X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

বেড়াল

কবির চান্দ
০৩ এপ্রিল ২০২২, ১৬:০২আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২২, ১৬:০২

কে বলে এটা জৈষ্ঠ্যের মধ্যদুপুর? এ ঘরে, কার্পেটের নরম ঘাসে পা ডুবিয়ে, সোফার রেশমি বুকে গা এলিয়ে, যে কারও মনে হতেই পারে স্বর্গ যদি থাকে তো সে এইখানে, এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রকের হিমেল বাতাসে, হালকা আলোর নীলাভ ছায়ায়। অন্তত কৌশিকের তা-ই মনে হল। এই মূহূর্তে সে ব্যারিস্টার খানের ড্রয়িংরুমে বসে। অপেক্ষায়। মিসেস খানের অপেক্ষায়।

ঘড়ির দিকে তাকালে কৌশিক বুঝতে পারত, এখানে আসার পর সেকেন্ডের কাঁটা তার গ্লাস-ঢাকা নিজস্ব পৃথিবীকে পঞ্চান্ন বার পাক খেয়েছে। কিন্তু সে বোঝেনি, কারণ এরকম নানা ঘরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘড়ির দিকে তাকানোর অভ্যেস ঘুম জড়িয়ে আসা ছাত্রের হাত থেকে কলম খসে যাওয়ার মতো কবেই যে খসে গেছে, কৌশিক তা জানে না। আর আমরা, লেখককূলও, সে ইতিহাস লিখে রাখিনি। ফলে কৌশিক বুঝতে পারে না অপেক্ষার প্রহর কতটা দীর্ঘ হয়েছে। প্রায় একঘণ্টা ধরে তার এ অপেক্ষা অসহনীয় হতে পারত, যদি না সামনের ওই ছবিগুলো থাকত। ব্যারিস্টার খানের ছবি। কোনোটিতে নামজাদা মন্ত্রীর সাথে করমর্দন করছেন, কোনোটাতে তার বাসায় আসা খ্যাতিমান লোকদের সঙ্গে গল্প করছেন, কোনোটাতে আবার বিদেশের কোনো হোটেলে ক্রিকেট তারকাদের সঙ্গে পোজ দিয়েছেন। মাঝখানের একটিতে সরকারপ্রধানের হাত থেকে স্বাধীনতা দিবসের পুরস্কার নিচ্ছেন।

ছবিগুলোর তলায়, লম্বা দেয়ালজুড়ে নিচু করে বানানো শো-কেসে হরেক রকমের জিনিস, নানা রঙের, নানা আকারের, নানা দেশের। ব্যারিস্টার খান যত দেশে গেছেন, যত শহরে গেছেন, সেগুলোরই স্মারক হিসেবে আনা শো-পিস। পত্র-পত্রিকায় দেখা ছবির সাথে মিলিয়ে কয়েকটাকে চিনতে পারল সে। ডানদিকেরটা নিউ ইয়র্কের এক সময়কার টুইনটাওয়ার, তার পাশে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, আরেক দিকে চিনের প্রাচীর। চেনা গেল মিশরের পিরামিড আর আগ্রার তাজমহলকেও। কিন্তু অন্যগুলো তার কাছে কেবলই কিছু উজ্জ্বল আর সুন্দর বস্তু হয়েই থাকল, যেন ট্রেনে সামনের সিটে বসা কোনো সুন্দর তরুণী, যার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে, কিন্তু নাম জানা হয়ে ওঠে না। কৌশিকের অবশ্যি বেশি ভালো লাগল পাশের দেয়ালে টানানো মুঘল আমলের ভারতীয় একটা চিত্র, যাতে হাতির পিঠে চড়ে শিকাররত যুবরাজ জাহাঙ্গীরের ওপর একটি সিংহীর আক্রমণ শিল্পীর নিপুণ তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কোনো ছবি আসল না নকল তা ধরবার সাধ্যি কৌশিকের নেই, তবে ইতিহাস জ্ঞান থেকে অনুমান করল এটি নকল, মূল ছবিটি হয়তো ইংল্যান্ডের কোনো জাদুঘর বা সংগ্রহশালায় আছে। সে একবার ছবিটার দিকে তাকাল, একবার তাকাল তার নিচে খান সাহেবের বসার চেয়ারে, যার পাশে একটি টিপয়ে রেশমি সুতোয় তৈরি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্বোদ্ধত মাথা অন্যদের ছাপিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচেছ। আবছা আলোয় এরও চোখ যেন টিভিতে দেখা রাতের বাঘের মতই জ্বলছে। অবশ্য খান সাহেব এমন অনায়াস ভঙ্গীতে সোফায় বসেন যে মনে হয় বনের বাঘও বুঝি তার করতলে চুমো খায়।

কৌশিক প্রায়ই এখানে আসে। ব্যারিস্টার খানের পূর্বপুরুষ তাদেরই গাঁয়ের লোক ছিল। এখন এরা গ্রামে না থাকলেও সে সূত্র ধরেই চাকরির আশায় তার বাসায় আসা। অবশ্য দেখা যে সব দিন হয় তা নয়। কোনো দিন হয়তো তিনি ওই আসনে এসে বসেন, টুকটাক কথা বলেন, চাকরি-বাকরির কিছু হলো কি-না জিজ্ঞেস করেন, আর প্রতিবারই এককপি করে ওর জীবন-বৃত্তান্ত নেন। কোনো দিন-বা কাজের লোক এসে বলে, সাহেবের শরীর ভালো নেই, দেখা হবে না। আপনাকে বায়োডাটা দিয়ে যেতে বলেছে। সে তখন তার হাতে জীবন-বৃত্তান্ত দিয়ে চলে আসে। আজ অবশ্যি অন্য ঘটনা। দারোয়ান গেটের খিড়কি খুলে দিতে লম্বা বাগানটাকে চুলের সিঁথির মতো ভাগ করা লাল ইটের রাস্তা পেরিয়ে মূল দরজায় এসে কৌশিক বেল টিপলে ভেতর থেকে একটি সুরেলা আওয়াজ ওঠল। বীণার তার শুধু টংকার দেয়, কথা বলে না, এমন কণ্ঠ যে না শুনেছে সে এ নিদারুণ ভুল ধারণা নিয়েই প্রাণ ত্যাগ করবে।

‘কে?’
‘আমি কৌশিক। খান সাহেবের কাছে এসেছি।’
‘উনি ইটলি গেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটা কনফারেন্সে।’
‘কবে ফিরবেন?’
‘সেটা বলা যাচ্ছে না। কয়েকদিন পর এলে দেখা হতে পারে।’
খবরটা জেনে দরজা থেকে কৌশিক ফিরে আসছিল, সে মুহূর্তেই আরেকটি নারীকণ্ঠ কানে বাজল।
‘এই যে ভাই, হুনছেন?’

ঘাড় ঘুরিয়ে কৌশিক দেখে যে খোলা দরজার পাট ধরে একটি আঠারো-উনিশ বছরের তরুণী, পরনে কম-দামি সালোয়ার কামিজ, মাথায় চুলের খোলা জঙ্গল। বোধ হয় কাজের মেয়ে।

‘কী?’
‘মেমসাব আফনেরে বইতে কইছে। আইয়েন।’
‘কেন?’
‘হেইডা আমি কি জানি? বইতে কইছে, আইয়েন, ভিতরে বইয়েন।’
মেয়েটি দরজা খুলে ধরে ড্রয়িং রুমের দিকে ইশারা করে।

তারপর থেকে এ অপেক্ষা। অন্যদিন খান সাহেবের জন্য, আজ মিসেস খানের জন্য। কৌশিক তার পরিচিত ঘরটাকেই আবার দেখতে থাকে, খুঁটে খুঁটে। এক সময় কাজের মেয়েটি ঢোকে, হাতে সোনালি রঙের ট্রে, সোনার কাজ করা কি-না কে জানে।

‘নেন, একটু নাশতাপানি খান। মেমসাবের আইতে দেরি অইবো, গোসলখানায় ঢুকছেন।’

খান সাহেবের পরিবারের কেউ হলে কৌশিক হয়তো ভদ্রতা করে ‘এ সবের কী দরকার ছিল’ গোছের কিছু একটা বলত, কিন্তু কাজের মেয়ের সঙ্গে ভালোমানুষি দেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল না সে।

