‘শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই’

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৮:১১, মার্চ ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৪, মার্চ ২৬, ২০২০

১৯৭২ সালের আজকের দিনের পত্রিকাদেশের স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। সেই বাংলায় আগামী দিনের মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবো। আপনারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন, সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে পারি।

সমাজবিপ্লবের যুগান্তকারী পদক্ষেপ

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ব্যাংক-বিমা, পাটশিল্প, বস্ত্র, চিনিশিল্প, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের বিরাট অংশ, ১৫ লাখ টাকার বেশি সম্পত্তির অনুপস্থিত মালিকদের পরিত্যক্ত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ বিমান ও জাহাজ করপোরেশনের জাতীয়করণের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেওয়া এ ভাষণে তিনি জাতীয়করণ বিষয়ক এই ঘোষণা দেন।১৯৭২ সালের আজকের দিনের পত্রিকা

আজিমপুর গার্লস হাইস্কুল মাঠে জাতীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনও অলসতান্ত্রিক কথা মাত্র নয়। আমার সরকার ও পার্টি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটা নতুন সমাজব্যবস্থার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে।

১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ দৈনিক বাংলায় বঙ্গবন্ধুর পুরো বক্তৃতা প্রকাশিত হয়।

বৈষম্য দূরে অঙ্গীকার

সেইসব ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যারা পাট চাষিদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে মানুষ হয়েছেন তাদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে বলে ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেন, আমি ইতোমধ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রামে কাজ করার জন্য পাঁচশত ডাক্তারকে নিযুক্ত করেছি। বাংলাদেশ মানুষে মানুষে, ব্যক্তিত্বে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না; সম্পদের বণ্টনব্যবস্থা সমতা আনতে হবে এবং উচ্চতম আয় নিম্নতম উপার্জনের ক্ষেত্রে যে আকাশচুম্বী বৈষম্য এতদিন ধরে ছিল সেটা দূর করার ব্যবস্থা উদ্ভাবনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়ে তার বিবেচনার কথাও জানান বঙ্গবন্ধু।

টিক্কা খানের ভাগ্য ভালো১৯৭২ সালের আজকের দিনের পত্রিকা

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে হত্যাকাণ্ড চালায় তাতে পুলিশ বাহিনীর শতকরা ৬০ জন এবং ভূতপূর্ব ইপিআর-এর শতকরা ৫৬ তিনি বলেন, এছাড়া তারা বাংলাদেশে অসংখ্য বাঙালি সৈন্য, ছাত্র, কৃষক-মজুরকে হত্যা করেছে। তবুও টিক্কা খান দাবি করেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশ মাত্র ৩০ হাজার লোককে হত্যা করেছে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল টিক্কা খান এর কিছুদিন আগে বিদেশে পত্রিকার সাংবাদিকদের এই সংখ্যার কথা বলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু এ প্রসঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন করেন, আমরা যদি তার (টিক্কা খান) দেশে ৩০হাজার লোককে হত্যা করতাম তাহলে তার মনোভাব কিরূপ হতো? বঙ্গবন্ধু বলেন, টিক্কা খানের ভাগ্য ভালো যে সে এখন এদেশে নেই।

দুস্থ পুনর্বাসন

বিধবা, অনাথ ও নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যেভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংস করে গেছে, তাদের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় পুনরুদ্ধার করতে ১০ বছর সময় দরকার। আমাদের বিপ্লবী সরকার আশা করছে ৩ বছর সময়ের মধ্যে কাজ সমাধা করা যাবে।

বিপুল খাদ্য ঘাটতি আমাদের জন্য এক দুঃসহ অভিশাপ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, কিন্তু আমি কাউকে না খেয়ে মরতে দিতে চাই না। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আমি ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আনতে পারবো। ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১০ লাখ টন আমদানি করা যেতে পারে। প্রিয় দেশবাসী, আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন, উচ্চতম অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খাদ্য ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হবে।১৯৭২ সালের আজকের দিনের পত্রিকা

সমাজবিপ্লব

অবাস্তবতা নয়, আমার সরকারও বিজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে অর্থনীতির প্রবর্তনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তবিক প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে পুরাতন সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে নতুন সমাজ গড়তে হবে। শোষণমুক্ত সমাজ আমরা গড়ে তুলবো আর জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে ছাড়িয়ে সম্পদের সামাজিকীকরণের পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচির সূচনা হিসেবে আমার সরকার উল্লেখিত বিষয়গুলো জাতীয়করণ করছে। এরমধ্যে আছে ব্যাংকসমূহ, সাধারণ ও জীবন বীমা, সকল চটকল, সকল বস্ত্র ও সুতাকল, সকল চিনিকল, অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযানের বৃহদাংশ, ১৫ লাখ টাকা মূল্যের পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকানা সম্পত্তি, বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে সরকারি সংস্থা হিসেবে স্থাপন করা।

যেসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেবাঙালিদের মালিকানার স্বার্থ সরাসরি জড়িত সেসবপ্রতিষ্ঠানের সাবেক মালিক অথবা প্রধান কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে আমরা যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি সেগুলো সবদিক থেকে বিপ্লবাত্মক এবং জনসাধারণকে অবশ্যই এসব ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করে তুলতে হবে।

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