ঠেকানো গেলো না চামড়া বিপর্যয়

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২১:৩৩, আগস্ট ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৫, আগস্ট ০৫, ২০২০

চামড়ায় পচন ধরেছে ঠেকানো গেলো না চামড়া বিপর্যয়। ক্রেতা না থাকায় এখনও রাজধানীর অদূরে লালবাগের পোস্তায় পচে নষ্ট হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের কাঁচামাল। রাজধানীর বাইরে মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পদ্মা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবেই হাজার হাজার পিস চামড়া এই ক’দিনেই নষ্ট হয়ে গেছে। এতকিছুর পর যেসব চামড়া এখনও রয়েছে সেগুলোরও ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীর চামড়ার বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে কোরবানির পশুর চামড়া কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বুদ্ধি-পরামর্শ করেই গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ২৯ শতাংশ কমিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। সেই দরেই চামড়া কিনবেন, ব্যবসায়ীরা এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি। ঠিক করে দেওয়া দরে চামড়া তারা কেনেননি। মোট কথা, সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে পাত্তাই দেননি চামড়া ব্যবসায়ীরা।

উপরন্তু চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্য দর ঠিক করে দিয়েছে, সেই দরে চামড়া কেনা সম্ভব না। কারণ, তাতে লোকসানের সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ এ বছর চামড়ার বাজারে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কোনও দৌরাত্ম্যই ছিল না। দেশের অনেক গ্রামে-মহল্লায় চামড়া কেনার জন্য একটি মানুষও আসেনি। অনেকেই বাধ্য হয়ে কোরবানি দেওয়া পশুর চামড়া কাছের মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানায় গিয়ে দান করে এসেছেন।

এছাড়াও কম দামের কারণেও বেশিরভাগ কোরবানির চামড়া মসজিদ, মাদ্রাসা বা এতিমখানায় দান করে দেওয়া হয়েছে। সেই মসজিদ-মাদ্রাসা বা এতিমখানা কর্তৃপক্ষই দান হিসেবে পাওয়া চামড়া বিক্রির জন্য পোস্তায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিক্রি করতে না পারায় অনেককেই সেখানে চামড়া রেখে আসতে হয়েছে।

রাজধানীর কোরবানির পশুর চামড়া বেচাকেনার সবচেয়ে বড় বাজার লালবাগের পোস্তা। রাজধানীতে কোরবানি হওয়া সব পশুর চামড়া কোনও না কোনও ফরম্যাটে পোস্তা হয়ে বিভিন্ন ট্যানারিতে প্রবেশ করে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে সংগ্রহ করা কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির উদ্দেশ্যে পোস্তায় নিয়ে এসেছেন অনেকেই। কিন্তু এখানকার ব্যবসায়ীরা কিনছেন না সেই চামড়া। তারা বলছেন, দাম বেশি দিয়ে চামড়া কিনে লোকসান দিলে ব্যবসা চলবে না। কেউ কেউ বলছেন, ব্যাংকের ঋণ শোধ দিতে পারিনি। নতুন চামড়া কেনার টাকা নেই। আবার কেউ বলছেন, গত বছরের কেনা চামড়া রয়ে গেছে। নতুন চামড়া কিনে কী করবো?চমড়া ব্যবসায়ী ধস

রাজধানীর শাহজাহানপুরের ঝিল মসজিদ সংলগ্ন নূরানী মাদ্রাসার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা আজিজুল হক বললেন, ‘এমনিতেই এ বছর কম সংখ্যক কোরবানি হওয়ায় চামড়া কম পেয়েছি। তার ওপর আবার দাম কম। ব্যবসায়ীরা সময় মতো না কেনায় কিছু চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। মহল্লায় বিক্রি করতে না পেরে ট্রাক ভাড়া করে পোস্তা নিয়ে গিয়েও বেচতে না পারিনি। সেখানেই রেখে এসেছি। শুনেছি ৮ তারিখ থেকে কিনবে। দেখি কী হয়।’

অবশেষে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী ৮ আগস্ট থেকে তারা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করবেন। সরকার নির্ধারিত দামে আড়তদার ও ডিলারদের কাছ থেকে এ চামড়া সংগ্রহ করা হবে। চামড়ার মান অনুযায়ী দাম পরিশোধ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। এদিকে ইতোমধ্যে বেশিরভাগ চামড়ায় পচন ধরেছে। এসব চামড়া থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় এই বছর অনেক কম চামড়া সংগৃহীত হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চামড়া নিয়ে কেনও এই নৈরাজ্য? জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ‘চামড়া বাজারে এই নৈরাজ্যের জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীরা দায়ী। তারা সরকার নির্ধারিত দরের বেশি দাম দিয়ে চামড়া কিনেছেন। এতে তারা লবণও লাগাননি। তারা জানেনই না কীভাবে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়। তারা তো চামড়াগুলো নষ্ট করে ফেলেছেন। এসব নষ্ট চামড়া দিয়ে তো কিছু হবে না। এগুলো আমরা কিনবো না। এই নষ্ট চামড়ার দায় আমাদের না।’

চামড়া সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনা ও বন্যার কারণে এ বছর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কোরবানি কম হয়েছে। রাজধানী থেকে প্রতিবছর কোরবানির সময় চার লাখের কমবেশি চামড়া সংগ্রহ করা গেলেও এ বছর তিন লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করা যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।’

এদিকে, এ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৯ শতাংশ কমিয়ে ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর ছিল ৪৫-৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়ার দর ঠিক করে ২৮ থেকে ৩২ টাকা। গত বছর যা ছিল ৩৫-৪০ টাকা। এক্ষেত্রে কমানো হয় প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়ার দর ১৩-১৫ টাকা করা হয়, গত বছর যা ছিল ১৮-২০ টাকা। এটি গত বছরের চেয়ে ২৭ শতাংশ কম। পাশাপাশি বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ১০ থেকে ১২ টাকা, গত বছর ছিল ১৩ থেকে ১৫ টাকা, যা ২৩ শতাংশ কম।

পোস্তার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী টিপু সুলতান বলেন, ‘ট্যানারি মালিকদের কাছে গত বছরের অনেক টাকা এখনও বাকি পড়ে আছে। সেগুলো দিলেও তো চামড়া কেনা যেত। ব্যাংকের ঋণ পাইনি খেলাপি বলে। আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা ঠিকমতো দাম পরিশোধ করলে ব্যাংকের ঋণ শোধ দিয়ে নতুন ঋণ নিতে পারতাম। তার পরেও আগামী ৮ আগস্ট থেকে আমরা কাঁচা চামড়া কিনতে শুরু করবো। চামড়ার মান অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামেই আমরা লবণযুক্ত চামড়া কিনবো।’

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ শফিকুজ্জামান জানিয়েছেন, সরকার কাঁচা চামড়া নিয়ে খুবই সচেতন। এটি জাতীয় সম্পদ। যেকোনও মূল্যে এই সম্পদ রক্ষা করা হবে। রফতানি খাতের পণ্য হিসেবে চামড়া নিয়ে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ বছর কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্লু রফতানির সুযোগ দিয়েছে সরকার।

/এমএএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