‘ঠিক আছে। রেখে যাও।’

মেয়েটি উবু হয়ে টি-টেবিলের ওপর ট্রে নামিয়ে অভ্যস্ত হাতে হলুদ রঙের শরবতের গ্লাস আর মিষ্টির পিরিচ কৌশিকের সামনে রাখে। ট্রে তুলে সোজা হবার সময় শিথিল ওড়না আর ঢোলা সালওয়ারের প্রান্ত ঘেঁষে ব্রা-হীন বুকের ঢেউ এসে আঠাশ বছরের চোখে আছড়ে পড়ে। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে,

‘ভাইজানের নামডা জানি কি?’
‘কেন?’
‘এমনি। জানবার চাইছি। আফনেরে ত পরায়ই দেহি, হের লাইগা।’
‘কৌশিক।’

ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হলেও সে জবাব দেয়।

‘আমি কুলসুম। এ বাড়িতে আছি পরায় দশ বছর।’
‘ও।’

কৌশিক আগ্রহ দেখাচ্ছে না বুঝতে পেরে কুলসুম ভিতরে চলে যায়।

সামনে নাশতার প্লেট দেখে নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি করা শরীরে ক্ষুধা চাগিয়ে ওঠে। শ্রুতিমধুর গানের অন্তরার মতো শরবত আর মিষ্টি দ্রুত শেষ হয়ে যায়। না ফুরোতে চাওয়া অপেক্ষার পালাও একসময় ফুরিয়ে আসে। ভারি পর্দা ঠেলে বাসার ভেতর থেকে কালো ভূষণে হলদে শরীরের এক দীর্ঘাঙ্গিনী ঢোকেন। বাতাসে হিল্লোল তুলে কৌশিকের সামনে দিয়ে টি-টেবিলটাকে পাশ কাটিয়ে খান সাহেব যে সোফাটায় সব সময় বসেন সেদিকে এগিয়ে যান। বোধ হয় এরকম কারও সামনে দিয়ে চলে যাওয়াকে মনে রেখেই বিদ্যাপতী লিখেছিলেন, ‘যব গোধূলি সময় বেলি, ধনি মন্দির বাহির ভেলি/ নব জলধর বিজুরি রেহা, দ্বন্দ্ব পসারি গেলি’, গোধূলিবেলায় তরুণীটি মন্দির থেকে বের হ’ল, তার সৌন্দর্য এমন যে কবির মনে হ’ল যেন নবীন মেঘ থেকে বিজলি চমক দিয়ে চকিতে মিলিয়ে গেল। ভদ্রমহিলা অবশ্য চকিতে মিলিয়ে গেলেন না, বরং আয়েশ করে, বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে সোফায় বসলেন। একহাত কোলের ওপর, আর হাতের আঙুলগুলো পাশে রাখা বাঘের মূর্তির মাথায় ব্যস্ত। চট্ করেই আপাদমস্তকে চোখ বুলানো হয়ে গেল কৌশিকের। পিঠ-ছোঁয়া কালো চুলের সঙ্গে ম্যাচ করা কারুকার্যপূর্ণ শাড়ির আলগোছে পথ বেয়ে তার দৃষ্টি এসে থামল মাত্র গজখানেক দূরের ধবধবে ফরসা পায়ের পাতায়, যেখানে গোলাপি স্যান্ডেলের সাথে লাল আলতার সুমানান মাখামাখি। একটা মিষ্টি গন্ধ এসে নাকে আদর বুলিয়ে গেল, তবে সেটা কোন্ পারফিউমের, কৌশিক বুঝতে পারল না।

‘আমি মিসেস খান। তোমাকে তুমি করেই বলি।’
‘জি নিশ্চয়ই। আপনি গুরুজন, যেভাবে ইচ্ছা ডাকবেন।’
‘চাকরির ইন্টারভিউর মতো কথা বলো না তো। আমি কি বুড়িয়ে গেছি?’
‘না-না, আমি আসলে ও ভাবে বলিনি। সরি।’
‘ইটস অলরাইট। কী নাম তোমার?’
‘কৌশিক।’
‘বাঃ, সুন্দর নাম। তোমাকে তো মনে হয় প্রায়ই এখানে দেখি।’
‘জি, ব্যারিস্টার সাহেবের কাছে চাকরির তদবিরে আসি।’
‘আই সি। তিনি কোনো ব্যবস্থা করেছেন?’
‘এখনো কিছু হয়নি। তবে চেষ্টা করছেন।’
‘ও.কে.। আমিও দেখব তোমার জন্য কিছু করা যায় কি-না।’
‘আপনার দয়া।’
‘আবার ইন্টারভিউ?’

