X
শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২০ মাঘ ১৪২৯
মুজিববর্ষ উপলক্ষে আফসান চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বানিয়ে বলার দরকার নেই, সত্যটা বললেই হয়

উদিসা ইসলাম
০৩ জানুয়ারি ২০২০, ১৬:৪৭আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৫৪

আফসান চৌধুরী সাংবাদিক, শিক্ষক ও গবেষক আফসান চৌধুরীর জন্ম ১৯৫৪ সালে ঢাকা শহরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি উন্নয়ন গবেষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি হচ্ছে ‘তাহাদের কথা’ নামে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি, ‘গ্রামের একাত্তর’ আরেকটি গবেষণা। তার সম্পাদিত বই বাংলাদেশ ১৯৭১। হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। তার প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বর্তমানে অনেক কাজের পাশাপাশি গবেষণা করছেন বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনীতি নিয়ে। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আপনি কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধুকে জানতে ও জানাতে নানা উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। তারপরও আপনার গবেষণা অভিজ্ঞতা কী বলে, আমরা এই নেতাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পেরেছি?

আফসান চৌধুরী: মূল্যায়নের নানা ধরন আছে। মূলত মূল্যায়ন করে আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কিন্তু আমাদের রাজনীতির প্রধান শক্তি বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যাদের মূল্যায়ন আমরা জানিও না, করিও না। এই না করার জায়গা থেকে যদি বঙ্গবন্ধুকে দেখি, তাহলে তাঁর রাজনীতি পুরোপুরি বোঝা সম্ভব না। শেখ মুজিবকে বুঝতে হলে তাঁর আত্মজীবনী পড়তে হবে। পড়া দরকার এই কারণে যে, তার রাজনৈতিক ভাবনাগুলো কোন সূত্র থেকে এসেছে, এই বই থেকে সেটা বোঝা যায়।

আমার কাজ ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে। শেখ সাহেব গোপালগঞ্জের তৈরি, অন্য কোনও জায়গার তৈরি নন। তার সঙ্গে ১৯৩৯ সালে সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হকের দেখা হলো। তারও আগের ইতিহাসে আমরা কী দেখতে পাই? বঙ্গবন্ধু একজন প্রতিবাদী প্রান্তিক, যিনি লড়ছেন জমিদারের সঙ্গে। সেই জমিদার কার প্রতিনিধি? সে হচ্ছে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী—যারা তাদের প্রতিনিধি। মনে রাখতে হবে শেখ সাহেব প্রথমে জেলে গিয়েছেন রাজনৈতিক কারণে নয়, মারপিট করার কারণে। সেই ঘটনায় তাকে ছুরি মারার মামলায় ফাঁসানো হয়। কিন্তু শেখ সাহেবই বলেছেন, ‘ওই লোক আমাকে লাঠি দিয়ে আক্রমণ করেছিল। আমি লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছি।’ এই যে অকপটে স্বীকার করার শক্তি এটা কিন্তু একেবারে প্রান্তিক পূর্ববঙ্গের মানুষ, একজন বাঙালের কথা। এটা আমাদের দেশের বাবু ইতিহাসবিদরা, রাজনীতিবিদরা ধরতে পারেন না। ফলে সেই দিকের মূল্যায়নটাও আমরা পাই না, দেখার চোখের দুর্বলতার কারণে।

মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী নামে বঙ্গবন্ধুর একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ৬২ সালে যার মাধ্যমে শেখ সাহেব ভারত গিয়েছিলেন। তিনি (মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ) আমাকে বলছিলেন যে, তাদের দুজনের একটা মিল ছিল যে তারা দুজনে বন্দুক চালাতে পারতেন। যে লোকটা বন্দুক চালাতে পারেন, একটা লোকের কাছ থেকে লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে মাথা ফাটাতে পারেন, জেলে যেতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন, সেই মানুষটি তো সম্পূর্ণ ভিন্ন শক্তি নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। এই ধারাবাহিকতা হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষক বিদ্রোহের ধারাবাহিকতা। কৃষক বিদ্রোহ কিন্তু একক কৃষকরা করেননি, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নানা সময়ে তারা। এই যে মাল্টিক্লাস বিভিন্ন শ্রেণিভিত্তিক আন্দোলনে বাংলাদেশের সফলতা, এতে বেশি লাভ হয়েছেন সোহরাওয়ার্দী। কারণ, তার পক্ষে মাঠে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। রাতের বেলা বস্তি পাহারা দেওয়া সম্ভব না। সেটা শেখ সাহেব করতে পেরেছেন। ফলে বঙ্গবন্ধুকে চেনা বলেন, তাকে মূল্যায়ন বলেন, কলকাতার বাবু রাজনীতিবিদদের ছাচে ফেলে সেটা সম্ভব না।

