X
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ধর্ষণকাণ্ডের সেই মামুনের ইয়াবা বিক্রির ‘হটজোন’ জাবি ক্যাম্পাস

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৮:১৩আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৯:১৩

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মূল পরিকল্পনাকারী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুন বহিরাগত হলেও দীর্ঘদিন ধরে সে ক্যাম্পাসে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে ক্যাম্পাসে বিক্রি করতো। জাবি ক্যাম্পাস হচ্ছে তার মাদক বিক্রির ‘হটজোন’, বিশেষ করে বটতলা।

মামুন গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছে  র‌্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ  ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।’

র‌্যাবের মুখপাত্র জানান,  জাবির হলরুমে স্বামীকে আটকে রেখে তার স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মূল পরিকল্পনাকারী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুনকে বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে এবং এ ঘটনায় তার অন্যতম সহায়তাকারী মো. মুরাদকে নওগাঁ থেকে গ্রেফতার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক মুরাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার আমন্ত গ্রামে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানতে পেরেছে র‌্যাব।

মামুনের দেওয়া তথ্যের বরাতে র‌্যাব বলছে, ‘মাদক কারবারি মামুন ২০১৭ সাল থেকে জাবি ক্যাম্পাসের প্রভাবশালী সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় ক্যাম্পাসে মাদক কারবার করতো। হরহামেশাই ক্যাম্পাসে নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় জড়িত সে।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘৩ ফেব্রুয়ারি রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ৪ জনকে আটক করে। ওই ঘটনায় ভিকটিমের স্বামী বাদী হয়ে ঢাকার আশুলিয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন (মামলা নম্বর-১০)।’

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার ধর্ষণ মামলার আসামি মামুন ও মোস্তাফিজ তিনি জানান, চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় র‌্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার রাতে র‌্যাব-৪, র‌্যাব-২ এবং র‌্যাব-৫ এর যৌথ অভিযানে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে ধর্ষণ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুন (৪৪) ও নওগাঁ সদর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তার সহযোগী মো. মুরাদ (২২)- কে গ্রেফতার করা হয়।

কমান্ডার মঈন বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, মামুন প্রায় ৬/৭ বছর যাবত মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রতি মাসে কয়েক দফায় প্রায় ৭/৮ হাজার ইয়াবা এনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকাসহ মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীকে সরবরাহ করতো।’

র‌্যাবের মুখপাত্র জানান, এছাড়া মামুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদক বিক্রির সুবাদে মামলার ১ নম্বর আসামি মোস্তাফিজুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র ছাত্রদের সঙ্গে তার সখ্যতা তৈরি হয়। মাঝে মাঝে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে মাদকসহ রাত যাপন করতো সে। তখন ছাত্রদের সঙ্গে সে মাদক সেবনও করতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছে।

র‌্যাব জানায়, একই এলাকায় বসবাসের কারণে  ৩/৪ বছর আগে মামুনের সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর  পরিচয় হয়। পরিচয়ের সুবাদে মামুন মাঝে মধ্যে ওই নারীর স্বামীর মাধ্যমেও বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশেপাশের এলাকায় মাদক সরবরাহ করতো বলে দাবি করে মামুন।

কমান্ডার মঈন বলেন, ‘বেশি দিন একস্থানে থাকতো না মামুন। মাদক কারবারের কারণে কিছুদিন আগে তার থাকার জায়গার সমস্যা হয়। তখন সে ভুক্তভোগীর স্বামীকে জানায় যে, কিছুদিনের জন্য তাদের বাসায় থাকবে সে। গ্রেফতারকৃত মামুন ভুক্তভোগীর ভাড়া  বাসায় সাবলেট হিসেবে প্রায় ৩/৪ মাস অবস্থান করায় তাদের মধ্যে সখ্যতা তৈরি হয়।’

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানায়, ঘটনার আগে মামলার ১ নম্বর আসামি মোস্তাফিজুর রহমান অনৈতিক কাজের ইচ্ছা পোষণ করে মামুনের কাছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, মামুন গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকালে ভুক্তভোগীর স্বামীকে ফোন দিয়ে জানায়—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোস্তাফিজুর নামে এক বড় ভাই তার জন্য হলে থাকার ব্যবস্থা করেছে। এখন থেকে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকবে। তাই মোস্তাফিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে ওই নারীর স্বামীকে জাবি ক্যাম্পাসে আসতে বলে মামুন।

মামুনের কথা মতো ওই দিন সন্ধ্যার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের ৩১৭ নম্বর কক্ষে দেখা করে ওই নারীর স্বামী। সেখানে তাকে মোস্তাফিজ, মুরাদ, সাব্বির, সাগর সিদ্দিক ও হাসানুজ্জামানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় মামুন।

অভিযুক্ত মামুন কৌশলে ভুক্তভোগীর স্বামীকে তাদের বাসায় থাকাকালীন তার ব্যবহৃত কাপড়চোপড় হলে নিয়ে আসার জন্য তার স্ত্রীকে (ভিকটিম) ফোন দিতে বলে। স্বামীর ফোন পেয়ে একটি ব্যাগে করে মামুনের ব্যবহৃত কাপড় নিয়ে রাত ৯টার দিকে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে উপস্থিত হন ওই নারী।

র‌্যাব জানায়, ওই সময় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, মামুন ও মোস্তাফিজ কৌশলে ভিকটিমের স্বামীসহ মামুনের ব্যবহৃত কাপড়ের ব্যাগ হলের ৩১৭ নম্বর রুমে নিয়ে যেতে বলে এ মামলার আসামি মুরাদকে। মুরাদ ভুক্তভোগীর স্বামীকে নিয়ে হলের রুমে অবস্থান করে।

এ সময় মামুন ও মোস্তাফিজ ভিকটিমকে কৌশলে হলের পাশে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে পর্যায়ক্রমে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই নারীকে বাসায় চলে যেতে বলে। মামুন ও মোস্তাফিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের রুমে গিয়ে নারীর স্বামীকেও চলে যেতে বলে।

পরে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা জানতে পেরে ওই নারীর স্বামী থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করেন। ঘটনা জানাজানি হলে মামুন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় আত্মগোপন করে। মুরাদ ধর্ষণের বিষয়টি ঘটনার সময় না জানলেও থানায় মামলা হওয়ার পর সেও পালিয়ে নওগাঁ গিয়ে আত্মগোপন করে। পরে মোস্তাফিজসহ সে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামিদের দেওয়া তথ্যের বরাতে কমান্ডার মঈন বলেন,  ‘মামুন প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকার জুরাইনে গার্মেন্টসকর্মী হিসেবে চাকরি শুরু করে। পরে আশুলিয়া এলাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরির পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মাদকসেবী শিক্ষার্থীকে সে মাদক সরবরাহ করতো। তাদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি হলে ২০১৭ সালে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়।

র‌্যাব জানায়, তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় মাদক সংক্রান্তে ৮টি মামলা রয়েছে। এর আগে এসব মামলায় সে একাধিকবার কারাভোগ করেছে।

আসামি মুরাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে থাকতো। তার বিরুদ্ধে নওগাঁ থানায় মারামারির অভিযোগে একটি জিডি রয়েছে বলে জানা যায়। ৩১৭ নম্বর কক্ষটি তার নামে বরাদ্দ হলেও সে থাকতো অন্য কক্ষে।

এক প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার মঈন বলেন, ‘‘মামুন নিয়মিত কক্সবাজার থেকে মাদক আনতো। তার মাদক কারবারের ‘হটজোন’ ছিল ওই বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বটতলা এলাকা। সে মাদক বিক্রি ছাড়াও প্রায়ই ক্যাম্পাসে নারীদের হেনস্তা, নিপীড়ন, শ্লীলতাহানিসহ ধর্ষণের  ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তবে ভুক্তভোগীসহ অনেক নারী ভয়ভীতির কারণে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।

/কেএইচ/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
বাড্ডায় বোমা তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব
রাজধানীতে মাদকসহ গ্রেফতার ৩৮
রাজধানীতে চাঁদা আদায়ের সময় গ্রেফতার ১৩  
সর্বশেষ খবর
একটি ম্যাচ, তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দুই লক্ষ্য
একটি ম্যাচ, তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দুই লক্ষ্য
১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মিষ্টি জান্নাতকে আইনি নোটিশ তমা মির্জার
১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মিষ্টি জান্নাতকে আইনি নোটিশ তমা মির্জার
আফসানা মিমির বাবা মারা গেছেন
আফসানা মিমির বাবা মারা গেছেন
শ্রম আইন লঙ্ঘন: ৪ জুলাই পর্যন্ত জামিনে থাকবেন ড. ইউনূস
শ্রম আইন লঙ্ঘন: ৪ জুলাই পর্যন্ত জামিনে থাকবেন ড. ইউনূস
সর্বাধিক পঠিত
যেভাবে এমপি আনোয়ারুল আজীমকে হত্যা করা হয়
যেভাবে এমপি আনোয়ারুল আজীমকে হত্যা করা হয়
‘খুন’ কিন্তু ‘লাশ নেই’: যা জানা গেলো এমপি আজীমকে নিয়ে
‘খুন’ কিন্তু ‘লাশ নেই’: যা জানা গেলো এমপি আজীমকে নিয়ে
কে এই এমপি আনার?
কে এই এমপি আনার?
এমপি আনোয়ারুল আজীম হত্যা নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে যা জানা গেলো
এমপি আনোয়ারুল আজীম হত্যা নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে যা জানা গেলো
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অস্ত্র’ দুর্নীতি
সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাযুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অস্ত্র’ দুর্নীতি