শক্ত পাথরে কাচ পড়ার শব্দ তুলে বাঁধভাঙ্গা হাসি ছড়িয়ে গেল সারা ঘরে। জবাবে কী বলা যায়, বুঝতে পারল না কৌশিক। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। সে-ই আবার কথা তুলল।

‘ওই ছবিটা খুব সুন্দর।’

দেয়ালের গায়ে সাঁটা মুঘল আমলের চিত্রটার দিকে দেখিয়ে বলল সে।

‘শুধু ছবিটাই?’

‘না, না, এ ঘরের সবকিছুই। তবে আমার চিত্রকলা ভালো লাগে।’

‘ওটা খানের পছন্দ। আমার পছন্দেরও কিছু কালেকশন আছে। দেখবে?’

‘জি। ভার্সিটিতে পড়ার সময় চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রদর্শনীগুলোতে মাঝে মাঝে যেতাম।’

‘তাহলে তো তুমি রীতিমতো সমঝদার। ভেতরে চলো।’

সোফা থেকে উঠতে উঠতে মিসেস খান ডাক দেন, ‘কুলসুম, এই কুলসুম, ড্রয়িংরুমে চা দে, মেহমান যাবার আগে চা খেয়ে যাবে।’ কৌশিক তাকে অনুসরণ করে বাসার ভিতর দিকটায় ঢোকে। সঙ্গে আনা ব্যাগটা ড্রয়িং রুমেই থাকে। এত বড় লোকের বাড়িতে ওটা কেউ ধরবে না এ বিশ্বাস তার আছে। এছাড়া বহু ব্যবহারে বিবর্ণ হয়ে আসা ব্যাগটাতে তেমন কিছু থাকেও না, বায়োডাটা, চাকরির বিজ্ঞাপনযুক্ত পুরনো দৈনিক আর পানির বোতল ছাড়া। কৌশিক তাই ব্যাগটা সঙ্গে নিল না, সোফার পাশে রেখেই মিসেস খানের সঙ্গে গেল। বিশাল ডাইনিং রুম আর ফ্যামিলি স্পেস পার হয়ে আধো-আলো আধো-অন্ধকার যে কক্ষটাতে তারা ঢুকল তা নিশ্চয়ই বেডরুম। মাঝখানে পাতা কিং সাইজের খাট তো সে সাক্ষ্যই দেয়। মিসেস খান দেয়ালের দিকে গেলেন, সুইচবোর্ডের দিকে হাত বাড়ালেন। পায়ের গতি অভ্যস্ত হলেও হাতের আঙুলগুলোকে কৌশিকের অনভ্যস্ত মনে হলো, কোনোবার ডিম লাইট জ্বলল, কোনোবার নীল লাইট, কোনোবার-বা তীব্র আলোর ঝলকানি দেওয়া ডাবল টিউবলাইট। শেষ পর্যন্ত খাটের চারপাশ ঘেঁষে মেঝে থেকে অস্ফুট আলোর ফোয়ারা বের হলো, যাতে দেয়ালগুলো, বিশেষ করে দেয়ালের ছবিগুলো দৃশ্যমান হলো, কিন্তু বৃষ্টির পর কলসির ভাঙ্গা টুকরোয় রয়ে যাওয়া পানির মতো কিছুটা অন্ধকার বিশাল খাটের মাঝখানে জমেই থাকল। কৌশিক মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। বিশেষ করে একটা ছবির ওপর এসে চোখ আগ্রাসী হয়ে উঠল। উদ্ভিন্ন যৌবনা এক যুবতীর প্রমাণ সাইজের ছবি। মানুষের শরীর যে কতটা সৌন্দর্যের আকর, শিল্পীর চোখ দিয়ে না দেখলে তা কে বুঝতে পারে? মূল ছবি এটা নয় নিশ্চিত। আগে এর একাধিক কপি চোখে পড়লেও প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট উঁচু মানুষের প্রমাণসাইজ কপি এর আগে দেখেনি সে।

‘বিদেশ থেকে আনালেন বুঝি?’

‘না, এতবড় সাইজ বিদেশেও খুঁজে পাবে না। এখানেই আঁকানো।’

‘কে আঁকল এত নিখুঁতভাবে?’

মিসেস খান দেশের একজন নামজাদা চিত্রকরের নাম বললেন। কৌশিক অবাক হলো।

‘উনি কপি করেন জানতাম না তো।’

‘ঠিকই বলেছো, উনি কপি করেন না। বিশেষ অনুরোধে আমাদের জন্য করে দিয়েছেন। খানকে অবশ্য অনেক পে করতে হয়েছে।’

বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়ল। এত বড় একজন শিল্পী টাকার জন্য অন্যের ছবি কপি করে দিয়েছেন ভাবতে কষ্ট হলো তার। কিন্তু চোখের সামনের এই প্রমাণ সে অবিশ্বাসই-বা করে কী করে?

‘তুমি ছবি দেখো। আমি রান্নাঘরটা একটু ঘুরে আসি।’

‘আমিও তাহলে যাই।’

বড়লোকের বেডরুমে একা থাকতে চাইল না কৌশিক। কোনো কিছু খোয়া গেলে পরে আর মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না।

‘না, না, তুমি থাকো। চা রেডি হলে কুলসুম তোমাকে ডাকবে।’

মিসেস খান দরজার দিকে গেলেন। কৌশিক এবার অন্য ছবিগুলোর দিকেও মনোযোগ দিলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অবশ্য কুলসুম ঢুকল।

‘ভাইজান, চা দিছি, আহেন ।’

কুলসুমের চোখ উজ্জ্বল, মুখে হাসি, এই অকারণ খুশির উৎস কী কে জানে। কৌশিক বেডরুম থেকে বের হয়ে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসল। চায়ের উষ্ণতায় ঠোঁট ভেজাতে ভেজাতে সে সদ্য দেখা ছবিগুলোর কথাই ভাবছিল। এ বাড়িতে আসার মূল কারণ চাকরির তদবির এ মূহূর্তে ব্যারিস্টার খানের মতই হাজার মাইল দূরে, তার মাথায় এখন পিকাসো, তাঁর মাথায় এখন ভিঞ্চি আর দালি। এ সময় কুলসুম আবার এল।

‘ভাইজান, মেমসাবের বিড়ালডা পাইতাছি না। আফনে দেখছেন নাকি?’

‘না তো। কখন থেকে পাচ্ছ না?’

‘আফনে আসার পর থিকাই। আফনে আবার লুকান নাই ত?’

‘আমি বেড়াল লুকাব কেন? কী বলছ এই সব?’

‘রাগ অইয়েন না ভাইজান। বিড়ালডা খুব সুন্দর ত, হের লাইগা যে দেহে সেই লইয়া যাইতে চায়। আগেও দুই-একবার এইরহম হইছে। দেহি আফনের ব্যাগটা দেহি।’

‘তোমার সাহস তো কম না। আমি কি চোর নাকি?’

যদিও কৌশিক জানে যে ওর ব্যাগে কিছু নেই, তবু ওটা দেখাতে রাজি হলো না সে। ব্যাপারটা তার কাছে চরম অপমানজনক মনে হলো। কুলসুমও ছাড়বে না, সে ব্যাগ দেখার জন্য জোরাজুরি করতে লাগল। এ সময় আবারও মিসেস খানের আবির্ভাব। ওদের কথাবার্তা বোধহয় বাসার ভিতর দিকেও পৌছে থাকবে।

‘কী রে কুলসুম, কী হয়েছে? চেঁচামেচি করছিস কেন?’

