জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপের ক্থা বলা হলেও সেটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দিনদিন উজাড় হচ্ছে জলবায়ু সহায়ক সবুজ বেষ্টনী। জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পগুলোতেও চলছে অর্থের তছরূপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষ্ঠু নীতিমালা, অদক্ষতা, প্রতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অনিয়মর ও দুর্নীতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা কারণ ও এখাতের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের স্টাফ রিপোর্টার শাহেদ শফিকের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে একাদশ পর্ব।
জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলে বনায়ন করে সরকার। বনায়নকৃত এসব স্থানের মধ্যে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আইন অনুযায়ী এসব স্থানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু এই বনাঞ্চলকে আবার ঘোষণা করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ! এতে মানুষের বসবাস বৈধতা পেয়েছে এখানে। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য। বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, একই বিষয়ে দ্বৈতনীতি মেনে নেওয়া যায় না।
বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ১৯৬৬ সালের পর এ যাবতকালীন বনায়নের জন্য উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ লাখ ৩৬ হাজার একর জায়গা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করে সরকার। বন আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী একে সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিঝুম দ্বীপে এসে দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একে জাতীয় উদ্যানের ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণা অনুযায়ী ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল জাহাজমারা রেঞ্জের আওতাধীন ১১টি মৌজার ৪০ হাজার ৩৯০ একর জমি উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর গেজেটের মাধ্যমে একে সংরক্ষিত বনভূমির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরমধ্যেই ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে নিঝুম দ্বীপকে নতুন ইউনিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
চরওসমান, চরকমলা, চরআফতাব মিলে নিঝুম দ্বীপের আয়তন প্রায় ২০ হাজার একর। ওই ঘোষণার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন নিঝুম দ্বীপের সংরক্ষিত বনের জমি বন্দোবস্ত দিতে শুরু করে। তার আগেও বনদস্যুরা দ্বীপের গাছপালা কেটে ভূমিহীনদের মাঝে জমি বিক্রি করেছিল। ওই সময়ই নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের রাস্তারচর, দমারচর, কালামচর, চরমিজান, চরমাহিদসহ সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানের অনেক বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়ে যায়। বনবিভাগের অভিযোগ, ভূমি অফিস থেকে সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে।
নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করার পর একে ৯টি ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। এর প্রতিটি ওয়ার্ড সংরক্ষিত ও জাতীয় উদ্যানের একেকটি অংশ। নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করার পর ইউনিয়ন পরিষদ ও বন বিভাগের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ইউনিয়ন পরিষদ তার ওয়ার্ড উন্নয়নের নামে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে সড়ক নির্মাণ ও বসতি বসাতে শুরু করে। বসতি শুরু হওয়ার পর থেকে শুরু হয় বনের বৃক্ষনিধন
শুধু তা-ই নয়, বনের ভেতরে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সড়ক নির্মাণও শুরু করা হয়েছে। এসব সড়ক দিয়ে অবাধ চলাচল ও বাগানে বসতি গড়ে ওঠার ফলে দ্বীপের বাগানে থাকা প্রায় ৪০ হাজার হরিণ এখন বিলুপ্তির পথে। যদিও হরিণের এই সংখ্যা ২০০৮ সালের। বর্তমানে এটি বেড়ে কয়েকগুণ হওয়ার কথা থাকলেও তা দাঁড়িয়েছে হাজার চারেকে। বন বিভাগের দাবি, ব্যাপক হারে বাগান ধ্বংস, জনবসতি গড়া ও ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করে এর স্বকীয়তা নষ্ট করার কারণে দ্বীপের এমন পরিণতি হয়েছে।
নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণার পর থেকে এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন মেহেরাজ উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে জাতীয় উদ্যানের গাছ কাটা, ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া ও বসতি নির্মাণসহ নানা কারণে ১৩টি মামলা করেছে বনবিভাগ। চেয়ারম্যান মেহেরাজ উদ্দিনের দাবি, নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান হলেও সবটাই তার ইউনিয়ন পরিষদের অংশ। সে কারণে জনবসতি শুরু হয়েছে। যে যার মালিকানাধীন ভূমির গাছ কেটে বসতি গড়েছে।
সংরক্ষিত এলাকা ও জাতীয় উদ্যানের ভেতরে কীভাবে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা একটি ইউনিয়ন পরিষদ। আমি এর নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ বাস করছেন। পরিষদের সব কার্যক্রম চলবে। আমি বলেছি, ইউনিয়ন পরিষদ ও জাতীয় উদ্যানের জমি পৃথক করে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হোক। কিন্তু এখনও তা করা হয়নি।’
সরেজমিন দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ইট-পাথর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্বীপের ছোঁয়াখালী এলাকায় দেখা গেছে, ছোঁয়াখালী থেকে বন্দরটিলা বাজারের পশ্চিম পাশের বউবাজার পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্যানের বাগান কেটে চাষাবাদ ও বসতি গড়ে তোলা হয়েছে।
