পিতা তুই সময়ের ডাক দে—এইরূপে একে একে বিষণপুরের হাওয়া সেই যখন বদলাইয়া দিতে চায়, তহনই একদিন অতৃপ্তির স্বাদ লইয়া জন্মের সুখ ছাড়াইয়া লয়। কীয়ের সুখ? নিজের লয় তো! প্রভা নাম তো তার আছিল না। তার নাম ছিল থ্যালথ্যালি। এ কোল ও কোল করে পুটুলির শরীরটা থ্যালথ্যাল হলে এরকম নাম হয়। সে বড় হয়। গুত্তা খায়। শুকনা হয়। ভারি হয়। কিন্তু থ্যালথ্যাল যায় না। কী কপাল। মনে হয় সুখের নহরে তৈরি নহবতখানায় জীবন ধন্য! কেউ তার খেয়াল করে না। বড় না ছোট, পুষ্টি না অপুষ্টি সেসব দেখার মালিক তো নাই। সবটুকু শুষিয়া নিয়া গেছে মরণ হারানো সময়। কী কারণে এই বিষণপুরের এন্দুরের টঙে কালা-জলপাই রঙা দুএকটা গাড়ি আসি থামে। ওগুলাও কেউ চিনে না। কী যে কারা ক্যাডা জানে। তহন আড়ার ওপার থাকি সেই জঙ্গলার ভেতর থ্যালথ্যালিরে দেখে। সে তহন ডুমুর কুড়ায়। ডুমুর খায় আর টরটর করি তাকায়। কালসিপড়া চোখেমুখে কালা ছাইয়ের শরীরের ছুডু হাড়জ্বালানি কইন্যা দেইখা ওদের জ্বালা জাগে। কেমুন মানুষ? কী কয় বুঝা যায় না। এধার ওধার কয়। সে ভয়ে ফুড়ুৎ করে। তখন ওখানে একটা বড় নালা দিয়া সুড়ুৎ করি তার লোকজনের ঘরোত ঢোকে। কী আর ঘর! পুরানা বাঁশের ডাবের ওপর কলাপাতার হ্যাকনার বেড়া দিয়া এ এলাকাটা ঘেরা। ঘেরার ভেতর আরও ঘেরা। ওই যে ছোট্ট করে চৌকোনা ওটা বাহ্যি করার জায়গা। মোটামুটি প্রত্যেকদিন গোটা পনেরো মানুষের কাম চলে ওতে। তার লাগোয়া ছাপড়া দিয়া ঘর তোলা হয়েছে। এদিক ওদিক অপরিকল্পিত ঘর। ঘরের বাইরেই আকন্দ আর আটাষ্যড়ির জঙ্গল। জঙ্গলের ওদিকটায় তুমুল ঘন ভাঁটফুলের বুনো গাছ। এই ফুলগুলা খালি হাসে আর এদের ন্যাংটা জীবনের দিকে তাকায়। তবুও ভাঁটফুলের গন্ধ যায় না! সে জন্মায় তার নিয়মে। রোদে ঝড়ে গম্ভীরে তার মরণ নেই। ধুমধুম করে যতো ধাওয়াই আসুক সে নিজের স্বরে আকণ্ঠ থাকে। পেছনে তাকায় হাসে স্বভাবে ফেরে এবং দুলতে থাকে—কী এক রং—ঘিয়ের মধ্যে পাতলা আরও কোনো রঙ আছে কি? ভেতরের পরাগ রেণু? খয়েরি অঙ্কন সবটাই এই বিষণপুরের রঙ। এন্দুরের টঙের মানুষের প্রেম আর রঙজ্বলা কণ্ঠের খাওয়া না-খাওয়া পীড়ন। মাঝেমধ্যে থ্যালথ্যালিটা এদিকে আসে আর রঙে রঙে কীসব ভাবে। ভাঁটফুল মরিলে কারো কিছু হয় না। কেউ কান্দে না। সে শুধুই সবটুকু দেখিয়া শুষিয়া যায়। ভাঁটফুলের জঙ্গলের কখনো দাগমারা দুটা কুত্তা শোঁ শোঁ করি দৌড়ায়, মরা শালিকটার গোশত খাওয়ার জন্য। কিন্তু গিয়ে তারা থমকায়। দেখে ফ্যান তোলা গোক্ষুর দাঁড়ায়া আছে। ফোঁস