মিসেস খান এবারে আর ড্রয়িং রুমের ভিতরে ঢুকলেন না। ড্রয়িং আর ডাইনিং রুমের মাঝখানের পর্দার ফাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

‘ক্যাটিরে পাইতাছি না আফা। ভাইজানরে কইলাম ব্যাগটা একটু দেহান, কিন্তু কিছুতেই দেহাইবেন না। ভিতরে য্যান কত মণিমুক্তা রাখছেন।’

‘ছিঃ এভাবে কথা বলতে নেই কুলসুম, মেহমানের অসম্মান হয়। ক্যাটিকে পাওয়া যাচ্ছে না সেটা আমাকে বললেই হোত। ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছিস কেন?’

‘ছরি মেমসাব।’

কুলসুম নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। কৌশিকের মন কিছুটা শান্ত হয়, অপমানবোধ একটু কমে। মিসেস খান এবার গলা সামান্য চড়িয়ে মিষ্টি সুরে ডাক দেন,

‘ক্যা..টি, ক্যা..টি, ক্যা..টি সোনা।’

মিউ...মিউ...মিউ।

নিজের কানকেও বিশ্বাস হল না কৌশিকের। শব্দটা আসছে তারই ব্যাগ থেকে। বিস্ফারিত চোখে সে ওটার দিকে তাকায়। কুলসুম দৌড়ে এসে ব্যাগের চেইন খোলে, অমনি একটা ছোট আকারের বেড়াল ভেতর থেকে লাফ দিয়ে বের হয়। সোজা মিসেস খানের কাছে গিয়ে তার পায়ে গা ঘেঁষতে থাকে। মিসেস খান কৌশিকের দিকে একবার তাকিয়ে পর্দার আড়ালে মিলিয়ে যান। কুলসুম এবার ঝাঁজানি দিয়ে ওঠে।

‘ছি ছি ছি। মেমসাব আফনেরে এত আদর কইরা বসাইলো, গল্ফ করলো, বেডরুমে লইয়া গিয়া ফডো দেহাইল, আর আফনে এমুন বেঈমানি করলেন?’

কৌশিক যেন স্থবির পাথর, তার হতচকিত ভাব তখনও কাটেনি।

‘অহন মেমসাব যদি আফনেরে বেইজ্জত করে? পুলিশে দেয়?’

এ কথা ভাবতেই আতঙ্ক ভর করে কৌশিকের মনে। এরা উপরতলার লোক, এদের ক্ষমতা অনেক। মামলা-মোকদ্দমা করলে যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে কিছুটা সে আন্দাজ করতে পারে। তার কণ্ঠ একটু আগে শোনা বেড়ালের ডাকের চেয়েও মিনমিনে শোনায়।

‘আমি তো কিছু করিনি।’

‘কিছু করেন নাই ত’ বিড়াল আফনের ব্যাগে ঢুকলো ক্যামনে? হে কি চেইন খুলবার পারে? আমাগোরে বেকুব পাইছেন নি?’

কৌশিক চুপ। কুলসুম কথা বলতেই থাকে।

‘আফনের ভাইগ্য বালা যে মেমসাবের দিলডা দয়ামায়ায় ভরা। অন্য কেউ অইলে এতক্ষণে কত কী কইরা ফালাইতো।’

‘ব্যাগে আমি বেড়াল ঢুকাইনি।’

‘হ, হ, আফনেরে ভালই চিনছি। আর প্যাঁচাল পাইরেন না। ভালই ভালই কাইটা পড়েন। আর আফনের মোবাইল নম্বরডা দিয়া যান।’

‘মোবাইল নাম্বার ক্যান?’

‘ক্যাটির যুদি কিছু অয়? মেমসাব যুদি আফনের সঙ্গে কথা কইতে চায়? হের লাইগা দরকার।’

কৌশিকের আর কথা বাড়াতে ইচেছ করে না। তা ছাড়া ওর মুঠোফোন নাম্বার তো খান সাহেবকে দেয়া জীবন-বৃত্তান্তেও আছে। এর কাছে আরেকবার দিলে কী-ইবা এমন ক্ষতি? ব্যাগ থেকে একটুকরো কাগজ বের করে তাতে বলপয়েন্ট কলম দিয়ে মুঠোফোন নাম্বার লিখে দেয় সে।

