বঙ্গবন্ধু কানে কানে বললেন, জয় বাংলা স্লোগানটা একটু দে: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

Send
আদিত্য রিমন
প্রকাশিত : ১৪:৪৭, জানুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩৫, জানুয়ারি ২৭, ২০২০

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

১৯৬৬ সালে ৮ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জেলখানাতেই প্রথম সরাসরি দেখা হয়েছিল মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের। বর্তমানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক এই সভাপতি। একই দল না করলেও ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার। তার কাছে বঙ্গবন্ধু ‘কালজয়ী’ পুরুষ। তবে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সেলিম। 

২৪ জানুয়ারি রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বসে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

বাংলা ট্রিবিউন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রথম কবে আপনার দেখা হয়েছিল?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: শেখ মুজিবুর রহমান নামটার সঙ্গে আমার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে পরিচয়। তখন এমন একটা অবস্থা যে, তখন আরও অনেক বড় বড় নেতার নামের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে এই নামটি উচ্চারণ না হয়ে পারতো না। কিন্তু ১৯৬৬ সালের ৮ জুন জেলখানায় তার সঙ্গে চাক্ষুষ দেখা হয় আমার। আমি আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের নেতা ছিলাম না। তখন আমি ছাত্র ইউনিয়ন করতাম, গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলাম। তখন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল— ৬ দফা ন্যায্য দাবি, কিন্তু বাঙালির মুক্তির সনদ নয়। ফলে এই দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ডাকা হরতালে আমরা জনতার সঙ্গে থাকবো। ওই হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে আমি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হই এবং এক মাসের জেল হয়। পরের দিন যখন কয়েদিদের টেবিলে কেস ফাইল রেডি করা হচ্ছে, তখন কেস টেবিলের পাশে জেলখানার ভেতরে ছিল দেওয়ানি এলাকা। সেখানে কাচের একটা দরজা ছিল। ওই দরজার ভেতর থেকে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা একজন লোক আমাদের উদ্দেশে হাত নাড়লেন। তখন আশপাশের হাজতিরা বললো— এটাই শেখ মুজিব। তখন তিনিও জেলখানায়। এটাই হলো তাকে আমার প্রথম চাক্ষুষ দেখা।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমবাংলা ট্রিবিউন: কখনও কি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক টেবিলে বসে রাজনৈতিক আলাপ হয়েছিল?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি ১৯৭২ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হই, তারপর এক টেবিলে বসে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল। যদিও সেগুলো রাজনৈতিক আলাপ ছিল না। এরপর বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে আলোচনা-কথাবার্তা বলার সুযোগ হয়েছিল। তখন আমি বয়সে অনেক জুনিয়র, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী। তিনি তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি।