ফোঁস করলে কুত্তা দিশাহারা, কী যে লালাঝরা শখ সেটা—অপরাগ হলো। ফোঁসফোঁসানির জন্য বুক ঘেঁষে সরীসৃপটা এগিয়ে এলে কুত্তা পাল্টা দিকে দৌড় শুরু করে—আরও দৌড়ায় তার পিছু কালারঙের আরও দুটা কুত্তা ভুগতে ভুগতে পিছু নেয়—মরা পাখিটা আর গোক্ষুরটা তখন একে অপরের হয়। খুব সুখে ওটা নিতে চায় কিন্তু কী একটা বুঝে সে ফণা নামিয়ে ঘাড় দুলিয়ে অন্যত্র রওনা দেয়। চকচকা সূর্যের আলোর ছায়া পড়ে, আর ছায়ার ওপারে কায়া—তারপরও ওই মেলেটারির উর্দির রঙ আর সরীসৃপের রঙ একই থাকে। একইভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। পথের প্রান্তে না পৌঁছিয়ে এন্দুরের টঙের পাশে বসে আর মরা শালিকের মতোই কী একটা ভক্ষণের গুজব মনের ভিতরে আওড়ায়। কে? হল্ট চেক। বড় কেউ আসামাত্র জনাকয়েক উঠে স্যালুট করে। সব গুজব হারায়া যায় পাতলা মেঘের মতো। তখন ‘ঝুট হ্যায়’—বলে এগিয়ে গেলে সবগুলো বসে পড়ে। এন্দুরের টংটা খুব গরম হয়। গরমের ভেতর আরও গরম। কুণ্ঠা নয় ক্রেজ তৈরি করে। ক্রেজের ঠ্যালায় মরা শলিকের মুখে সরীসৃপের রাগ প্রস্তুত হয়। তখন না-খাওয়া বাহিনীর পেটক্ষুধা আর যৌনক্ষুধা এক হলে—ভিন দিকে তাকায়। চোখ নামায় না। চোখের সম্মুখে বিরাট সামিয়ানা আর ওই কলাপাতার ওপারে কারো হলদ্যা রঙজ্বলা শাড়ি দেখে কাঁপে ছায়ায় দোলে, রোদ ও রঙ শুষে নেয়—শোষণের ছলে শাসন করে। তখন বাহিনীর মন ভর করে তাতে কীসব আঠালো গাঢ় আয়না নাকি পাতকুয়ার পাড়ের জলভরা জোলার পানি দেখে—জোলার পানির কাঁপুনি আর শাড়ির কাঁপুনি আলাদা ভাবে খেললেও সেটি একইরকম হয়। বাহিনীর মনের বারান্দা এন্দুরের টঙ থেকে বহুদূর প্রসারিত হয়ে সেটি নাচতে নাচতে থ্যালথ্যালথেলির পানিরঙা কামিজের বুকের ওপর পড়ে। সেখানে হাতড়ায় আর পনির তেষ্টা মেটানোর বৃথা চেষ্টা করে। এরকম অবস্থার ভেতরেই আবার কমান্ড কানে আসলে সবটাই সরে যায়। থ্যালথ্যালির মুখও থাকে না। মরা শালিক বা সরীসৃপ সরিয়ে তখন কমান্ডই গুরুত্ব পায়। তারপর কী এক তর্জনীর ইঙ্গিতে সব্বাই এন্দুরের টঙ ছাড়ি ফলির বিলের দিকে টার্ন নেয়। অতঃপর আর তাহারা কি করিল জানা কঠিন হয়। কিন্তু থ্যালথ্যালি তখনও প্রভা হয় নাই।
