X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৩:৩৩



বালুখালি ক্যাম্প
১৪ সেপ্টেম্বর, সাবরাং ইউনিয়ন ও টেকনাফ রোড পার হয়ে লেদা শরণার্থী ক্যাম্প

করিম মোল্লা (৬০)’র বাড়ি ছিল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু জেলার বাহাছড়া গ্রামে। গত শুক্রবার অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে দু’টার দিকে শাহ পরী দ্বীপের নিকটবর্তী সাবরাং সীমান্ত এলাকায় এই বৃদ্ধের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়। করিম মোল্লা ভাগ্যবান যে পুত্র-কন্যা-নাতি-নাতনী-জামাতা-পুত্রবধূ ও বৃদ্ধা স্ত্রী সবাইকে নিয়েই তিনি এদেশে পালিয়ে আসতে পেরেছেন। সাবরাংয়ের এই সীমান্ত পথে শাহ পরী দ্বীপ পার হয়ে তখনো নামছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী সহিংসতায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা নর-নারীর ঢল। বৃদ্ধ করিম মোল্লার বাহুলগ্ন কয়েকটি ফুটফুটে শিশু- যারা তাঁর নাতি-নাতনী। একজনের গাল টিপে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্কুলে যাও? ওদেশে স্কুলে যেতে? কোন ক্লাসে পড়তে?’

আমার সাথে দৈনিক ‘সমকাল’ পত্রিকার স্থানীয় প্রতিবেদক ও আমাদের সিএনজি চালক দু’জনেই চাটগাঁই ভাষা ভাল জানেন যা দিয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে কথোপকথন সহজ। তাঁরা আমার কথা অনুবাদ করে দিলে করিম মোল্লা বলেন, ‘মগরা স্কুলে আঁরারে ফইড়ত ন দেয় (বর্মীরা আমাদের স্কুলে পড়তে দেয় না)!’ করিম মোল্লার এক জামাতা দলু হোসেন (৩৫) ও এক মেয়ে মমতাজ বেগম (৩০) ও পুত্রবধূ তৈয়বা (২০) জানালেন কোরবানী ঈদের দু’দিন আগেই কিভাবে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে তাদের মাতৃভূমিতে ও মগরা কি বেদম মারধরই না তাদের করেছে!

পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন দ্বীন মোহাম্মদ (৪৫)। মংডুর হাসসুরাতা থানা থেকে তিনি এসেছেন, ‘আঁর পোঁয়ার বয়স ১৮। লড়াই হইছে শুক্কুরবার। পোঁয়া ব্যাকগুন জখম হইছে।’ আহত পুত্রের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শোকগ্রস্ত পিতা।

সে এক ভয়ানক দৃশ্য। মাথার উপর গনগন করছিল গত শুক্রবারের সূর্য। পাশেই বয়ে চলেছে নাফ নদী। নদীর ওপাশে তখনো জ্বলছে রোহিঙ্গা গ্রাম। যা পুড়িয়ে দিয়েছে বর্মী সেনাবাহিনী। খাণ্ডবদাহন তখনো চলছিল। আক্রান্ত ও বুভুক্ষু নর-নারীরা নির্লিপ্ত মুখে জানাচ্ছিল তাদের প্রায় পক্ষকালব্যপী সংগ্রামের বয়ান। যেমন, মংডুর দেলপাড়ার আমির হোসেন (৩৮) ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহান প্রায় ১২ দিন বলতে গেলে কিছু না খেয়ে, অনেকটা পথ হেঁটে এবং কিছুটা পথ নৌকায় করে শাহ পরী দ্বীপ পার হয়ে সাবরাংয়ে পৌঁছেছেন। মংডু জেলারই জনৈক ইমান হোসেন স্বস্তি প্রকাশ করছিলেন তাঁর বাড়ির মেয়েদের বর্মী বাহিনী ধরতে বা অত্যাচার করতে পারেনি বলে। টানা বিশ দিন হেঁটে মাত্রই পা রেখেছেন ইয়াসমীন ও নূর হোসেন দম্পতি। মংনি পাড়ার বৃদ্ধা মজুমা খাতুন (৮০)’কে দেখলাম একটি বেতের ডুলিতে বসিয়ে এনেছে তাঁর সন্তানেরা। কোন সদয় ব্যক্তি ডুলিতে রেখে গেছেন একটি কলা ও কমলা এই বৃদ্ধার জন্য। বৃদ্ধার চোখে ছানি আর নির্লিপ্ত, ঝাপসা দৃষ্টি। একটি তরুণী মেয়েকেও দেখলাম এমনি একটি বেতের ডুলিতে রাখা। সম্ভবত : সে দৈহিক প্রতিবন্ধী।

‘ছ’জন আছি আঁরা। মংডুর চম্মইন্যা পাড়া দিয়া সাগরদি আইছি। ভাত ন খাই ম্যালা দিন,’ বললেন রাসিদং থেকে আসা ফাতেমা খাতুন (২৬), ফাতুলি (৩১), রাইজান (২৯), মোহাম্মদ শরিফ (৩৫), ফয়সাল (২৪) ওনূরা (১৮)। মংডুর চম্মইন্যা পাড়া গ্রাম থেকে সমুদ্রপথে আসা এই ছয় নর-নারী অনেক দিন ভাত খান না বলে জানালেন তাদের রোহিঙ্গা বা চাটগাঁই বুলিতে।