আফসান চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সেই সময়ের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সুভাষ বোস কিংবা মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক তফাৎটা কোথায়?

আফসান চৌধুরী: শেখ সাহেব ও মওলানা ভাসানী—এরা কেউ বিলেতে লেখাপড়া করেননি। অন্যরা প্রত্যেকে বিলেতে পড়ে এসেছেন। এই যে মৌলিক পার্থক্য—সেটা প্রান্তিক আর কেন্দ্রের পার্থক্য। প্রান্তিক আর কেন্দ্রের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেটা এই রাজনীতির একটা বড় অংশ।

১৯৪৮ সালে যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতাটা পড়া হয়, তাহলে মানুষের আর কোনও কিছু পড়ার দরকার হয় না। কারণ, খুব পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান জন্ম লাভ করেনি। আমার থিসিস হচ্ছে—পাকিস্তান বলে কোনও রাষ্ট্র ছিল না। একটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান আরেকটা ছিল বাংলাদেশ, যেটা আটকে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে।

অনেক সময় প্রশ্ন আসে, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কী ছিল। ভাষা আন্দোলন মধ্যবিত্তরা শহরে মবিলাইজ করেছে। বামপন্থীরা ১৯৫৭ সালে শেষ হয়ে গেছে। এরপরে তো বামপন্থীরা আমাদের রাজনীতিতে নেই। সোহরাওয়ার্দীর পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিও বিলুপ্ত হয়ে গেলো, মওলানা ভাসানী প্রান্তিক হয়ে গেলেন। মূলধারা না থাকলে তো ইতিহাসই তৈরি হয় না। মূলধারা শেখ সাহেবের হাতে ছিল।

সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানপন্থী মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে শেখ সাহেবের যতই ঘনিষ্ঠতা থাকুক রাজনৈতিকভাবে মূলত দুজনে আলাদা। ১৯৬২ সালে যখন শেখ সাহেব দেশ স্বাধীন করার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিটিং করেন, তখন তারা বলেছিল—‘তোমার নেতা (সোহরাওয়ার্দী) তো এসব বিশ্বাস করেন না।’ শেখ সাহেবের জবাব ছিল—‘নেতা নেতার জায়গায় আছেন।’

আর বাকি থাকেন মওলানা ভাসানী—যিনি ইতিহাসের একটি ট্র্যাজিক নাম। উনি যদি কাগমারিতে বামদের সঙ্গে না পড়ে থাকতেন, তাহলে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের কম্বিনেশন আমাদের জন্য আদর্শ একটা জুটি তৈরি করতো। মওলানা ভাসানী একদম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা মানুষ। কিন্তু তা হলো না। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে শেখ মুজিবের যে যোগাযোগ তা আমরা জানি না। ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মোর্চা আমরা ধরতে পারিনি। কারণ, আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের অবস্থান নিয়ে ছিলাম।

মওলানা ভাসানী মেনে নিয়েছিলেন যে, ইতিহাস এখন আর তার হাতে নেই। আমি মনে করি, আমাদের যেটা দেখা দরকার, মওলানা ভাসানী কি স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে নিজের দলকে সরিয়ে নিয়েছিলেন? যাতে সত্তরের নির্বাচনে আর কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী দল না থাকে। মওলানা ভাসানীর এই নির্বাচনে না যাওয়াটা আওয়ামী লীগের বিজয়ের জন্য সুবিধা ছিল। ভাসানীর বিশালতা হচ্ছে উনি ইতিহাসকে মেনে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, ইতিহাস শেখ মুজিবের হাতে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে লক্ষ্য ছিল স্থির। অন্য অনেকে নানা সময়ে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকে সরে এলেও তাঁর সেরকম কোনও উদাহরণ নেই।