তবে খুব বেশিদিন নয়। পাড়াটা উঠে যাক, তেলাপোকার মতো হেথাহোথা চলা জনসমষ্টি কই যায়, কী হয় কেউ জানে নাই। পাড় ভাঙে পাড় গড়ে। পাখিরা চিলের মতো ওড়ে। চিল আর শকুনের পার্থক্য কেউ করে নাই। কেউ লোভী কেউ বেশি দূর ওড়ে কেউ কমদূর । দূর আবার কী? সেগুলোর পরিসংখ্যান কেউ কখনো করে নাই। কেন করিবে? করার বিশেষ কাম নাই। আর পৃথিবীতে কে কতোজনের খবর নেয়। দিনের তরে রাতের মাঝে গৎবাঁধা কিছু পরিবর্তন আসে। এন্দুরের টঙ ক্রমশ বিলোপ হয়। এর পাশের জায়জঙ্গলে নানারকম নতুন গাছ, পরগাছ বড় হয়। অন্ধকারে নানারকম জন্তু জানোয়ারের উপদ্রব বাড়ে। মানুষগুলা নাই হয়া যায়। ছাপড়া, পাতকুয়া, ভেন্নপাতার ঘর সব উন্মুক্ত। তখন নানা দিকে বায়ু বয়। ঝড়জলে কীসব ঘটে। এন্দুর টং না থাক এন্দুরের উৎপাত বাড়ে। তবে এসব উর্বর ভূমির বাড়ন্ত আগাছার ভেতর সবকিছুই প্রকৃতির নিয়মে পরিত্যক্ত স্তূপ হয়ে বিরান লবণাক্ত রোদপাথারে পরিণত হলে ওরা নাই হয়া যায়। বুঝি কোথায় চলি যায়। নদীর পাড়ে—যেখানে হাগা-খাওয়ার সুবিধা বা আহার উপার্জনের সহজ কাম চলে আর নিরাপদ যৌনতা চলিবে সেখানেই তাহারা আছে। থাকিবে। থ্যালথ্যালির জীবনও একমতো। একই নহবতে সহযোগ। বুঝি সেই মোগল এ আযমের জহরত আর সেই প্রাসাদ আর বিলাসী জীবনের অপার সুখ বা আরও কোনো সুখের দিকে সে চলিয়া যায়। চলতে চলতে কার দেখা হবে এ পথে বা পথের সীমানায় কে জানে? জীবনের গল্প তো দাঁড়ায় না। কোন পথ দিয়া কে চলিবে কোথায় যাইবে কে জানে। থ্যালথ্যালির নাম বদলিয়া গেল। হঠাৎই সে এক সেনাবাক্সে করিয়া বা কোন আদরে পড়িয়া চুমুতে চুমুতে এক অজানা ক্যাম্পে চলিয়া আসে। কীভাবে সে হাতবদল হয়, কাহার সান্নিধ্যে সে এলাকার পর এলাকা ছাড়িয়া আসে সে অন্ধকার রাতের কাহিনি কেউ জানে নাই। তবে কেউ একজন কয়, তুমি সুন্দর, তোমারে কাজে লাগানো হবে। কাজের ক্ষেত্রে তুমিই পারফেক্ট। কাজ কী? এটা কি মরুঅঞ্চল? না, সে আসিয়াছে এক বড় আশ্রমে। সেখানে তার ঘষামাজা হয়। নতুন সাবানে স্নান হয়। কীসব গুলজার কথাবার্তায় তাহার মন ভরে। খাওনের তো অভাব নাই। এইটা আর এক প্যান্ডেল। এখানে কিছু মানুষের সেবা কম্ম চলে। সেই কাজে থ্যালথ্যালির কিছু শেখার আছে। মাদার তাহার মন বুঝে কাজ দেন। মাদার এই বড় ক্যাম্পের প্রধান। তাহার নির্দেশে পুরোটা চলে। এই বন্দিশালার শেষ লক্ষ্য কি থ্যালথ্যালি তা জানিবে কেমনে। সে যখন ধরা পড়ে আর কে একজন নিয়া আসে—তখন সে কিচ্ছু বলে নাই। থ্যালথ্যালির বলিবার কে আছে? সে তো নদীর পুরানা জল। জলের গতি উঁচু হইতে নিচুর দিকে। সে ছায়া নিয়া সে নিচুর দিকে চলে। নাইয়া নাও বায়। সমস্ত ভরা জীবনের সেই ছন্দ কাইয়ূম চৌকিদার, এন্দুরের টং, বিষণপুরের বটতলা কবেই কোথায় চলিয়া গেছে। সব ছেড়ে এ পাড় ওপাড়—সেই দলবদ্ধ হয়া নদীর বাতাত ঠাঁই নেছেলো। তারপর ঘুমের রাইতে কী এক বাঁশির আওয়াজে আবার