X
সোমবার, ২৭ জুন ২০২২
১৩ আষাঢ় ১৪২৯

বয়া আঁকড়ে বেঁচে যান ফয়েজ, দড়ি ধরে ঝুলছিলেন ফোরকান

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:১৯

রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা ফয়জুল আমিন খান ফয়েজ (৩২) ও তার আত্মীয় কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা ফোরকান হোসেন (৩২)। পেশায় দুজনেই ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বৃহস্পতিবার সদরঘাট থেকে অভিযান-১০ লঞ্চে ওঠেন বরগুনা যাবেন বলে। প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন দুজনই। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন কাছ থেকে দেখা সেই বিভীষিকার কথা।

ফয়জুলের এক পায়ে সমস্যা। খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। কিছুটা সাঁতার জানেন। তবে ফোরকান সাঁতার জানতেন না। কিছু ক্যামেরা ও সরঞ্জাম লাগানোর কাজে যাচ্ছিলেন বরগুনা। সঙ্গে ছিল প্রায় দেড় লাখ টাকার মালামাল। উঠেছিলেন ২১৮ নম্বর কেবিনে।

ফয়জুল জানালেন, ‘রাত আনুমানিক পৌনে তিনটা। কথা হয় লঞ্চের এক স্টাফের সঙ্গে। তাকে বললাম, রামনা ঘাট এলে নামিয়ে দিয়েন, আমরা চিনি না। স্টাফ জানায়—দেরি আছে, আপনারা ঘুমান। পরে কেবিনে ঘুমাতে যাই। কিন্তু ঘুম আসছিল না। কিছু সময় মোবাইলে কোরআন তেলাওয়াত শুনি। কিছুক্ষণ পর চোখে ঘুম লেগে আসে। মোবাইল বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। চোখ লাগতেই হঠাৎ হইচই শুনি। বাইরে যাই কী হচ্ছে দেখতে।’

“দেখি লঞ্চের পেছনে ইঞ্জিনের দিকে বিকট শব্দ হচ্ছে। আগুনও বাড়তে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ইঞ্জিন। মানুষের হুড়োহুড়ি আর চিৎকার শুনতে পাই। লঞ্চটি পাড়ের কাছাকাছিই মনে হলো। আমার ধারণা ছিল দূরত্ব হবে বড়জোর ২০-২৫ গজ। চিন্তায় পড়ে যাই। আগুন বেড়েই চলছে। হঠাৎ দেখি স্টাফরা লাফিয়ে পড়ছে পানিতে। আরও অনেককে ঝাঁপ দিতে দেখলাম। এমন সময় বন্ধ হয়ে গেলো লঞ্চের বাতি। আমি লাফ দেওয়ার কথা জানাই। কিন্তু ফোরকান বললো, সে ঝাঁপ দেবে না। কারণ সাঁতার জানে না। আমি বয়া খুঁজতে থাকি। হাতের কাছেই পেয়ে যাই একটা। আমি লাফ দেওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু ফোরকান বারবার বলছে, ‘তুই যা, আমি নামবো না। পাড়ে গিয়ে দেখ কোনও নৌকা পাওয়া যায় কিনা। আমি পরে ওটায় চড়ে যাবো।’ তখন আর কিছু মাথায় আসেনি। মায়ের কাছে ফোন করি। বলি, ‘মা আমাদের লঞ্চে আগুন লেগেছে, দোয়া করেন। বেঁচে গেলে পরে আবার ফোন করবো।’ এই বলে গায়ের কাপড়চোপড় খুলে লুঙ্গি পরে নিই। সব ফোরকানের কাছে রেখে ঝাঁপ দেওয়ার প্রস্তুতি নিই।”

ফয়েজ বলেন, ‘এরই মধ্যে দেখি বয়ার জন্য কাড়াকাড়ি চলছে। দেরি না করে লাফ দিতেই দেখি পাড়ের দূরত্ব আমার ধারণার চেয়ে বেশি। একপাশ দিয়ে দড়ি ধরে বেয়ে বয়া নিয়ে নেমে যাই। ভাসতে থাকি আমি। আমার পাশে নারী-পুরুষ-শিশু সকলেই ঝাঁপ দিচ্ছে। চোখের সামনে অনেককে তলিয়ে যেতে দেখলাম।’

ফয়েজ আরও বলেন, ‘ভাসতে ভাসতে নদীর মাঝখানে চলে যাই। প্রচণ্ড ঠান্ডা। কূলকিনারাও দেখা যাচ্ছে না। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছে। গায়ে শক্তি পাচ্ছিলম না। ভাসতে ভাসতে কোন এক চরে গিয়ে ঠেকি। সেখানে সিরাজ নামের এক ব্যক্তি ছিলেন নৌকা নিয়ে। তিনি আমাকে টেনে তোলেন। একটি জামা আর গামছা দেন। শরীর কিছুটা ঠিক হলে তাকে জানাই লঞ্চে আমার লোক আছে, তাকে আনতে যাবো। কিন্তু তিনি বলেন, আগে নিজে বাঁচেন। ওই সময় পুরো লঞ্চ জ্বলছে। মনে হলো, কারও বেঁচে থাকার কথা নয়।’

‘পরে সিরাজের নৌকায় চড়ে পাড়ে যাই। সেখানে দেখি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করছেন। তাদের একজনকে অনুরোধ করি আমাকে লঞ্চে নিয়ে যেতে। তিনি বললেন, পাশের মসজিদে আশ্রয় নেন। আমরা যাদের পাচ্ছি তাদের উদ্ধার করে পাড়ে আনছি। সেখানে দেখেন আপনার লোককে পান কিনা। সেখানে গিয়ে ফোরকানের দেখা পাইনি। আরেকজনের ফোন নিয়ে বাড়িতে জানাই যে আমি বেঁচে আছি। ফোরকানদের বাসায় সংবাদ দিতে বলি। সারা রাত ফোরকানকে খুঁজে বেড়াই। ফজরের আজানের পর পর খবর পাই ফোরকান বেঁচে আছে। পরে তার সঙ্গে কথা হয়। সে চলে গিয়েছিল নদীর আরেক পাড়ে।’

ফোরকান জানান, ‘লঞ্চের সামনের দিকে শেষ মাথায় একটা দড়ি ঝুলছিল। আমি ওটা ধরে ঝুলেছিলাম। পরে লঞ্চটি যখন একটি চরের পাড়ের দিকে আসে, তখন নেমে পড়ি।’

এ সময় সঙ্গে নিজের দুটি ব্যাগও নিতে পারেন ফোরকান। পরদিন বাসে করে বাড়িতে ফেরেন দুজন।

ফয়জুল মনে করেন, ‘আগুন যখন লাগে, তখন লঞ্চটি নদীর পাড়ের কাছে ছিল। সে সময়ে লঞ্চের স্টাফরা যদি নোঙর ফেলতো, তবে অনেকেই বেঁচে যেতো। তা না করে তারা সবার আগে লাফিয়ে নেমে যায়।’

প্রসঙ্গত, সদরঘাট থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় বরগুনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে অভিযান-১০ লঞ্চ। এরপর থামে চাঁদপুর, বরিশাল ও দপদপিয়া ঘাটে। দপদপিয়া থেকে লঞ্চটি ছাড়ে বেতাগীর উদ্দেশে। রাত ৩টায় সুগন্ধা নদীতে যখন ছিল, তখন ইঞ্জিন কক্ষে আগুন লাগে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় লঞ্চজুড়ে। এখন পর্যন্ত ৩৭টি লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। আহত অবস্থায় ভর্তি আছেন শতাধিক। অনেকের অবস্থা গুরুতর। উদ্ধার করা লাশের মধ্যে ২৩টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। নমুনা সংগ্রহ করে লাশগুলো শনিবার বরগুনার পোটকাখালী গ্রামের খাকদোন নদীর পাড়ে গণকবরে দাফন করা হয়। পরিচয় পাওয়া ১৪ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে প্রশাসন।

/এসও/এফএ/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
শ্রীলঙ্কায় স্কুল বন্ধ, সরকারি কর্মীদের হোম অফিসের পরামর্শ
শ্রীলঙ্কায় স্কুল বন্ধ, সরকারি কর্মীদের হোম অফিসের পরামর্শ
সিরাজগঞ্জে কৃষক হত্যায় ৮ জনের যাবজ্জীবন
সিরাজগঞ্জে কৃষক হত্যায় ৮ জনের যাবজ্জীবন
বরিস জনসন সেজে পুলিশের তাড়া!
বরিস জনসন সেজে পুলিশের তাড়া!
এ বিভাগের সর্বশেষ
প্রতিদিন রেলে কত যাত্রী?
সংসদে প্রশ্নোত্তরপ্রতিদিন রেলে কত যাত্রী?
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা
২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ
২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ
চার মাস পর শনাক্ত ২ হাজার ছাড়িয়ে
চার মাস পর শনাক্ত ২ হাজার ছাড়িয়ে
পদ্মা সেতু পারাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
পদ্মা সেতু পারাপারে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান