মন্ত্রণালয়কে ডিসি সুলতানার জবাবের বিষয়ে যা বলছেন সাংবাদিক আরিফ

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:৫৯, জুলাই ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৭, জুলাই ০৯, ২০২০

আরিফুল ইসলাম ও সুলতানা পারভীন‘সেদিন রাতে যা ঘটেছে, পুরো ঘটনাটি তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ঘটেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু ঠিক করে তার অধস্তন বাহিনী পাঠিয়ে দিয়ে নিজে ঘুমিয়ে থাকার দাবি করাটা স্বাভাবিক হলেও হাস্যকর। তিনি এখন অন্যদের ওপর দায় চাপিয়ে নির্দোষ সাজার নাটক করছেন।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের দেওয়া জবাবের বিষয়ে জানতে চাইলে এই কথাগুলো বলেন বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগান।

গত ১৪ মার্চ মধ্যরাতে নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ‘জানতেন না’ এবং তিনি ‘সেই সময় ঘুমিয়ে ছিলেন’ বলে দাবি করেন তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীন। তবে বিভাগীয় মামলার অভিযোগের জবাবে তার দাখিল করা এমন বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন আরিফুল ইসলাম রিগ্যান।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ দিনগত মধ্যরাতে বাড়িতে হানা দিয়ে ধরে নিয়ে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট। মধ্যরাতে ডিসি অফিসের দুই-তিন জন ম্যাজিস্ট্রেট ১৫-১৬ জন আনসার সদস্যকে নিয়ে দরজা ভেঙে তার বাসায় প্রবেশ করেন। তবে তারা কোনও তল্লাশি অভিযান চালাননি। পরে ডিসি অফিসে নেওয়ার পর তারা দাবি করেন, আরিফুলের বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে।

এই ঘটনা নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে তোলপাড় হলে রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার কে এম তারিকুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিভাগীয় মামলা করা হয়। সেই মামলায় আনা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন সুলতানা পারভীন।

গত ২৫ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে কুড়িগ্রামের তৎকালীন ডিসি সুলতানা পারভীন জানিয়েছেন, ঘটনার দিন মধ্যরাতে সাংবাদিক আটক ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন ঘুমিয়ে ছিলেন। মোবাইল ফোনে আসা ‘মিসড’ কল নম্বরে পরের দিন সকালে ফোন দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিবের কাছ থেকে প্রথম ঘটনা শুনেছেন। বিভাগীয় মামলায় দায়ের করা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও অনুমান-নির্ভর বলে এই মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি চেয়েছেন।

অপরদিকে অভিযানে অংশ নেওয়া অপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা গত ১৮ জুন তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অভিযোগের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সংঘটিত ঘটনায় তিনি ‘মর্মাহত ও অনুতপ্ত’ বলে জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নবীন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। চাপে পড়ে সাজা পরোয়ানায় স্বাক্ষর করা থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারেননি। ১৪ মার্চ রাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে রিন্টু বিকাশ আগে থেকেই অবগত ছিলেন, আগের দিনই তাকে আরডিসি নাজিম উদ্দিন এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরিফ বলেন, “১৪ মার্চ রাতে আমাকে এনকাউন্টার করার উদ্দেশ্যে ধরলা সেতুর পূর্ব পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে গাড়ি থামালে নাজিম উদ্দিন তার সঙ্গে থাকা এনডিসি রাহাতুল ইসলামকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই এনডিসি, ডিসি স্যারকে ফোন দাও, না হলে হোয়াটসঅ্যাপে বা মেসেঞ্জারে মেসেজ দাও। কী করবো জিজ্ঞাসা করো’। তখন ডিসি সুলতানা পারভীনকে ফোন দেন এনডিসি। তারা অপর প্রান্ত থেকে নির্দেশনা পেয়ে আমাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেন এবং বলেন ‘তোর এত বড় সাহস, তুই ডিসির বিরুদ্ধে লিখিস!’

আরিফ আরও বলেন, ‘এ থেকেই প্রমাণিত, ওই রাতে ডিসি ঘুমিয়ে ছিলেন না। পুরো ঘটনা তৎকালীন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় ঘটেছে। এখন তিনি তার তৎকালীন অধস্তনদের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেকে বাঁচানোর কূটকৌশল হিসেবে বিভাগীয় মামলার অভিযোগের জবাবে অসত্য কথা বলছেন।’

আরিফুল ইসলাম রিগান বলেন, “আমি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আমার সঙ্গে সুলতানা পারভীনের কথোপকথনের যে অডিও প্রকাশ হয়েছে, তাতেও বোঝা যায় এ ঘটনায় তার সক্রিয় সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমা‌কে এনকাউন্টা‌রে দেওয়ার কারণ জান‌তে চাই‌লে তি‌নি (সুলতানা পারভীন) ব‌লেন, 'এনকাউন্টা‌রের মান‌সিকতা আস‌লে ছিল না আমা‌দের, ওইভা‌বে ছিল না'। এ‌তেই প‌রিষ্কার যে তি‌নি পু‌রো বিষয় অবগত ছি‌লেন এবং তার প‌রিকল্পনা‌তেই সব হ‌য়ে‌ছে। তা না হলে তিনি আমাকে মিডিয়া থেকে দূরে সরে থাকতে বলতেন না এবং নিজে অনুতপ্ত জানিয়ে সংঘটিত ঘটনা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করতেন না।”

তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন মধ্যরাতে ঘরের দরজা ভেঙে আরডিসি নাজিম উদ্দিন প্রথমেই আঘাত করে বলেন, ‘তুই খুব জ্বালাচ্ছিস, ডিসির বিরুদ্ধে নিউজ করিস! তুই খুব বড় সাংবাদিক হয়েছিস, তোকে আজ সাংবাদিকতা শেখাবো’। আরডিসির এই বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, যে শুধু ডিসি সুলতানা পারভীনের ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা থেকে নির্দেশিত হয়ে তারা মধ্যরাতে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেন।’

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের বিষয়ে দাখিল করার জবাবে সুলতানা পারভীন আরও বলেছেন, তিনি কোনও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেননি। এমনকি তিনি কোনও মৌখিক বা লিখিত নির্দেশনাও দেননি। জেলা প্রশাসক নিজে কোনও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন না। প্রতি মাসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশনা থাকায় মাসের শুরুতে ডিসি অফিসে কর্মরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কোর্ট পরিচালনার সিডিউল প্রস্তুত করে তাতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই সিডিউলের বাইরে অন্য কোনও তারিখে কোর্ট পরিচালনা করতে হলে তা অবশ্যই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে হয়। ওই দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তার কোনও কথা হয়নি। ঘটনার পরে তিনি নথি তলব করে জেনেছেন প্রসিকিউশন পক্ষ ছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। একজন অফিসারসহ ছয় জন পুলিশ ও চার জন ব্যাটালিয়ন আনসার কোর্ট পরিচালনার সময় ছিলেন।

সাবেক এ ডিসি জানান, ঘটনার দিন সকাল থেকে তিনি রৌমারী উপজেলায় জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সভায় ব্যস্ত ছিলেন। সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, জেলা ও দায়রা জজসহ বিচার বিভাগের কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি ভোর ৫টায় রওনা হন। সভা শেষে ফিরে আসেন রাত সাড়ে ৯টায়। ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত থাকায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন ঘুম থেকে উঠে মোবাইল ফোনে দেখতে পান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিবের এবং ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনারের ‘মিসড’ কল। কল ব্যাক করে তিনি এ ঘটনা অবগত হন। মোবাইল কোর্টের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে এ বিষয়ে তার কোনও কথা হয়নি। এই অবস্থায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার দায় কোনোভাবেই তার ওপর বর্তায় না বলে জবাবে লিখেছেন ডিসি সুলতানা।

তিনি তার জবাবে বলেছেন, মোবাইল কোর্টের নির্ধারিত আইন আছে। এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট আইন, বিধি ও পদ্ধতি অনুযায়ী কোর্ট পরিচালনা করেন। তারা স্বাধীনভাবে বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। মোবাইল কোর্টে গিয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কোনও পরিস্থিতিতে কার সঙ্গে কী আচরণ করবেন তা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা অনুযায়ী হয় না। তার জ্ঞানের অগোচরে সংঘটিত কোনও বিষয়ের দায় কখনও তার ওপর বর্তায় না।

গভীর রাতে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া অভিযান পরিচালনা বিধিসম্মত হয়নি এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি এ দায় এড়াতে পারেন না- এই অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেছেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তো কোনও আলোচনাই হয়নি। কাজেই এ অভিযোগ তার জন্য প্রযোজ্য নয়।

সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী অসদাচরণের অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই বলে তিনি নির্দোষ দাবি করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অন্য কোনও শাস্তির আইনগত কোনও ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেছেন সুলতানা পারভীন। বিভাগীয় পর্যায়ে পরপর দুই বছর তিনি শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯ বছরের সরকারি চাকরি জীবনের পুরোটাই মাঠে কাজ করেছেন। অথচ একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্ট সংক্রান্ত ‘বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনাকে’ কেন্দ্র করে ‘দুঃখজনকভাবে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি’ হতে হয়েছে জানিয়েছেন সুলতানা পারভীন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় রয়েছে। সময় সাপেক্ষ বিষয়। তাদের লিখিত জবাব পেয়েছি মাত্র। পরবর্তীতে তাদের ব্যক্তিগত শুনানির জন্য ডাকা হবে বলেও জানান জনপ্রশাসন সচিব।

আরও পড়ুন-

মধ্যরাতে আরিফকে গ্রেফতার করে সাজা: রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ

আরিফের ওপর অন্যায় হয়ে থাকলে ডিসিকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: প্রতিমন্ত্রী

রাতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে পারেন না মোবাইল কোর্ট

মোবাইল কোর্টে আরিফকে সাজায় ক্ষুব্ধ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, তদন্তের নির্দেশ

কুড়িগ্রামের ডিসির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বললেন আইনমন্ত্রী

তুই অনেক জ্বালাচ্ছিস- বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে

মধ্যরাতে বাড়ি থেকে সাংবাদিককে ধরে নিয়ে মোবাইল কোর্টে এক বছরের জেল

মধ্যরাতে সাংবাদিক আরিফুলকে তুলে নিয়ে গেলো মোবাইল কোর্ট

কাবিখার টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসির নামে নামকরণ!

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