ইতোমধ্যেই আমার সাথে আসা দৈনিক ‘সমকালে’র টেকনাফ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বা সিএনজি চালক আমাকে সতর্ক করছিলেন যে, কিভাবে আমি সদ্য এদেশে পা রাখা রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মানুষ বা দশ-বারো বছর আগে আসা রোহিঙ্গাদের আলাদা করব : ‘মাত্র আসা রোহিঙ্গারা আপনার ভাষা বুঝবেই না। আর ওরা আপনার কাছে বিশেষ কিছু চাইবে না। ওরা জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেই খুশি। আর স্থানীয় চাটগাঁই বা দীর্ঘদিন ধরে থাকা রোহিঙ্গারাই টিঁয়া বা টাকা চেয়ে বিরক্ত করবে বেশি। সে সব কথায় কান দেবেন না।’

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ শুক্রবারের এই মধ্য দুপুরে আমি যে পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে পারছিলাম তা নয়। বৃহস্পতি বার রাত সাড়ে আটটা থেকে সকাল সাড়ে ন’টা অবধি টানা তেরো ঘণ্টা বাস জার্নি করে টেকনাফে পৌঁছেছিলাম সকাল সাড়ে ন’টায়। তার আগে সপ্তাহের পুরো পাঁচ দিন ন’টা- পাঁচটা অফিস করার ক্লান্তিত ছিলই। বাস-স্ট্যান্ড থেকে হাঁটা দূরত্বে ‘নিউ গার্ডেন’ হোটেলের একটি কক্ষে পৌঁছে, সকাল এগারোটা অবধি রুম পরিষ্কার করিয়ে এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে, আগের রাতে সারা পথ বমি করার জন্য স্যালাইন খেয়ে ও সামান্য নাস্তা করে কাজে বের হতেই লেগেছে প্রায় পৌনে একটা। টেকনাফ থেকে সাবরাং ইউনিয়ন সিএনজিতে যেতে আরো একঘণ্টা লেগেছিল। সাবরাংয়ে যখন পৌঁছাই তখন অসংখ্য গাড়ি আর সিএনজির জটলা সেখানে। প্রচুর রোহিঙ্গা নর-নারী কেউ পথে বসে বেশ কয়েক দিন ধরে আবার কেউ মাত্রই এসে পৌঁছেছে। ইউ এন এইচ সি আর-এর গাড়িগুলো এসে তাদের কাউকে কাউকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ এখনো শরণার্থীর নিবন্ধন পায়নি। একাধিক বিদেশী সাংবাদিক বা আলোকচিত্রীকে দেখলাম কাজ করতে। দেশের নানা জায়গা থেকে আসছেন তরুণ পর্যবেক্ষক, ত্রাণদাতা বা আলোকচিত্রী। সত্যি বলতে যত দরিদ্র বা ছোট দেশই হোক বাংলাদেশ, আমরা ’৭১-পরবর্তী প্রজন্ম তো একটি স্বাধীন আর শান্ত দেশেই বড় হয়ে উঠেছি। এই প্রথম মনে হল আমি যেন স্বচক্ষে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ প্রত্যক্ষ করছি। সবচেয়ে অসহায় লাগছিল বিশেষত : তরুণী রোহিঙ্গা মেয়েদের কথা ভেবে। এই প্রকাশ্য যাপনে তারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবেন কিভাবে? সাথের দুই দোভাষীর সহায়তায় জিজ্ঞাসা করলাম। রোহিঙ্গা নারীরা জানালেন তারা এখনো পর্যন্ত লোক লজ্জায় ‘বাথরুম চেপে রাখছেন।’ এছাড়া বেশ কিছু দিন পেটে তেমন খাবার পড়েনি বলে প্রাতঃকৃত্যের তেমন দরকারও পড়ে না। ভাবুন অবস্থা! আমার আরো জানার কৌতুহল ছিল যে এদের ভেতর কোন নির্যাতিত নারী আছেন কিনা? ‘সমকাল’ টেকনাফ প্রতিনিধিকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি কয়েকজনকে চাটগাঁই ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। তবে, এসব বিষয়ে প্রাণ গেলেও অনেকে মুখ খুলতে চায় না বলেই ‘সমকাল’ টেকনাফ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান ভাই বললেন। মনে পড়ে গেল বৃহস্পতি বার রাতের বাসে যখন টেকনাফ আসছি, তখন তিনজন যুবকের একটি ছোট দল যারা নিজেদের উদ্যোগে সাড়ে পাঁচ লাখের মতো টাকা তুলে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে আসছিলেন তাদের ভেতর একজন যিনি আমার পাশে বসেছিলেন- কথায় কথায় আমার কাছ থেকে আমি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়ে সামান্য কিছু দেখতে বা জানতে চাচ্ছি এবং ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারীর জবানবন্দী নিতে চাই শুনে তাঁর এক পরিচিত উন্নয়ন কর্মীকে ফোন করলেন। ঐ উন্নয়ন কর্মী ঢাকা থেকে কক্সবাজার প্রায় দু’সপ্তাহ গিয়ে কাজ করছেন। উন্নয়ন কর্মী তাঁকে ফোনে জানালেন যে এমন একাধিক রেপ-ভিক্টিমকে তিনি দেখেছেন তবে দূর্ভাগ্য জনকভাবে হঠাৎ শাশুড়ি মারা যাওয়ায় তিনি (সেই উন্নয়ন কর্মী) আগামীকাল অর্থাৎ শুক্রবারই ঢাকা ফিরে যাচ্ছেন। নইলে হয়ত রোহিঙ্গা ধর্ষিতা নারীর কোন জবানবন্দী আমি এ যাত্রায় সংগ্রহ করতে পারতাম।

