কোভিড পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থা এই মুহূর্তেই জরুরি

জাকিয়া আহমেদ
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:০১আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৫

করোনাভাইরাস গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দেওয়া সরকারি হিসাবে, দেশে এখন পর্যন্ত মোট তিন লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৪ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন পাঁচ হাজার ৪৪ জন। আর সুস্থ হয়েছেন দুই লাখ ৬২ হাজার ৯৫৩ জন। তবে আপাতদৃষ্টিতে করোনা থেকে সুস্থ হলেও করোনামুক্তরা ভুগছেন নানা ধরনের জটিলতায়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী কোভিড থেকে মুক্ত হওয়ার পরও বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন, তাদের মধ্যে শর্ট ও লং টার্ম জটিলতা রয়েছে। যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে লং কোভিড বা লং হলার্স। এর ভেতরে রয়েছে সিভিয়ার মেন্টাল হেলথ সমস্যা (অনিদ্রা, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, ক্রনিক ফ্যাটিগ বা অসম্ভব রকম অবশাদগ্রস্ততা), দুর্বলতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ক্রনিক হাইপোক্সিয়া (করোনা থেকে সেরে ওঠার পর অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম), মাংসপেশিতে ব্যথা, চুল পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা।

তারা বলছেন, কোভিড রোগীদের পাশাপাশি এই মুহূর্তে দেশের সব হাসপাতালে, না হলে অন্তত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চালু করা দরকার। নয়তো মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে।

গত জুলাই মাসে করোনায় আক্রান্ত হন বেসরকারি একটি ব্যাংকের চাকরিজীবী পারভেজ আলম। ২১ দিন পর তিনি করোনা নেগেটিভ হলেও এরপর থেকে একের পর এক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পারভেজ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে এখন পর্যন্ত যত ডাক্তারের কাছে গেলাম, ২৮ বছরের জীবনেও এতবার যাইনি।’

পারভেজ তার ভোগান্তির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেই আমি। আমার সুস্থ হতে একটু বেশি সময় লেগেছে। তবে এখনও হঠাৎ করেই উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যায়, ঘাড় এবং মাথায় তীব্র ব্যথা হয়। এর জন্য একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ’র কাছে যাই। চিকিৎসক বেশ কিছু টেস্ট দেন, সেখানে মেরুদণ্ডে বাত জাতীয় সমস্যা ধরা পড়ে। এরপর আমি রিউমেটোলজি বিশেষজ্ঞের কাছে যাই। তিনি চিকিৎসা দেন। সঙ্গে বলে দেন এটা দীর্ঘমেয়াদি, চিকিৎসা চলবে অনেকদিন।’

এসব সমস্যা আগে ছিল না জানিয়ে পারভেজ বলেন,  ‘কোভিডের পরই আমার এ সমস্যা শুরু হলো। চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু এর মধ্যেই শরীরে বিষফোঁড়া হতে শুরু করে। সেগুলো ইনফেকশন হয়ে যাচ্ছিল। এরপর আবার যেতে হলো চিকিৎসকের কাছে। ফোঁড়াগুলো সার্জারি করতে হলো। এখন আবার নাকের অ্যালার্জির কারণে কানের পর্দা ফেটে গেছে। আমার একটার পর একটা ভোগান্তি হচ্ছেই। কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার পর গত এক মাসে যত চিকিৎসকের কাছে গেলাম, পুরো জীবনেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার এত প্রয়োজন হয়নি। আমি ভুগলাম, এখনও ভুগছি।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার পর নানা সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে মানুষ। এ নিয়ে যেমন জরিপ হওয়া প্রয়োজন, তেমনি এসব মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতালগুলোতে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন এই সময়ে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

দেশে প্রথম পোস্ট কোভিড ক্লিনিক করেছে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন এই মহামারির চিকিৎসা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, কোভিড পজিটিভ রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার পরও তারা নানা ধরনের জটিলতার কথা জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের। তার মধ্যে রয়েছে দুর্বলতা না কাটা, শরীর ব্যথা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, আর শ্বাসকষ্ট তো আছেই। এই মানুষগুলো এখন নেগেটিভ। কিন্তু তারা তো একেবারে সুস্থও হচ্ছেন না। আবার তাদের স্পেসিফাইড করা যায় এমন কোনও ফাইন্ডিংসও পাওয়া যাচ্ছে না।’ অর্থাৎ নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, কোভিড চলে যাওয়ার পর এই এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, ‘তারা সাফার করছে, কিন্তু ম্যানেজমেন্টের আওতায় আসছে না। তারা যাবে কোথায়? গত মাসে (আগস্ট) ১০ টাকা টিকিটের বিনিময়ে তাদের জন্যই এই পোস্ট কোভিড ক্লিনিক করা হয়েছিল। নতুন ভবনের চারতলায় এ পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চলছে সকাল ৯টা থেকে দুপুর দেড়টা-২টা পর্যন্ত। এখানে সপ্তাহে রবি এবং বুধবার রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো রোগী আমরা পাচ্ছি। কিন্তু এটা নিয়ে প্রচারণা সেভাবে হয়নি। অথচ পোস্ট কোভিড সিন্ড্রোম নিয়ে অনেক মানুষ ভোগান্তিতে রয়েছে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল

গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে পোস্ট করোনা ক্লিনিক চালু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুলফিকার আহমেদ আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথম দিকে রোগী কম থাকলেও ধীরে ধীরে সেটা বাড়ছে। প্রতি সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার দুই দিন এই ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছে। গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন করে রোগী পাচ্ছি।’

আবার এসব রোগীর মধ্যে যাদের ভর্তি করানোর প্রয়োজন হচ্ছে, তাদের ভর্তিও করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। জানালেন, এ প্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৫০ থেকে ১৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিদেশের মেডিক্যাল জার্নালসহ আমাদের চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, করোনায় যখন কেউ আক্রান্ত হন তখন শরীরের কিছু কিছু অর্গান যেমন হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক, লিভার, ফুসফুসে ড্যামেজ হচ্ছে। কিন্তু করোনা থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার পরও ড্যামেজ হয়ে যাওয়া অর্গানগুলো পুরোটা ‘রিকভার’ করছে না। সেইসঙ্গে দরকার তার কষ্ট লাঘব করা। এসব কারণেই পোস্ট কোভিড ক্লিনিকের সূচনা হয়।

বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যান্ড হোপ আগামী শনিবার থেকে শুরু করতে যাচ্ছে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোভিড সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে গেলেও তার ক্ষত শরীরে থেকে যায় প্রায় কয়েক সপ্তাহ। প্রচণ্ড ক্লান্তি, দুর্বলতা, ঘুম না হওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শরীরে এক ধরনের গরম অনুভূত হওয়া, চুলকানি এসব আগে ছিল না, কিন্তু কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো এসব অসুখেও অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন।  আবার অনেকেই ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা আগে কম থাকলেও কোভিডের পর সেটা বেড়ে যায়। এসব সমস্যা নিয়ে অনেকেই অবহিত নন। যার কারণে তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। আবার অনেকে অসহায় বোধ করতে থাকেন অসুস্থতা নিয়ে। এসব মিলিয়ে মানসিক হতাশা, বৈকল্য তৈরি হয় ভেতরে। এসব কিছুর চিকিৎসা দেওয়ার জন্যই মূলত পোস্ট কোভিড ক্লিনিকের দরকার হয়।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন ও ইনফেকশাস রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মারুফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাড়ে তিন লাখের ওপরে মানুষ করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এর আগে সার্স ভাইরাসে গড়ে ১০ শতাংশ রোগীর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। আমরা সন্দেহ করছি, সার্স কোভ-২ অর্থাৎ করোনাভাইরাসেও এমন রোগী পাওয়া যাবে, যেহেতু তারা সমগোত্রীয়। আর তাই এখনই পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চালু করা উচিত। আর সব হাসপাতালে যদি পোস্ট কোভিড ক্লিনিক চালু করা নাও যায় তাহলে অন্তত বড় হাসপাতালগুলোতে সেটা দরকার এবং এখনই। একইসঙ্গে পোস্ট কোভিড ক্লিনিক নন কোভিড হাসপাতালেও চালু করা উচিত। এক্ষেত্রে তাদের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে যেহেতু তারা সংক্রামক নন। নন কোভিড হাসপাতালে যদি এ ধরনের রোগীদের আলাদা করে অ্যাড্রেস করা হয় তাহলে সবার জন্যই সুবিধা হবে।’

ডা. ফরহাদ উদ্দিন হাছান চৌধুরী মারুফ জানান, লং কোভিড কী কী প্যাটার্ন নিয়ে আসছে, কত রোগীর এ ধরনের জটিলতা হচ্ছে সে বিষয় কাজ করছেন তারা।

পোস্ট কোভিড ক্লিনিক এ মুহূর্তেই চালু করা দরকার মন্তব্য করে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তো সব জায়গায় বলছি, সব হাসপাতালে এটা চালু করা উচিত। যেখানেই কোভিড চিকিৎসা হবে সেখানেই পাশাপাশি পোস্ট কোভিড চিকিৎসা চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কোভিডের পর অনেক জটিলতা হচ্ছে। এসবের ফলোআপ লাগবে, চেকআপ লাগবে। তাই অন্তত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এটা করা দরকার।’

আরও পড়ুন- করোনামুক্তরা জর্জরিত অন্য রোগে

/এফএস/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
'মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা' স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
'মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা' স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের