দেশে শিশুদের জন্য করোনা ইউনিট মাত্র একটি!

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৬:৪৮, জুন ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৪৩, জুন ২৯, ২০২০

শিশুদের করোনা ইউনিটইউনিসেফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ শিশু, যার সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশে শিশুদের করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অন্য দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও চিকিৎসায় ভরসা ঢাকা মেডিক্যালে মাত্র ৩২টি বেড, যেটি দেশের একমাত্র শিশু করোনা ইউনিট। এছাড়া দেশের কোথাও আর শিশুদের জন্য আলাদা করোনা ইউনিট নেই। তাছাড়া আর্থিক সমস্যায় চালু করা যাচ্ছে না ঢাকা শিশু হাসপাতালের করোনা ইউনিট।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সব হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা আক্রান্ত শিশুদের পূর্ণাঙ্গ বয়সী রোগীর সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না। শিশুদের জন্য আলাদা ইউনিট প্রয়োজন।   

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৬৪ লাখ। বিবিএস বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮ দশমিক ৪ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের নিচে। সেই হিসাবে ১৫ বছরের নিচে জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ। তবে বাংলাদেশে শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের সবাইকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এই অনুযায়ী হিসাব করলে মোট শিশুর সংখ্যা আরও বাড়বে। আইনে বয়সের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী প্রকৃত হিসাব বিবিএস দেয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরীতে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল আছে ১৬টি এবং মহানগরীর বাইরে ঢাকা জেলায় আছে একটি। ঢাকা মহানগরীতে কোভিড রোগীদের জন্য সাধারণ বেড আছে ৫ হাজার ৭০৯টি এবং আইসিইউ বেড আছে ২৭৪টি। দেশের সব বিভাগ মিলে সাধারণ বেড আছে ১৩ হাজার ৫৮৬টি এবং আইসিইউ বেড আছে ৪৭৩টি।

অন্য দেশের তুলনায় করোনায় শিশু মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বেশি

সরকারের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এক থেকে ১০ বছর বয়সীদের করোনা শনাক্ত ৩ শতাংশ এবং ১১ থেকে ২০ বছর বয়সীদের ৭ শতাংশ । এছাড়া মৃত্যুহার ১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ এবং ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বিশ্বে করোনায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর হার যুক্তরাষ্ট্রে। সে দেশে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে ১-২০ বছর বয়সীদের করোনায় মৃত্যুহার ১.৫ শতাংশের ওপরে। আর ১ থেকে ২০ বছর বয়সীদের আক্রান্তের হার ১০ শতাংশ।

ঢামেকে করা হয় প্রথম ও একমাত্র শিশু করোনা ইউনিট

গত ২ মে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবন এবং পুরাতন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারপর ১০ মে প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এইচডিইউকে (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) শিশু করোনা ইউনিট হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। প্রথমে সেখানে ১৪টি বেড নিয়ে শুরু হলেও পরে আরও ১০টি বেড সংযুক্ত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আরও আছে ৮টি আইসোলেশন বেড। বর্তমানে ৩২টি বেডে করোনা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে এবং সব বেড পূর্ণ বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সাঈদা আনোয়ার।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'শিশুদের আমরা পূর্ণাঙ্গ বয়সীদের সঙ্গে রাখি না, কারণ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া শিশুদের উপসর্গ বড়দের থেকে একেবারে ভিন্ন। আর শিশুদের চিকিৎসার ধরনও আলাদা, এটা বড়দের সঙ্গে মেলে না। যার জন্য আমরা শিশুদের করোনা ইউনিট আলাদা করে ফেলেছি। এখন পর্যন্ত আমাদের শিশু ভর্তি আছে ৩২ জন।'

তিনি আরও বলেন, 'শিশুদের উপসর্গ বড়দের থেকে একেবারেই আলাদা। তারা অন্য রোগের উপসর্গ নিয়ে আসে, আমরা করোনা টেস্ট করে পজিটিভ পাই। তাছাড়া যে ৫টি শিশু মারা গেছে, তারা ক্যানসারসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ছিল। এদের বেশিরভাগই অন্য হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে আসা। এ কারণে আমাদের ওপর চাপ বেশি। ঢাকা মেডিক্যালে দেশের প্রথম শিশু করোনা ইউনিট করা হয়েছে। এছাড়া আর কোথাও নেই। আরও করোনা ইউনিট চালু করা গেলে ভালো হবে, আমাদের ওপর চাপ একটু কমবে।'  

আর্থিক সমস্যায় চালু হচ্ছে না শিশু হাসপাতালের করোনা ইউনিট

ঢাকা শিশু হাসপাতালে একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড আছে করোনা আক্রান্ত শিশুদের জন্য, যেখানে বেড আছে ২২টি। এছাড়া সিঙ্গেল ক্যাবিনগুলোতে করোনা সন্দেহজনক শিশুদের ভর্তি করা হয়। এছাড়া মোটামুটি কম উপসর্গ কিংবা অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শফি আহম্মেদ মুয়াজ এসব তথ্য জানান।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা যদি দেখি ১০ শতাংশের বেশি শারীরিক অবস্থা খারাপ এবং হাসপাতালে রাখার প্রয়োজন মনে করি, তবে ঢাকা মেডিক্যালের করোনা ইউনিটে রেফার করে দিই। কারণ আমরা কোভিড ডেডিকেটেড ইউনিট তৈরি করেছি, কিন্তু আর্থিক সংকটে শুরু করতে পারছি না। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আর্থিক অনুদানের বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছি, সেখান থেকে সাহায্য পেলে এই ইউনিট চালু করতে পারতাম। আমাদের এখানে ৩-৪ মাস রোগী একদম না থাকায় ফান্ড ক্রাইসিস আছে। আমরা আশাবাদী, হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে মন্ত্রণালয় সাড়া দেবে।'

ডা. শফি আহম্মেদ মুয়াজ আরও বলেন, 'আমাদের চিকিৎসক ও নার্সদের আলাদা আবাসন ব্যবস্থার জন্য এই অনুদান প্রয়োজন। তবে আমাদের এখানে ডেডিকেটেড ইউনিট চালু না হলেও চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি। টেস্ট সুবিধাও আছে। দেখা যাচ্ছে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেশিরভাগই বাসায় রেখে হয়ে যাচ্ছে। যদি অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুরা করোনা আক্রান্ত হয়ে আসে তাহলে আমরা আপাতত ঢাকা মেডিক্যালের ডেডিকেটেড ইউনিটে পাঠিয়ে দিই।'

অন্য রোগের সঙ্গে করোনা আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ডা. শফি আহম্মেদ মুয়াজ। তিনি বলেন, 'করোনা আক্রান্ত শিশুদের আইসোলেশন করে আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা করতে হবে। অন্য রোগের সঙ্গে চিকিৎসা করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। সিঙ্গেল কেবিনে হলেও সমস্যা নেই, তবে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড থাকাই ভালো।'

শিশু হাসপাতালের আবেদন বিবেচনাধীন আছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি জানান, চিঠিটির বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে এই সপ্তাহে হয়তো হতে পারে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেনের মতে দেশে করোনায় শিশুদের মৃত্যুহার অন্য দেশের তুলনায় বেশি। এর জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা দায়ী বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, দেশে আরও শিশু করোনা ইউনিট থাকা প্রয়োজন।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকেই আছেন যাদের ঢাকায় আসার সামর্থ্য থাকে না কিংবা রোগীর অনেক খারাপ অবস্থা থাকে। যদিও শিশুদের সংখ্যা কম তারপরও করোনা বেড সারা দেশেই থাকা দরকার। বড় বড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সেই ব্যবস্থা রাখা উচিত। শিশুদের জন্য করোনা আলাদা ওয়ার্ড না হলে চিকিৎসা করা যাবে না। করোনা চিকিৎসা হলো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, সেটা হয়তো একই জায়গায় করলে খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু শিশুদের শারীরিক সমস্যা আর বড়দের শারীরিক সমস্যা এক না। শুধু করোনা নিয়েই তো আসে না, তার সঙ্গে অন্য উপসর্গও থাকে। শ্বাসকষ্টের যদি সমস্যা থাকে বড়দের যে যন্ত্র দিয়ে অক্সিজেন দেবেন, শিশুদের তা দিয়ে তো দেওয়া যাবে না।'

ডা. মোশতাক হোসেন আরও বলেন, 'বিশ্বের অপরাপর দেশের কাছাকাছি আমাদের দেশের শিশুরা করোনা আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু করোনায় শিশু মৃত্যুর হার অন্য দেশের তুলনায় একটু বেশি। অন্যান্য দেশে করোনায় শিশু মৃত্যু নেই বললেই চলে, কিন্তু আমাদের দেশে আছে। এর কারণ হলো, আমাদের দেশের শিশুদের স্বাস্থ্যের মান অবশ্যই ভালো না। তাদের পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। আমাদের এখানে চিকিৎসার সমস্যা সব বয়সীর আছে, কিন্তু শিশুদের চিকিৎসার সমস্যা আরও বেশি, চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল। এছাড়া অভিভাবকরা অনেকেই জানেন না যে, চিকিৎসার জন্য যথাসময় কোথায় যেতে হবে।'

/আইএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