বুলেটিন বন্ধের সিদ্ধান্ত কার পরামর্শে?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৪:২৫, আগস্ট ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১২, আগস্ট ১৩, ২০২০

অধ্যাপক নাসিমা সুলতানাগত পাঁচ মাস ধরে চলা করোনা বিষয়ক বুলেটিন বন্ধ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে করোনা বিষয়ে ভুল বার্তা যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মানুষ স্বাস্থ্যবিধিতে এতদিনে যতটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল, তাতে ‘ঢিলেমি’ পড়বে। এতে করে একদিকে যেমন সংক্রমণের বড় ঝুঁকিতে পড়বে দেশ, তেমনি সঠিক তথ্যের অভাবে গুজবের ডাল ছড়াবে। মহামারির সময়ে যেখানে প্রতিটি বিষয় মানুষকে জানানো উচিত সেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কার সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়েছে সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাৎক্ষণিকভাবে বুলেটিন দেখায় মানুষের যতটা আগ্রহ ছিল, প্রেস রিলিজ বা তা থেকে তৈরি করা রিপোর্ট খুঁজে বের করে পড়ায় মানুষের ততটা আগ্রহ থাকবে না বলেও মনে করছেন জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলা ট্রিবিউনকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সূত্র জানায়, মূলত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অধিদফতরের বুলেটিন বন্ধ হচ্ছে। তারা বলছেন, এত বড় সিদ্ধান্ত অধিদফতরের নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে, পরিস্থিতি ভালোর দিকে থাকায় তারা বুলেটিন বন্ধ করতে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘চার মাস, পাঁচ মাস তো হলোই, এখন একটু কন্ট্রোল হচ্ছে বলে আমরা মনে করি, একটু কমে আসছে। রেগুলার ওইভাবে একজন ব্যক্তি দিয়ে প্রেস ব্রিফিং না করে প্রেস রিলিজ দেওয়া হবে।’ অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ কমে আসার মতো কোনও ঘটনাই ঘটেনি, বরং কোরবানির ঈদের পর সংক্রমণ বেড়েছে।

১২ আগস্ট সংক্রমণের ১৫৮তম দিনে এসে মৃত্যু সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট মারা গেছেন তিন হাজার ৫১৩ জন। একইসময়ে করোনায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৯৯৫ জন, এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত হয়েছেন দুই লাখ ৬৬ হাজার ৪৯৮ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নমুনা সংগ্রহ যা-ই হোক, কিংবা পরীক্ষা যে পরিমাণেই হোক না কেন, দেশে করোনা শনাক্তের হার আগের মতোই রয়েছে, এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

এদিকে, করোনা বুলেটিন বন্ধ না করার পক্ষে কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ১২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ, মৃত্যুসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে প্রতিদিন স্বাস্থ্য বিভাগের আপডেট বন্ধ হলে সংক্রমণ বিস্তারে জনমানুষের মাঝে শৈথিল্য দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি গুজবের ডালপালা বিস্তারের আশঙ্কাও থেকে যাবে। তাই বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতিও অনুরোধ জানাই।’

বাংলা ট্রিবিউন করোনা বুলেটিন বন্ধ হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছে একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। সেখানে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতিসহ তিন জন বলেছেন, মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কে তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি। তারা প্রত্যেকেই এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি কমিটির আগামী মিটিংয়ে এ নিয়ে তারা কথা বলবেন, সুপারিশ করবেন বুলেটিন পুনরায় চালু করার জন্য।

এই বুলেটিন বন্ধ করা ঠিক হয়নি মন্তব্য করে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা চালানো উচিত ছিল। কারণ, বুলেটিন কেবল শুধু ফিগার দিতো না, ফিগারের বাইরেও অনেক কিছু জানা যেতো। প্রতিদিন সচেতনতামূলক অনেক বার্তা এখানে বলা হতো। এইগুলো খুবই কার্যকর ছিল। এটা চালানো উচিত বলে আমার মতামত। এই বুলেটিনের জন্য মানুষ অপেক্ষা করতো। কত মানুষ মারা গেলো, কত আক্রান্ত হলো, কত টেস্ট হলো এবং সেই সঙ্গে সচেতনতামূলক বার্তা ছিলই, যেটা কন্টিনিউ করা উচিত।’

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সঙ্গে বুলেটিন বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনও আলোচনা করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আলোচনা হয়নি। তবে হয়তো পরবর্তী মিটিংয়ে বুলেটিন চালানোর বিষয়ে পজিটিভ ফিডব্যাক দেবো।’

কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলানও পরামর্শক কমিটির সঙ্গে আলোচনা হয়নি জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা কার পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত নিলেন তাও জানি না।’ যদি আলোচনা হতো তাহলে বুলেটিন বন্ধ করার পক্ষে মতামত দিতেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি দিতাম না। তথ্য প্রবাহ যখনই বন্ধ করা হবে তখনই তথ্য বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং নানান গুজবের সৃষ্টি হবে। এটা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানার দরকার নাই।’

তথ্য না দিলে মানুষের কাছে এ নিয়ে ‘মারাত্মক ভুল বার্তা’ যাবে মন্তব্য করে অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘তারা করোনা নেই মনে করে অসেচতন হবে। যেসব স্বাস্থ্যবিধিতে কিছুটা হলেও দেশের মানুষ অভ্যস্ত হয়েছিলেন সেগুলো আর মানবে না। এতে করে দেশ বড় সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংক্রমণ কন্ট্রোলে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য কোথায় পেলেন প্রশ্ন করে এবং এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পরামর্শক কমিটির আরেক সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বুলেটিন বন্ধ করার কারণে মানুষ সঠিক তথ্য পাবে না, গুজব ছড়াবে। মানুষ করোনা নিয়ে আর ভাববেই না, তারা অসেচতন হবে, এতে করে সংক্রমণ বাড়বে। প্রতিদিন দুপুরে সাধারণ মানুষ থেকে সবাই এ বুলেটিনের জন্য অপেক্ষা করতো, তথ্য জানতো, সচেতনতামূলক কথা শুনতো। কিন্তু প্রেস রিলিজ আকারে যেটা দেওয়া হবে সেটায় মানুষের আগ্রহ থাকবে না। বুলেটিন আকারে না হলে অসচেতনতা বাড়বেই। মন্ত্রণালয় পরামর্শক কমিটির সঙ্গে আলোচনাও করেনি এ নিয়ে, মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত। একইসঙ্গে যদি আলোচনা করতো তাহলে এটা বন্ধ করার পরামর্শ আমি দিতাম না।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীও। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের যে হার সেটা বিশেষ উচ্চতায় ওঠার পর ক্রমশই প্রলম্বিত হচ্ছে, তার নিম্নমুখিতা আমরা দেখছি না। তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য ও বিবেচ্য নয়।’

ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘যে কোনও সংকটে অথবা মানুষকে প্রতিনিয়ত জানানোর মতো বিষয় যখন থাকে তখন সংশ্লিষ্টরা নিয়মিত বুলেটিন দেয়, তথ্য জানায়। আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান) প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিলেও পরে সেটি বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। হয়ে যায় একমুখী বুলেটিন। আর এখন বুলেটিন বন্ধ করে দিয়ে মানুষের জানার অধিকারকে সংকুচিত করে দেওয়া হলো। এর মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যাবে। করোনা আর নাই বলে তারা মনে করবেন, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। আর যখন সঠিক তথ্য সঠিক জায়গা থেকে দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তখন ভুল সংবাদ এবং গুজব ডালপালা বিস্তার করে। বুলেটিন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে গুজব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হলো। আর এতে করে পুরো করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রম ক্ষতির মুখে পড়বে।’

চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটি (এফডিএসআর) এর মহাসচিব ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বুলেটিন বন্ধ করা উচিত হয়নি। এতে করে ভুল বার্তা যাবে মানুষের কাছে, করোনার গুরুত্ব হারাবে। বুলেটিনে মৃত্যু, শনাক্ত সম্পর্কে মানুষ জানতো, এতে করে সচেতন থাকতো সাধারণ মানুষ। একইসঙ্গে কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, এরকম বার্তা থাকতো। মানুষকে বের হতে হলেও সেসব সচেতনতামূলক বার্তা মানুষ শুনতো, মানতো।’

কিন্তু বুলেটিন বন্ধ করার ফলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যাবে যে এ নিয়ে এত চিন্তা বা সতর্ক থাকার কিছু নেই। এতে অসচেতন হবে মানুষ এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে এতে, বলেন ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

আরও পড়ুন-

‘ব্রিফিং বন্ধ হলেও তথ্য প্রবাহে কোনও অসুবিধা হবে না’

করোনা বুলেটিন বন্ধ না করার আহ্বান ওবায়দুল কাদেরের

/এফএস/এমএমজে/

লাইভ

টপ