জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইইআর) তীব্র সেশনজট ও শিক্ষক সংকটে চরম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। এতে ক্লাস, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ যেখানে করোনা-পরবর্তী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ক্লাস-পরীক্ষা দ্রুত শেষ করছে, সেখানে আইইআরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, পরীক্ষার রুটিন প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা, খাতা মূল্যায়নে বিলম্ব এবং ফল প্রকাশে ৬ থেকে ৭ মাস দেরির কারণে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইনস্টিটিউটের ১৬ থেকে ২০ ব্যাচ পর্যন্ত প্রতিটি ব্যাচই বর্তমানে তীব্র সেশনজটের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যেখানে মাস্টার্স শেষ পর্যায়ে, সেখানে আইইআরের ওই ব্যাচের এখনো অনার্স চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার (৪–২) শেষ হয়নি। মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার রুটিন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এতে শিক্ষার্থীদের চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৭ ব্যাচের ৩–২ সেমিস্টারের মিডটার্ম ১ এপ্রিল শেষ হলেও মে মাস পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা হয়নি। ১৮ ব্যাচের পূর্ববর্তী সেমিস্টারের ফল এখনো ঝুলে আছে। ১৯ ব্যাচের ২–১ সেমিস্টারের ক্লাস ও মিডটার্ম শেষ হলেও ফাইনাল পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। সাধারণ নিয়মে একটি সেমিস্টার ছয় মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখানে ৮–৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ইনস্টিটিউটে স্থায়ী শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। এই সংকট নিরসনে শুরু থেকেই গেস্ট টিচার বা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানানো হলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। সম্প্রতি নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, তারা বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। দ্রুত পড়ালেখা শেষ করে চাকরিতে প্রবেশ করা তাদের জন্য জরুরি। কিন্তু চার বছরের কোর্স ছয় বছরেও শেষ না হওয়ার আশঙ্কা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ও ভাইভায় ভিন্ন মত প্রকাশ করলে শিক্ষকদের বিরূপ আচরণের শঙ্কাও থাকে।
শিক্ষার্থীরা দ্রুত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, অন্তর্বর্তী সময়ে গেস্ট টিচারের মাধ্যমে ক্লাস সচল রাখা, পরীক্ষা শেষের এক মাসের মধ্যে ফল প্রকাশ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেমিস্টার শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।
আইইআরের বর্তমান সংকট ও সেশনজটের বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আজম খান বলেন, শিক্ষক সংকটই মূল সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষক আছেন, সেখানে এখানে মাত্র পাঁচজন। এই অল্প কয়েকজন শিক্ষক দিয়ে পাঁচটি ব্যাচের ২৫ থেকে ২৭টি কোর্স চালানো হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং সময়মতো ক্লাস-পরীক্ষা নেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইউজিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের জটিলতার কারণে নতুন পদ সৃষ্টি সম্ভব হচ্ছে না। বাইরে থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক আনার চেষ্টা করা হলেও দূরত্বের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কঠিন হচ্ছে। ফলে বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে। তাঁর মতে, দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া গেলে এই সংকটের প্রায় ৯০ শতাংশ সমাধান সম্ভব।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইচ উদ্দিন বলেন, আইইআরের শিক্ষক সংকট ও সেশনজট বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবগত। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইউজিসির সঙ্গে আলোচনা করে নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ ও বিশেষ একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়েও কাজ চলছে। তিনি শিক্ষার্থীদের সেশনজট কমিয়ে আনার আশ্বাস দেন।