আফসান চৌধুরী

আপনার ইতিহাস পাঠ কী বলে, বঙ্গবন্ধু  ছাড়া কেউ রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারতেন? অনেক মত পথ আর নেতা তো ছিল।

আফসান চৌধুরী: এ বিষয়ে খুব মজার একটি তথ্য আছে। মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলতেন, ‘দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একজনকেই ভাবা যায়, তিনি হলেন দ্য টল ম্যান ফ্রম গোপালগঞ্জ।’ আমার কাছে এটা খুব ভালো লাগে। ১৯৪৭ সালে যে রাষ্ট্র জন্মলাভ করেছে, সেই রাষ্ট্রের প্রধান তো শেখ মুজিব—টল ম্যান ফ্রম গোপালগঞ্জ। কোনও ব্যক্তি কোনোদিন ওই পর্যায়ে যেতে পারেননি। একে ফজলুল হক সাঁইত্রিশের নির্বাচনে জিতেছেন। কিন্তু উনি যখন নিজের রাজনীতির স্বার্থে বের হয়ে এসে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত হলেন, কৃষক তো তাকে ক্ষমা করেনি। কৃষক তো পরিষ্কার বুঝতে পারেন—কোনটা তার স্বার্থ রক্ষা করছে, আর কোনটা স্বার্থ রক্ষা করছে না। ফলে সাতচল্লিশে কৃষক তাকে শাস্তি দিয়েছেন।

ছেচল্লিশের নির্বাচনের পরে শেখ সাহেব প্রান্তিকে জাতীয়তাবাদী নেতা। কারণ, যৌথ বাংলা হওয়ার কথা ছিল এবং তার প্রচুর দলিল আছে। ১৯৪৭ থেকে আমাদের কিছুতেই শুরু হতে পারে না। ১৯৫২ সালের আগে সব আন্দোলন হয়ে গেছে। আমি বলবো ছেচল্লিশ একটা ঘটনা, লাহোর রেজ্যুলেশন থেকে আমাদের শুরু। সেই লাহোর রেজ্যুলেশন পরিবর্তন করা হলো দিল্লি রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে। সে সময় বলা হলো, দুইটা স্টেট হবে না। কিন্তু ইতিহাস হিসেবে আমরা তো সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা হচ্ছি কৃষকের সমাজ। কৃষক সমাজ আর ভূমিয়ালদের সমাজ এক না। কিন্তু স্বার্থের প্রয়োজনে বারবার মানুষ এই ভুলগুলো করে এই মোর্চাগুলো করে এসেছে।

আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী অনেকেই পড়েনি। ফলে তার অনুসারী বলে নিজেদের যারা দাবি করেন, তারা তার রাজনৈতিক ভিত্তি বুঝতে পারে না। একটা ঘটনা বলি—শেখ সাহেবের সঙ্গে বিবিসির সামাদ (আতাউস সামাদ) সাহেবের ২৫ মার্চ রাতে দেখা হয়েছে। শেখ মুজিব কিন্তু ২৫ মার্চের রাতে আগুন জ্বলার ঘটনা শুনে প্যানিক করেননি। তার মানে তিনি জানতেন, আন্দাজ করেছিলেন। যখন সামাদ সাহেব বাসায় যান তখন শেখ সাহেব তাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। সামাদ সাহেব বেরিয়ে আসবেন যে মুহূর্তে, সেই সময় তাকে পেছন থেকে ডেকে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘সামাদ, আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডিপেনডেন্স, নাও গো অ্যান্ড প্রিজারভ ইট।’ ফলে স্বাধীনতার ঘোষণা কে করলো, তা নিয়ে আর কীসের বিতর্ক থাকে। এই বিতর্ক হওয়ার কোনও সুযোগ নেই এই কারণে যে, শেখ সাহেব তো সেই কবে থেকেই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনের নেতা। তাহলে আর ঘোষণা দেবে কে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপিকেন্দ্রিক রাজনীতি ইতিহাসের যে কত ক্ষতি করেছে, তা কল্পনা করা যায় না। ইতিহাস চর্চাকে যদি এই বিতর্কগুলো থেকে মুক্ত করা না যায়, তাহলে শেখ সাহেবের ইজ্জত ফিরবে না।

আফসান চৌধুরী

তাহলে আপনি বলছেন কৃষকই বাংলার শক্তি?

