জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালই ‘ক্যান্সারে’ আক্রান্ত!

Send
হাসনাত নাঈম
প্রকাশিত : ১৩:০১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৪, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আবর্জনার স্তূপদেশে ক্যান্সার আক্রান্তদের সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে একমাত্র ভরসা রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। কিন্তু এখানে পরিষ্কার-পরিছন্নতার বালাই নেই। বারান্দা, করিডোর ও টয়লেটসহ বিভিন্ন জায়গায় ময়লার স্তূপ ও দুর্গন্ধ। অন্যদিকে বসার জায়গার সংকটে বাধ্য হয়েই অপরিচ্ছন্ন মেঝেতে শুয়ে-বসে থাকতে হচ্ছে রোগীদের। বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর ক্ষেত্রে সিরিয়াল জটিলতায় ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও স্বজনরা। সব মিলিয়ে ক্যানসার হাসপাতাল যেন নিজেই অব্যবস্থাপনার ‘ক্যান্সারে’ আক্রান্ত!জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে ময়লার স্তূপ

সরেজমিনে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ভবন ঘুরে দেখা যায়, নিচতলায় ঢুকতেই প্রচুর ভিড়। ধাক্কাধাক্কি করে সিরিয়াল নিচ্ছে অনেকে। অধিকাংশই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে ঘিঞ্জি বসার ব্যবস্থা

ভেতরে ঢুকতেই হাতের ডান পাশে রাখা ফায়ার এক্সটিংগুইশারের প্রায় অর্ধশত সিলিন্ডার। উল্টো পাশেই অনেক অকেজো লাইটবক্স। রোগীরা সেগুলোর পাশেই ময়লা মেঝেতে শুয়ে-বসে কাতরাচ্ছেন। টয়লেটের অবস্থা খুব নাজুক। সুস্থ মানুষও গেলে বমির উপক্রম হবে।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আবর্জনার স্তূপ

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেই চোখে পড়ে দেড়-শতাধিক মানুষ অপেক্ষমাণ। তাদের কেউ রোগী, কেউবা তাদের স্বজন। দোতলার বারান্দায় দুটি প্লাস্টিকের বালতি ময়লা ভর্তি হয়ে উপচে পড়েছে। আশেপাশে মাছি ঘুরছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে ময়লার স্তূপ

তৃতীয় তলায় ফ্লোর ভর্তি বালি। এর মধ্য দিয়েই চলাফেরা করছে মানুষ। করিডোরগুলোতে পড়ে আছে চিপসের প্যাকেট। অপেক্ষা করার আসনগুলোর নিচে ব্যবহৃত টিস্যু, কাগজের টুকরো, রশি ও কমলার খোসাসহ বিভিন্ন ময়লা।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে ময়লা-আবর্জনা সবখানে

চতুর্থ তলায় অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্সে ঢোকার ফটকের বাঁ-পাশের দেয়াল পানের পিকে লেপ্টে আছে। কলাপসিবল ফটকে চুনের দাগ। এখানকার ওয়েটিং রুমে রাখা একটি ড্রামে অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত বর্জ্য। অন্য পাশে একটি বাক্সে রক্তে ভেজা চাদর। সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, মাছি ভন ভন করছে। পঞ্চম তলা তুলনামূলকভাবে কিছুটা পরিষ্কার।

হাসপাতালের এমন বেহাল অবস্থার মধ্যে পুরো একঘণ্টার পর্যবেক্ষণে কোনও পরিছন্নতাকর্মীকে মেঝে মুছতে কিংবা বর্জ্য পরিষ্কার করতে দেখা যায়নি।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আবর্জনার স্তূপ

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রয়েছে ৩০০টি শয্যা। স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের চিকিৎসা দিতে এটি গড়ে তোলা হয়। সারাদেশের ক্যান্সার আক্রান্তরা এখানে আসেন। কিন্তু প্রতিদিনই তাদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে। অনেকে এক কক্ষ থেকে অন্যটিতে দৌড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। কেউ কেউ সিরিয়াল হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষারত। কোনও কারণে একবার সিরিয়াল মিস হয়ে গেলে পরের দিন ছাড়া আবারও তা পাওয়ার সুযোগ নেই।জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আবর্জনার স্তূপ

সবকিছু মিলিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা। তাদের মন্তব্য, ক্যান্সার হাসপাতালে ইমার্জেন্সি রোগীর সেবা পাওয়া অসম্ভব। একেকটি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয় চার-পাঁচদিন পর্যন্ত।

