‘রোম এক দিনে তৈরি হয়নি’ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই প্রবাদ শুধু একটি কথাই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা ও পরিবর্তনের গল্প।
ইতালির রাজধানী রোম আজও বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন শহর। প্রাচীন সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে আধুনিক ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী হয়ে ওঠার পথে রোম দেখেছে যুদ্ধ, রাজাদের উত্থান-পতন, স্থাপত্যের বিস্ময় এবং মানবসভ্যতার নানা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
শহরের প্রতিটি রাস্তা, ধ্বংসাবশেষ ও স্থাপনা যেন অতীতের গল্প বলে। রোমানদের উদ্ভাবন, জীবনযাপন ও বিশ্বাসের অনেক বিষয় আজও মানুষকে বিস্মিত করে।
জেনে নেওয়া যাক রোম সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য, যা হয়তো অনেকেরই অজানা।
১. রোম কী বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিল
রোমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে অনেকেই মনে করেন, এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। তবে আয়তনের বিচারে রোমান সাম্রাজ্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য নয়।
বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যের তালিকায় ব্রিটিশ, মঙ্গোল, রুশ ও স্প্যানিশ সাম্রাজ্য রয়েছে। আয়তনের হিসাবে রোমান সাম্রাজ্যের অবস্থান প্রায় ২৮তম।
তবে আয়তনের দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও আইন, স্থাপত্য, ভাষা, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে রোমের প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান।
২. ইতিহাসের দীর্ঘতম সংঘাতের সাক্ষী রোম
রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘাত ছিল মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলোর একটি। প্রায় ৭২১ বছর ধরে চলা এই বিরোধের মূল কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, ভূমি ও সাম্রাজ্য বিস্তারের নিয়ন্ত্রণ ছিল এর মূল কারণ। আবার কেউ কেউ মনে করেন, আইওনীয় বিদ্রোহের প্রতিশোধও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। এই দীর্ঘ সংঘাত প্রমাণ করে, প্রাচীন বিশ্বে ক্ষমতা ও সাম্রাজ্য বিস্তার কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৩. প্রাচীন রোম ছিল নিউইয়র্কের চেয়েও ঘনবসতিপূর্ণ!
আজকের দিনে নিউইয়র্ক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শহর। কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রাচীন রোমও ছিল অত্যন্ত জনাকীর্ণ এক মহানগর। রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় ৪৪ লাখ বর্গকিলোমিটার এবং সেখানে বসবাস করতো আনুমানিক ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। ব্যস্ত বাজার, সংকীর্ণ রাস্তা ও বহুস্তর ভবনে ভরা রোম ছিল তার সময়ের অন্যতম বড় নগরসভ্যতার উদাহরণ।
৪. প্রাচীন রোমে মজুরি বৈষম্য ছিল তুলনামূলক কম
প্রাচীন রোমে ধনী-গরিবের পার্থক্য থাকলেও শ্রমিকদের পারিশ্রমিকে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্য ছিল বলে ধারণা করা হয়। কাজের ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে মজুরিতে পার্থক্য থাকলেও তা আধুনিক সময়ের মতো চরম বৈষম্যমূলক ছিল না।
৫. ভেস্টাল কুমারীদের কঠোর জীবন
প্রাচীন রোমে ভেস্টাল কুমারীরা ছিলেন দেবী ভেস্তার সেবায় নিয়োজিত বিশেষ নারী পুরোহিত। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে তাদের ব্রহ্মচর্যের শপথ পালন করতে হতো। প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করতেন তারা। শপথ ভঙ্গ করলে তাদের জন্য ছিল কঠোর শাস্তি।
৬. রোমে নর্দমা ও শৌচব্যবস্থারও ছিল ধর্মীয় গুরুত্ব
প্রাচীন রোমে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য আলাদা দেবতার ধারণা ছিল। নর্দমা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল দেবী ক্লোয়াসিনা। যদিও জনপ্রিয় অনেক গল্পে রোমানদের বিশ্বাস নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য পাওয়া যায়, তবে বাস্তবে রোমানরা উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
৭. টয়লেট পেপারের বদলে ব্যবহার হতো স্পঞ্জ-লাঠি
প্রাচীন রোমে আধুনিক টয়লেট পেপার ছিল না। জনসাধারণের শৌচাগারে ব্যবহার করা হতো লাঠির মাথায় লাগানো স্পঞ্জ, যার নাম ছিল ‘টারসোরিয়াম’। বর্তমান সময়ের তুলনায় এই ব্যবস্থা অস্বাভাবিক মনে হলেও, সে যুগে এটি ছিল পরিচ্ছন্নতার প্রচলিত পদ্ধতি।
৮. প্রস্রাবও ছিল বিক্রির পণ্য!