বস্তত আগস্টের শেষ থেকেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক সহিংসতা ও তার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে আছড়ে পড়া অসহায় ছয়-সাত লাখ রোহিঙ্গা নর-নারীর ঢল একজন স্বাভাবিক বোধ-শক্তি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে আর সবার মতো আমাকেও বিচলিত করছিল। রোজই পত্রিকার পাতায় অজস্র প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, টিভি চ্যানেলগুলো দেখাচ্ছে টাটকা নানা খবর। তবে, আগে পত্রিকায় সাংবাদিকতা করার সময় কিংবা উন্নয়ন খাতে কাজ করার সময় বা লেখক হিসেবেও স্বচক্ষে কোন বড় ঘটনা না দেখে আমি কিছুই লিখতে পারি না। কাজেই ভেতরে ভেতরে ক্রমাগত অস্থিরবোধ করছিলাম কবে যাব শরণার্থী মানুষের বেদনায় আর্ত হয়ে ওঠা আমাদের বৃহত্তর কক্সবাজার-উখিয়া-টেকনাফ জনপদে সেটা ভেবে। ২০১১ সালে একবার ইউ এন এইচ সি আর-এ কাজও হয়েছিল। সেই একই পরিবারের কন্যা সন্তানের কাজের ভুবনের পরিধির প্রতি নানা বিধি-নিষেধ কিংবা হয়ত আমারই নানা মধ্যবিত্ত সুলভ রাজধানীমুখী টান- সব মিলিয়ে যোগ দেওয়া হয়নি। এখন অনুশোচনা হয়। যা হোক, ক’দিন থেকেই ভাবছিলাম একবার যেতে হবে। গত বুধবার অর্থাৎ ১৩ তারিখ ফোন করলাম টেকনাফে থেকে মানবিক সব প্রতিবেদন লিখতে থাকা গল্পকার এবং দৈনিক ‘সমকাল’ পত্রিকার সিনিয়র প্রতিবেদক রাজিব নূরকে। রাজিবদা বললেন, ‘অদিতি, আমি আপনাকে আসতে উৎসাহ দেব না। আবার নিরুৎসাহিতও করব না। তাহলে বলবেন যে রাজিবদা’র জন্য আমার যাওয়া হল না।’ এটুকু বলে হাসতে হাসতে জানালেন যে রাত সাড়ে আটটায় ঢাকা থেকে টেকনাফ অবধি সরাসরি একটি বাস ছাড়ে আরামবাগ থেকে। নাম ‘সেন্টমার্টিন পরিবহন।’ সকালে যেখানে গাড়ি থামবে, তার সামনেই ‘নিউ গার্ডেন’ নামে একটি হোটেল আছে যেখানে ক’দিন আগে থেকে গেছেন এটিএন নিউজের সিইও মুন্নী সাহা। আমি চাইলে সাহস করে রওনা করতে পারি। বাসাতেও না বলে অফিস থেকে বের হয়ে (সাথে একটি হ্যান্ড ব্যাগে দু’টো জামা নিয়ে সকালেই বের হয়েছিলাম) একটি শপিংমলে ঢুকে এক জোড়া আরামদায়ক চপ্পল কিনেছিলাম। তারপর সোজা বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাত্রা।

এসি বাসে বমি করা আমার একটি সমস্যা। ভোর রাত সাড়ে চারটা থেকে শুরু হলো বমি। সাতটার দিকে বাস কক্সবাজার থেকে উখিয়ার পথে ঢুকলো। বমিধ্বস্ত, ক্লান্ত আমার চোখে একটু ঘুমঘুম ভাবও ছিল। হঠাৎই অবাক হয়ে দেখি দু’পাশে পাহাড়ি টিলা রাস্তার সামনে অসংখ্য মানুষ মহাসড়কে বসে আছে। ক্লান্ত, দীর্ণ অসংখ্য নর-নারী-শিশু। কেমন একটি ঝাঁকুনি খেলাম আর শরীরের রোমকূপে বিষ্ময়ের শিহরণ খেলে গেল! এমনো হয়? ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে দেখা নানা তথ্যচিত্রের ভিডিও বা টেলিভিশন ফুটেজে এমনটা দেখেছি। দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তথ্যচিত্রেও এমন সব ছবি। তা এমন ছবি আমার জ্যান্ত চোখে দেখছি? আমি দু’চোখে ভাল করে আঙুল ঘষলাম। অবশ্য পাবর্ত্য চট্টগ্রামেও অতীতে একাধিকবার সেটেলারদের হামলায় এমন ঘর পোড়া নিঃস্ব পাহাড়ি নারী-শিশুকে নিজ দেশেরই রাস্তায় বসতে দেখিনি তা নয়। ২০১৩-এর ডিসেম্বরে বরিশালের কাউয়ার চর গ্রামে দেখেছিলাম আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি হিন্দুগ্রাম। দেখেছি রামু, নাসির নগর বা গোবিন্দগঞ্জ। কিন্তু এই মানুষগুলোর মিছিল তো শেষ হচ্ছে না। বাস চলছে আর পথে পথে বসে থাকা অসংখ্য নর-নারী-শিশুর বিরামহীন দৃশ্যও চলছেই। জহির রায়হানের তথ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর কথা মনে এল, মনে এল তারেক মাসুদের অসামান্য তথ্যচিত্র ‘মুক্তির কথা’-য় এ্যালেন গীন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’-র মৌসুমী ভৌমিককৃত অনবদ্য তর্জমা সঙ্গীতের কথা। বিষ্মিত হয়ে আমি দেখতেই থাকলাম জানালা দিয়ে শরণাগত মানুষের ঢল। আমার পাশে বসে একজন মোবাইলে অনবরত ছবি তুলছেন। আমার স্মার্ট ফোন যথারীতি চার্জবিহীন- আমার মতো অগোছালো মানুষের যা হয় আরকি! এর ভেতর আবার বমির ঝাঁকুনি। বাস কর্তৃপক্ষ সদয়ভাবে আমার অসুস্থতা সহ্য করছেন। এভাবেই সকাল সাড়ে ন’টায় তেরো ঘণ্টা যাত্রার পর বাস থামলো হোটেল ‘নিউ গার্ডেনে’র সামনে। রাজিবদা আমার কথা বলেই রেখেছিলেন হোটেল কর্তৃপক্ষকে। বাস স্ট্যান্ডে নেমে হোটেল পর্যন্ত দশ পা’র রাস্তা পার হতে গিয়ে দেখি আরো অসংখ্য রোহিঙ্গা নর-নারী-শিশু পথে বসে আছে। যত দরিদ্র আর ছোট হোক, একটি স্বাধীন আর শান্তিপূর্ণ দেশের নাগরিক হিসেবেই জন্মাবধি বড় হয়েছি। এমন দৃশ্য তাই আমার কল্পনার অতীত ছিল!