আফসান চৌধুরী: আমি মনে করি, আমাদের দেশের যে মানুষ, পূর্ববঙ্গের মানুষ কৃষক শ্রেণির—এটাই হচ্ছে আমাদের পরিচিতি। কৃষক ভোট দেয়। তাহলে কৃষককে বাদ দিয়ে কীভাবে রাজনীতি চিন্তা করবেন? নেতৃত্ব আছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করছে কৃষক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অন্য কিছু দায়ী নয়। সে সময় ক্ষুধা-দারিদ্র্য ছিল। ঢাকায় ভুখা মিছিল হয়েছিল। সেখানে গুলি চালানো হলো। গুলিতে এক লোক ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো। আমার বাবা সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। আমার ব্যাংকার বাবা বলেছেন—‘চারদিকে গোলাগুলি চলছে। একসময় ভুখা মিছিলে গুলি করা হলে একজন নিহত হন। এরপরই শেখ সাহেব বেরিয়ে এসে ওই লাশটাকে তুলে নিলেন।’

বর্তমান রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ভারতঘেঁষা রাজনীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করতে দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ-পূর্ব রাজনৈতিক জীবনে ভারতকে কীভাবে আবিষ্কার করেন?

আফসান চৌধুরী: বাষট্টির পরে শেখ সাহেব যখন ভারত গেলেন, তখন তেমন ইজ্জত পেলেন না—কথাটা বললেই লোকে ভাবে আমি বানিয়ে বানিয়ে কথাগুলো বলছি। মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী আমাকে বলেছেন—‘শেখ সাহেব তখন হতে চলেছেন যে রাষ্ট্রের প্রধান, কিন্তু সেই বিবেচনায় তিনি ইজ্জত পাননি।’ আমি মনে করি, সেটি পরবর্তীতেও তিনি মনে রেখেছিলেন। ভারতের প্রতি তাঁর মনোভাবটা বিরূপ ছিল না, কিন্তু বন্ধুসুলভও ছিল না। তিনি কংগ্রেসকে কোনও সময় ক্ষমা করেছেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। কেন ক্ষমা করেননি? ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বলছে, কংগ্রেস যদি চাপ না দিতো, তাহলে ১৯৪৭ সালেই বাংলাদেশ হতো। কংগ্রেসের চাপে এটা হয়নি। শেখ সাহেব তো বাবু রাজনীতিক না। তার আত্মসম্মানের অভাব ছিল না। তিনি সেটা ভোলেননি।

আফসান চৌধুরী আরেকবার ভারত যাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। ২৬ মার্চের রাতে মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী শেখ সাহেবকে বলেন, ‘আমি ভারতে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করেছি।’ শেখ সাহেব তখন বলেছেন, ‘আমি যদি যাই তাহলে ঢাকার একটা বাড়িও থাকবে না।’  তারপরে বলেছেন, ‘তুমি দেখোনি ভারত আমার সঙ্গে (১৯৬২ সালে) কী রকম ব্যবহার করেছে।’

আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলটা তো হচ্ছে প্রান্তিকতা। আমি ক্ষমতায় নেই, আমার ক্ষমতা চাই, আমার একটা রাষ্ট্র চাই। আমি যেভাবেই হোক সেই রাষ্ট্র গঠন করবো। শেখ সাহেবের রাজনীতি তো সেখানেই।

আবার ফিরতে চাই, আমাদের সামনে এত রকমের ইতিহাস কেন? বঙ্গবন্ধুকে, জাতির যিনি জনক, তাকে সম্মিলিতভাবে স্বীকৃতি না দিতে পারার কারণ কী?

