X
বুধবার, ২২ মে ২০২৪
৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

এক জনপদজুড়ে শুধুই আক্ষেপের গল্প

আতিক হাসান শুভ
৩০ মার্চ ২০২৪, ২০:০০আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ১৫:৫৮

‘সেদিন সারি সারি লাশ চোখের সামনে ভেসে ছিল। দরজার সামনে, বাগানে কত লাশ যে পড়ে থাকতে দেখেছি তার হিসেব নেই। জায়গার অভাবে কতো লাশ একসঙ্গে গণকবর দিয়ে দিছে। কাপড়ের অভাবে অনেক লাশ কোনোরকম পলিথিনে মুড়িয়ে দাফন করছে। ভাবছিলাম সেবার হয়তো মরেই যাবো। কোলে একটা দুধের বাচ্চা ছিল, আরেকটার বয়স তখন চার বছর। এই দুই বাচ্চা আর তার বাবারে নিয়ে কোনও রকমে বেঁচে ছিলাম। টানা চার দিন না খেয়ে ছিলাম। ঝড় যখন থামছে তখন একটু স্বস্তি ফিরে আসছে।’

এভাবেই ২০০৭ সালের ১১ নভেম্বর ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াবহতার বর্ণনা করছিলেন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা সফুরা বেগম (৪২)।

সফুরা বলেন, ‘সিডরের এক সপ্তাহ পরেও বেড়িবাঁধের কাছে, গাছের গোড়া আর জঙ্গল থেকে লাশ, লাশের অংশবিশেষ উদ্ধার হয়। ছয় দিন পর আমরা খাবার পাই। এক সিডরে আমাদের সব ধ্বংস করে দিয়েছে। তখন থেকে অভাব, অনটন, সংকট লেগেই আছে। দুঃখের আর শেষ হয় না। হালকা ঝড়ে হলেই ঘর বাড়ি উড়ে যায়। না খেয়ে থাকতে হয়।’

সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চল গাবুরা জনপদ জুড়ে এমন দুঃখের অন্ত নেই। প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার তাগিদে ও জীবিকা নির্বাহের জন্য যুদ্ধ করতে হয় এখানকার হতদরিদ্র মানুষদের। কোনোরকমে খড়কুটো আর পাতার ছাউনি, আর পাশে বেড়া দিয়ে এখানকার বেশিরভাগ মানুষের বসবাস। খানিকটা দূরে চোখ বুলালে টিনের চালের দেখা মেলে, তবে পাকা ঘর খুবই কম। কারণ এখানকার বাসিন্দাদের মনে সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করে। এই বুঝি আবার ঝড় এলো, আবার সব কেড়ে নিলো! কখন কোন দুর্যোগ এসে ঘরবাড়িসহ সবকিছু কেড়ে নেয় এই ভাবনায় ডুবে থাকেন গাবুরা জনপদের মানুষ।

এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বললে শোনা যায় একের পর এক শুধুই দুঃখের গল্প। দিন এনে দিন খায় এখানকার বেশিরভাগ মানুষ। বলা চলে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। নদী থেকে মাছ ও কাঁকড়া, সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করে এবং ইটভাটায় কাজ করে এখানকার বেশিরভাগ মানুষের সংসারের চাকা ঘুরে।

গাবুরার বাসিন্দা মহসিন গাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাছ, কাঁকড়া আর মধু সংগ্রহ করেই তার সংসার চলে। অভাব-অনটনের শেষ নেই। তারওপর জোয়ার এলেই বাঁধ ভেঙে যায়। পুকুরে নদীর পানি চলে আসে। খাওয়ার পানি থাকে না। বেশিরভাগ সময় কাদামাটিতে হাঁটতে হয়। স্কুলে বাচ্চাদের বসার জায়গা নাই। চিকিৎসার জন্য নদী পার হয়ে উপজেলায় যেতে হয়। দুঃখের কি আর শেষ আছে!’