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ হোটেল রিসেপশনে ঢুকতেই রুমের চাবি পেলাম আর ফোনে দেখলাম রাজিবদা’র টেক্সট মেসেজ। ভোর রাত পৌনে চারটায় পাঠানো। আমি যদি সকালের আলো ফোটার পর টেকনাফ পৌঁছাই, তবে ঘুমন্ত তাঁকে ফোন দেবার দরকার নেই। তিনি এখন ঘুমাতে যাচ্ছেন। আর আলো ফোটার আগে পৌঁছালে অবশ্যই যেন তাঁকে ফোন দেই। তিনি তবে আমাকে বাস স্ট্যান্ডে আনতে যাবেন। তখন দিব্যি সকাল সাড়ে নয়টা। যা হোক, দোতলায় রুমে উঠে দেখলাম রুমের হাল ভাল নয়। সার্ভিসও করুণ। রুম পরিষ্কার করাতেই এগারোটা বাজল। বারোটায় ঘুম ভাঙল রাজিবদা’র ফোনে। উনি সেদিন বিকেল অবধি রুমে থেকে লিখবেন আর আমার জন্য ‘সমকালে’র টেকনাফ প্রতিবেদক ওনার রুমে অপেক্ষা করছেন। তাঁর সাথে শাহ পরীর দ্বীপের কাছে যেতে পারি যে পথ দিয়ে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী ঢুকছে। তথাস্তু। ঝটপট একটু শাওয়ার নিয়ে, বমির জন্য ওরস্যালাইন ও হোটেল বয়ের আনা একটি পরোটা আর ডিম ওমলেট খেয়ে পথে বের হলাম পৌনে একটায়। তখন গনগন করছে সূর্য। টেকনাফে সেদিন ভয়ানক গরম।  ‘সমকালে’র টেকনাফ প্রতিনিধি আব্দুর রহমান বললেন যে শাহ পরীর দ্বীপ যেতে হলে আরো সকালে রওনা করতে হত। জোয়ারের জলে নৌকায় সেখানে যেতে সুবিধা। যেহেতু নানা কারণে আমাদের যাত্রা শুরু করতেই দেরি হয়েছে,  কাজেই আজ আর শাহ পরীর দ্বীপ যাওয়া যাবে না। তবে, শাহ পরীর দ্বীপ পার হয়ে সাবরাং থেকেই সবাই টেকনাফে ঢোকে। এই হলো আমার সাবরাং আসার ইতিবৃত্ত।

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনটা ছোঁবার পর আব্দুর রহমান বললেন, ‘আপা, এবার ফিরবেন নাকি? দুপুরের ভাত তো খেতে হবে।’

লজ্জিত হলাম। আব্দুর রহমান ভাই আমার জন্য সকাল দশটা থেকে নাকি রাজিবদা’র রুমে অপেক্ষা করছিলেন। রাজিবদাও হোটেলে আমাদের ফেরার জন্য অপেক্ষা করছেন। উনিও দুপুরের খাবার খাননি। কিন্তু দুপুরের খাবার কি খাব? পথে যেতে যেতে দেখছি ত্রাণের ট্রাকগুলো পথে ছুঁড়ে মারছে পাউরুটি কি কলা আর হর্ষিত রোহিঙ্গা শিশুরা ছুটে যাচ্ছে সেই খাবারের পেছনে। দু’টো রুটি ফুটপাথ থেকে খাবলে তুলে এক চার বছর আর এক বছর দুয়ের শিশুর মুখে সেকি হাসি! যা হোক, দুপুর সাড়ে চারটা নাগাদ আমাদের সিএনজি থামল হোটেল ‘নিউ গার্ডেনে’র সামনে। কিছু রোহিঙ্গা নারী আমাদের দিকে করুণ চোখে চেয়ে দূর্বোধ্য চাটগাঁই ভাষায় খাবার বা সাহায্যের মিনতি করছিল। সেই মিনতিকে পাশ কাটিয়েই আমরা নিচ তলায় খাবারের রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। রাজিবদা বললেন তিনি দুপুর দু’টার দিকে খেতে নেমেছিলেন। কিন্তু সাত-আট সন্তানের এক জননী কোলের শিশুকে স্তন্যদানের সুবিধার জন্য নিজে যখন বুভুক্ষু স্বামী আর অনেকগুলো সন্তানকে পাশে রেখে ভাত আর মাংস খেতে খেতে অঝোরে কাঁদছিল, সে দৃশ্য দেখে তিনি খেতে পারেননি। এবং এই প্রথম এই প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে তিনিও কেঁদেছেন। রাজিবদা অবশ্য এমনি। তাঁকে চিনি বহু বছর। অল্পতেই তাঁর কান্না আসে। ছেলেমানুষ এত ইমোশনাল আমি খুব কম দেখেছি। লইট্টা ফ্রাই, কোরাল মাছ আর স্থানীয় একটি শাকের তরকারি খেয়ে আমি হোটেলের নিচের মেয়েদের সাথে আবার কথা বলতে গেলাম। এবং তখন বুঝলাম এই যে আমাদের পুরুষ-শাসিত সমাজে মেয়েদের এত এত ক্ষমতায়ন ও টিভি বা সংবাদপত্রে অনেক মেয়ে কাজ করার পরও এমন কঠিন জায়গায় কাজ করতে আসার জন্য মেয়ে সাংবাদিক আজো কত কম এবং অসহায়, প্রান্তিক নারীরা নিজেদের মাঝে একজন শিক্ষিত নারী প্রতিনিধি পেলে কেমন ব্যাকুল হয়ে ওঠে!

