জলবায়ুজনিত ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। ঝুঁকি কমাতে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না কোনোটির। জলবায়ু তহবিলের প্রকল্পগুলোতেও চলছে অর্থের তছরুপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অদক্ষতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা দিক ও এ খাতের অনিয়ম নিয়ে শাহেদ শফিকের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ থাকছে ত্রয়োদশ পর্ব
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে নদীভাঙনসহ নানা কারণে উদ্বাস্তু হয়ে রাজধানী ঢাকায় বাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। এরা থাকছেন বস্তি, ফুটপাত ও উন্মুক্ত স্থানে। তাদের সংসারে বেড়ে ওঠা শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যের মৌলিক অধিকার থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। এসব মানুষের কথা চিন্তা করে রাজধানীর সদরঘাটে ‘শেখ হাসিনা জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয় ও সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টার’ নামে একটি আধুনিক জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কিন্তু অযত্ন, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে উদ্বোধনের কয়েক মাস না যেতেই প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে আশ্রয়কেন্দ্রটি।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আশ্রয় ও বস্তিবাসীদের আর্থসামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে রাজধানীর সদরঘাটে নগরভবনের আদলে মাল্টিপারপাস ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। ৮৪ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে ১৪ তলা ফাউন্ডেশনে ছয় তলা ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০২ সালে। কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালের দিকে। প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি টানা ৯ বছর ফাঁকাই ছিল। পরে একে জলবায়ু আশ্রয়কেন্দ্র ও সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারে রূপান্তর করে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশনকে।
২০১৫ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর স্থানীয় ৩৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুর রহমান মিয়াজী ভবনটির দ্বিতীয় তলার প্রায় এক হাজার বর্গফুট জায়গায় কার্যালয় তৈরি করেন। এরপর থেকে তিনি সেখানে নিয়মিত অফিসও করছেন। সিটি করপোরেশন থেকে তাকে বারবার সেই জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তিনি তা শোনেননি। তার কার্যালয়ে নানা কাজে নগরীর মানুষের অবাধ যাতায়াত লেগেই আছে। এতে উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি কার্যত আর আশ্রয়কেন্দ্র থাকেনি।
দায়িত্বে থাকা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকেও বারবার আপত্তি জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চুক্তির শর্তানুযায়ী করপোরেশন থেকে তারা সহযোগিতা পাচ্ছে না। তাছাড়া করোনার কারণে কেন্দ্র পরিচালনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জানা গেছে, ডিএসসিসির কেন্দ্রটির জন্য গত অর্থবছরে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য গত ৩০ মার্চ সাজেদা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে দুই বছর মেয়াদী চুক্তি করে ডিএসসিসি। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিবছর সাজেদা ফাউন্ডেশনকে ৬ কোটি টাকা করে দেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। কিন্তু চুক্তির মাত্র তিন মাস না যেতেই পরের জুনে এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চ টারমিনালের উত্তর-পূর্ব কোণে ভবনটির অবস্থান। ভবনটির দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশে আলাদা চারটি কক্ষ নিয়ে কাউন্সিলর কার্যালয়। জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবদুর রহমান মিয়াজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনটি নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়নি। নকশায় এতে একটি কাউন্সিলর কার্যালয় রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে কাউন্সিলর কার্যালয় উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে আমার একটি রিট আবেদন করা আছে। আদালত সে পরিপ্রেক্ষিতে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি মাল্টিপারপাস ভবন। এখানে এলাকার মানুষের জন্য ঐতিহ্যবাহী ব্যায়ামাগার, কাউন্সিলর কার্যালয়, মাতৃসদন ও কমিউনিটি সেন্টার ছিল। আমি সেগুলো বহাল রাখার প্রস্তাব করি। কিন্তু আমার প্রস্তাব রাখা হয়নি। পরে আমাকে সরে যাওয়ার নোটিস দেওয়া হয়। বলা হয় আমার অবস্থান অবৈধ। পরে আমি উচ্চ আদালতে রিট করি। কোন ক্ষমতা বলে এটা সাজেদা ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়েছে তা আমি জানি না।’
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, সদরঘাটের ভবনটি দীর্ঘদিন ফাঁকা পড়ে থাকার পর নগরীতে অবস্থানরত জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য বেসরকারি সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশনকে দায়িত্ব দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে তার নামেই এর নামকরণ করা হয়। এ জন্য করপোরেশনের বোর্ডসভার অনুমোদনও নেওয়া হয়। কিন্তু বোর্ডসভার অনুমোদনের পরও স্থানীয় কাউন্সিলরের বাধার মুখে পড়ে আশ্রয়কেন্দ্রটি। তিনি ভবনের চারটি কক্ষ ও ভবনের নিচে থাকা পাবলিক টয়লেটটিও দখলে রাখেন। কথা ছিল অত্যাধুনিক এই পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের জন্য যে অর্থ পাওয়া যাবে তা আশ্রয়কেন্দ্রের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
বোর্ডসভার অনুমোদনের পরও কার্যালয় সরিয়ে না নেওয়াটা করপোরেশনের কাজে বাধার সামিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুর রহমান মিয়াজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি বোর্ডসভায় এলাকাবাসীর দাবি উত্থাপন করেছি। তখন বলা হয়েছিল এ নিয়ে আমার সঙ্গে বসা হবে। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করেই সাজেদা ফাউন্ডেশনকে ভবনটি দিয়ে দিয়েছে।’
গত ৩০ মার্চ ডিএসসিসির সঙ্গে সাজেদা ফাউন্ডেশনের সমঝোতা চুক্তির পর থেকেই করোনা মহামারির কারণে সারা দেশ লকডাউন করা হয়। তার আগে গত ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন। তখন আশ্রয়কেন্দ্রটি ছিল লোকে লোকারণ্য। এরপর করোনা, করপোরেশনের অবহেলা ও কাউন্সিলরের বাধার কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে এর কার্যক্রম। জুনের পর এর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। আর এসব কারণেই ভবনটি আর পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে ডিএসসিসিকে জানিয়ে দেয় সাজেদা ফাউন্ডেশন। তবে এখন চুক্তি বাতিল না হলেও কর্তৃপক্ষ বিকল্প সিদ্ধান্ত নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরে আধুনিক ব্যবস্থা থাকলেও তাতে কোনো জলবায়ু উদ্বাস্তুর দেখা মেলেনি। প্রতিটি কক্ষ প্রায় ফাঁকা রয়েছে। তবে শিশুদের কক্ষগুলোতে ৪-৫ জন শিশুকে খেলতে দেখা গেছে। ভবনের মূল ফটকে কয়েকজন দায়িত্ব পালন করছেন।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ভবনটির নিচতলায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবাসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে ডায়াগনস্টিক, গাইনি, শিশু, মেডিসিন, চর্ম ও দন্ত সেবা প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় তলার বাম পাশে রয়েছে ৭৫ জন বয়স্কর জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং ডানপাশের কক্ষগুলোর মধ্যে একটি প্রশিক্ষণ, একটি কম্পিউটার ল্যাব, একটি মনোসামাজিক কাউন্সিলিং কেন্দ্র। এর একটি কক্ষে রয়েছে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়।
ভবনের তৃতীয় তলার বাম পাশে রয়েছে দুই থেকে ছয় বছর বয়সী ৮৫ জন শিশুর জন্য প্রারম্ভিক বিকাশ কার্যক্রম (ইসিডি) ও দিবাযত্ন কেন্দ্র। এ ছাড়া ৭ থেকে ১০ বছরের শিশুদের শিক্ষাসহ সব শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য ও বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। ডান পাশে ৮৫ জন স্কুলপড়ুয়া শিশুর জন্য শিক্ষা, শারীরিক বা মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক শিক্ষা সেশন রয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় রয়েছে ৪৫২ জনের জন্য আবাসন সুবিধাসহ জীবিকা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুবিধা। ভবনসংলগ্ন একটি উন্নতমানের প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবাকেন্দ্র এবং পাবলিক টয়লেট ও মানবিক অধিকার নিশ্চিতকরণে রয়েছে একটি মাতৃদুগ্ধপান কেন্দ্র। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য রয়েছে কমিউনিটিভিত্তিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানের সুব্যবস্থা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাজেদা ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ‘সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়েছে সেটা তারা পুরোপুরি পালন করতে পারেনি। কাউন্সিলর কার্যালয়টি সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও সরেনি। পাবলিক টয়লেটটিও তার দখলে। এখন পর্যন্ত সব কিছু আমাদের অর্থেই চলছে। সব মিলিয়ে আমাদের মতামত কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন তাদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সুরাহা করা হবে।’
জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ডিএসসিসির বস্তি উন্নয়ন বিভাগ। জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা একেএম লুৎফুর রহমান সিদ্দীক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা জলবায়ু উদ্বাস্তু আশ্রয়কেন্দ্রটি নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলরের সঙ্গে ঝামেলা চলছে। তাকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য আমরা কয়েকবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তিনি সরেননি। এখন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে তা বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাজেদা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি ছিল দুই বছরে সিটি করপোরেশন তাদেরকে ১২ কোটি টাকা দেবে। বিনিময়ে তারা আশ্রয়কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে। ডিএসসিসি শুধু তদারকি করবে। কিন্তু এখন তারা নানা কারণে অপারগতা প্রকাশ করে আমাদের চিঠি দিয়েছে। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ফাইল পাঠিয়েছি।’
জানতে চাইলে সাজেদা ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘ভবনটি আর পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা বিষয়টি জানিয়ে গত অক্টোবর মাসে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। তাতে চুক্তি বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। চিঠি পেয়ে ডিএসসিসি মেয়র আমাদের সঙ্গে বসবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এখনো তারিখ নির্ধারণ হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিতে যেসব শর্ত ছিল তার কিছুই মানেনি ডিএসসিসি। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের প্রভাবে কোনও কাজও করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যে সেবামূলক কাজের জন্য ভবনটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম সেটা না হলে অযথা চুক্তি রেখে লাভ কী?’
আরও পড়ুন...
জাতীয় উদ্যান-সংরক্ষিত বনাঞ্চল যখন ইউনিয়ন পরিষদ!
বিলুপ্তির পথে নিঝুম দ্বীপের চিত্রা হরিণ
সৌরবাতি প্রকল্পে মাটির নিচেই নষ্ট হলো কোটি টাকার যন্ত্র
জলবায়ুর টাকায় ফুট ওভারব্রিজ, ট্রাফিক বাতি!
বায়ুদূষণ কমাতে ৮০০ কোটি টাকা: বেতন-ভাতা, যন্ত্রপাতি আর বিদেশ ভ্রমণেই ফুরালো!
জলবায়ুর টাকা পুরোটাই গেছে জলে, ২৯৬ জনের বিদেশ সফর
৮ হাজার একর বন উজাড়, ক্ষতি সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা!
৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ৩০ কোটি নিলো পরামর্শকরাই!