নরসিংদী থেকে মাকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে এসেছেন সুব্রত সাহা। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ওপর ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানকার কিছু অযাচিত নিয়মের কারণে রোগীদের ভোগান্তি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কোনও কক্ষেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। একজন এক রুম থেকে আরেকটিতে পাঠাচ্ছেন, এরপর আবার আরেকজন আরেক রুমে পাঠাচ্ছেন। এভাবেই চলছে। রোগী নিয়ে কেন এত রুমে দৌড়াতে হবে? হাসপাতালে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে সব বন্ধ হয়ে যায়। একটি কক্ষের কাজ শেষ করতে করতেই সময় পেরিয়ে যায়। এরপর শুনতে হয়– আবার কালকে আসুন।’জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আবর্জনার স্তূপ

রোগীর এই স্বজন মনে করেন, একটি চিকিৎসার জন্য সাধারণত একদিনই যথেষ্ট। তার অভিযোগ, ‘পাঁচটি কক্ষে দৌড়িয়ে আমার পাঁচদিন নষ্ট করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমরা দূর থেকে আসি, রোগী নিয়ে এসে সিরিয়াল না পাওয়া গেলে পুরো দিন মাটি। ইমার্জেন্সি রোগীদের তো এখানে ট্রিটমেন্ট পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার!’জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল

ফরিদপুর থেকে আসা শফিকুল ইসলাম তুললেন একই অভিযোগ, ‘আমার খালার স্তন ক্যান্সার। তার একটি টেস্টের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আগামী রবি বা সোমবার এলে নাকি সিরিয়াল পাওয়া যাবে। একটি টেস্টের সিরিয়ালের জন্য পাঁচদিন অপেক্ষা করতে হবে ভাবা যায়? এখানে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, আটঘণ্টায় দুই-তিনবার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে থাকে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এছাড়া ওয়াশরুম অপরিচ্ছন্ন থাকার কারণ হিসেবে রোগী ও স্বজনদের দায়ী করেছেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. সফিকুল ইসলাম। তার মন্তব্য, ‘আমাদের এখানে একজন রোগীর সঙ্গে পাঁচ জন করে লোক আসে। তাদের অসচেতনতার কারণে হাসপাতালের পরিবেশন পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা বাথরুম যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে, পানি পর্যন্ত ঢালে না। তারা সচেতন না হলে কতক্ষণ পরিষ্কার রাখা যায়? তবুও আমি নিজেই মাঝে মধ্যে দেখে আসি, পরিষ্কার করার নির্দেশ দেই। একজন কর্মচারী আটঘণ্টা ডিউটি করে। এর মধ্যে তিনবার সবকিছু পরিষ্কার করে। এছাড়া অন্যান্য ক্লিনিং তো আছেই।’জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে অপরিচ্ছন্ন হাত ধোয়ার জায়গা

অবকাঠামোসহ ও অন্যান্য জিনিস মেরামত না হওয়ার পেছনে গণপূর্ত বিভাগকে দায়ী করেন উপ-পরিচালক (প্রশাসন)। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানছি আমাদের কয়েকটি বাথরুম নষ্ট এবং ফিটিংস ঠিক নেই। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। আমাদের কিছুই করার সুযোগ নেই। একটি ফ্যান, লাইট কিংবা পানির কল নষ্ট হলেও তাদের জানাতে হয়। তারা ‘আসছি, আসছি’ বলে বলে একমাস পার করে দেয়। এ কারণে জিনিসপত্র নষ্ট হয়। সরকার যদি এসব দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দিতো, তাহলে কারও কাছ থেকে এসব অভিযোগ আসতো না।’জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল পুরোটাই যেন অপরিচ্ছন্ন

ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের অজুহাত, লোকবল সংকটের কারণে রোগীদের সেবা দিতে বিলম্ব হয়। তাছাড়া তারা মনে করেন, রোগীরা নির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য কোথায় যেতে হবে সেটা না জেনেই কোনও একটি কক্ষে ঢুকে পড়ে। মূলত এ কারণে তাদের এক কক্ষ থেকে অন্যটিতে দৌড়াতে হয়।
রোগীদের ভোগান্তির বিষয়ে ডা. মো. সফিকুল ইসলামের কথা, ‘আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। তারপরও আমরা স্বীকার করি, আমাদের লোকবল সংকট আছে। তাছাড়া এক বিভাগের রোগীকে অন্য বিভাগের চিকিৎসক দেখবে না, দেখতে পারেও না। এখন কোথায় যেতে হবে সেটা যদি তথ্যকেন্দ্র থেকে কেউ জেনে না নেন, তাহলে তো দৌড়াদৌড়ি করতেই হবে। এটা তাদের অজ্ঞতা।’

আরও পড়ুন- শিশুবান্ধব হয়ে উঠছে শিশু হাসপাতাল

 

/জেএইচ/

লাইভ

টপ
X