ঢাকার বস্তির ৭০ ভাগ মানুষই জলবায়ু উদ্বাস্তু

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৭:৪৭, ডিসেম্বর ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৫, ডিসেম্বর ২০, ২০১৭

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বেড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত উদ্বাস্তুর সংখ্যা। অনেকেই কাজের সন্ধানে বাস্তুভিটা ছেড়ে আসছেন। ঢাকার বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে উদ্বাস্তু হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা—আইএমও-এর এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর কড়াইল বস্তি (ছবি: সংগৃহীত)বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা ও নদীভাঙন বাড়ছে। বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। সাগরের লবণাক্তও বেড়ে গিয়ে পরিবেশকে বসবাসের অনুপযোগী করছে তুলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এমনই এক মানুষ মাহফুজুর রহমান। বাড়ি সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ উপজেলার উত্তর কদমতলায়। আগে কৃষি কাজ করে জীবন নির্বাহ করলেও এখন আর তার কোনও কাজ থাকে না। বাধ্য হয়েই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আসতে হয় শহরে। বছরের বেশিরভাগ সময় আশেপাশের জমি সব পানিতে ডুবে থাকে। কাজ করার মতো জমি নেই। আর জমি থাকলেও তাতে লবণাক্ততার কারণে কোনও ফসল হয় না। ফলে জীবনযাপন করতে হলে বাইরে না গিয়ে উপায় নেই মাহফুজুর রহমানের।

শুধু মাহফুজুর রহমান নন, তার মতো অনেকেই আজ এই পরিবর্তনের শিকার। আর এভাবেই বেড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা।

ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার-এর হিসাব  অনুযায়ী  জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন। ঢাকার বস্তি এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্থানান্তরিত বলে জানিয়েছে অভিবাসন-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএমও। লবণপানি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে ধীরে ধীরে গ্রাস করায় সেখানকার মানুষ শুধু কাজ হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে। খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, বাগেরহাটের মংলা ও শরণখোলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলাসহ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে।

এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ-পরিচালিত গবেষণায় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে অভিবাসী হওয়া প্রায় দেড় হাজার পরিবারকে শনাক্ত করা হয়। পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে তারা স্থানান্তরিত হয়েছেন।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর  উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এক জনপদ। এছাড়া একই উপজেলার পদ্মপুকুর ও আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরও জলাবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান জানান, ‘২০০৯ সালে আইলার পর পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে টিকতে না পেরে গাবুরার আট হাজার পরিবারের মধ্যে তিন হাজার পরিবারই তাদের আবাস্থল ছেড়ে চলে গেছে। এর মধ্যে ২০টি পরিবার গেছে ভারতে। তারা খাদ্য, পানীয় জল ও কাজের সংকটের কারণে জন্মভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।’

বাংলাদেশের জলবায়ুর পরিবর্তনের শিকার অঞ্চলগুলো চষে বেড়ানো মানুষ পিযুস বাউলিয়া পিন্টু। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। এই অঞ্চলের অনেকেই বাস্তুভিটা হারিয়েছেন। পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে হাজারও মানুষকে। আর এই পেশা বদল করতে গিয়ে অনেক লোককে বাইরেও যেতে হয়েছে।’

এমনই এক ইউনিয়ন বুড়িগোয়ালিনী। এই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এই ইউনিয়নটি বাংলাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখানকার লবণাক্ততা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।’ তিনি বলেন, ‘লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই এলাকার কৃষি জমিতে এখন আর ফসল হয় না। আগে  এ অঞ্চলের পুকুরগুলোতে দেশি মাছের চাষ হতো। লবণাক্ততার কারণে এখন তাও হয় না। এদিকে নাব্যতার কারণে চিংড়িও চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব কারণে এই ইউনিয়নের মানুষের কাজের জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে। আয় না থাকায় বাধ্য হয়েই গ্রাম ছাড়ছেন তারা।’ তিনি বলেন, ‘কাজের সন্ধানে খুলনা, বরিশাল শহর ছাড়া অনেকে ঢাকায়ও যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে পেশাও। আগে যারা কৃষি কাজ করতেন, আজ তারা ইট ভাটায় কাজ করছেন। কেউ কেউ দেশের বাইরেও যাচ্ছেন।’ এরমধ্যে ভারতের যাওয়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি জানান।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত চার লাখ লোক ঢাকায় চলে আসে। দিনের হিসাব করলে প্রতিদিন কম করে হলেও দুই হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় আসে আশ্রয়ের সন্ধানে। যাদের ঠাঁই হয় বস্তিতে। তাদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই জলবায়ু উদ্বাস্তু।

প্রতিবছর বাংলাদেশে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৮ মিলিমিটার করে বাড়ছে। যা বিশ্বের গড় বৃদ্ধির দ্বিগুণ। ২০৮০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে পানির উচ্চতা ২ ফুট বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ৪০ ভাগ এলাকা লবণ পানিতে তলিয়ে যাবে। আর এই ৪০ ভাগ এলাকায় প্রায় ৫ কোটি মানুষের বসবাস। এর ফলে ফসলি জমি নষ্ট হবে, কৃষক-জেলে তাদের পেশা হারাবে। তারা হারাবে তাদের আশ্রয় বা আবাস।

নদী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ তিনটি কারণে দেশান্তরী হচ্ছেন। প্রথমত, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে লবণাক্ততা বাড়ছে; দ্বিতীয়ত, আইলা-সিডরের কারণেও লবণাক্ততা বাড়ছে; তৃতীয়ত, উজান থেকে মিঠা পানি না আসার কারণেও লবণাক্ততা বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘শীতকালে ওইসব এলাকার পানির লবণাক্ততা সমুদ্রের পানির মতোই হয়ে যায়। বর্ষাকালে কিছুটা কমলেও তা গ্রহণযোগ্য মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। ফলে তীব্র খাবার পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে কৃষি কাজও করা যাচ্ছে না। ফলে জীবিকা হারিয়েছেন অনেকে। জীবিকার সন্ধানে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম এমনকি ঢাকাও আসছে অনেকে। সীমান্তা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেও যাচ্ছেন।’

অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বাঁধগুলোর উচ্চতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প প্রয়োজন হবে। তবে এসব করার পরও এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ নেই।’ এটি অব্যাহতভাবে ঘটতেই থাকবে বলে তিনি অভিমত দেন।

/এমএনএইচ/ আপ এমও/

লাইভ

টপ