প্রতিদিন জোয়ারে প্লাবিত হয় গাবুরা

প্রয়োজন টেকসই বেড়িবাঁধ

শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার সবচেয়ে বড় সমস্যা টেকসই বেড়িবাঁধ। গাবুরার দক্ষিণ-পশ্চিমে খেলপেটুয়া নদী, তার উত্তর-দক্ষিণে কপোতাক্ষ নদ। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী বাঁধ সংস্কারের দাবি জানালেও এতো দিন এর তোয়াক্কা করেনি কেউ। এখন বাঁধ নির্মাণ শুরু হলেও ধীরগতিতে চলছে এর নির্মাণকাজ। গাবুরার বাসিন্দারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার না হলে আবার কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে সাতক্ষীরার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিদিন জোয়ারে প্লাবিত হয় গাবুরা। স্থানীয়দের দেওয়া রিংবাঁধে কোনোরকম টিকে আছে এ ইউনিয়ন। বড় কোনও ঝড় এলে আবার বাঁধ ধসে পড়ে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করবে। গেলো আম্পানে গাবুরার কপোতাক্ষ নদের ২৭ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ২১ কিলোমিটারি ধসে যায়। সরকারিভাবে বাঁধ সংস্কারের কাজ চললেও তা খুবই ধীরগতিতে চলছে। ফলে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কোনও রকমের দেওয়া রিংবাঁধ যেকোনও মুহূর্তে ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গাবুরা ইউনিয়নের চারপাশে বেড়িবাঁধ দেওয়ার জন্য গত বছর সরকারি উদ্যোগে যে প্রকল্প চালু হয়েছে তার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান স্থানীয়রা। গাবুরার বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গাবুরা টিকে আছে আমাদের তৈরি করা বাঁধের ওপর। তবে এটা খুবই দুর্বল। কয়দিন পরপরই বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে যায়। গত বছর সরকারিভাবে বাঁধ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার কাজ চলছে। তবে এই কাজটা দ্রুত শেষ করলে আমাদের জীবন যাপনে বেশ সুবিধা হবে। কারণ আমরা রাতে বাঁধ দেখে ঘুমাতে যাই, সকালে উঠে দেখি বাঁধ ভেঙে ঘরের মধ্যে পানি চলে এসেছে। গাবুরাবাসীর একটাই চাওয়া, দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করা।

সুপেয় পানির তীব্র সংকট, অকার্যকর সরকারি পিএসএফ

গাবুরার চারপাশে যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। তবে দুঃখের বিষয় এই পানি লবণাক্ত। এখানে খাবার পানির সংকট। জনপদজুড়ে খাবার পানির হাহাকার। এখানকার মানুষ পুকুরের পানি খেতে অভ্যস্ত। তবে বেড়িবাঁধ ভেঙে নদীর পানি পুকুরে ঢুকে সবচেয়ে বড় বিপত্তি বাঁধায়। খাওয়ার জন্য এক দেড় কিলোমিটার দূর থেকে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয় প্রতিদিন।

গাবুরার বাসিন্দা জ্যোৎস্না বেগম বলেন, এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রতিদিন রান্না-বান্না ও খাবারের জন্য পানি সংগ্রহ করি। মাঝেমধ্যে যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি তখন আবার লবণাক্ত পানি খেতে হয়। তাতে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ি। অসুস্থ হলে আশেপাশে চিকিৎসার ভালো কোনও জায়গা নেই। নদী পার হয়ে যেতে হয় সদর হাসপাতালে।

খাবার পানির জন্য এখানে অনেকেই বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে রাখেন। এর জন্য সরকারি ভাবে তিন হাজার লিটারের পানির ট্যাংক দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি এই সুবিধা পেতেও পোহাতে হয় ভোগান্তির। টাকা ছাড়া মেলে না এই সুবিধা, অভিযোগ এখানকার বাসিন্দাদের। এবিষয়ে জোৎস্না বেগম বলেন, সরকারিভাবে সবার ঘরের জন্য তিন হাজার লিটারের পানির ট্যাংক দিয়েছে। এটা আমরা পাইনি। কারণ তিন হাজার লিটারের জন্য ৩ হাজার টাকা বোর্ড অফিসে দিতে হয় বা মেম্বার ঘুষ নেয়। টাকা ছাড়া এই সুবিধা পাওয়া যায় না। যারা মেম্বারের কাছের লোক তারা সবাই এই সুবিধা পেয়েছে।

গাবুরার বাসিন্দাদের সুপেয় পানি পাওয়ার সুবিধার্থে এখানে বেশ কয়েকটি সরকারি পিএসএফ প্রকল্প রয়েছে। তবে অধিকাংশ পিএসএফ প্রকল্প অকার্যকর। ৬৮ নম্বর খলিশাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে রয়েছে একটি পিএসএফ প্রকল্প। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নষ্ট হয়ে উপরে আবর্জনার স্তূপ পড়ে আছে। স্কুলের পাশের একজন দোকানদার জানান, গত তিন মাস ধরে এটা নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এর দেখভাল করার জন্য কেউ নেই। এখান থেকে আগে যারা পানি সংগ্রহ করতো এখন তারা পাশের পুকুর থেকে পানি নিয়ে যায়। স্থানীয় এক দোকানদার সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের পানির কষ্টের শেষ নেই। সরকারি যে প্রকল্প গুলো আছে সেগুলো থেকে যদি ঠিকমতো পানি পেতাম তাহলে আর এই সমস্যা হতে হতো না। তাছাড়া সরকারিভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করার জন্য যে ট্যাংক দিয়েছে তার সঠিক বন্টন হয়নি।

অসুস্থ হলে নদী পার হয়ে সদর হাসপাতালে যেতে হয়

মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের দাবি

স্থানীয়রা জানান, বিরূপ আবহাওয়ার ফলে গাবুরার বাসিন্দাদের বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই লেগেই থাকে। সবচেয়ে বেশি পানিবাহিত ও চর্ম রোগ। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের বেশ সমস্যা পোহাতে হয়। তাছাড়া ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস এগুলো গাবুরার বাসিন্দাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। গাবুরার বাসিন্দা ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী রিনা আক্তার বলেন, একজন মানুষ অসুস্থ হলে সে যে ন্যূনতম সেবাটুকু পাবে এই সুযোগ সুবিধা এখানে নেই। একটা ক্লিনিক আছে সেটার অবস্থা ভালো না। কোনও ডাক্তার নেই। আশেপাশে কেউ অসুস্থ হলে বা আমরা যদি অসুস্থ হই, তাহলে নদী পার হয়ে সদর হাসপাতালে যাই।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, আমরা যেহেতু বাংলাদেশের নাগরিক, একজন মানুষ হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভাবের খাদ্য বস্ত্র থাকলেও বাকি তিনটির জন্য আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আমরা একটা নিরাপদ বাসস্থান চাই, চিকিৎসা সেবা চাই। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ চাই। স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষ সংকট, বেঞ্চ পর্যন্ত নেই। অনেকের ফ্লোরে ক্লাস করতে হয়।

ঘুরে দেখা যায়, গাবুরা গোপাল লক্ষী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৬৮ নম্বর খলিশাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই। বেঞ্চের অভাবে ফ্লোরে পাঠদান হচ্ছে।

৬৮ নম্বর খলিশাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ডালিয়া আক্তার উর্মি বলেন, এখানে পর্যাপ্ত রুম নাই। যে কয়টা রুম আছে সেগুলোতে বসার বেঞ্চ নেই। ফ্লোরে বসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করে। আমাদের বসার জায়গাও নাই। স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ খাবারের পানি নেই। এ বিষয়গুলো অনেক আগেই উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে আমরা জানিয়েছি। তিনি এর সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু আদৌ কোন ফল আসেনি। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পড়ানোর জায়গা না দিতে পেরে নিজের কাছেই আফসোস লাগে। আমার প্রত্যাশা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন অন্তত শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বসে ক্লাস করতে পারে সেই সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হোক।

এই শিক্ষক আরও বলেন, এই এলাকার মাত্র ২কিলোমিটার পাকা রাস্তা আছে। ৭০ কিলোমিটারের মতো কাঁচা রাস্তা। বাঁধ ভেঙে যখন পানি চলে আসে তখন পুরো এলাকা কাঁদা কাঁদা হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা তখন স্কুলে না আসার নানা বাহানা দেয়। আমাদের নিজেদেরও স্কুল আসতে কষ্ট হয়। এত এত সমস্যার মাঝে পাকা রাস্তা আসলে একটু বিলাসিতা। তবুও সমস্যার কথা যেহেতু এসেছে তাই বলবো, এই জনপদের বাসিন্দাদের স্বপ্ন পাকা রাস্তায় চলাচল করা।

ঝড়-ঝাপটায় জীর্ণ দশার এরকম ঘরই বেশি উপকূলজুড়ে, বাসিন্দাদেরও সামর্থ নেই দুর্যোগসহিষ্ণু টেকসই ঘর করার

বাল্যবিয়ের ব্যাধি

নানা সংকটে মাঝে গাবুরায় বাল্যবিয়েও যেন একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বলছেন স্থানীয়রা। গাবুরার ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহানুর আলম বলেন, আমার দুই মেয়ে। এখনও ছোট তারা। আমার ইচ্ছা আছে তাদের পড়াশুনা করানো। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সেটা বোধহয় পেরে ওঠা সম্ভব হবে না। কারণ এই এলাকায় ১২/১৩ বছর না হতেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। আমার পাশের বাড়ির লেলিন মিয়ার মেয়েদেরও এই বয়সে বিয়ে দিয়ে দিছে। আমি আমার মেয়েদের কেন বিয়ে দিচ্ছি না এটা নিয়ে নানান কানাঘুষা চলতেছে।

গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা মাস্টার আব্দুর রহিম বলেন, বাল্যবিয়ে শুধু গাবুরা না, পুরো শ্যামনগরের ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এই উপজেলা জুড়ে বাল্যবিবাহের প্রচলন বিশেষ করে গাবুরা ইউনিয়নে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমরা সবসময়ই সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করি। আমরা যখন মেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করি তখন তারা চুপ করে থাকে। এটা নিয়ে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ করা উচিত। এখানে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও বেশ স্বাভাবিক। সবার ধারণা আল্লাহ নিয়ে গেছে। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণের ফলে যে এই সমস্যা হচ্ছে তা মানতে নারাজ।

জীবিকা আহরণেও প্রতিকূলতা
গাবুরার দক্ষিণে সুন্দরবন পৃর্বে কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন উত্তর ও পশ্চিমে খোলপেটুয়া নদী। এর আয়তন-৩৩র্বগ কিলামিটার। এখানে গ্রাম আছে ১৫টি। এই জনপদে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ সারা বছর মাছ, কাঁকড়া এসব ধরে এবং সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করে নিজেদের জীবিকা চালান। তবে সুন্দরবনে যেতে ফরেস্ট অফিসার অতিরিক্ত টাকা দেওয়াসহ নানা খায়েস মেটাতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন গাবুরার স্থানীয় বাসিন্দারা।

মহসীন গাজী বলেন, সুন্দরবনে যেতে ছয় দিনের পারমিটের জন্য দুজনের ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা করে দিতে হয়। সুন্দরবন থেকে ঢুকতে আর বের হতে আরও ১ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। অথচ সরকারের হিসাব মতে দুই জনের সম্ভবত ৭০ বা ৭৫ টাকার মতো। সবকিছুর অনুমতি থাকলেও টাকা পয়সা নিয়ে যদি ঝামেলা হয় তাদের যদি না পোষায় তাহলে আবার জেল জরিমানা করে। এই ভয়ে সবাই চুপচাপ থাকে। সুন্দরবন যারা যায় তাদের বেশিরভাগই কমবেশ জেলখাটা লোক। কেউ তিন দিন কেউ এক সপ্তাহ কেউ আবার তিন মাসও জেল খাটছে। এর একটাই কারণ ফরেস্ট অফিসারকে আর মাঝপথে ঠিকমতো টাকা না দিলে।

সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে স্থাপন করা হয়েছিল পিএসএফ, যা এখন অকেজো

রফিকুল কবরি নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমাদের সুন্দরবনে যেতে যারা অনুমতি দেয় তাদের খায়েশ পূরণ করতে হয়। এই ধরেন তাদের মধু দিতে হয়, বড় মাছ ধরলে সেই মাছ দিতে হয়। আর অতিরিক্ত টাকা তো দেওয়া লাগেই। কথার গড়মিল হলে জেল জরিমানার শিকার হতে হয়। আমি একবার তিন দিনের জন্য জেল খাটছি। আমার মতো এমন অসংখ্য মানুষ আছে যাদের অনর্থক জেল জরিমানার শিকার হতে হয়েছে। মাছ ধরে যা আয় করি তা দিয়েই আমাদের কোনোরকম সংসার চালাতে হয়। আর মধু সেতো সিজনের সংগ্রহ করি। আমাদের স্বল্প আয় হয়। এর মধ্যে যখন অন্য কেউ ভাগ বসায় তখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজিবুল আলম রাতুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে যেসব পিএসএফ প্রকল্প আছে, তার অধিকাংশ বেসরকারি বিভিন্ন এনজিওর। সরকারি পিএসসি প্রকল্প আছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে থাকলেও সেটা সরাসরি জেলা জনস্বার্থ অধিদফতর দেখে। তাদের মাধ্যমেই সরকারি পিএসসি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হতে পারে। সরকারি কোনও কিছু যদি অকার্যকর হয়, তাহলে সেটা যোগাযোগ করে সমাধান করার চেষ্টা করবো।