‘বও মা- বও-’  বলে বয়সী প্রবীণারা উঠে দাঁড়ালেন আমার হাত ধরতে। পুরুষ সাংবাদিকদের সাথে অতটা স্বচ্ছন্দ তো তাঁরা বোধ করেন না। কিন্তু এ আমারই নিতান্ত স্পর্শকাতর ‘মধ্যবিত্ত ত্বক’ যে ক্লান্তি আর দুপুরের গরমে আমি বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলাম না, যা অবশ্য শুক্রবারই রাতের বাতাসে আমি পুষিয়ে ফেলব। আমার সাথে পরিচয় হবে দুই তরুণীর যারা দু’সপ্তাহ হয় বর্মী বাহিনীর গুলিতে স্বামীহারা হয়ে আর অনেকগুলো ছোটছোট সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে এই টেকনাফে।

‘আমার মনে হয় খানিকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় আমরা লেদা ক্যাম্পে যাই। ওটা একটা অ-নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্প যেখানে একটি অদ্ভুত চরিত্রের সাথে আমরা আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেব। সিএনজিঅলাকে সাড়ে পাঁচটায় আসতে বলি?’ রাজিবদা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘ছ’টায়।’ আমি কাতরভাবে বললাম।

রাজিবদা এবং রহমান ভাই তাদের রুম থেকে এবং আমি আমার রুম থেকে ছ’টায় আবার নিচে নেমে এলাম। অদ্ভুত বিষয় হলো এখন দিব্যি ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সিএনজি ছুটে চলছিল টেকনাফ সড়ক দিয়ে। অবাক হয়ে- সত্যি বলতে বোধশক্তির ওপারে চলে গিয়ে আমি দেখছিলাম পথে পথে বসে থাকা বিপন্ন মানুষের জটলা। হাজার হাজার পরিবার পথে বসে আছে। কারো কারো গায়ে রীতিমতো দামি পোশাক। সিল্ক বা হাফ-সিল্কের থামি পরনে কোন কোন মেয়ের। হয়ত মিয়ানমারে কোন সম্পন্ন চাষী বা দোকানী পরিবারের কন্যা বা বধূ একরাতের ধাক্কায় আজ পার্শ্ববর্তী দেশের রাস্তায় এসে পড়েছেন। কাউকে কাউকে ইউএন-এর গাড়ি এসে তুলে নিচ্ছে। তারা ভাগ্যবান। ভাগ্যহীনরা পড়ে রয়েছে পথের ধূলায়। পথে যেতে যেতে তবু আমরা তিনজন (আমি, রহমান ভাই ও রাজিবদা) নাফ নদীর নৈসর্গিক সৌন্দর্যও দেখি।

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ ‘একটু আগে ঢাকায় এক সাংবাদিক ফিরে গেল। বাংলা নিউজের সেই প্রতিবেদক ফোনে আমাকে বলল যে কিছুক্ষণ আগেও এই রাস্তা থেকে নাফ নদীর ওপারে রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়তে দেখা গেছে,’ বললেন রাজিবদা।
বিজিবি-র সদস্যরা সিএনজিগুলো দেখছিলেন। নাফ নদীর পাড়ে এর আগেও একবার আমার আসা হয়েছিল। ২০০৯ সালে দু’টো রাখাইন মেয়ের সাথে এসে টেকনাফে দেখে গিয়েছিলাম প্রাক-১৯৪৭ পর্বে অবিভক্ত বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক ধীরাজ ভট্টাচার্যের আত্মজীবনী ‘যখন পুলিশ ছিলাম’-এ বিধৃত টেকনাফে চাকুরি করার সময়ে পরিচয় হওয়া রাখাইন মেয়ে মাথিনের সাথে করুণ প্রেম কাহিনীর বিখ্যাত ‘মাথিনের কুয়া।’ এই কুয়ার পাড়ে জল তুলতে এসেই মাথিন নাকি প্রেমে পড়েছিলেন ধীরাজের। ধীরাজ বাবা-মা’র কথায় সম্পর্কের দায়িত্ব না নিয়ে কলকাতা চলে যাবার পর অনশন ক্লান্ত মাথিন মারা যায় বড় অকালে। সম্প্রতি টেকনাফ পুলিশ সেই কূপ বা কুয়া খুব যত্ন করে বাধিয়েছে যদিও স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় বাঙালীর সাথে রাখাইনের এই প্রেমকাহিনীকে অস্বীকারই করে।
যা হোক,  লেদা ক্যাম্পে যাবার দীর্ঘ পথে আমরা থামলাম নয়া পাড়া ক্যাম্পের পাশে একটি চায়ের দোকানে। ঢাকায় বিহারীদের জেনেভা ক্যাম্পের মতোই এই ক্যাম্পেও ছোট ছোট খাবারের দোকানসহ নানা খুচরো ব্যবসায় জীবিকা অর্জনের সংগ্রাম করছে রোহিঙ্গারা। ইয়াবা বদির মতো সৌভাগ্যবান রোহিঙ্গা আর ক’জন? বদি যে রোহিঙ্গা বংশোদ্ভুত তা টেকনাফে এসেই অবশ্য জানলাম। চা খাওয়া শেষ করে ঘনায়মান সন্ধ্যার অন্ধকারে আমাদের সিএনজি আবার ছুটল লেদা ক্যাম্পের দিকে।

