স্পেনের কথা বলে লিবিয়ায় পাচার, নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় (ভিডিও)

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৩:৫৮, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৩, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯

 রায়হান ভুইয়া জনিব্রাহ্মণবাড়িয়ার রায়হান ভুইয়া জনি। অল্প খরচে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে দালাল রফিক তাকে বলেছিল, ‘স্পেন যাওয়া খুব সহজ। কাজও আছে, টাকাও পাওয়া যাবে অনেক।’ প্রথম প্রথম জনি দালালের কথায় প্রভাবিত হননি। তবে দালালরাও নাছোড় বান্দা। তাদের ক্রমাগত প্রলোভনে শেষ পর্যন্ত ফাঁদে পা দিলেন তিনি। এতেই তার জীবনে ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসে। কয়েক দেশ ঘুরিয়ে তাকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে বন্দি অবস্থায় তাকে নির্যাতন করে সে ভিডিও দেখিয়ে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। জনিকে মুক্ত করতে প্রায় ২৫ লাখ টাকা দিয়ে তার পরিবার এখন নিঃস্ব।

জনির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রফিক ১২ লাখ টাকায় স্পেন পাঠানোর প্রস্তাব দেয় এবং জানায়, ঝামেলা ছাড়াই সহজে স্পেন পৌঁছানো যায়। রফিকের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ২০১৮ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমে বেনিন যান জনি। এজন্য ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রথম দফায় ইসলামী ব্যাংকের কাঁচপুর শাখায় রফিকের অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। দ্বিতীয় দফায় ৭ নভেম্বর একই শাখায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা করেন জনির বাবা। দালাল রফিক হোয়াটস অ্যাপে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর দেয়। তৃতীয় দফায় নেয় ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

বেনিনে প্রায় ছয় মাস ছিলেন জনি। সেখান থেকে সেনজেন ভিসা করে স্পেন পাঠানোর কথা ছিল তার। এ সময় বারবার স্পেনে পাঠানোর জন্য চাপ দিলে রফিক জানায়, ‘এখন সমস্যা আছে, ভিসা হচ্ছে না।’ এরপরও রফিক আরও ৪ লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু জনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে জনির সঙ্গে মোতাহের নামের আরেক দালালকে পরিচয় করিয়ে দেয় সে। মরক্কো যাওয়ার জন্য মোতাহের ও জনির মধ্যে ৩ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। এরপর মোতাহের আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৫০ হাজার এবং আড়াই লাখ টাকা নগদ নেয়। কিন্তু জনিকে মরক্কো না পাঠিয়ে সে লিবিয়ায় পাঠিয়ে দেয়।  

জনির বাবা শাহনেওয়াজ বলেন,  মোতাহের ৩ লাখ টাকায় নাইজার থেকে আলজেরিয়া হয়ে মরক্কো দিয়ে স্পেন পৌঁছে দেবে বলে এক সপ্তাহের মধ্যে আড়াই লাখ টাকা দাবি করে। তাকে টাকা নিয়ে বাড্ডা যেতে বলে। বাড্ডা গিয়ে তিনি ফোন দিলে তাকে একটি চটপটি দোকানে ডেকে নিয়ে যায় এবং সেখানে মোতাহেরের লোকের কাছে তিনি টাকা দিয়ে বাড়িতে ফিরে যান। পরের দিন মোতাহের ফোন দিয়ে বলে, আরও ৫০ হাজার টাকা দিলে জনিকে স্পেনে পাঠাবে, তাছাড়া পাঠাবে না। তখন আবার তিনি ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে তাকে পাঠান।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘আমি ৫০ হাজার টাকা পাঠাই ব্যাংকের মাধ্যমে। সে টাকা পেয়ে তিন দিন পর নাইজার থেকে তার লোক জনিকে গাড়িতে উঠায়। তারপর ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। প্রায় ১২ দিন পর ইমো থেকে ফোন করে ছেলে জানায় তাকে লিবিয়া নিয়ে গেছে। দুই দিন ধরে বন্দি করে রেখেছে একটি অন্ধকার ঘরে।’

জনির সঙ্গে এই প্রতিবেদকের ইমোতে কথা হয়। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘বন্দি অবস্থায় খাবারও দিতো না। মোবাইল পাসপোর্ট সব রেখে দিয়েছিল মোতাহেরের লোকজন। তখন এক লোক আমার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করে। না দিতে চাইলে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসতো। সেখান থেকে মোতাহারের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সে আর ফোন ধরেনি। আমি কোনোরকমে সেখান থেকে পালিয়ে যাই। পরে জানতে পারি তারা আমাকে লিবিয়ায় বিক্রি করে দিয়েছে। লিবিয়ায় এক বাঙালির কাছে আশ্রয় নিতে গেলে সে তার ক্যাম্পে আটকে মারধর করে। প্রতিদিন বাঁশের সঙ্গে দুই পা বেঁধে বিভিন্ন কায়দায় মেরে সেটার ভিডিও করে। সেই ভিডিও আমার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করে।’

তিনি আরও বলেন, তার বাবা স্থানীয় যুবলীগের নেতা। তাকে অপহরণের বিষয়টি আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে জানানো হয়। আইনমন্ত্রী পুরো বিষয়টি শুনে নিজে লিবিয়ার দূতাবাসকে জানান। কিন্তু লিবিয়ায় সরকার না থাকায় দূতাবাস উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। পরে তার বাবা জমিজমা বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অপহরণকারীরা হুন্ডির মাধ্যমে টাকাগুলো দিনার করে নেয়। তার বাবা অনি এন্টারপ্রাইজের পূবালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে, জেসমিন বেগমের নামে জনতা ব্যাংকে, আল আমিন নামে সোনালী ব্যাংকে, ইয়াসমিন বেগম নামে ইসলামী ব্যাংকে, বিসমিল্লাহ খাদ্য ভাণ্ডারের নামে ইসলামী ব্যাংকে, রাকিব এন্টারপ্রাইজের নামে ইসলামী ব্যাংকে, মাহবুবুর রহমানের নামে পূবালী ব্যাংকে টাকাগুলো জমা করে। টাকা পাওয়ার পর অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দেয়। এরপর তিনি দূতাবাসে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি দূতাবাসের হেফাজতে আছেন। দূতাবাস তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছে বলে জানা গেছে।

দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা জানান, রায়হানকে আইওএম’র সহায়তায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফ্লাইট হলেই তাকে দেশে পাঠানো হবে।

ছেলেকে মুক্ত করতে গিয়ে নিঃস্ব জনির পরিবার। তার বাবা জানান, ছেলে দেশে আসার পর তিনি আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

দালাল রফিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। আর মোতাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

 

 

/এসও/এসটি/এমএমজে/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