করোনায় গতি কমেছে ৬ মেগা প্রকল্পের

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:১৭, আগস্ট ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৫, আগস্ট ১৫, ২০২০

সমগ্র পৃথিবীকে থমকে দিয়েছে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। করোনার প্রভাব পড়েছে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া  ছয় মেগা প্রকল্পেও। করোনাভাইরাস মোট ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ৬ মেগা প্রকল্পের কাজে বাধা সৃষ্টি করেছে, কমিয়ে দিয়েছে এর কাজের গতি।
তবে সম্প্রতি এসব প্রকল্পের কাজ আবার শুরু হয়েছে। জানা গেছে, গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফাস্ট ট্র্যাক মনিটরিং টাস্কফোর্সের সভায় প্রকল্পগুলোর কাজের গতি বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ফাস্ট ট্র্যাক অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত ব্যয় ধরে ছয় প্রকল্প মিলিয়ে এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। সরকার চায় প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে শেষ হোক। সে কারণে চলমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এই ৬ মেগা প্রকল্প হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছাকাছি ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত সিংগেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ।

পদ্মা সেতু:

এর মধ্যে গুরুত্বের দিক থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া প্রকল্প হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। কাজের অগ্রগতিও বেশি হয়েছে এই প্রকল্পে। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল সেতু নির্মাণ কাজ হয়েছে ৮৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি বা সমস্যা দেখভাল করেন, পরামর্শ দেন। করোনার প্রভাবে এ প্রকল্পের গতিও কমেছে। মাঝখানে কিছুদিন প্রকল্পের কাজ বন্ধও ছিল বলে জানা গেছে। তবে এখন আবার কাজ শুরু হয়েছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল চার হাজার ১৫ কোটি টাকা। মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে দুই হাজার ৮৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে বাকি থাকা ১০টি স্প্যান পিয়ারে (পিলার) তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। শরিয়তপুরের জাজিরা থেকে মাওয়া পর্যন্ত মোট ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ৩১টি স্প্যান বসেছে। বাকি রয়েছে মাওয়া অংশে ১০টি স্প্যান বসানোর কাজ। এ কাজটি শেষ হলেও পুরো সেতুর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হবে। স্প্যানের ওপর সড়কপথের কাজ শরিয়তপুরের জাজিরা পয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে মাঝ নদী হয়ে এটি মাওয়ার দিকে এগুচ্ছে।

দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প:

দোহাজারী-রামু-ঘুমধুম রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। ২০১০ সালে শুরু হয় এ প্রকল্পের কাজ। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে এ প্রকল্পটির। কিন্তু এখনও প্রকল্পের কাজ অনেক বাকি রয়েছে। গত ১০ বছরে প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩৯ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৯০৯ কোটি টাকা।

মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্টা সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প:

মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ২২৫ কোটি টাকা, ২০২০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ২০১ কোটি টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প:

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়। শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ২৫ দশমিক ০৪ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৪ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১ মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৮৭৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৩২৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প:

পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে। লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ৩০ দশমিক ৫২ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তিন হাজার ২৯৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৯৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ২৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন পদ্মা সেতুতে রেলও চলবে।

মেট্রোরেল:

মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০১২ সালের জুন মাসে। শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে। তবে নির্ধারিত সময়ে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে না। কারণ এ পর্যন্ত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল চার হাজার ৩২৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৩২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৯২৯ কোটি  ৯২ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির আওতায় মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশের জন্য সোশ্যাল সার্ভে চলছে। উত্তরা নর্থ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৯টি স্টেশনের নির্মাণ কাজ ৭১ দশমিক ০৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগারগাঁও থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত সাতটি স্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং কাওরান বাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত সাতটি স্টেশনের কাজ হয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম ৩৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, রেল কোচ ও ডিপো ইক্যুপমেন্ট ২৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ঋণ সংক্রান্ত জটিলতা ও ভূমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়ার কারণে অগ্রগতি সন্তোষজনক হয়নি। সবশেষ করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি আরও ধীর করে দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছেন, করোনা প্রকল্পগুলোর কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে।  সরকার আশা করছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সবকটি প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।

/এমআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