অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ঋণখেলাপি কমানো ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার আহ্বান রুমিন ফারহানার

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:৫৩আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:৫৩

সরকারকে হুন্ডি ও অর্থপাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, “২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ফেরত কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের কোনও পরিবর্তন কাজে আসবে না।”

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিন মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) এসব কথা বলেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, “রাষ্ট্রপতি ভাষণের পাঁচ নম্বর প্যারায় বলা হয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৪৯ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং, উৎপাদন ও সেবা খাতগুলোকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ধরা হয়। সেই দুই খাতেই কর্মসংস্থান চলছে। একে চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি বলে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ঝুঁকি।”

তিনি বলেন, “দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, দক্ষতার অভাব এবং ভাষাগত দুর্বল কারণে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হচ্ছে অন্য লোক নিয়োগ দিতে। অর্থাৎ, কর্মমুখী শিক্ষা দিয়ে চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। মাধ্যমিকের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার যেখানে তিন দশমিক শূন্য এক শতাংশ, সেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে এটি আট দশমিক সাত শতাংশ।”

মূল্যস্ফীতি নিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, “ভাষণের ছয় নম্বর প্যারায় মূল্যস্ফীতির কথা বলা আছে। বিবিএস এর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর লাল তালিকায় অলরেডি বাংলাদেশের নাম গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। যাদের মোট আয়ের দুই তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত খাবার কিনতেই চলে যায়। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি দারিদ্র বাড়ায়, পুষ্টিহীনতা তৈরি করে এবং আগামী প্রজন্মের মেধা বিকাশে সরাসরি প্রভাব রাখে। মাননীয় স্পিকার, ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ সেটা দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ বিলিয়ন ডলার বলে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন। এই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত হলো পোশাক রফতানি। এরপর আছে প্রায় এক কোটি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স, বৈদেশিক ঋণ, ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই, বৈদেশিক অনুদান ইত্যাদি।”

তৈরি পোশাক খাত ও বৈদেশিক নির্ভরতা কমানোর আহ্বান জানিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, “একক শিল্প হিসেবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার হওয়া, এফডিআই’র ক্রমাবনমন ইত্যাদিকে মোকাবিলা করতে হলে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি, বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোর কোনও বিকল্প নেই। সম্প্রতি সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। তাই এখন থেকেই আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। রফতানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্ত না হলে এই চাপ সামাল দেওয়া সত্যিই কঠিন।”

পাচার ও খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হুন্ডি ও অর্থপাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে যার পরিমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব মতে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। সেটি ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ছয় লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের কোনও পরিবর্তন কাজে আসবে না। টাকার ৭৫ শতাংশই যায় ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। গত ১০ বছরে এই ওভার অ্যান্ড আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হয়েছে ৬৮ বিলিয়ন ডলার। এই মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচারও বন্ধ সম্ভব নয়।”

সরকারের সমালোচনা করে রুমিন ফারহানা বলেন, “রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি, উন্নতকরণ, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত, খেলাপি ঋণ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি সরকারের ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উচ্চ ডিগ্রিধারী মানুষজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকজন নিয়োগ পায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর যিনি নিয়োগ পেয়েছেন তিনি হলেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং একজন সোয়েটার ফ্যাক্টরির এমডি।”

স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “একই ঘটনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখেছি। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি-প্রোভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দল করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু, দল না করলে যদি নিয়োগ না হয় সেটা দুর্ভাগ্যজনক।”

/এসএমএ/এবিএম/
সম্পর্কিত
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
বাজেটের আগেই নতুন ধাক্কাবিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ায় মানুষের পকেটে বাড়তি চাপ 
মে মাসে রফতানি আয় ৪৪০ কোটি ডলার
সর্বশেষ খবর
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
আসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী