জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি বলেছেন, সংসদ অধিবেশনের চেয়ে কোনও রাষ্ট্রীয় কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুজব নিয়ে সময় ব্যয় করা উচিত নয়। অপরদিকে বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, এটি সংসদের শৃঙ্খলা ও ডিসেন্সির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৩তম দিন মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালে সংসদে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্পিকার এবং বিরোধী দলীয় নেতা।
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধিতা না করে বাজেট বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা উচিত। একইসঙ্গে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, শেখ হাসিনা ফিরলে জুলাই আন্দোলনে প্রোফাইল লালকারীদের জীবন কালো করে ছাড়বে।
অপরদিকে, বিরোধী দলীয় সদস্যরা বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি ও দলীয়করণ। তারা জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হবে কিনা—সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও সুরক্ষার বিষয় বিবেচনা করা হবে।
দিনের শুরুতে স্পিকার বলেন, অধিবেশনের চেয়ে কোনও রাষ্ট্রীয় কাজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি সংসদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।
বিরোধী দলীয় নেতা সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, অধিবেশন চলাকালে কয়েকজন সদস্যকে ছোট ছোট দলে আলাদা আলোচনা করতে দেখা যায়, যা সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুসরণে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
স্পিকার বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার উত্থাপিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট অধিবেশনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, সব রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংসদ অধিবেশনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। মন্ত্রীদের অবশ্যই সময়মতো সংসদে উপস্থিত থেকে তাদের মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট আলোচনা শুনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, বিরোধী দল আন্দোলনের প্রস্তুতির কথা বলছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে সহযোগিতা করা উচিত। না হলে আবারও শেখ হাসিনা ফিরলে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল লাল করেছিলেন, তাদের জীবন কালো করে ছাড়বে—এমন হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, অতীতে ‘আয়নাঘর’-এর বৈদ্যুতিক শক চেয়ারের প্রসঙ্গ তুলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে ওই অভিজ্ঞতা করানো উচিত—এ ধরনের মন্তব্যও করেন।
এরপর জুলাই শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা এবং জামায়াত জোটের মনোনীত সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, সন্তানের বেদনা একজন শহীদ মা ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। তিনি ৫ আগস্ট তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করার কথা তুলে ধরেন। জুলাই আন্দোলনে শহীদদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরসহ অন্যান্য বিচারবহির্ভূত ঘটনার বিচার দাবি করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিলেও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি। এর জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার আইনি কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষা দিয়েছে, যা রাজনৈতিক সুরক্ষার সমতুল্য।
বাজেটকে ‘বিশাল ঘাটতি ও ঋণনির্ভর’ বলে আখ্যায়িত করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রসুল। তিনি বলেন, বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে এবং এডিপির ৮১ শতাংশই ঋণনির্ভর। বর্তমানে প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা।
তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ও দলীয়করণই বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান বাধা।
মেম্বার থেকে এমপি
কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল গফুর সংসদে জানান, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য (মেম্বার) থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান, পরে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
সংসদ সদস্য মো. আলী আজগার বলেন, বাজেটে আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বিএনপির সংসদ সদস্য শামিম কায়সার বলেন, চলতি বাজেটে এমন কোনো সুযোগ নেই। পরে আলী আজগার বলেন, তিনি বাজেট নথির তথ্যের ভিত্তিতেই বক্তব্য দিয়েছেন।
মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধ
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন বলেন, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, আয়নাঘরসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে ঐকমত্য থাকা উচিত। তিনি বলেন, বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে দেশ টেকসইভাবে এগোতে পারে না।
সংসদ সদস্য আবু তালেব মণ্ডল বলেন, দুর্নীতি ও মাদক দেশের প্রধান সমস্যা। তিনি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বাজেট গণমুখী ও মানবিক
বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বাজেটকে গণমুখী, উৎপাদনমুখী ও মানবিক বলা যেতে পারে। তিনি জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের মেট্রোরেল ভাড়া ছাড় ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন।