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, প্রাচীন রোমে প্রস্রাবের বাণিজ্যিক মূল্য ছিল। কাপড় পরিষ্কার করার জন্য প্রস্রাব ব্যবহার করা হতো, কারণ এতে থাকা অ্যামোনিয়া পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করতো। এমনকি এই পণ্যের ওপর করও আরোপ করা হয়েছিল।
৯. লবণ ছিল মূল্যবান সম্পদ
প্রাচীন রোমে লবণ শুধু রান্নার উপকরণ ছিল না, এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পণ্য। খাবার সংরক্ষণ এবং ক্ষত পরিষ্কারের কাজেও লবণ ব্যবহার করা হতো।
১০. গ্ল্যাডিয়েটরদের ঘামও বিক্রি হতো!
প্রাচীন রোমে গ্ল্যাডিয়েটরদের ঘাম নিয়ে ছিল নানা কুসংস্কার। অনেকে বিশ্বাস করতেন, তাদের ঘাম ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে পারে। এমনকি গ্ল্যাডিয়েটরের রক্ত নিয়েও নানা অলৌকিক বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।
১১. খ্রিস্টানদের নিয়ে ছিল ভুল ধারণা
প্রাচীন রোমে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় আচার নিয়ে নানা ভুল ধারণা ছিল। অনেক রোমান মনে করতেন, তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানুষের মাংস খাওয়া বা রক্ত পান করা হয়। পরে খ্রিস্টানরা ব্যাখ্যা করেন, এসব প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়।
১২. ক্যালিগুলাকে ঘিরে রহস্যময় গল্প
রোমের সম্রাট গাইয়াস ক্যালিগুলা ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত শাসক। তাকে নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা অদ্ভুত গল্প—যার মধ্যে রয়েছে চাঁদের সঙ্গে কথা বলা এবং নিজের ঘোড়াকে সিনেটর করার পরিকল্পনার মতো ঘটনা। তবে এসব গল্পের অনেকটাই ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্কিত।
১৩. রোমান কংক্রিট আজও বিস্ময়
প্রাচীন রোমের নির্মাণপ্রযুক্তি আজও গবেষণার বিষয়। রোমানরা এমন এক ধরনের কংক্রিট তৈরি করেছিল, যা হাজার বছর পরও অনেক স্থাপনায় টিকে আছে। তাদের তৈরি সেতু, রাস্তা ও ভবন আজও প্রকৌশলীদের বিস্মিত করে।
১৪. আধুনিক সড়ক ব্যবস্থার পূর্বসূরি রোম
রোমানরা তৈরি করেছিল বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক। অ্যাপিয়ান ওয়ের মতো রাস্তা দিয়ে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হতো। এখান থেকেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘সব পথ রোমের দিকে যায়’ প্রবাদটি।
১৫. ক্রাসাসের রিয়েল এস্টেট কৌশল
প্রাচীন রোমের ধনী ব্যক্তি মার্কাস লিসিনিয়াস ক্রাসাস ক্ষতিগ্রস্ত ভবন কম দামে কিনে সংস্কার করে বেশি দামে বিক্রি করতেন। এই ব্যবসায়িক কৌশল তাকে বিপুল সম্পদের মালিক করে তোলে।
১৬. ইতিহাসের প্রথম শপিং মল
সম্রাট ট্রাজান নির্মাণ করেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম প্রথম বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ‘ট্রাজানের মার্কেট’। বহুতল এই বাজারে খাবার, পোশাক ও বিভিন্ন পণ্য কেনাবেচা হতো। আধুনিক শপিং মলের ধারণার সঙ্গে এর অনেক মিল পাওয়া যায়।
১৭. আজকের ক্যালেন্ডারের পেছনেও রোম
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে জুলিয়াস সিজার চালু করেন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। পরবর্তীতে আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আজ আমরা যে ১২ মাসের ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি, তার পেছনেও রয়েছে প্রাচীন রোমের অবদান।
হাজার বছরের পুরোনো রোম শুধু একটি শহর নয়, এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। স্থাপত্য, বিজ্ঞান, আইন, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে রোমের রেখে যাওয়া প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান।
তথ্যসূত্র: বিজনেস ইনসাইডার— বিশ্বের ইতিহাসের ১০ বৃহত্তম সাম্রাজ্য। হিস্ট্রি হিট— প্রাচীন রোম ও রোমানদের সম্পর্কে ১০০ তথ্য। অ্যারাউন্ড রোম ট্যুরস— ইতালির রোম শহর সম্পর্কে ৩০টি আকর্ষণীয় তথ্য। প্রোভাইডার— প্রাচীন রোম সম্পর্কে ৪৬টি চমকপ্রদ তথ্য।