তাহারা ঘুমভাঙা চক্ষে কোনদিকে তাড়ানো হয়। তাড়াইতে তাড়াইতে চলতে চলতে কোন এক এলাকার খাসজমির দিকে লক্ষ্য আছিল। উদ্বাস্তু তো শুধু বসতিতে নয় জীবনে ও জানেও। ফলে এইরূপ চললেও তার হাগামোতা লাগে। একসময় তাহারা শরীর থেকে মাসান্তরের ঋতু শুরু হয়। কিছুই তো সে জানে নাই। বুঝে ওঠার আগেই এপার ওপার ধাওয়া জীবনের তরে কাক আর শকুনের কল্লোলের ক্রিয়ার এই জালে সে আটকাইয়া যায়। প্রথমে নাকি ওরা কয়, এইডা কামে লাগবো। সত্যিই সে বুঝি কোনো কামে লাগছে। মাদারের আশ্রয়ে সে কামের মধ্যে থাকে। স্বাস্থ্যবতী হয়। সুখী হয়। শন্তি পায়। সবটুকু নিয়া সে বড় হয়। ক্রমশ সে কালোর ওপর আলো পড়ে। আলোর রোশনাই তো এমনিতে নয়। মায়া পাইলে কতোকিছুই আর পুরানা থাহে না। সে স্বভাবে বদলায়। পরিবেশের আনচানে ছায়াপাত করে। ছায়ার মধ্যে উষ্ণতা রচিত হয়। গভীর নিদ্রা প্রসব করে। নৈঃশব্দ্যের রাতে নয়া যৌবনের আবেশ রচিত হয়। কতোরকম প্রসাধনীতে রোদ তার রঙ বদলায়। নির্বিশেষের রদ্দি জীবন ফেলিয়া বিশেষ হয়া ওঠে। শীত সকালের পচা চালকুমড়ার বদলে কচি সবুজ শসার শিরিস গদ্য রচিত হয়। ভোরগুলো নানা আলাপচারিতায় ভরানদীর মতো ডগমগে হয়া ওঠে। কী নাই তার এখন। থ্যালথ্যালিকে রাতের চাদরে গ্রহণ করিয়া মাদার বলে তুমি ‘প্রভা’। যে আলো আর ছায়া তোমার সতেজ স্বাস্থ্য দিয়াছে সেখানে তুমি বন্য নও ধন্য। তাই তুমি তোমার আলোয় এখানে একসময় আমার হয়া অন্যদের ছায়া দিবা। প্রভার প্রচুর আলোকে কতোকিছুই নতুন আলো পাইবে সেটা তুমি বুঝিবে। ছায়া আরও বড় হয়। শিমুল বড় হয়। শিমুলের গোড়াটায় উঁই ধরিয়াছে। সেখানে বুঝি সন্ত্রাস চলে। কীরকম একটা বেপরোয়া গোড়ার অংশটা। উপরের লালে লাল প্রভাময় গুচ্ছ গুচ্ছ করতাল। সে করতালে গভীর রৌদ্রছায়ার নিবেশ নৈতিকতায় থাকে। কিন্তু গোড়াটা চাপে হোক আর নিশ্চাপে থাক—কেমন ঢেউ ঢেউ হয়া ফুটে থাকে। উঁই লাগে। তাতে বস্তির মানুষের পচা মোটা কাপড় শুকানো যায়। কেউ গোবর শুকায়। প্রভার দশা কী সেই শিমুলের। কতোভাবেই তো সে সেবায় চিন্তায় দক্ষ হইয়া রৌদ্র আর জ্যোৎস্নার জীবন গড়ে। কিন্তু গোড়াটা নান্দনিক নয়। সে শুধু কাইয়ূম চৌকিদার আর বিষণপুরের জন্য উন্মুখ হয়া থাকে। তার মুক্তির জায়গা যেন সেটাই।
মাদার যতোই শিক্ষা দিক, আনন্দে রাখুক, জীবনের সবটুকু নক্ষত্রনিষ্ঠা শিখিয়ে দিক তবুও ফিরে ফিরে সে চৌকিদারের কথায় ফিরে যায়। সেই তো তার জীবনদাতা। সেই তো প্রথম ওই বিষণপুরের জমিনে জীবন ফিরিয়া দিয়াছিল। তারপর এখন সে ফিরিয়া চলে শেখে দেশজন্মের কথা কয়, সত্যস্বরূপা হয়া সকলেরে আগলাইয়া রাখে, কী যে সে তর্জনীর দাম, যেজন্য সবটুকু স্বপ্ন দিয়া সে সকলেরে এক কইরা ফেলে। তবে হ, মাদার তার আর একটা জেবন দেছে। এরকম কইরা কইলে তো যে তাতে সেই আন্ধার রাইতে পছন্দ করছিল সেও তো জেবন দেছে। মাঝেমধ্যে তার মনে পড়ে : ‘আসমান জমিন ফারাক কইরা অকাল কুসুম রোও রে বন্ধু... / কাছে আইসা নিবা রে হয় / নিও রে বন্ধু... রে হায় নিও রে বন্ধু’—গুনগুনাইয়া সে গায়—কই পাইলো এই পূন্নিমাসুর, সেই বিষণপুর—বুনোহাওয়ার সেই দিন। ভাবতে ভাবতে সে কাইন্দা দেয়। প্রভা এখন বুইঝা গেছে, সমস্ত সুখ যেন সে কিইনা ফেলাইছে। কীভাবে কে যেন তাকে ডাকে, হুপ পাইড়া কান্দে। এই সুখের জীবন তার তেমন আনন্দ দেয় না। ভেতরে একটা কঠোর জেলখানা তৈরি হইছে। এইটা কী? কেন এমন হয়! এই হাসপাতালের জেবন একসময় তাহাকে বিতাড়িত করে, গুনগুনাইয়া ভজে—নিও রে বন্ধু ... ও হায়—কইতে কইতে সে শুইয়া যায়। সমস্ত শরীরজুড়ে কামনার মানচিত্র ছাইয়া রয়। নিজের সাথে নিজেরে রমণ করতে মন চায়। রমণের সুখ তারে অ্যারেস্ট কইরা ফেলে। নিজের মুখ, বুক, স্তনবৃন্ত, পেট, নাভি, উরু, পদযুগল, অঙ্গুলিগুচ্ছ, নখের ছাদ নিয়ে সে এক অদ্ভুত পুরু পুকুর তৈরি কইরা ফেলে। সেখানে সে ডুবিয়া যায়। আচ্ছন্ন হয়। কম্প্রমান মুখ কাঁপে। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু বিসর্জিত হয়। বৃত্তাকার বর্ণালি আভায় কার কথা মনে আসে? জোবেদার স্বামী কাইয়ূম চৌকিদার? সে তার বাপ? না—বাপ কেন? তার সুন্দর সোনা মুখ, যে মুখে সে চুমা দিছিল, আদর করছিল, বাসনা দিছিল—সেই বাসনা বুঝি তারে আবার ডাকে—আয় আয় আয়! উপদ্রব নয়, আনন্দ পায়। সে তারে ভালোবাসছে। সে তারে প্রেম দিছে। প্রীতি দিছে। আর আমি তার লগে যামু। প্রভার বৃত্তে কাইয়ূম চৌকিদার ছায়া হয় থাকে। শীতল হাতের স্পর্শ ভুলি যায়। ফুল ফল নীলাকাশ সবটুকু ওই ঘুমের তিমিরে ডুইবা থাকে। এ এক নিরুদ্বেগ রাজশিশু যেন। সে কি তবে জোবেদার হয়া চৌকিদারের কাছে নিজেরে সাজাইছিল। কালো আঁখির মতো এক কবিতার নবীন জাতক হয়া উঠেছিল। পারে না তাই পরির মতো সে হাওয়ায় দোলে। কিন্তু হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলে প্রভা অস্থির হয়। অন্য জীবন আর এ জীবন একাকার করিয়া মাদারের আহ্বানে ফিরে যায়। মদির মায়া চুবিয়া যায়। কিন্তু পরিণতি তার যাই হোক—সে এই পূর্ণতর আয়েসের রাজশিশুর জীবন হইতে মুক্তি চায়। সে ফিরিবে ওই বিষণপুরের বটতলায়।
