কিশোর গ্যাং কালচার কেন থামানো যাচ্ছে না

কবির হোসেন
২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০০:০১ আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০০:০১

গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু-কিশোররা সংগঠিত হয়ে নানারকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গ্যাংয়ে-গ্যাংয়ে দ্বন্দ্ব, অন্তঃকোন্দল, চাঁদাবাজি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও মাদক সিন্ডিকেটেও সম্পৃক্ততা মিলছে তাদের। নানাবিধ হত্যাকাণ্ড, সংঘাত ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে ভবিষ্যৎ জীবন নষ্ট করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরুতে রাজধানীকেন্দ্রিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’। শুধু ২০২৩ সালেই অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ৩৪৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। তবে এসব অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না গ্যাং কালচার।

চলতি মাসের ৯ জানুয়ারি বিকালে রাজধানীর হাতিরঝিলের মধুবাগ এলাকায় ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে আশিক মিয়া নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাত আহত করে আরেক দল কিশোর। পরে আহত আশিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৫ জানুয়ারি সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। এলাকায় ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জের ধরে একদল কিশোর এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে নিহত আশিক মিয়ার পরিবারের অভিযোগ।

শুধু এ ঘটনাই না ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হুট করে কিশোরদের এক গ্রুপের সঙ্গে আরেক গ্রুপের এমন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে শোনা যায় প্রায়শই। তবে এসব কিশোর গ্যাং কালচার কেন থামানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অপরাধ বিজ্ঞানীর বলছে, পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়; কোনও জায়গা থেকেই সুবিধাবঞ্চিত, ঝরেপড়া এসব শিশু-কিশোরদের নিয়ে তেমন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং কিছু ব্যক্তি, ব্যবসায়ী তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তাদের ব্যবহার করে যাচ্ছে। আর সে কারণেই এখনও কিশোর গ্যাংয়ের নামে তারা বিভিন্ন অপকর্মে জড়াচ্ছে।

র‍্যাব বলছে, বাংলাদেশের শিশু-কিশোররা গ্যাং কালচার রপ্ত করে কয়েক দশক আগে। এর শুরুতে এমন না থাকলেও ধীরে ধীরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সন্ত্রাসী ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে।

সংস্থাটির ভাষ্যমতে, শিশু-কিশোরদের মাঝে ক্ষমতা বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক গ্রুপের সঙ্গে অন্য গ্রুপের মারামারি করা বহুল আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গ্যাং সদস্যরা এলাকায় নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করার জন্য উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালায়, পথচারীদের উত্যক্ত করে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়ে মারামারি, এমনকি খুনোখুনি পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলে।

এছাড়াও তারা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য একই এলাকায় অন্যান্য গ্রুপের সঙ্গে প্রায়শই কোন্দলে লিপ্ত হয়। এই আধিপত্যের বিষয়টিকে তারা তাদের ক্ষমতা হিসেবে ভাবে এবং কোনও ঘটনায় কেউ প্রতিবাদ করলেও ক্ষমতা জাহির করতে মারামারি করাসহ অনেক সময় খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

এ প্রসঙ্গে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘২০১৭ সালে উত্তরায় স্কুল ছাত্র আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আলোচনায় আসে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মূলহোতাসহ বেশ কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরবর্তী সময়ে উত্তরা, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় স্কুলছাত্র শুভসহ আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কিশোর গ্যাং নামক অপসংস্কৃতি রোধকল্পে র‌্যাব এসব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামিকে গ্রেফতার করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এদের মধ্যে মাত্র ৪০ জনকে; যার ৩০ জনকে অর্থদণ্ড ও ১০ জনকে মুচলেকা দিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে র‌্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের ৩৪৯ জন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং অপরাধীদের বিরুদ্ধে র‌্যাব ফোর্সেসের গোয়েন্দা নজরদারি ও জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়াও কিশোর গ্যাং অপরাধ প্রতিরোধের জন্য র‌্যাব ফোর্সেস ইতিপূর্বে কিশোর গ্যাং বিরোধী লিফলেট বিতরণ, বিলবোর্ড, স্টিকার স্থাপন, টিভিসি প্রচারসহ বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে।

একই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পারিবারিক কিংবা সামাজিক অথবা রাষ্ট্রীয় কোন জায়গা থেকেও সুবিধাবঞ্চিত, ঝরে পড়া এসব কিশোরদের নিয়ে, তাদের উন্নয়নের কথা ভেবে সেভাবে চিন্তা করা হয়নি। যদি একটি পরিবারের কথাই আগে বলি। একটি পরিবারে বাবা-মা কেবল তার নিজের সন্তানকে নিয়ে ভাবেন। সমাজের আরেকটি কিশোর কি করলো না করলো, এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। দ্বিতীয়ত যারা এসব কিশোর গ্যাং কালচার প্রতিরোধ করবে, তাদেরও দায়িত্ব, কর্তব্য রয়েছে। এলাকার জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী যারা রয়েছেন; যাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অনেক সময় উল্টো চিত্র দেখা যায়। নিজেদের স্বার্থে এসব কিশোরদের ব্যবহার করে তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবেও এসব সুবিধাবঞ্চিত ঝরেপড়া কিশোরদের নিয়ে সেভাবে এখনও চিন্তা করা হয়নি। কিশোর গ্যাং দলের মধ্যে কোনও একটি ঘটনার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়। অভিযান চালায়, গ্রেফতার করে। পরে আবার থেমে যায়। এসব কিশোর গ্যাংদের বিরুদ্ধে সবসময় অভিযান ও নজরদারি রাখার কথা তিনি বলেন।

/আরআইজে/ইউএস/
সম্পর্কিত
রাজধানীতে ছুটির হাওয়া, সড়ক নেই চিরচেনা ব্যস্ততা
শাহজালালে স্টোর বিল্ডিংয়ে আগুন, নেভালেন কর্মীরা
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮৬, মামলা ৪৯
সর্বশেষ খবর
রাজধানীতে ছুটির হাওয়া, সড়ক নেই চিরচেনা ব্যস্ততা
রাজধানীতে ছুটির হাওয়া, সড়ক নেই চিরচেনা ব্যস্ততা
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের অবস্থান
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের অবস্থান
খুলনায় যুবদল ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ
খুলনায় যুবদল ও ছাত্রদলের মধ্যে সংঘর্ষ
শিলাবৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছিল হাজার হাজার পোকার লার্ভা
শিলাবৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছিল হাজার হাজার পোকার লার্ভা
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত