X
রবিবার, ১৪ আগস্ট ২০২২
৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

কওমি স্বীকৃতি ঠেকাতে বেফাকের নামে জমিয়তের তৎপরতা: শফীকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা

চৌধুরী আকবর হোসেন
০১ অক্টোবর ২০১৬, ১৪:০০আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৬, ১৫:৩৭

বেফাক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি ঠেকাতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটভুক্ত রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।দেশের বৃহৎ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) এর দায়িত্বে থাকা জমিয়তের নেতারা স্বীকৃতি নিলে মাদ্রাসা সরকার নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে বলেও প্রচারণা চালাচ্ছেন। স্বীকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বেফাক চেয়ারম্যানকে ভুল বোঝাচ্ছেন জমিয়তের নেতারা। যদিও মাদ্রাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে সনদের স্বীকৃতি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ কওমিপন্থী আলেমরা। কওমিপন্থী আলেম ও বেফাক সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, কওমি মাদ্রসারা সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি বর্তমানে কওমি অঙ্গনে আলোচিত বিষয়। শোলাকিয়ার ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ১১ আগস্ট কওমি সনদের স্বীকৃতি দিতে প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার কাছে দাবি তুলেন আলেমরা। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা কওমি সনদের স্বীকৃতির পক্ষে সবাই একমত হলে অথবা যাঁরা আগ্রহী, তাঁরা একমত  হলে স্বীকৃতি প্রদানের আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর থেকেই নতুন করে আলোচনায় আসে কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি। সর্বশেষ ২৭ সেপ্টেম্বর  কওমি শিক্ষাসনদের সরকারি স্বীকৃতি দিতে ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রসা শিক্ষা কমিশন’ এর খসড়া আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দিতে শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসঊদকে চেয়ারম্যান এবং গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার মহাপরিচালক মুফতি রুহুল আমিনকে সদস্যসচিব করে একটি কমিটি গঠন করে।

জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর থেকেই বাড়তে থাকে আলোচনা সমালোচনা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি পেলে বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটভুক্ত রাজনৈতিক দল জমিয়তের উলামায়ে ইসলামের প্রভাব কমে যেতে পারে বলে তৎপর হয়ে ওঠেন দলটির নেতারা। বেফাক ও জমিয়ত নেতারা  বেফাক সভাপতি আল্লামা শাহ আহমাদ শফীর সঙ্গে দেখা করতে বুধবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রসায় যান। বৃহস্পতিবার বেফাকের সভাপতি আল্লামা শফীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আশরাফ আলী, মাওলানা আজহার আলী আনোয়ার শাহ, মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা সাজিদুর রহমান, মুফতি ওয়াক্কাস, মাওলানা জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী, মাওলানা মাহফুযুল হক,  মাওলানা আবদুল হামিদ, মাওলানা নুর হোছাইন কাসেমী, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, মাওলানা জুনাইদ আল হাবীব, মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী, মাওলানা মনজুরুল ইসলাম, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা আবদুল কুদ্দুস প্রমুখ।

বৈঠকে কওমি মাদ্রাসার  শিক্ষাসনদ স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ঘোষিত মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে প্রত্যাখান করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে লিয়াঁজো করার জন্য ৭ সদস্য বিশিষ্ট সাব কমিটি গঠন করা হয়। আল্লামা আশরাফ আলীর নেতৃত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মাওলানা আযহার আলী আনোয়ার শাহ, মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মাওলানা সাজিদুর রহমান, মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী, মাওলানা মাহফুযুল হক, মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী। কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে বেফাকের নামে ও আল্লামা শফীকে প্রধান করে কমিশন গঠন করে স্বীকৃতি বিষয়ে সরকারকে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের অনুরোধ জানাবে। অন্যদের আপত্তির মুখে স্বীকৃতি বিষয়ক ৭ সদস্যবিশিষ্ট বেফাকের  কমিটিতে নেই জমিয়তের কোনও নেতাকে রাখা হয়নি।

বৈঠকে উপস্থিত বেফাকের এক সহ সভাপতি জানান, মাদ্রাসার স্বকীয়তার শর্ত সাপেক্ষে কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন আল্লামা শফী। আর তিনি যখন স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলেছেন, তখন যারা বিরোধিতা করতো তারাও আর কোনও কথা বলার সুযোগ পায়নি।

আল্লামা আহমদ শফীর মূল বক্তব্য হল,  সরকারকে বোঝাতে হবে কওমি মাদ্রসা কী। আহমদ শফী বৈঠকে কারও নাম উচ্চারণ করেননি। এখন হয়ত অনেকে রঙ দিয়ে নানা কথা বলছেন। সরকার গঠিত কমিটিকে প্রত্যাখানের প্রস্তাব দিয়েছিল জমিয়তের নূর হোছাইন কাসেমী ও তার সহযোগীরা। সূত্র জানায়, এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি (আল্লামা শফী) বলেছেন, তোমরা শুধু কথা বলো, কাজ করো না। অন্য সংগঠনদের সঙ্গে বসো, আলোচনা করো, এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাও, বোঝাও কওমি মাদ্রসা কী।’