‘আইজকা যান। আমরা এই কথা কাউরে কমু না। ব্যারিস্টার সাব জানতে পারলে আফনেরে জানে মাইরা ফালাইব। আর একটা কথা। মেমসাব ফোন করলে কথা হুইনেন। বোকামি কইরেন না।’

ব্যাগটা হাতে নিয়ে কৌশিক যখন বের হল তার মাথায় তখন বারুদ জ্বলছে। সামনে পড়া প্রথম রিক্সাটাতেই সে লাফ দিয়ে চড়ে বসল। মেসে এসে পানির কল ছেড়ে অনেকক্ষণ ধরে মাথা ভেজাল। এ ঘটনার রেশ চললো পুরো দিন। সন্ধ্যার দিকের নিয়মিত টিউশনি দু’টোতেও সে গেল না।

পরদিন মন একটু শান্ত হয়ে এল। তার পরদিন আরেকটু। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় বাইরে বেরুনোর জন্য তৈরি হচ্ছে, এমন সময় মুঠোফোনের রিং বেজে ওঠল।

‘আর ইউ মিস্টার কৌশিক?’

‘হ্যাঁ। বলছি। কে বলছেন প্লিজ?’

জবাবে ও প্রান্ত থেকে রাজধানীর খ্যাতনামা একটি পাঁচতারা হোটেলের রিসেপশনিস্ট ইংরেজ উচ্চারণে জানাল যে সে হোটেলের একজন অতিথি কৌশিকের সঙ্গে কথা বলতে চান।

‘মিসেস খানকে দিচ্ছি। একটু হোল্ড করুন প্লিজ।’

কৌশিক অবাক হ’ল। মিসেস খান কী বিষয়ে কথা বলতে চান? তা-ও আবার হোটেল থেকে? সে মুঠোফোন কানে ধরে অপেক্ষা করলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেদিনের সেই রিনরিনে কন্ঠ ভেসে এল।

‘কৌশিক, তুমি কি ফ্রি আছো?’

কিছুক্ষণ পর টিউশনিতে যাওয়ার ব্যাপার ছিল। কৌশিক সেটা উপেক্ষা করল। ওর কানে বাজলো ব্যারিস্টার খানের বাসা থেকে চলে আসার সময় কুলসুমের শেষ সাবধানবাণী। ‘মেমসাব ফোন করলে কথা হুইনেন। বোকামি কইরেন না।’

‘জি, আমি ফ্রি।’

‘তাহলে এখনি একটু চলে এসো। আমি ৯০৭ নাম্বার রুমে আছি। রিসেপশনে এসে বললেই ওরা তোমাকে পৌঁছে দেবে। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউ।’

মিসেস খান লাইন কেটে দিলেন, কৌশিককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। তিনি যে হোটেলে ওঠেছেন সেটা কৌশিকের টিউশনি করতে যাওয়ার রাস্তায়ই পড়বে। তার সঙ্গে দেখা করেও টিউশনিতে যাওয়া যাবে। বেশি সময় লাগলে ওদেরকে জানিয়ে দিলেই হবে যে ওর পৌঁছুতে একটু দেরি হবে।     

পাঁচতারা হোটেলের আলো-ঝলমল রিসেপশনে পৌঁছে মিসেস খান ও তার রুম নাম্বার বলতেই ওরা একজন স্টাফকে সঙ্গে দিল। বুকে সাদা অক্ষরে ‘আলতাফ’ লেখা কালো প্লাস্টিকের নেমপ্লেট। আয়নার মত ঝকঝকে লিফটের দেয়ালে নিজেদের দেখতে দেখতে ওরা নবম তলায় পৌছে গেল। করিডোরে পুরু কার্পেট। এর উপর দিয়ে মিলিটারি বুট পায়ে দৌড়ালেও বুঝি শব্দ হবে না। মিসেস খানের রুমের সামনে পৌঁছে আলতাফ নামের স্টাফটি এত মৃদুভাবে টোকা দিল যে উৎকর্ণ না হ’লে টের পাওয়া দায়।

‘দ্য ডুঅর ইজ ওপন্।’

ভেতর থেকে মিসেস খানের প্রলম্বিত কন্ঠ ভেসে এলো।

‘যান, ঢুকে যান। আমি চলে যাচিছ।’

