করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১০:৫৯, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩৮, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে করোনার ‘প্রথম ঢেউ’ শেষ না হলেও এখনই আলোচনা হচ্ছে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ নিয়ে। সামনে শীতকাল। শীতে করোনার সংক্রমণের ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেজন্য তিনি প্রস্তুত থাকার কথাও বলেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শীতের সময়ে করোনার সংক্রমণ ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে টেস্ট বাড়ানো, রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসার জন্য আইসোলেশন, ট্রেসিং (রোগীর সংস্পর্শে আসাদের শনাক্ত), তাদের কোয়ারেন্টিন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য প্রচারণা বাড়ানো এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সম্পৃক্ত করার কথা বলছেন তারা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য কর্মজীবী জনগণকে সহায়তা দিতে হবে।

শীতকালে করোনার সেকেন্ড ওয়েব শুরুর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হলে তার জন্য কী কী করণীয় সে ব্যাপারে আমাদের সব প্রস্তুতি এখনই নেওয়া হচ্ছে। করোনা মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই দেশের স্বাস্থ্য খাত সক্ষমতা দেখিয়েছে। সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হলেও দেশের স্বাস্থ্য খাত এভাবেই মোকাবিলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।’

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও দেশে পুনরায় করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে। কমিটি দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে এখনই করণীয় ঠিক করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখার জন্য কমিটি পরামর্শ দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার সংক্রমণ দ্রুত নির্ণয়ের লক্ষ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে এখনই করণীয় বিষয়ে রোডম্যাপ প্রস্তুত করে সেই মোতাবেক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় যেখানে যেখানে ঘাটতি রয়েছে সেগুলো পূরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘রোগী শনাক্ত করে তাকে আইসোলেট করা এবং তাদের কন্ট্যাক্টে যারা রয়েছেন তাদের কোয়ারেন্টিন করতে হবে। এটা একেবারেই শহরাঞ্চলে হচ্ছে না, গ্রামে কিছুটা হচ্ছে। তবে এখন হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো কিছুটা পরিস্থিতি হয়েছে। কারণ তাদের খাওয়াতে হবে, চাকরি যেন না যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

ডা. মুশতাক বলেন, ‘রোগী চিহ্নিতকরণ, আইসোলেশন, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে কোয়ারেন্টিন করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সহায়তা দিতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল এগুলো প্রচার করলেই হবে না। মাস্ক বিতরণ করা, যেসব জায়গায় হাত ধোয়ার মতো সুবিধা নেই, সেখানে এসবের ব্যবস্থা করতে হবে। এরসঙ্গে যুক্ত রয়েছে, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়টি।’

তবে এ কাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে এই মহামারি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো কাজ করতে হলে লাখ লাখ স্বেচ্ছাসেবী দরকার।’ সরকারি কাঠামোতেই অনেক মাঠকর্মী রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কর্মীদেরই তো কাজে লাগানো হচ্ছে না, কারণ ওপরের নির্দেশ নেই।’

‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং করোনার এই সময়ে কী কাজ করেছে?’ প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘তাদের কোনও তৎপরতাই ছিল না।’ ডা. মুশতাক বলেন, ‘শিক্ষা, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ এনজিওকর্মীদের করোনা মোকাবিলায় সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে রোগী শনাক্তকরণ এবং স্বাস্থ্যবিধি নিয়ন্ত্রণের কাজে সম্পৃক্ত করলে ভালো ফল আসবে। শুরুর দিকে যেসব কাজ করা হয়নি, এখন সেসব করতে হবে। মাল্টিসেক্টরাল কর্মসূচি আবার চালু করতে হবে জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্বে।’

কেন্দ্রীয়ভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে দৃশ্যমান হেডকোয়ার্টার থাকতে হবে, যারা নির্দেশনা তৈরি করে সবাইকে নিয়ে কাজ করবে। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং কমান্ড অস্বচ্ছ। কমান্ডার হিসেবে এমন একজনকে নিয়োগ করতে হবে যিনি প্রশাসনিকভাবে দক্ষ এবং যার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।’

বিভিন্ন দেশে এখন ‘ইন্ট্রা অ্যাকশন রিভিউ অর্থাৎ আন্ত কর্মপর্যালোচনা’ হচ্ছে এবং এটা এখন খুব দরকার জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে একটি গাইডলাইন দিয়েছে, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াতে হয়েছে। সব ‘স্টেকহোল্ডারকে’ নিয়ে আমরা কতটুকু কী কাজ করলাম সে নিয়ে রিভিউ করলেই বের হবে অনেক কিছু।’

করোনা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ

‘করোনার ভয়ে যখন রোগীরা হাসপাতালে আসছিল না, তখন চিকিৎসক একজন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে জ্বরাক্রান্তের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে পজিটিভ হলে তাকে আইসোলেশন করা হয়েছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে খাবার দিয়ে এসেছেন। তার সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের কোয়ারেন্টিন করা হয়েছে। রাজশাহীর বাগমারা, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, কক্সবাজারের পেকুয়াতে এই গুড প্র্যাক্টিস হয়েছে। এগুলো গণমাধ্যমে আসতে হবে, যাতে অন্যরা উৎসাহিত হয় এসব কাজে।’ বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশেও পুনরায় করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। আর সেজন্য দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি সংক্রমিত হলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।’ তবে সরকারকে এক্ষেত্রে কী কী পরামর্শ দেবে সে বিষয়ে আগামী সোম বা মঙ্গলবার কমিটি বৈঠক করবে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘তখনই আমরা আমাদের পরামর্শগুলো সবাইকে জানাবো। কারণ সেখানে সবাই মতামত দেবেন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল এ বিষয়ে বলেন, ‘মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে। একই সঙ্গে টেস্টের সংখ্যা বাড়াতে হবে, রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন করতে হবে, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করে তাদের কোয়ারেন্টিন করতে হবে। আর এখন চেষ্টা করতে হবে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা যায় কিনা, এটা এখন অ্যাডিশনাল।’

আগে সবকিছুই ঢাকা থেকে পরিকল্পনা করে করা হয়েছে, কিন্তু এখন ‘লোকাল লেভেল প্ল্যানিং’ খুব দরকার উল্লেখ করে ডা. ফয়সাল বলেন, ‘এক জায়গার পরিকল্পনা আরেক জায়গায় কাজে লাগবে না। বরগুনাতে যা করা হবে সেটা বগুড়াতে কাজে লাগবে না। এজন্য জনগণ ও প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে কাজ করতে হবে।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুরুতে এ মহামারির বিষয়ে তথ্যের ঘাটতি ছিল আমাদের। কিন্তু এবার যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন, তাই মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরের আগের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না।’ আর এবারও যদি সেটা হয় তাহলে জাতিকে সেই খেসারত দিতে হবে বলে জানান তিনি।

/এমএএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X