আব্দুল মতলব : অং সান সূচির ঘোর সমর্থক- অশ্লেষার রাক্ষসী বেলায়

লেদা ক্যাম্পে ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম এখানে আইওএমের একটি অস্থায়ী অফিস আছে। ঘিঞ্জি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে আমরা ঢুকলাম আব্দুল মতলব নামে এক ষাটোর্দ্ধ ব্যক্তির সঙ্কীর্ণ বাড়ির সামনে। মিয়ানমারের মংডুতে কয়েক পুরুষের বাস তাঁদের। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যখন মুসলিমদের উপর প্রবল সাম্প্রদায়িক বৈষম্যনীতি প্রয়োগ শুরু করেনি, সেই বৃটিশ উপনিবেশ শেষ হবার পর, পরের মুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক বার্মায় বড় হয়েছেন আব্দুল মতলব। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া আব্দুল মতলব ইংরেজি মোটামুটি জানেন। বাংলাদেশে এসেছেন দশ-বারো বছর আগে। নবম শ্রেণির পর আর পড়েননি কেন তার উত্তরে বললেন যে তারা মংডুর কৃষক সম্প্রদায়। চাষের অনেক জমি ছিল বলে আর পড়েননি। যৌবন থেকেই আর দশজন রোহিঙ্গা মুসলিমের মতোই অং সান সূচির কঠিন সমর্থক তিনি। সূচির প্রতি ভালবাসা তাঁর আজো কমেনি। রোহিঙ্গা গণহত্যা সম্পর্কে প্রিয় নেত্রীর নীরবতা প্রসঙ্গে বললেন, ‘সে আর্মির হাতে ট্রাপড। সে খি খরবে?’ আব্দুল মতলব বিশ্বাস করেন যে ১৯ সেপ্টেম্বরের বক্তৃতায় সূচি মুসলিমদের জন্য নতুন পথের দিশা দেবেন। হায় রে মানব হৃদয়! ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না!

কথায় কথায় জানালেন তাঁর যেটুকু আর্থিক সামর্থ্য আছে তাতে ক্যাম্পের বাইরে ভাল বাসায় থাকতে পারেন। তবে ক্যাম্পের তরুণতর প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাখার সংগ্রামের জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করছেন। আব্দুল মতলবের পাশে আর একজন প্রৌঢ় রোহিঙ্গাকে দেখলাম যিনি ক্যাম্পে বেসরকারী সংস্থা ‘কো ডেকে’র স্কুলেই উইনিসেফ নির্দ্ধারিত সিলেবাস অনুযায়ী রোহিঙ্গা শিশুদের বার্মিজ পড়তে-লিখতে শেখান। বাংলা কেন শেখেননি বা শেখেন না তারা? বাংলা বর্ণমালা কি লিখতে-পড়তে আদৌ জানেন না? এমন প্রশ্নের জবাবে দু’জনেই বললেন যে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা যখন চট্টগ্রাম ছেড়ে মংডু থেকে আকিয়াব অবধি আরাকানে ঠাঁই গেঁড়েছে, শুধু কথ্য চাটগাঁই ভাষাই তাঁদের মাতৃভাষা হিসেবে টিকে থেকেছে। ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে লিখিত লিপির সাথে দূরত্ব। দু’জনেই বললেন যে তাঁরা তো বার্মিজই আসলে। বার্মা তাদের যত পীড়ন করুক, বার্মাই তাদের দেশ। শান্তি পেলে আবার ফিরে যাবেন।