বাল্যবিবাহের বিষয়ে ইউএনও বলেন, বাল্যবিবাহ সারা দেশজুড়েই আছে। শ্যামনগরে বাল্যবিবাহ রোধে আমরা সামাজিকভাবে বিভিন্ন সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই ব্যবস্থা নিই। আমি এখানে যোগ দেওয়ার কিছু সময়ের মধ্যে তিন-চারটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছি। যারা বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। এখানে বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠন বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছে। আমরা তাদের সঙ্গে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

গাবুরা ইউনিয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এবং বনে চাঁদাবাজির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন ইউএনও।

শ্যামনগরের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ (তেজারত) ছুটিতে থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক কর্মকর্তা জানান, শ্রেণিকক্ষ সংকট, বেঞ্চ সংকট নিয়ে এমন কিছু দরখাস্ত আমাদের কাছে এসেছে। আমরা সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এসব সংকট নিরসনে ব্যবস্থা নেবো।

সাতক্ষীরা বন বিভাগের কর্মকর্তা জি এম মারুফ বিল্লাহ বলেন, সুন্দরবন সংক্রান্ত চাঁদাবাজি বা অনিয়মের বিষয় সুন্দরবন বন বিভাগ দেখবে। আমার জেলাভিত্তিক দায়িত্ব। সুন্দরবনের জন্য আলাদা বন বিভাগ আছে। তবে আমাদের কাছে যদি কেউ সহযোগিতা চায়, তাহলে আমরা সেটা অঞ্চলভেদে সুন্দরবন বন বিভাগকে হস্তান্তর করতে পারি।

/এফএস/এনএআর/
সম্পর্কিত
কোরবানির পশুর বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণে মন্ত্রণালয়ের আহ্বান
বিলুপ্তপ্রায় গন্ধগোকুল আহত অবস্থায় উদ্ধার
বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা
সর্বশেষ খবর
বগুড়ায় হিমাগার থেকে আবারও দুই লক্ষাধিক ডিম উদ্ধার
বগুড়ায় হিমাগার থেকে আবারও দুই লক্ষাধিক ডিম উদ্ধার
তিনবারের চেয়ারম্যানকে হারিয়ে এমপির ভাইয়ের চমক
তিনবারের চেয়ারম্যানকে হারিয়ে এমপির ভাইয়ের চমক
নানা আয়োজনে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত
নানা আয়োজনে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদযাপিত
নিপুণের ‘শাস্তি চেয়ে’ এফডিসিতে মিছিল
নিপুণের ‘শাস্তি চেয়ে’ এফডিসিতে মিছিল
সর্বাধিক পঠিত
বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডার সংস্কারে নতুন আদেশ
বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডার সংস্কারে নতুন আদেশ
প্রথমবারেই তরমুজ চাষে চমক
প্রথমবারেই তরমুজ চাষে চমক
রাইসির মৃত্যুতে উল্টে গেছে পাশার দান, আলোচনায় খামেনির ছেলে
রাইসির মৃত্যুতে উল্টে গেছে পাশার দান, আলোচনায় খামেনির ছেলে
প্রচুর ভুয়া ‘নুলস্তা’ পাওয়ায় ভিসা দিতে দেরি হচ্ছে: ইতালির রাষ্ট্রদূত
প্রচুর ভুয়া ‘নুলস্তা’ পাওয়ায় ভিসা দিতে দেরি হচ্ছে: ইতালির রাষ্ট্রদূত
১২০ টাকায় উঠলো ডলারের দাম
১২০ টাকায় উঠলো ডলারের দাম