প্রশ্ন থেকেই গেল যৌন নিপীড়ক জবি শিক্ষকের বহাল থাকা নিয়ে

Send
জবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৭:২২, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৬, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক আব্দুল হালিম প্রামাণিক একাধিক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন নিপিড়নের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার সত্ত্বেও স্বপদে বহাল রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। যদিও কিছু শাস্তির আওতায় তাকে আনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও তদন্তের সুষ্ঠুতা ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অভিযুক্ত শিক্ষক আব্দুল হালিম প্রামাণিক
গত ৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮২তম সিন্ডিকেটে যৌন নিপিড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক প্রামাণিকের ৮ বছর পদন্নোতি স্থগিত করে। এছাড়াও অন্য শাস্তির মধ্যে রয়েছে ১০ বছর প্রশাসনের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি ও নিজ কোর্সের বাইরে তিনি ক্লাস-পরীক্ষা-মূল্যায়ন করতে পারবেন না। তবে বিচার চলাকালীন ৩ বছর তার শাস্তির মধ্যে বিবেচ্য হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এমন সিদ্ধান্তে খুশি নয় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তাদের অবস্থান জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে দেখা করেছেন তারা। তবে উপাচার্য জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর করার কিছু নেই। তবে ভুক্তভোগীরা এখনও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেননি।
এ ঘটনায় ২ তদন্ত কমিটির তদন্ত শেষে সিন্ডিকেটে বক্তব্য উপস্থাপন করে রিভিউ কমিটি। রিভিউ কমিটির দাবি, অভিযোগ সন্দেহতীতভাবে প্রমাণ হয়নি তবে এ ধরনের অভিযোগ অমূলক নয়। রিভিউ কমিটির বক্তব্যের অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সিন্ডিকেট সদস্যরা।
তবে পূর্ববর্তী দুই কমিটিই শাস্তির দাবি জানানো সত্ত্বেও রিভিউ কমিটির এমন অস্পষ্ট বক্তব্যের কারণ জানতে চাইলে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. শওকত জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী দুই কমিটির বক্তব্যে ভিন্নতা ছিলো তাই আমাদের কমিটি করা হয়। আমরা আমাদের বক্তব্য সিন্ডিকেটকে জানিয়েছি। যেহেতু সিন্ডিকেট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে, আমাদের কিছু বলা ঠিক হবে না।
২য় তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনিও রিভিউ কমিটির প্রধান শওকত জাহাঙ্গীরের সাথে সুর মিলিয়ে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের পর এবিষয় নিয়ে কথা বলতে চাননি।
২য় তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক ছিলো বেশি। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত না করে মীমাংসার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠায় কমিটি বাতিল করা হয়। তবে পুনরায় অজানা কারণে কমিটি বহাল করা হয়। ভুক্তভোগীরা জানায় এই কমিটির একজন সদস্য তাদের বিভিন্ন বিব্রতকর প্রশ্ন করে হয়রানির শিকার করেছে।
তবে রিভিউ কমিটির বক্তব্য ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ১ম তদন্ত কমিটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয় যৌন নিপিড়ন প্রতিরোধ সেলের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. হেলেনা পারভীন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তদন্ত কমিটিতে অভিযোগ প্রমাণ হয়েছিলো। কমিটির সদস্যরা সবাই এবিষয়ে একমত ছিলাম। তবে এরকম যদি হতে থাকে আমাদের শিক্ষার্থীরা কখন বিচার পাবে না।’
পূর্ববর্তী দুই তদন্ত কমিটি শাস্তির দাবি জানালেও রিভিউ কমিটির এধরণের অস্পষ্ট বক্তব্য, সিন্ডিকেটের লঘুদণ্ড প্রদান ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা ও তদন্ত নিয়ে বিতর্ক সবমিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে যথাযথ তদন্ত যে হয়নি এ বিষয় একমত প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ ও তদন্তের জন্য ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন দরকার। আমাদের সিনিয়র অধ্যাপকদের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো, তারা তাদের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শিক্ষকরাতো এমন ইনভেস্টিগেশনে পারদর্শী নয়। তবে ভবিষতে এধরণের তদন্তে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।’
তবে বিচার নিয়ে তার দাবি প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাব ছিলো না। তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটে যারা আছেন সবাই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। সিন্ডিকেটের বিজ্ঞ সদস্যরা তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। বরখাস্তর পরের সর্বোচ্চ শাস্তিটা তাকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গত ৩ বছর তদন্ত চলাকালীন সময়েও তার বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আর্থিকভাবেও তার শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সে অভিযোগকারীদের কোনও ক্লাস-পরীক্ষা মূল্যায়ন করতে পারবে না, পাশাপাশি প্রশাসনের কোনও দায়িত্ব সে ১০ বছর পাবে না, এতে যারা আন্দোলন করেছে তাদের উপরও কোনও হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে না।

পুনঃতদন্তের সুযোগ আছে কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ৩ ধাপে তদন্ত করেছি। এখন আর কোনও সুযোগ আমাদের হাতে নেই। অভিযোগকারীরা চাইলে আদালতে যেতে পারে। আমি তাদের বলেছি, তদন্ত সংশ্লিষ্ট কাগজ-ফ্যাক্স যা লাগে আমি সাহায্য করবো।’
আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সরকার আলি আক্কাস বলেন, ‘যদি অভিযোগকারীরা মনে করে বিচার বা তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি সেক্ষেত্রে তারা আদালতে যেতে পারে। আদলত যদি মনে করে বিচার বা তদন্তে সুষ্ঠুতার অভাব রয়েছে সেক্ষেত্রে পুনরায় তদন্ত বা বিচারের নির্দেশ দিতে পারেন।’
তবে ছাত্র নেতারা মনে করছেন, শাস্তি যখন দেওয়া হয়েছে সেহেতু অভিযোগ সত্য। তাই প্রামাণিকের স্বপদে বহাল থাকার সুযোগ নেই। এ ইস্যুতে প্রশাসনের উপর চাপ অব্যহত রাখবেন তারা। তবে করোনার কারণে এখনই পুরোদমে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। তবে এরই মধ্যে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা।
এবিষয়ে মানববন্ধনের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিচারের নামে প্রশাসনের এমন প্রহসনের কারণে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অত্যাধিক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে উপযুক্তের শাস্তি বহিষ্কার দাবি করছি, যা ভবিষ্যতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যদি আবদুল হালিম প্রামাণিকের বহিষ্কার না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মাধমে দাবি আদায় করতে সচেষ্ট থাকবে।’
এ বিষয়ে জবির ৭ দফা আন্দোলনের সংগঠকদের একজন তৌসিব মাহমুদ সোহান বলেন, ‘যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণের পরও একজন শিক্ষক কিভাবে স্বপদে বহাল থাকেন সেটাই আমার বোধগম্য না! এমন একজন শিক্ষকের সাথে অন্য শিক্ষার্থীরা কিভাবে ক্লাস করবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আমাদের দাবি থাকবে তাকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সাথে আমাদের কথা হয়েছে।প্রয়োজনে আমরা এই বিষয়টা নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হব।’
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে জবির নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক আব্দুল হালিম প্রামাণিকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন দুই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় দুই দফা তদন্তের পর ২০১৮ সালে ৭৭তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে তিরস্কার ও দুই বছরের জন্য পদোন্নতি পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী ছাত্রী এমন শাস্তিতে অসন্তুষ্ট জানিয়ে উপাচার্য বরাবর চিঠি দিলে ফের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ চলতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর ৮২তম সিন্ডিকেটে তাকে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়।

/এনএ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