ছয় মাসে এসে এখনও ঊর্ধ্বগতিতেই করোনা!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২৩:০৫, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, আগস্ট ১৫, ২০২০

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একদিনে আরও ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৭৬৬ জন। দেশে করোনা শনাক্তের ১৬০তম দিনে এসে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে দুই লাখ ৭০ হাজার এবং মোট মৃত্যু হয়েছে তিন হাজার ৫৯১ জনের। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রোগী বাড়ার তালিকাতে বাংলাদেশের নাম রয়েছে পাঁচ নম্বরে। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে ভারত, মেক্সিকো, ফিলিপাইন ও রাশিয়া।

গত ৮ মার্চ তিন জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর দেয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। আর সেটি আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যায় গত ৭ আগস্ট। এরমধ্যে গত ২ জুলাই একদিনে চার হাজার ১৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা ছিল একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। প্রথম রোগী শনাক্তের ঠিক ১০ দিন পর প্রথম মৃত্যুর খবর দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। আর ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।

প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পরবর্তী ১০০ জন শনাক্ত হয় ৬ এপ্রিল, এক হাজার ১৪ এপ্রিল, ১০ হাজার ৩ মে, ২৫ হাজার ১৮ মে, ৫০ হাজার ১ জুন, ৭৫ হাজার জন শনাক্ত হয় ১১ জুন। করোনা শনাক্তের পর ১০৩তম দিনে গত ১৮ জুন এক লাখ ছাড়ায় শনাক্তের সংখ্যা। ওইদিন পর্যন্ত মোট শনাক্ত ছিল এক লাখ দুই হাজার ২৯২ জন, তার ঠিক এক মাস পর গত ১৮ জুলাই শনাক্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, সেদিন পর্যন্ত দেশে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ লাখ ২ হাজার ৬৬ জন। অর্থাৎ তার আগের ৩১ দিনে শনাক্ত হয় ৯৯ হাজার ৭৭৪ জন। গত ২৫ জুলাই শনাক্তের ১৩৮তম দিনে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, সেদিন পর্যন্ত দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন দুই লাখ ১৬ হাজার ১১০ জন। এর ঠিক ১৫ দিনের মাথায় রোগী শনাক্ত আড়াই লাখ ছাড়িয়ে যায় ৭ আগস্ট। ১৪ আগস্ট ঠিক এক সপ্তাহ পর এসে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭১ হাজার ৮৮১ জন। অর্থাৎ ৮ দিনে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২০ হাজারের বেশি। তবে সরকারি এই হিসাবের বাইরেও আরও রোগী রয়েছেন বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গতকাল ১৩ আগস্ট ৪৪ জন, ১২ আগস্ট ৪২ জন, ১১ আগস্ট ৩৩ জন, ১০ আগস্ট ৩৯ জন, ৯ আগস্ট ৩৪ জন, ৮ আগস্ট ৩২ জন এবং ৭ আগস্ট ২৭ জনের মৃত্যুর খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। সাত আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হন দুই হাজার ৮৫১ জন, মোট শনাক্ত হয়েছিলেন দুই লাখ ৫২ হাজার ৫০২ জন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর মধ্য দিয়ে সেদিন শনাক্তের ১৫৩তম দিনে আন্তর্জাতিক জরিপ পর্যালোচনাকারী সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যান অনুসারে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যায় ইতালিকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। ইতালিকে পেছনে ফেলে বর্তমানে ১৫ নম্বরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

প্রথম রোগী শনাক্তের ৩৯তম দিনে গত ১৬ এপ্রিল পুরো দেশকে করোনাভাইরাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেদিনের ঘোষণায় স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর সংক্রমণ ঘটেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে রোগী শনাক্তের ষষ্ঠ মাসে এসেও করোনার ঊর্ধ্বমুখী হার এখনও চলমান। আর এসবের জন্য সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানা, কিছু জেলা লকডাউনসহ ঢাকার ভেতরে ক্লাস্টার ভিত্তিতে লকডাউন, কোরবানির ঈদে পশুর হাট, রাজধানী ছেড়ে গ্রামে যাতায়াতসহ করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনও কার্যক্রম না থাকাকেই দায়ী করেছেন তারা। আগামী সপ্তাহ থেকে রোগী আরও বাড়বে এবং তার পরের সপ্তাহ থেকে বাড়বে মৃত্যু।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা, করোনা টেস্টের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি, টেস্ট করাতে গিয়ে ভোগান্তিসহ নানা কারণে দেশে টেস্টের সংখ্যা কমেছিল। কিছু কিছু জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কারণে গত সপ্তাহ থেকে আবার টেস্টের সংখ্যা বেড়েছে। তবে টেস্টের সংখ্যা বাড়ুক আর কমুক, সংক্রমণের হার একই ছিল। বরং কম টেস্টেও রোগী শনাক্তের হার ছিল বেশি।’

‘সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বগতিতেই রয়েছে’ মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আর এক সপ্তাহ পরে করোনার সংক্রমণের হার আরও ঊর্ধ্বগতি আমরা দেখতে পাবো। সেটা হবে ঈদের ছুটির সময়ে যাতায়াত, পশুর হাটে জনসমাগমের ফলে।’

সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি চলছিল সেটা এখনও চলমান রয়েছে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ঈদের কারণে চলাচল বেড়েছিল, তাতে বিভিন্ন কমিউনিটিতে যদি সংক্রমণ হয়, সেটা কতটুকু ছড়ায় তার ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে পরবর্তীতে কী অবস্থা ঘটতে যাচ্ছে। রোগী শনাক্ত এখনও সেভাবে অতটা বাড়েনি, কিন্তু প্রচুর বাড়তে পারে- এটা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বোঝা যাবে। আর সরকার নতুন করে এমন কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি যে সংক্রমণ কমবে। তাহলে কমবে কীভাবে?’

সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের যে কর্মকৌশল সেটা কী হতে যাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে সংক্রমণের ঢেউ কী রকম হবে মন্তব্য করে অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘সেটা সেকেন্ড ওয়েব নাকি এই ওয়েব কন্টিনিউ করেই এগুতে থাকবে তার জন্য আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

গত এক সপ্তাহে রোগী শনাক্ত ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এই রোগী বাড়াটা ঈদের আগে যারা অসুস্থ ছিলেন তাদের হার। কিন্তু ঈদের সময়ের সংখ্যা দেখা যাবে আরও এক সপ্তাহ পর থেকে। আর দেশে ধীরে ধীরে হলেও সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী।’

/জেএ/এনএস/এমওএফ/

লাইভ

টপ