বাংলা ট্রিবিউন: বঙ্গবন্ধু কখনও আপনাকে কোনও বিষয়ে উপদেশ বা অনুরোধ করেছেন কিনা, তার সঙ্গে কোনও স্মৃতির কথা মনে আছে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আমি ভিন্ন দল করতাম, এবিষয়ে বঙ্গবন্ধু সচেতন ছিলেন। আমি নিজে তো সচেতন ছিলামই। এই কারণে কখনও সম্পর্কটা গুরু-শিষ্যের মতো ছিল না। আমার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি তার মতো করে স্বাগত জানাতেন, হয়তো কখনও তিনিও বলতেন— সেলিম এটা করে আসলাম। আমিও কিছু বিষয় তার সঙ্গে শেয়ার করতাম। ১৯৭২ সালে প্রথমবার ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তখন পতাকা উত্তোলন করে সম্মেলন উদ্বোধন করার পর আমি স্লোগান দিলাম— ছাত্র ইউনিয়ন জিন্দাবাদ, জয় সমাজতন্ত্র। তখন তিনি কানে কানে আমাকে বললেন, ‘দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। জয় বাংলা স্লোগানটা একটু দে।’ তখন আমি জয়বাংলা স্লোগানটাও দিলাম। এই একটা ঘটনা মনে আছে।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউন: আপনি ডাকসু ভিপি থাকার সময় ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সদস্যপদ বাতিল করেছিলেন…, এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: উত্তর ভিয়েতনাম একটা স্বাধীন দেশ। তখন দক্ষিণ ভিয়েতনামে যুদ্ধ চলছিল। কিন্তু আমেরিকা… তীব্র বোমা বর্ষণ শুরু করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন শুরু করি এবং সংহতি দিবস ডাকা হয় ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। সেটা বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে (এখন যেটা মতিঝিল আদমজি কোর্ট) আমেরিকান দূতাবাসে যায়, একটা স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য। আমরা যখন কদম ফোয়ারা পার হয়ে পল্টনের দিকে যাচ্ছি, (তখন কোনাটায় ছিল আমেরিকান তথ্য কেন্দ্র) তার সামনে পুলিশ লাইন ধরে দাঁড়ানো ছিল। তারা আমাদের মিছিলের ওপর গুলি চালায়। মতিউল ইসলাম, মির্জা আব্দুল কাদের মৃত্যুবরণ করে এবং বহু আহত হয়। তারপর এই ঘটনার জন্য আমরা সরকারকে দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা চাইতে বলি। কিন্তু তারা এটা না করে উল্টো অভিযোগ করে বলে— কতিপয় দুষ্কৃতিকারী বিশৃঙ্খলকারী হয়ে ওঠে, তারপর তাদের গুলি করা হয়। এতে আমরা এবং দেশবাসী আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। পরের দিন হরতালে পল্টনে জনসভায় আমি বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বক্তৃতা করি যে— যার হাত নিজের সন্তানের রক্তে রঞ্জিত, তিনি পিতৃত্বের দাবি করতে পারেন না। আপনারা কেউ তাকে জাতির পিতা বলবেন না, যতক্ষণ তিনি ক্ষমা না চান। আর তার ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ স্থগিত করা হলো। এই ঘটনায় আমরা কতগুলো দাবি দিয়েছিলাম। এটাই ছিল ঘটনা। যখন শেখ মুজিবের ডাকসু সদস্যপদ স্থগিত করা হলো, তখন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিল মাহবুবুর জামান। তিনি আরেকটু অতি উৎসাহে বই থেকে তার সদস্য পদের কাগজটি ছিঁড়ে ফেলেন। এর ৩-৪ দিন পর সরকারের মত পরিবর্তন হয়, তারা শুধু দুঃখ প্রকাশ নয়, যতগুলো দাবি করেছিলাম তা সব মেনে নেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দিচ্ছি। বাংলাদেশ ছিল প্রথম অকমিউনিস্ট দেশ, যারা দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল। আর ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্রকে বলা হয়— তোমরা বাংলাদেশে অ্যাম্বাসি খোলো, এটা চালানোর খরচ বাংলাদেশ সরকার দেবে। এরপর সেদিনের ঘটনায় আহতদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসার জন্য একজনকে লন্ডনেও পাঠানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও সরিয়ে দেওয়া হয় এবং ঘটনা তদন্ত করার জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও অন্যান্য ছাত্রনেতা

বাংলা ট্রিবিউন: এরপর বঙ্গবন্ধুর সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম:  না, তখন আর বিষয়টি নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য হয়নি। তখন আর এতো আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার ছিল না। তার সদস্য পদ থাকলে কী আর না থাকলে কী। আমাদের মূল দাবি ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। তখন তাৎক্ষণিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কতগুলো দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। শহীদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের রক্তের বিনিময়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এলে বছর বছর পালন করি। এটা আগে বলতাম ভিয়েনতাম সংহতি দিবস, এখন এটাকে সামজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস হিসেবে পালন করি। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। আজকে দেশ তার পদলেহন করে চলছে। ভারতে মোদি সরকার যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তার বিরুদ্ধে ফাইট না করে তাকে প্রধান বক্তা হিসেবে আনা হচ্ছে মুজিববর্ষ পালনের জন্য। এগুলো দুঃখজনক ব্যাপার।

বাংলা ট্রিবিউন:  বঙ্গবন্ধুর ডাকসুর সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য কখনও ক্ষমা চেয়েছিলেন কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম:  না, আমি ক্ষমা চাইবো কেন? ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বঙ্গবন্ধু আমাদের দাবিগুলো মেনে নিয়েছিলেন। ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এতে আমাদের সাফল্য এসেছে। এটা প্রাসঙ্গিক ছিল না, তখন এগুলো নিয়ে মাথা ঘামানো হতো না, এখন যেমন হয়।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদক আদিত্য রিমন

বাংলা ট্রিবিউন:  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম:  বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন কালজয়ী পুরুষ। তিনি দেশের একজন বড়মাপের নেতা ও রাজনীতির একজন মহানায়কই শুধু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইতিহাসের নায়ক। আরও সত্য করে বললে, তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক মহানায়ক। রাজনৈতিক-সামাজিক পরিমণ্ডলে এক ক্রম-অগ্রসরমান বিবর্তন ও উত্তরণের ধারার মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের মহানায়কের এই অবস্থানে উত্থিত হতে পেরেছেন। তার ভাবনা-চিন্তা, আদর্শবোধ, জীবন দর্শন ইত্যাদি বিভিন্ন আত্ম-পরিচয়ের মৌলিক উপাদানগুলো ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়েছে। এক সময়কালের অবস্থান থেকে পরবর্তী অন্য এক সময়কালে সেসবের উন্নত উত্তরণ ঘটেছে। উত্তরণ ও বিবর্তনের এই গতি কোনোদিন বন্ধ হয়নি, অব্যাহত থেকেছেন তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। রাজনীতির অনেক আঁকাবাঁকা পথে বঙ্গবন্ধুকে চলতে হয়েছে। অনেক আগু-পিছু করে বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির পথ পরিক্রম করতে হয়েছে। বাস্তব প্রতিকূলতার মুখে কখনও কখনও তাকে সাময়িক আপসও  করতে হয়েছে। কিন্তু তার সার্বিক বিবর্তনের গতি ছিল সামনের দিকে, প্রগতি অভিমুখে। এটাই ছিল স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী। কেন? কারণ, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের লোক, ছিলেন জনতার নেতা। রাজনীতির তাত্ত্বিক পণ্ডিত তিনি কখনও ছিলেন না। তিনি একজন সর্বজ্ঞানী স্কলার অথবা কোনও এক বা একাধিক বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন একজন বিশেষজ্ঞও ছিলেন না। কিন্তু তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রজ্ঞাবান একজন নেতা। ছিলেন মানুষের লোক। মানুষের কাছ থেকে তিনি গ্রহণ করতে পারতেন, বিচার-বিবেচনার রসদ সঞ্চয় করতে পারতেন। সব বিষয়ে শেষ ভরসা করতেন মানুষের ওপরে। মানুষের ওপর তার এহেন অপার ভালোবাসা ও নৈকট্যই তার ক্রমবিবর্তনের প্রগতিমুখী হওয়াটাকে স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল।

বঙ্গবন্ধু শুরুতে একজন দুরন্ত কিশোর ছিলেন উল্লেখ করে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘অনেকের কাছে তিনি মুজিব ভাই। তারপর মুজিবর রহমান, অথবা শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর বহুদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে তার নাম ছিল শেখ সাহেব। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন পরিচয় ‘বঙ্গবন্ধু’। একাত্তরের পর তিনিই হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতি এবং জাতির পিতা। তিন দশক সময়কালের মধ্যে এভাবেই ঘটেছিল তার অবস্থানের উত্তরণ।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এএইচ/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