তার এই বক্তব্যে স্বীকৃতির বিরোধিতা করতে না পেরে এখন এর কৃতিত্ব কে নেবে সেটার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সেটার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। চিহ্নিত যারা আগে বিরোধিতা করেছিল, তাদের নিয়ে আশংকা রয়েছে। অল্প কিছু লোকের কারণে স্বীকৃতি আদায়ে দেরি হয়েছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে আশ্বাসের পর থেকেই তৎপর হয়ে ওঠে জমিয়ত নেতারা।  গত ২২শে আগস্ট হাটহাজারী মাদ্রাসায় কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে আল্লামা শাহ আহমাদ শফীর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে হেফাজত ও বেফাকের নেতার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিএনপি-জামায়াত জোটভুক্ত হেফাজত নেতার স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান না নিতে আল্লামা আহমদ শফীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে  স্বীকৃতি নিলে ‘মাদ্রাসাগুলোর স্বকীয়তা’ থাকবে না বলেও অনেক হেফাজত নেতা আল্লামা শফীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এছাড়া, বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে স্বীকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও প্রচারণা চালান জমিয়ত নেতারা।

বেফাক সূত্রে জানা গেছে, বেফাকের পরিচালনার দায়িত্বে  থাকা মজলিসে আমেলার (নির্বাহী কমিটি) সদস্য সংখ্যা ৫৫ জন। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী মজলিসে আমেলার সভাপতি। এছাড়াও এই কমিটিতে রয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামা ইসলাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা। এসব নেতারা রাজনৈতিক দল ও বেফাক উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে। এরমধ্যে বেফাকে জমিয়তে উলামা ইসলামের প্রভাব বেশি। এই দলের কমপক্ষে ৭ জন নেতা বেফাকের মজলিসে আমেলায় রয়েছে। এছাড়া, মজলিসে আমেলা ছাড়াও বেফাকের বিভিন্ন দায়িত্বেও রয়েছেন জমিয়ত নেতারা।

বেফাকের মজলিসের আমেলার তালিকায় দেখা গেছে,  জমিয়তের  মহাসচিব  মাওলনা নূর হোসেন কাসেমী বেফাকের সহ-সভাপতি, নির্বাহী সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাস বেফাকের সহ-সভাপতি,  জমিয়তের  সহ-সভাপতি মোস্তফা আজাদ বেফাক সহ-সভাপতি,  যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মনঞ্জুরুল ইসলাম বেফাকের আমেলার সদস্য, জমিয়তে  সহকারী মহাসচিব মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী বেফাকের আমেলার সদস্য, সহকারী মহাসচিব মাওলানা মাসউদুল করিম বেফাকের আমেলার সদস্য, জমিয়ত ঘরনার আলেম আবু ফাতাহ মোহাম্মদ বেফাকের আমেলার সদস্য ও বেফাক সহকারী মহাসচিব। বেফাক মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদীও বেফাকের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত।

এ প্রসঙ্গে বেফাকের সহ সভাপতি আনোয়ার শাহ বলেন, স্বীকৃতি আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। আল্লামা আহমদ শফীও স্বীকৃতি নিয়ে বিরোধিতা করেননি। যারা বিরোধিতা করছেন, তারও বেশি সুযোগ পাচ্ছেন না। স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে দেশের সব বোর্ডকে নিয়ে আলোচনা হবে। স্বকীয়তা বজায় থাকলে স্বীকৃতি নিয়ে এখন আর কারও আপত্তি নেই। যারা রাজনীতি করেছেন তার আর রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন না।

স্বীকৃতি প্রসঙ্গে জমিয়তের নির্বাহী সভাপতি ও বেফাকের সহ-সভাপতি  মুফতি ওয়াক্কাস  বলেন, সরকার ঘোষিত নতুন কমিটিকে আমরা প্রত্যাখান করেছি। মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বড় মাপের আলম ঠিক আছে, কিন্তু ব্লগারদের পক্ষ অবস্থান নেওয়াই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক বোর্ডগুলোকে নিয়ে সোমবার বৈঠক হবে। সেই বৈঠকের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

 আরও পড়ুন: জঙ্গিদের বোমা-গ্রেনেডের উৎস যেখানে

/টিএন/

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পিএইচডি গবেষণা: নীতিমালার খসড়া তৈরি করতে ৭ সদস্যের কমিটি
পিএইচডি গবেষণা: নীতিমালার খসড়া তৈরি করতে ৭ সদস্যের কমিটি
উচ্চ শব্দে গান বাজাতে নিষেধ করায় প্রতিবেশীকে হত্যা, গ্রেফতার ৩
উচ্চ শব্দে গান বাজাতে নিষেধ করায় প্রতিবেশীকে হত্যা, গ্রেফতার ৩
গুচ্ছ পরীক্ষায় প্রক্সির ঘটনায় ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা
গুচ্ছ পরীক্ষায় প্রক্সির ঘটনায় ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা
শেখ কামালের মৃত্যুবার্ষিকীতে দিনব্যাপী আবাহনীর কর্মসূচি
শেখ কামালের মৃত্যুবার্ষিকীতে দিনব্যাপী আবাহনীর কর্মসূচি
এ বিভাগের সর্বশেষ
মিশেল ব্যাচেলেট ঢাকায়
মিশেল ব্যাচেলেট ঢাকায়
বঙ্গবন্ধু তার মেয়েদের দেখে রাখতে বলেছিলেন
বঙ্গবন্ধু তার মেয়েদের দেখে রাখতে বলেছিলেন
দেশ পরিকল্পিত পথেই এগোচ্ছে: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
দেশ পরিকল্পিত পথেই এগোচ্ছে: পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিদর্শন জাতির অমূল্য সম্পদ: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নিদর্শন জাতির অমূল্য সম্পদ: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
‘আগুন নিয়ে আসবেন না বলে দিচ্ছি’
‘আগুন নিয়ে আসবেন না বলে দিচ্ছি’