দ্বীপের বৌবাজার, ছোঁয়াখালী, নামারবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন কৌশলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বড় বড় গাছ কেটে মাটিতে ফেলে রাখা হচ্ছে। এরমধ্যেই চলছে নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ ও চাষাবাদের আয়োজন। এসব বিষয়ে বৌবাজার এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলতে গেলে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে এ প্রতিবেদককে।
দ্বীপের ছোঁয়াখালী খালের ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি লাইট হাউজ নির্মাণ কাজ চলছে। কিন্তু নিঝুম দ্বীপে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও কীভাবে লাইট হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে সে বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, দখলদাররা প্রথমে বাগানে গিয়ে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল কেটে দেন। এর কয়েক মাস পর গাছগুলো মরে যায়। এরপর ভেঙে পড়ে। পরে দখল করেই চাষাবাদ শুরু করা হয়। এর সঙ্গে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, বন বিভাগ ও ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালীরা জড়িত।
প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন জাহাজমারা রেঞ্জের নিঝুম দ্বীপ (চরওসমান) বিটের এক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চেয়ারম্যান মেহরাজ উদ্দিনকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি কোনও কথাই শুনছেন না। তার লোকজন দিয়ে বনের গাছ কেটে জমি দখল করেই চলেছেন।’
জাতীয় উদ্যানকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করায় সেভ দ্য নিঝুম দ্বীপের মহাসচিব রফিক উদ্দিন এনায়েত জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। রায়ে আদালত নিঝুম দ্বীপকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা কেন অবৈধ করা হবে তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
জানতে চাইলে রফিক উদ্দিন এনায়েত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে কীভাবে সরকার আবার ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করে সেটা আমার বুঝে আসছে না। আমরা এ নিয়ে আদালতেও গিয়েছি। এ সময় স্থানীয় চেয়ারম্যান মেহেরাজ উদ্দিন ২০১৪ সালের দিকে আদালতে একটি মামলা করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারি করে নিঝুম দ্বীপে ইউনিয়ন ও বনবিভাগের জমি আলাদা করে সীমানা নির্ধারণের জন্য কেন আদেশ দেওয়া হবে না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জবাব চেয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত শুধু বনবিভাগ ছাড়া আর কেউ রুলের জবাব দেয়নি। পরে মামলাকারী চেয়ারম্যানও আর মামলাটি তদারকি করেননি। কারণ, আদালত সীমানা নির্ধারণের জন্য আদেশ দিলে ইউনিয়ন পরিষদ থাকবে না। ইউনিয়ন পরিষদ তো বনবিভাগের জমিতে। আর আমাদের মামলাটির আগামী তারিখে একটা রায় হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর এখানে জনবসতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালেই এ দ্বীপকে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ ২০১২ সালে সরকার এ দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ঘোষণা হয়েছে। তবে বন বিভাগের বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধারে একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করা সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল বা পরিবেশনীতির লঙ্ঘন বলে মনে করছেন পরিবশে ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ ঘোষণার মাধ্যমে বনে মানুষের অবাধ অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছে। এতে বন আর সংরক্ষিত হিসেবে থাকল না।
জানা গেছে, সরকারে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির রূপরেখা অনুসারে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অনুমিত অবদান (এনডিসি), ২০১৫’তে জাতীয় প্রশমন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রার আলোকে বাংলাদেশ উপকূলীয় বনের সীমা বৃদ্ধিকে ̧গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সমন্বয়ে জলবায়ু প্রশমন সহায়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন, বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণমূলক প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করবে। কার্যক্রমের ধরনভেদে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের (বিসিসিটিএফ) হতে প্রদত্ত তহবিলের প্রায় ৫২ শতাংশ তহবিল (৩১৬ কোটি টাকা) বনায়ন ও বন ব্যবস্থাপনায়, ৩২ শতাংশ তহবিল (১৯৫ কোটি টাকা) নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং ১৬ শতাংশ তহবিল (৯৮ কোটি টাকা) প্রশমন সংক্রান্ত অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হচ্ছে। এভাবে একটি অর্থ ব্যয় অন্যদিকে বন ধ্বংসের জন্য সহায়ক সিদ্ধান্ত জলবায়ুর জন্য ইতিবাচক হতে পারে না।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল কীভাবে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করা হলো? যদি সরকার করেই থাকে তাহলে বনবিভাগের জমি চিহ্নিত করে দিতে হবে। সেখানে ইউনিয়ন পরিষদের কোনও অধিকার থাকবে না। এখন সরকার যদি দ্বৈতনীতি অবলম্বন করে তাহলে তো সেখানে কিছুই করার থাকে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ল্যান্ড বিভাগ একভাবে চলে আর বন বিভাগ এক ভাবে চলে। কারো সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই। বন বিভাগের মতামত ছাড়া তো সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করতে পারে না।
আরও পড়ুন...
নিঝুম দ্বীপের বন সাবাড় করছে বন্দোবস্তপ্রাপ্তরা
সৌরবাতি প্রকল্পে মাটির নিচেই নষ্ট হলো কোটি টাকার যন্ত্র
জলবায়ুর টাকায় ফুট ওভারব্রিজ, ট্রাফিক বাতি!
বায়ুদূষণ কমাতে ৮০০ কোটি টাকা: বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতি আর বিদেশ ভ্রমণেই ফুরালো!
জলবায়ুর টাকা পুরোটাই গেছে জলে, ২৯৬ জনের বিদেশ সফর
৮ হাজার একর বন উজাড়, ক্ষতি সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা!
৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩০ কোটি নিলো পরামর্শকরাই!