বৌদ্ধরা বিশেষত: বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কেন মুসলিমদের উপর এত ক্ষিপ্ত এ কথার উত্তরে আব্দুল মতলব বললেন সামরিক বাহিনী রাখাইন রাজ্যে রাখাইনদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। বৌদ্ধ ভিক্ষু তথা বৌদ্ধ জনতার বড়জোর ৪০ শতাংশ মুসলিম বিদ্বেশী। বাকিরা কিন্তু সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এটা সামরিক জান্তার একটি কৌশলও বটে। নিজেদের দমন-পীড়নকে অব্যাহত রাখতে ধর্মীয় ও জাতিগত উত্তেজনা জিইয়ে রাখা। দু:খজনক হল ১৭৮৪ সালে প্রায় একই নৃ-তত্ত্ব, ভাষা ও ধর্মীয় ঐক্য সত্ত্বেও (খুব সূক্ষ্ম প্রভেদ অবশ্য আছে) যে বর্মী রাজা বোদপায়ার চণ্ডনীতিতে লাখ লাখ রাখাইন গণহত্যার শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বর্তমান বাংলাদেশের কক্সবাজার ও পটুয়াখালি অঞ্চলে, আজ তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মা সম্প্রদায়ের সামরিক বাহিনীকে খুশি করতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। জিজ্ঞাসা করলাম যে সাবরাং ইউনিয়নে পথে পথে রোহিঙ্গাদের ভেতর রাখাইন নারী বিয়ের কারণে সন্তানদের চেহারায় যে নৃ-তাত্ত্বিক কিছু বদল লক্ষ্য করেছি, সে নিয়ে কি রাখাইনরা ক্রুদ্ধ? বললেন, মিশ্রণ কিছু হলেও ২০-৩০ শতাংশের বেশি তো হয়নি। আব্দুল মতলব নিজেই এক রাখাইন নারীকে বিয়ে করেছিলেন যৌবনে। তবে সে বিয়ে টেকেনি বা সন্তানাদি হয়নি। এছাড়াও তিনটি রোহিঙ্গা স্ত্রী আছে তাঁর। রোহিঙ্গাদের ভেতর বহু বিবাহ আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘বেশি না। এক এক পুরুষের গরে তিন-চারটা বউ আছে।’

উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে রাখাইন বৌদ্ধ বনাম রোহিঙ্গা মুসলিমের জন অনুপাত ৬০ : ৪০। গত কয়েক দশকে দফায় দফায় লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে না হলে হয়ত তারা সংখ্যাগরিষ্ঠই হত।
রোহিঙ্গারা তো এক সময় আরাকান রাজসভায় রোসাঙ রাজ দরবারে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ চিহ্নিত করেছিলেন। আজো কি রোহিঙ্গাদের ভেতর অন্তত শ্রুতি পরম্পরাভিত্তিক কথ্যসাহিত্যের ধারা সচল বা সজীব রয়েছে? যেমন ধরা যাক মেয়েলী বিয়ের গীত? এ কথার উত্তরে আব্দুল মতলব অনেক ডাকাডাকির পর নূর বাহার নামে এক অশীতিপর বৃদ্ধা এলেন। তাঁর মুখে বহু বছরের বলিরেখা। থামি আর ব্লাউজ পরনে, মাথায় গামছাটি রাখাইন/বর্মী/আরাকানী ঢঙ্গে বাঁধা। বৃদ্ধা আমাদের দেখে সচেতন হয়ে গামছাটি মুসলিম রীতিতে পর্দার মতো করে মেলতে চাইলেন। আমি তাঁকে আরাকানী রীতিটিই রাখতে অনুরোধ করলাম। বৃদ্ধা একটি ‘বৈরাত গীত (বিয়ের গান)’ গাইলেন যেখানে এক যুবক নদীর জলে স্নান করছে যেন ‘লাড়ায়’-এ যাবার মতো তেজ সংগ্রহ করে নিতে চাইছে। যুদ্ধ যাত্রায় যাবার আগের সময়ের মতোই বিয়ে করতে যাবার আগে সে স্নান করে, পরিশুদ্ধ হয়ে আর পূর্ণ তেজে যাত্রা করতে চাইছে।
ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আসার পথে আব্দুল মতলব কয়েকটি বালককে ডাকলেন, ‘ইক্কা আয় (এদিক আয়)।’ হাসি মুখে আব্দুল মতলব দেখালেন স্কুলে পড়া শিশুদের। বর্মী শিখছে তারা। অঙ্ক আর কিছুটা ইংরেজিও শিখছে। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি বস্তির ভেতর এরাই কি অনাগত দিনের দিশারী?

আরবা ও হারজা : বর্মী সেনাবাহিনীর গুলিতে স্বামী হারা দুই তরুণী

রাত প্রায় সাড়ে ন’টার মতো বেজে গেল টেকনাফে হোটেলে ফিরতে। সিএনজি থেকে নামতে নামতে রাজিবদা পরিচয় করিয়ে দিলেন হোটেল ‘নিউ গার্ডেনে’র সামনে দাঁড়ানো সাংবাদিক দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’-এর প্রতিবেদক দেব দুলাল মিত্রের সাথে।