বটতলায় যখন কেউ নাই, এন্দুরের টং যখন হারানো প্রত্নগহ্বরে নিপতিত তখন তিমির গহন রাত্রি। সে সবটুকু নিয়া সেখানেই হাজির। মাদারের শর্ত মাথায় নিয়া সে এখানে আসিয়াছে। এখন সে নতুন দিনে কতো প্রশান্তির চিত্ত মন্থরিত হতে দেখে। তাই তার এ স্থান মাতৃগর্ভের সুখের মতো। এখানেই সে নিজের কাজের বিস্তৃতি যখন ঘটাইবে তখন কুহু-ঝঙ্কারের নেশায় সে অবমুক্ত। এই মুক্তি তাহার প্রাপনীয়। সে প্রাপ্য। আত্মহারা সে এবার। এই ফেরা আর কাইয়ূম চৌকিদারের জীবনে ফেরা যখন একইরকমের তবে—সে কিছুদিন এখানে থাকিয়াই মেল্যা রকমের কাম করিতে পারিবে। মাদারের স্বপ্নের একটা এক্সটেনশন এখানেই গড়িয়া উঠুক। কিন্তু সেটি তো সহজ নয়। এই নিরাকপড়া এলাকায় এসব জীবনকর্ম কেউ মানিবে না। তবে অর্থকড়ি আর অন্তরঙ্গ স্বচ্ছলতা আনিতে পারে নতুন পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের জন্যই কাইয়ূম চৌকিদারের স্মৃতিমাখা এই স্থানে তার প্রত্যাবর্তন।
কিন্তু গল্পের প্যার‌্যা আর জীবনের প্যারা যখন বাড়ে সবকিছু সে সামালাইয়া তীরে ওঠারই চেষ্টা করে। সেটা যখন অনুশীলনের বাতাসে জুড়িয়া গভীর আরামে কর্মক্লান্ত তখনই একপ্রকার প্রভা আত্মমাঝে নিজেরে বিলায়। তাতে দেশটা আর দেশের মাটির কৃত্যঋণ সহস্র আকাশে কীসের উত্তর খুঁজিবে কে জানে? হঠাৎ মৃত্যুর পরও হঠাৎ জন্মের মতো সে শুধু সকলের হাহাকাররূপে মধুর নিশায় ব্যাপৃত থাকিল। কাজ আর কিছু পুরাতন কথাই তখন ঘুরিয়া ফিরিয়া আসে কিন্তু তা মাত্র কয়দিন! তারপর এই দণ্ডে পৃথিবী সুন্দর হয়া স্বাভাবিকরূপে চলিতে থাকে আর ক্রমশ তা নিজের মতো বদলাইয়া যায়। তখন উপায় কী? গল্পের তো শেষ নাই! এক চৈত্র—চৈতালি গেলে আবার কোনো চৈতালি আসিবে। পুনর্বার তাহা গল্পের জন্য আর এক তোরণ তুলিবে—মরিবে—আবার তুলিবে...

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আম পাড়তে নিষেধ করায় পিটিয়ে হত্যা
আম পাড়তে নিষেধ করায় পিটিয়ে হত্যা
‘সাংবাদিকদেরও দায়বদ্ধতা আছে’
‘সাংবাদিকদেরও দায়বদ্ধতা আছে’
ইভিএমে কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে পুরস্কৃত করা হবে: ইসি আহসান হাবিব
ইভিএমে কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে পুরস্কৃত করা হবে: ইসি আহসান হাবিব
নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ চায় মহিলা পরিষদ
নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ চায় মহিলা পরিষদ
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত