ডিসি সুলতানাসহ চার কর্মকর্তার নামে মামলার বিষয়ে ‘জানে না’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:১৬, আগস্ট ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৪, আগস্ট ১২, ২০২০

কুড়িগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (সুলতানা পারভীন), সহকারী কমিশনার (এসি) রিন্টু বিকাশ চাকমা, সিনিয়র সহকারী কমিশনার-রাজস্ব (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন ও সহকারী কমিশনার (এসি) এসএম রাহাতুল ইসলামকুড়িগ্রামে মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিককে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন ও মোবাইল কোর্ট বসিয়ে সাজা দেওয়ার ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে জেলার সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনসহ চার কর্মকর্তার নামে সদর থানায় মামলা হয়। মামলা দায়ের করেন বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ও ভিকটিম আরিফুল ইসলাম নিজেই। বিষয়টি জানিয়ে জনপ্রশাসন সচিব বরাবর লেখা কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসির চিঠি দীর্ঘ চার মাসেও এসে পৌঁছায়নি। এ ধরনের কোনও চিঠি এখন পর্যন্ত হাতে পাননি বলে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সেই চিঠি এখন কোথায়?

সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের দায়ের করা মামলার নম্বর-২৪, জি আর নম্বর-৮৩/২০২০(কুড়ি)। মামলার ধারা ১৪৩, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৬, ৩৬৪, ৩৫৫, ৪২৭, ৫০৬, ১০৯ এবং ৩৪ পেনাল কোড। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, একই উদ্দেশ্য সাধনে বেআইনিভাবে দলবদ্ধ হয়ে বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, মারপিট করে সাধারণ ও গুরুতর জখম, অপমানের লক্ষ্যে অসম্মান, হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ, ক্ষতিসাধন, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান এবং এসব কাজে সহায়তা।

গত ১৩ মার্চ রাতে সংঘটিত ঘটনার বিবরণ দিয়ে ৩১ মার্চ বেলা ৩টা ৫৫ মিনিটে কুড়িগ্রাম সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম। বিষয়টি অবহিত ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৫ এপ্রিল কুড়িগ্রাম সদর থানা থেকে কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপারের দফতর হয়ে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত (১১ আগস্ট) চিঠিটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসে পৌঁছায়নি। জানা গেছে, কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসির লেখা চিঠি কুড়িগ্রাম এসপি অফিস, রংপুর ডিআইজি অফিস ও পুলিশের সদর দফতর হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আসার কথা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাহফুজার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, যেহেতু মামলার আসামিরা সরকারি কর্মকর্তা, সেহেতু তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা এবং অপর সহকারী কমিশনার এস এম রাহাতুল ইসলামের নামে মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর বিষয়টি অবহিত এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জনপ্রশাসন সচিব বরাবর লেখা চিঠিটি গত ৫ এপ্রিল পুলিশ সুপারের দফতরে পাঠানো হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খাঁন জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লেখা সদর থানার ওসির চিঠিটি সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সুপারের দফতর থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিধি মোতাবেক চিঠির অনুলিপি রংপুর ডিআইজি অফিস ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারেও পাঠানো হয়েছে। তবে উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি), রংপুর দেবদাস ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিষয়টি এই মুহূর্তে আমার মাথায় নাই। চিঠিটি অনেক আগেই পাঠানোর কথা। এটি বিধান। হয়তো পাঠিয়েছেনও। আমার দফতরে চিঠির কপি দেবেন এসপি কুড়িগ্রাম। এর বেশি নয়।

এদিকে কুড়িগ্রামের আরডিসি নাজিম উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন। তাকে গত ৬ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

একই ঘটনায় কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনসহ অন্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চললেও এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জানতে চাইলে শেখ ইউসুফ হারুন জানিয়েছেন, অন্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান। মামলা শেষে অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীন, সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা এবং এসএম রাহাতুল ইসলামকে পোস্টিং দেওয়া হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একটি ফৌজদারি মামলার আসামিদের কীভাবে পদায়ন করবেন- জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব জানিয়েছেন, সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনসহ অন্য তিন কর্মকর্তাকে পদায়নের বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে যেহেতু তারা কোনও মামলায় জামিন নেননি, গ্রেফতার হননি, সেহেতু বিভাগীয় মামলা চলাকালে তাদের পদায়নে কোনও বাধা নাই। তবে তারা যদি কোনও মামলায় জামিন নেন বা গ্রেফতার হন, তাহলে তারা ওএসডি হবেন বা সাসপেন্ড হবেন।

চলতি বছরের ১৩ মার্চ শুক্রবার রাতের ঘটনায় ১৫ মার্চ ডিসি সুলতানা পারভীনসহ চার কর্মকর্তাকে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। সুলতানা পারভীন ২০১৮ সালের ৩ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ১৬ মার্চ পর্যন্ত দুই বছর কুড়িগ্রামের ডিসি ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। তার বাড়িতে আধা বোতল মদ এবং গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। মধ্যরাতে বাড়ি থেকে একজন সাংবাদিককে ধরে এনে সাজা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় পরদিন ঘটনাস্থলে যান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। তার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন ও সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

আরও পড়ুন-

মধ্যরাতে আরিফকে গ্রেফতার করে সাজা: রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ

আরিফের ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে ডিসিকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: প্রতিমন্ত্রী

রাতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে পারেন না মোবাইল কোর্ট

মোবাইল কোর্টে আরিফকে সাজায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তদন্তের নির্দেশ

কুড়িগ্রামের ডিসির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বললেন আইনমন্ত্রী

তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস- বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে

মধ্যরাতে বাড়ি থেকে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে মোবাইল কোর্টে এক বছরের জেল

মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুলকে তুলে নিয়ে গেলো মোবাইল কোর্ট

কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ!

মন্ত্রণালয়কে ডিসি সুলতানার জবাবের বিষয়ে যা বলছেন সাংবাদিক আরিফ

 

/এফএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