X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে শুদ্ধি অভিযানের নামে টিসি আতঙ্ক

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৮, ২৩:০০

 


উইলস লিটল ফ্ল্যাওয়ার স্কুল

রাজধানীর নামি স্কুল উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের বিভিন্ন শ্রেণির ৯ শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক টিসি (ট্রান্সফার সার্টিফিকেট) দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এই খবরটি মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্ত বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে স্কুলের প্রত্যেক অভিভাবককে জানানো হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, অভিযানটি চলতে থাকবে এবং এই অভিযানে আরও অনেক শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়া হবে। ফলে অভিভাবকদের মাঝে এখন বিরাজ করছে টিসি আতঙ্ক।

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) বলছে, ভুক্তভোগী কোনও অভিভাবক ও শিক্ষার্থী টিসি দেওয়ার বিষয়ে মাউশিকে অভিযোগ করলে, অবশ্যই ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২৩ এপ্রিল দু’জন শিক্ষার্থীকে এবং গত ২৫ এপ্রিল আরও সাত শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়া হয়েছে।’ ওই শিক্ষার্থীরা স্কুলের পরিবেশ নষ্ট করায় তাদেরকে টিসি দেওয়া হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের কেন টিসি দেওয়া হলো জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী স্কুলের একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছে। এ কারণে তাকে টিসি দেওয়া হয়েছে। নবম শ্রেণির একছাত্রী মোবাইল ফোনে স্কুলের বাইরের একটি ছেলের সঙ্গে কথা বলছিল। এটার কারণে তাকে টিসি দেওয়া হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনের দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন অন্যজনের কাছে ৩০০ টাকার বিনিময়ে চাকু বিক্রি করেছে। চাকুটি যে কিনেছে তার কাছে আরও ২৮০ টাকা পাওয়া গেছে। এজন্য তাদেরকেও টিসি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, অষ্টম শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনের দুই শিক্ষার্থীর কাছে ইলেক্ট্রিক সিগারেট পাওয়া গেছে, যার দাম অন্তত পাঁচ হাজার টাকা। এত টাকা তারা পেলো কোথায়? এ কারণে তাদেরকে টিসি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, দশম, অষ্টম এবং সপ্তম শ্রেণির তিনজন শিক্ষার্থী সিনিয়রিটি ও জুনিয়রিটি নিয়ে টিফিন আওয়ারে মারামারি করেছে। তাদের একজনের কাছে একটি চাকু পাওয়া গেছে। ফলে তাদের সবাইকে টিসি দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের বেসরকারি  মাধ্যমিক স্কুল শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের খুব ছোটখাটো অন্যায় পেলেই শিক্ষকরা তাদেরকে শোধরানোর সুযোগ না দিয়ে, টিসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে শর্টকার্ট পথ বেছে নেন। কিন্তু ওই শিক্ষার্থীদের দুষ্টুমি ও অন্যায়ের দায়ভার তো অবশ্যই ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের ওপরে পড়ে। শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথটি দেখানো, সঠিকভাবে পরিচালিত করা, বেশি বেশি নার্সিং করতে হবে ওই শিক্ষকদেরই। কিন্তু তারা তা করেন না। এছাড়া, ওই শিক্ষার্থীদের যখন টিসি দেওয়া হয়, তখন তাদের মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে তারা বিপথে যেতে পারে। তাদের পরিবারেও অশাস্তি তৈরি হয়।’

ড. মান্নান আরও বলেন, ‘উইলস লিটল স্কুলে কেন টিসি দেওয়া হলো, তা আমার জানা নেই। তবে আমরা এবিষয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে কোনও অভিযোগ পেলে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।’

এদিকে, মাউশির সাবেক এক পরিচালক সাধন কুমার বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৩০ সালের এডুকেশন কোডে বলা আছে— কোনও শিক্ষার্থী যদি কোনও অন্যায় করে, তাহলে তাকে বহিষ্কার করা যাবে। তবে ওই শিক্ষার্থীকে সংশোধনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। বারবার তাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। অভিভাবকদেরকে ডেকে তাদের মাধ্যমে কাউন্সেলিং করতে হবে। প্রয়োজনে সাইক্রিয়াটিক দেখাতে হবে। তবুও যদি সে না শোধরায়, তখনই কেবল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে টিসি দিতে পারবে। কারণ, টিসি দেওয়া মানেই-তো একজন শিক্ষার্থীকে ফাঁসি দেওয়ার শামিল। এরপর সে  কোনও স্কুলে ভর্তিও হতে পারবে না। এর মানে তার একাডেমিক জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। এমনকি সে মানসিক বিকৃতিসহ বিপথগামীও হতে পারে।’

শিক্ষার্থীদের টিসি দেওয়ার আগে তাদেরকে শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ‘এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদেরকে শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’ তবে  তিনি এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য প্রমাণ দিতে রাজি হননি, এমনকি ওই ৯ শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তাদের মোবাইল নম্বর চাওয়া হলে, তিনি তা দিতেও অস্বীকৃতি জানান।

সিসিটিভির ক্যামেরা ভেঙে ফেলার কারণে টিসি দেওয়া শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে  আগেও কোনও অভিযোগ ছিল কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আগে কোনও অভিযোগ ছিলনা।’ তবে তিনি এও বলেন, ‘টিসিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা যদি ক্ষমা চেয়ে আবেদন করে, তাহলে সেটা বিবেচনা করতেও পারি।’

তিনি বলেন, ‘স্কুলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা তাদেরকে টিসি দিয়েছি। বর্তমানে এ বিষয়ে ঝটিকা অভিযান চলছে। আরও টিসি দেওয়া হবে।’

এদিকে, বহিষ্কৃত শিশুদের মানসিক অবস্থার কী পরিণতি হতে পারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একজন শিশুর কোনও ধরনের অন্যায়ই কখনও অপরাধ হিসেবে ধরা হয় না। ধরা হয় ভুল হিসেবে। সুতরাং ওই শিশুদের ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার কাজটি করবেন তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকরাই। কিন্তু তা না করে যদি ওই শিশুদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে ওই শিশুরা মানসিকভাবে বড় ধরনের চাপ অনুভব করবে। কারণ, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ এবং একজন শিশুর চাপ নেওয়ার ক্ষমতা একরকম নয়।’

তিনি বলেন, ‘ওই শিশুরা বহিষ্কার হওয়ার কারণে পরিবারের কাছে বারবার বকুনি খাবে। হয়তো আর ভালো কোনও স্কুলে ভর্তি হতেও পারবে না। তাহলে  তারা বিষণ্নতায় ভুগবে। ফলে তাদের নানা ধরনের ক্ষতি হতে পারে।’

টিসি দেওয়া শিক্ষার্থীদের পরবর্তী একাডেমিক জীবন হুমকির মুখে পড়ে গেলো কিনা জানতে চাইলে অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ‘তাদের কিছুই হবে না। এমন হয় না। তাছাড়া, এমন চরম দুষ্টু ছেলে-মেয়েদের কোথাও পড়াশোনার দরকার নেই। তাদের দেখেই অন্যরা শিখবে। অভিভাবকরা সচেতন হবে। আমরাও সেটাই চাই।’

বৃহস্পতিবার (২৬ এপ্রিল) উইলস লিটল ফ্ল্যাওয়ার স্কুলে  অভিভাবকদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে উপস্থিত  অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। নাম প্রকাশ না করে একাধিক অভিভাবক জানান, এভাবে হুটহাট  টিসি দেওয়া হলে তো খুবই আতঙ্কের ব্যাপার। ছোট শিশুরা তো একটু দুষ্টুমি করবেই, সেজন্য এভাবে টিসি দেওয়া ঠিক হবে না।

আরও পড়ুন:


ওদের কোথাও পড়ার দরকার নেই: উইলস লিটল ফ্ল্যাওয়ারের অধ্যক্ষ

 

/আরএআর/ এপিএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
তেলের দাম আর কাকে বলে!
কান ডায়েরি-২তেলের দাম আর কাকে বলে!
অনুমোদন না থাকায় সাভারের ৪ হাসপাতাল বন্ধ
অনুমোদন না থাকায় সাভারের ৪ হাসপাতাল বন্ধ
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধের গুজব ছড়ানো হচ্ছে
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বন্ধের গুজব ছড়ানো হচ্ছে