আফসান চৌধুরী: আমার মনে হয় মাস্টারদের দুর্বলতা আছে, গবেষকদের দুর্বলতা আছে এবং সরকার যেভাবে স্তুতির নীতি নিয়ে থাকে বিভিন্ন সময়, তাতে অনেকে মনে করেন যে, সে সেটাই বলবে যেটাতে তার লাভ হবে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বানিয়ে বলার দরকার নেই। তাঁকেসহ সব বিষয় নিয়ে সত্য বললেই হয়। এটা ইতিহাসবিদদের ধর্ম হওয়া উচিত।

বঙ্গবন্ধু একাত্তরের পরে কী করেছেন না করেছেন, সেই হিসাব একজন রাষ্ট্র পরিচালনকারীর হিসাব। কিন্তু ১৯৩৭ থেকে ১৯৭১ সালের জাতির জনকের যে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, সেসব সম্পর্কে সত্যি কথা বললেই হবে, বানাতে হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে সেসব চর্চা কম। যে শ্রেণির এতগুলো চেহারা তৈরি করে এরা কারা? এরা তো সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। শেখ সাহেবের আত্মজীবনীটা পড়লেই বোঝা যায় যে তার সংস্কৃতি কোনটা। শেখ সাহেবকে কি বাঙালি হিসেবে, মুসলমান হিসেবে লজ্জা পেতে হবে?

বঙ্গবন্ধুকে আপনার কোনও জায়গায় জাদুকর মনে হয়েছে?

আফসান চৌধুরী: আমার মনে হয় আওয়ামী লীগপন্থী মানুষ হিসেবে না দেখে, যদি শেখ মুজিবের চর্চা করা হয়—তাহলে দেখা যাবে যে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিকতা, এই ভারতের যত ইতিহাস আছে, সেই ইতিহাসের থেকে সবচেয়ে সবল। আজকে পাকিস্তান যে রাষ্ট্র হয়েছে, সেন্ট্রাল এশিয়ানভুক্ত আফগান মডেলের রাষ্ট্র, ভারত হচ্ছে একটা কলোনিয়াল রাষ্ট্র। কৃষকের রাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশ, এটা হচ্ছে শেখ মুজিবের অর্জন। এই সারা দক্ষিণ এশিয়ায় কোনও নেতা কৃষককে রাষ্ট্র গঠনে অংশগ্রহণ করাতে পারেননি।

সাতই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব বামপন্থী কোনও সংগঠন কি ভেবেছে, আর আমার গ্রাম কি ভেবেছে? সেটা তুলনা করে দেখেন। গ্রাম খুব পরিষ্কারভাবে ধারণা নিয়েছে তুমুল প্রতিরোধের। গ্রামে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, সে সময় এমন একটি জায়গা নেই, যেখানে গ্রামের মানুষগুলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়নি।

যে কৃষককে আপনি ভিত্তি বলছেন, তার এখনকার ভূমিকা কী? কেমন আছে কৃষক সমাজ?

আফসান চৌধুরী: আমি মনে করি, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশের কৃষকরা এখন সবচেয়ে সবল অবস্থায় আছে। এখন আর তাকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রয়োজন নেই। এ দেশে কোনও আন্দোলন হয়নি একক শ্রেণির ভিত্তিতে। মধ্যবিত্ত যদি ভেবে থাকে যে, তার নেতৃত্বে হয়েছে—এটা বাজে কথা। কৃষক আন্দোলন করছেন দুইশ’ বছর ধরে। তাকে শেখাতে হয়নি। নিজের পেটের তাগিদে করেছেন। এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণি এত প্রান্তিক হয়ে গেছে, কারণ সে ভোগের আন্দোলন করছেন। কিন্তু এখনও কৃষক বলেননি—এটা চাই ওটা চাই। আমি দেখেছি, কাজ করতে গিয়ে গ্রাম পাল্টাচ্ছে। গ্রাম আর শহরের কথা শোনে না। এটা হচ্ছে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়। যত কথাই বলা হোক না কেন, গ্রাম এখন আর শহর নিয়ে দুর্ভাবনায় নেই।

বাংলাদেশ এত ডকুমেন্টারি বানায়, গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার ওপর ডকুমেন্টারি বানায় না কেন? আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি আর কোনও ডকুমেন্টারি নাই। আমি গ্রামে কথা বলতে গিয়ে পেয়েছি, একজন বলেছেন—রাজাকারদের সামনে পাইলে আমি জবাই করতাম, কলমা পড়তাম না। কলমা তো মানুষকে জবাই করলে পড়ে, ওরা তো মানুষ না। এই হচ্ছে শক্তি। এই শক্তির সময় লাগে। বাংলাদেশ হতেও সময় লেগেছে। কৃষকের সঙ্গে গাদ্দারি করে কেউ টিকে না। এটা একেবারেই অসম্ভব। রাজনৈতিকভাবে মেজরিটি তার। তাদের শক্তির সঙ্গে তো আর কোনও তুলনা হবে না। ভদ্রলোক ভদ্রলোকের রাজনীতি করে। বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে হলে তার নিজস্ব গণ্ডি দিয়ে বুঝতে হবে।

আফসান চৌধুরী

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখছেন। সেটার বিষয় আমাদের সঙ্গে শেয়ার করবেন কিনা?

আফসান চৌধুরী: আমি যে কথাগুলো বললাম এগুলো নিয়েই কমবেশি আমি লিখছি। শেখ মুজিবকে বুঝতে হলে বাংলাদেশকে বুঝতে হলে ধারাবাহিকতাটা বোঝা দরকার। এর মূল শক্তি কৃষক সমাজ।

যখন ইতিহাস পড়াই আমরা অনেক আন্দোলন বিদ্রোহের কথা বলি। এই সবগুলোই ধারাবাহিকভাবে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কনস্ট্যান্ট ফ্যাক্টর হলো কৃষক। পূর্ববঙ্গের রাজনীতি বলতে যে জিনিসটা ১৯০৫ সালের পরে কিন্তু ওই ভৌগোলিক কাঠামো অনেক বেশি সবল হয়েছিল। আর সে সময়ের বাতাসে শেখ সাহেবের জন্ম, তিনি এসেছেন সেই রাজনীতি থেকে।

পাকিস্তানের রাজনীতি যদি কেউ পড়ে, আমরা তো কোনোদিন তাদের পক্ষে ছিলাম না। মুসলিম লীগ তো কোনও নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেনি। আমরা কোনও নির্বাচনে তাদের ভোট দিইনি। আমি একটা চ্যাপ্টারে লিখেছি—শেখ মুজিব কি কোনোদিন পাকিস্তানি ছিলেন? কোনোদিনই না। পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমরা অনেকভাবেই অনেক কিছু করি। কিন্তু শেখ মুজিব তা-ও করেননি। বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করেছেন অবস্থা ভালো হওয়ার। ভালো হয়নি, বিদ্রোহ হয়েছে। এসব  নিয়েই আমার শেখ ‍সাহেবকে নিয়ে লেখা বই।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

 

/এপিএইচ/এমওএফ/
সর্বশেষ খবর
সুন্দরবনে বেড়েছে বিদেশি পর্যটক
সুন্দরবনে বেড়েছে বিদেশি পর্যটক
সবাই ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চায়, দাবি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
সবাই ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চায়, দাবি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
গরুর আবাসিক হোটেল
গরুর আবাসিক হোটেল
২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না মেসি
২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না মেসি
সর্বাধিক পঠিত
টিকিট কাটতে বলায় সন্তানকে বিমানবন্দরে রেখেই চলে যান দম্পতি!
টিকিট কাটতে বলায় সন্তানকে বিমানবন্দরে রেখেই চলে যান দম্পতি!
পিন নম্বর ছাড়াই সব কার্ডে লেনদেনের সুযোগ
পিন নম্বর ছাড়াই সব কার্ডে লেনদেনের সুযোগ
নির্বাচন অফিসে গিয়ে আপ্যায়ন চাইলেন হিরো আলম, পেলেন মিষ্টি
নির্বাচন অফিসে গিয়ে আপ্যায়ন চাইলেন হিরো আলম, পেলেন মিষ্টি
হিরো আলমের এত ভোট পাওয়া নিয়ে যা বলছেন আ.লীগ-বিএনপির নেতারা
হিরো আলমের এত ভোট পাওয়া নিয়ে যা বলছেন আ.লীগ-বিএনপির নেতারা
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ
সাত পদে ১১৭ জনের সরকারি চাকরির সুযোগ