হোটেলের স্টাফ চলে গেল। কৌশিক নব্ ঘুরিয়ে দরজা একটু খুলে হোটেল রুমে ঢুকল। ভেতরে নীলচে আলোর নাচ।

‘কাম ইন।’ ওকে না দেখেই মিসেস খান ডাকলেন।

এতবড় হোটেলে কৌশিকের এই প্রথম আসা। এর অনেক নাম-ডাক শুনেছে ও। কিন্তু দেখল যে রুমটা তত বড় নয়। দরজার পরপরই বাথরুম আর সরু প্যাসেজ। সামনেই সেমি ডাবল খাটে উঁচু বালিশে মিসেস খান শুয়ে। ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমার মাঝখানে ছাই হতে হতে শেষ হয়ে আসা সিগারের টুকরো। রুমজুড়ে তার জীবন-পোড়ানো ধোঁয়া আর ঘ্রাণ। সুশোভিত টিপয়ে লাল পানীয়ের গ্লাস।

‘এসো, এসো, কৌশিক। পথে কষ্ট হয়নি তো?’

 মিসেস খান শেষ টান দিয়ে সিগারের টুকরোটি অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। পাশেই অবশ্যি প্যাকেট থেকে সদ্য বের করা আরেকটি সিগার রাখা। তার পরনে গোলাপি রঙের রাতের পোষাক। সেটি এমনই স্বচ্ছ যে হালকা আলোয়ও শরীরের অলি-গলি, খানা-খন্দ খাট থেকে লাফ মেরে চোখে ওঠে আসে । সুগঠিত উরুদ্বয় কৌশিকের চোখকে সংযোগস্থলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, সে প্রাণপণ চেষ্টায় চোখ নিচু করল।

‘কী হলো? দাঁড়িয়ে আছ কেন? কাছে এসো।’

মিসেস খানের কন্ঠে রাতের তৃতীয় প্রহরে নিদ্রিত মানুষকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া নিশির ডাক। তিনি কৌশিকের দিকে গভীর ভাবে তাকালেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলালেন। এক হাতে লাইটার নিয়ে অন্য হাত বাড়ালেন টিপয়ে রাখা সিগারের দিকে। আনকোরা নতুন সিগার।

কৌশিক তখনো দরজা আর খাটের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে।

/জেডএস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি চান নারী গৃহকর্মীরা
শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি চান নারী গৃহকর্মীরা
ডিবির সোর্স জালাল হত্যা মামলা শেষ হবে কবে?
ডিবির সোর্স জালাল হত্যা মামলা শেষ হবে কবে?
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহসী নারী পুরস্কার গ্রহণ করলেন ফাওজিয়া করিম
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সাহসী নারী পুরস্কার গ্রহণ করলেন ফাওজিয়া করিম
ভারত থেকে ৫০ হাজার টন আসার খবরে পেঁয়াজের দাম কেজিতে কমলো ২০ টাকা
ভারত থেকে ৫০ হাজার টন আসার খবরে পেঁয়াজের দাম কেজিতে কমলো ২০ টাকা
সর্বাধিক পঠিত
বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষে ভারতে গিয়েই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ব্রাজিলিয়ান তরুণী
বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষে ভারতে গিয়েই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ব্রাজিলিয়ান তরুণী
ছাত্রকে কেন গুলি করলেন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক?
ছাত্রকে কেন গুলি করলেন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক?
অবস্থান পাল্টালেন রাঙ্গা, বললেন ‘আর হাসির পাত্র হতে চাই না’
অবস্থান পাল্টালেন রাঙ্গা, বললেন ‘আর হাসির পাত্র হতে চাই না’
বাংলাদেশে চাকরি না পাওয়া আর্চার গ্রিনকার্ড পেলেন যুক্তরাষ্ট্রে
বাংলাদেশে চাকরি না পাওয়া আর্চার গ্রিনকার্ড পেলেন যুক্তরাষ্ট্রে
সব রেস্টুরেন্টের চাবি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠিয়ে দেবো, বলছেন মালিকরা
সব রেস্টুরেন্টের চাবি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠিয়ে দেবো, বলছেন মালিকরা