‘দেব দুলাল সবার আগে টেকনাফে এসেছে এবং সবার শেষে যাবে,’ রাজিবদা পরিচয় করিয়ে দিলেন হাসি মুখে। জানলাম দেব দুলাল দা টেকনাফ থেকেই কাজ করছেন। তবে, তিনি উঠেছেন ‘নিউ গার্ডেনে’র পাশেই অন্য এক হোটেলে। রাজিবদা এবং রহমান ভাই উঠে গেলেন হোটেলে তাঁদের রুমে। আমি হোটেলের নিচে রাস্তায় আশ্রয় নেয়া নর-নারী-শিশুদের সাক্ষাৎকার নিতে থাকলাম। মোহাম্মদ ইউনুস নামে একজন বললেন, ‘আঁর সাথত অউগ্যা বিবি আর অউগ্যা ননাতিন আছে। আঁই বুল্লইয়ের মাঝি।’ সোজা বাংলায় মংডু-র মোহাম্মদ ইউনুস সাথে বউ আর এক নাতনী নিয়ে এসেছেন। ছেলে-মেয়ে অনেকেই দীর্ঘ পথে আসার সময় হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি ছিলেন বুল্লই বা সাম্পানে রমাঝি। আট-দশ দিন টানা হেঁটে তিনি এসেছেন। রাসিদংয়ের রাজার বিল থেকে এসেছেন আয়েশা। মোহাম্মদ জনি এসেছেন বুসিডং থেকে। ১২ টি সন্তানের পিতা তিনি। এমন টুকটাক আলাপের মাঝে চাটগাঁই তথা রোহিঙ্গা ভাষায় ক’জন শরণার্থী নারী জানালেন তাদের মাঝে দু’জন নারী আছেন যারা স্বামীকে হারিয়েছেন মাত্র দু’সপ্তাহ আগে। এদের একজন আরবা (২৫) আটটি ছোট ছোট সন্তানের জননী। অপরজন হারজা (২৩) খুবই ভাগ্যাহত। যেদিন তার কনিষ্ঠতম সন্তানটি জন্মেছে, সেদিনই বর্মী সেনাবাহিনীর গুলিতে মারা গেছে তার স্বামী। দুই তরুণীকেই দেখলাম। এরা দু’জনই বিশেষত হারজা বোধ করি বেশ সম্পন্ন পরিবারের বধূ। হারজার পরনের থামিটি বেশ দামি। সম্ভবত হাফ-সিল্কের। সম্পন্ন কৃষক, মাঝি, মৎস্যজীবী বা ক্ষুদে দোকানদার থেকে রাষ্ট্রীয় পীড়নের কারণে রাতারাতি তারা উদ্বাস্তু হয়ে আছড়ে পড়েছে অন্য দেশের রাস্তায়।
উখিয়া থেকে টেকনাফ : যা দেখেছি, যা শুনেছি || পর্ব-১ আর একটি বিষয় অবাক হয়ে দেখলাম যে, দিনে যে মেয়েরা প্রচণ্ড তপ্ত দুপুরে কালো বোরখা পরে হাঁটছিল, তারাই এখন বোরখা খুলে থামি আর ব্লাউজ পরে রাস্তাতেই রাতের ঘুমের প্রস্ততি নিচ্ছে। দো-ভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞাসা করলাম যে দিনে ঐ গরমে বোরখা পরে এখন কেন ঠাণ্ডা হাওয়ায় তারা থামি আর ব্লাউজ পরে ঘুমোতে যাচ্ছে? মহিলারা জানালেন দুপুরবেলায় পুরুষ মানুষ আশপাশে বেশি ছিল। একথায় সামান্য খটকা লাগল। পুরুষ মানুষের সংখ্যা রাস্তায় এখন কম হলেও কিছু তো তবু ছিলই। অথবা হয়ত বোরখা পরে ঘুমোবেন কী করে?
রাতের খাবারের পর রাজিবদা আর রহমান ভাই তাদের রুমে যেতে যেতে (রহমান ভাইয়ের বাড়ি যদিও টেকনাফ তবে তিনি গত কিছু দিন ঢাকা থেকে আসা তাদের পত্রিকার সিনিয়র প্রতিবেদক রাজিবদা’র সাথেই হয় একসাথে বাইরে ঘুরছেন অথবা রাজিবদা’র রুমে বসে দু’জনে মিলে দু’টো ল্যাপটপে প্রতিবেদন লিখছেন- দিন-রাত একসাথেই থাকছেন) বললেন কাল সকালে ‘ভোরের কাগজ’-এর দেব দুলাল মিত্রের সাথে সিএনজিতে করে আমি টেকনাফ থেকে উখিয়া হয়ে কক্সবাজার যেতে পারি। আমার অফিস যেহেতু রবিবার খুলে যাবে এবং আমি কোন পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের স্ট্রাকচারড সাংবাদিক আর নই- এখন আমি পত্রিকায় লিখি প্রদায়ক হিসেবে- কাজেই ঢাকা যেতে হলে হয় কক্সবাজারের পথে যেতে হবে উখিয়া হয়ে এবং সেখান থেকে ঢাকা যাব অথবা উখিয়া থেকে কাজ শেষ করে আবার পেছন দিকের পথ অর্থাৎ টেকনাফে এসে বিশ্রাম নিয়ে চলে যেতে হবে রাতের বাসে ঢাকায়। আগের রাতে সাড়ে তেরো ঘণ্টার জার্নিতে বমির ধকলের কথা মনে রেখে আমি কক্সবাজারই যাব ভাবলাম। রাজিবদা যাত্রা পথের ধকল কাটাতে বিমানের টিকিট খুঁজছিলেন এবং একটি পেয়েওগেছেন। পরশু সকালে ওনার বিমানের টিকিট। উনি আর রহমান ভাই আগামীকাল সকালে সমুদ্রপথ ধরে বাইকে চেপে যাবেন কক্সবাজার। ‘আরসা’-র এক গেরিলা নেতাকে ইন্টারভিউ করার সুপ্ত বাসনা রাজিবদা’র। আমি যাব উখিয়া সিএনজি করে, দেব দুলাল দা’র সাথে। সেখান থেকে কক্সবাজার গিয়ে শরীরে কুলালে রাতেই ঢাকা অথবা পরের দিন সকালে যাব।

জেড. এস.
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ট্রেনের শৌচাগার পড়ে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ
ট্রেনের শৌচাগার পড়ে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধার লাশ
৬১২ লিটার সয়াবিন জব্দ, জরিমানা মাত্র ১০ হাজার 
৬১২ লিটার সয়াবিন জব্দ, জরিমানা মাত্র ১০ হাজার 
অন্যকে ফাঁসাতে ৯৯৯-এ কল, দুই যুবক গ্রেফতার
অন্যকে ফাঁসাতে ৯৯৯-এ কল, দুই যুবক গ্রেফতার
ভারত থেকে রোহিঙ্গা আসায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ
ভারত থেকে রোহিঙ্গা আসায় উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত