X
শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১০ ফাল্গুন ১৪৩০

ওয়াশিংটন দূতাবাসের চিঠির কী জবাব দেবে সরকার?

শফিকুল ইসলাম
০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৫৯আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৩:৫৯

শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে মেমোরেন্ডাম দিয়েছে, তা নিয়ে পর্যালোচনা করেছে বাংলাদেশ। এযাবৎ বাংলাদেশে শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার কী কী করেছে, কী কী করার উদ্যোগ নিয়েছে সে বিষয়টির লিখিতভাবে অগ্রগতি জানানো হবে। পোশাক খাত নিয়ে পাঁচ বছরের যে একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত যেসব অগ্রগতি হয়েছে, আর যেসব অগ্রগতি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে, সেগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক মার্কিন শ্রমনীতির বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, বাইডেন সরকারের নতুন ঘোষিত নীতি অনুযায়ী শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে মনে করলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সুযোগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক খাতের ওপর পড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয় ওই চিঠিতে।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (বাণিজ্য) মো. সেলিম রেজার লেখা চিঠিটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো হয়।

গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন (ফাইল ছবি)

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমনীতি গ্লোবাল ইস্যু। তবে বাংলাদেশে যারা ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে কাজ করেন, তাদের বিরুদ্ধে যেন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখার পক্ষে সরকার। কারণ, সেটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনও সুযোগ পায় না। তাই নতুন মার্কিন শ্রমনীতি নিয়ে কোনও চাপ অনুভব করছে না বাংলাদেশ। তারপরও ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে লেখা চিঠিকে আমলে নিয়েছে সরকার। এ কারণেই সেই চিঠির জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

চিঠির জবাব তৈরির কাজ শুরুও করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে সেই চিঠিতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে তা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৪ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত ওই সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (বেপজা), এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চিঠি চূড়ান্ত করার আগে আরও দুটি সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটন দূতাবাস থেকে আসা ওই চিঠির সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন, অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া স্মারকের সংকলিত একটি প্রতিবেদনও জুড়ে দেওয়া হয়। এই চিঠিকে কেন্দ্র করেই শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধে পড়তে পারে বাংলাদেশ—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গার্মেন্ট শ্রমিকদের আন্দোলন (ফাইল ছবি)

এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র শ্রম আইন বা শ্রম অধিকার নিয়ে আরও অগ্রগতি দেখতে চায়, তবে এটা একদিনে হবে না। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা চলমান প্রক্রিয়া। সরকার এটা নিয়ে সচেতন আছে। সব ধরনের নিয়ম মেনেই বাংলাদেশ থেকে পোশাক রফতানি করা হয় বিভিন্ন দেশে। কারও দয়ায় বাংলাদেশ কোনও দেশে তৈরি পোশাক রফতানি করে না বলেও মনে করে সরকার।

চিঠি প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের শ্রম ইস্যুতে ইতোমধ্যে অনেক অর্জন রয়েছে। এছাড়া পোশাক খাত নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের যে কর্মপরিকল্পনা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত যেসব অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হবে। এছাড়াও চিঠিতে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়েছে, যা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এছাড়া শ্রমিক কল্যাণে আরও কী করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। পোশাক খাত বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশের কিছু শর্ত ছিল। শ্রম আইন ও বেজা আইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে চাওয়া ছিল, তা অনেকটাই পূরণ করা হয়েছে। সেগুলো যুক্ত করা হবে।

সম্প্রতি মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা (ফাইল ছবি)

গত কয়েক বছরে চারবার শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে, সে বিষয়টিও লিখিত চিঠিতে থাকবে। বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কর্মক্ষেত্রে শ্রমমান, শ্রম আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি, শ্রম অধিকার ও ন্যায্য মজুরি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব ইস্যুতে কোথায় কী অগ্রগতি হয়েছে বা কোথায় কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিনা সেসব বিষয় একত্রিত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডার ও শ্রম মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। এসব বিষয় চিঠিতে উল্লেখ থাকবে।

শ্রম আইনের সংশোধন ও বেজা আইনের মাধ্যমে শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে তাও চিঠিতে উল্লেখ থাকবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) আইনের সংস্কার হয়েছে। আবার আগামী বছর জুন মাসে বেপজা আইনের সংস্কার হবে। ওয়াশিংটনে পাঠানো চিঠিতে এসব বিষয় উল্লেখ থাকবে।

গার্মেন্ট শ্রমিক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ জানিয়েছেন, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিধান ডব্লিউটিও’র (বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা) আইনে নেই। কিন্তু কেউ যদি কোনও দেশকে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দেয়, সেই সুবিধা বাতিল করতে পারে। আমরা যা করবো তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী করতে হবে। এ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেয় না। তারা চেয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন করতে ১০ ভাগ শ্রমিকের সম্মতি লাগবে। আমরা ১৫ শতাংশ করেছি। আগে ২০ শতাংশ ছিল। সব অগ্রগতি তো হয়েছে। এগুলোই তাদের জানানো হবে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাচ্ছে। আমরা এ পর্যন্ত চারবার শ্রম আইন সংস্কার করেছি। আমরা একটা সংস্কারের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। এ বিষয়টিও তাদের জানানো হবে।

সচিব বলেন, আমাদের মোট রফতানির মাত্র ১৭ শতাংশ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। আর ইউরোপে রফতানি করি ৫৫ থেকে ৬০ ভাগ। যথেষ্ট শুল্ক দিয়েই আমরা যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক পাঠাই। সেখানে বাংলাদেশ কোনও ছাড় তাদের কাছ থেকে পায় না। আমরাও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে চাই। এটিই আমাদের লক্ষ্য।

গার্মেন্ট শ্রমিক (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)

বাণিজ্য সচিব জানিয়েছেন, শ্রম অধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে নতুন শ্রমনীতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী শ্রম পরিবেশের আরও উন্নতি হোক। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

এদিকে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে এখন আর নেতিবাচক কিছু বলার সুযোগ নাই। এখানে চমৎকার কর্মপরিবেশ বিরাজ করছে। সর্বশেষ গত মাসেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুনভাবে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে, যা জানুয়ারি থেকেই কার্যকর হবে। বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্রিন ফ্যাক্টরি এখন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বিদ্যমান শ্রম আইন শ্রমিকবান্ধব। গত ১০ বছরে যা তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আগামীতেও করা হবে। 

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার। এই বাজার ধরে রাখতে যা করণীয় সবই করা হবে।

আরও পড়ুন-

শ্রম ইস্যুতে মার্কিন বিধিনিষেধে পড়লে কী করবে সরকার?

তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ সরকারের

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রদান হতাশাব্যঞ্জক: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ চুন্নুর
২৪ বার কামড় দিয়েছে বাইডেনের কুকুর!
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লা সিটি উপনির্বাচনে প্রতীক পেলেন চার মেয়রপ্রার্থী
কুমিল্লা সিটি উপনির্বাচনে প্রতীক পেলেন চার মেয়রপ্রার্থী
নৌকায় বিদ্যালয়, হলো সূর্যোদয়
নৌকায় বিদ্যালয়, হলো সূর্যোদয়
ইউক্রেন যুদ্ধের দুই বছর: সংঘাত, ক্রোধ আর ক্লান্তি
ইউক্রেন যুদ্ধের দুই বছর: সংঘাত, ক্রোধ আর ক্লান্তি
মাইক্রোওয়েভে করতে পারেন এই ৫ কাজ
মাইক্রোওয়েভে করতে পারেন এই ৫ কাজ
সর্বাধিক পঠিত
বাড়িওয়ালাদের তালিকা ধরে অভিযান চালাবে এনবিআর
বাড়িওয়ালাদের তালিকা ধরে অভিযান চালাবে এনবিআর
৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবসর সুবিধা দিতে হাইকোর্টের রায়
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীকে অবসর সুবিধা দিতে হাইকোর্টের রায়
ইউরোপে মানবপাচারে জড়িত বিমানবন্দরের কর্তারা: ডিবির হারুন
ইউরোপে মানবপাচারে জড়িত বিমানবন্দরের কর্তারা: ডিবির হারুন
বইমেলা থেকে বের করে দেওয়ায় ডিবি কার্যালয়ে গেলেন হিরো আলম
বইমেলা থেকে বের করে দেওয়ায় ডিবি কার্যালয়ে গেলেন হিরো আলম
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরভিএন্ডএফ কোরের সদস্যদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সেনাপ্রধান
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরভিএন্ডএফ কোরের সদস্যদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সেনাপ্রধান