X
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০২৪
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

২৩ বছরেও শেষ হয়নি রমনা বটমূলে বোমা হামলার বিচার

আরিফুল ইসলাম
১৩ এপ্রিল ২০২৪, ২৩:৫৯আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ২৩:৫৯

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। বরাবরের মতোই বঙ্গাব্দ বরণের উৎসব চলছিল রমনার বটমূলে। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ। বোমার আঘাতে এলোমেলো হয়ে যায় গোটা এলাকা। ঘৃণ্যতম সে হামলায় রমনাতেই প্রাণ হারান ৯ জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আরও একজনের। কলঙ্কিত সে হামলার ২৩ বছর পেরিয়ে গেছে। হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার মধ্যে একটিতে রায় হলেও আরেকটিতে বিচার শেষ হয়নি এখনও।

রমনার বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলাটির রায় হয় ঘটনার ১৩ বছর পর। তাতে আট জনের ফাঁসি ও ছয় জনের যাবজ্জীবনের আদেশ দেন আদালত।

হত্যা মামলার রায় হলেও একই ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি এখনও। মামলাটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে ছিল। কিন্ত ২০২২ সালের ২৮ জুলাই মামলাটি বদলি করে মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এ পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি মামলাটি মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ এর বিচারক তেহসিন ইফতেখারের আদালতে পাঠানো হয়। গত এক বছরের বেশি সময়ে ধরে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য রয়েছে।

সর্বশেষ চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি মামলাটির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য থাকলেও নিরাপত্তা জনিত কারণে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করেননি কারা কর্তৃপক্ষ। এজন্য মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৫ এর বিচারক তেহসিন ইফতেখারের আদালত আগামী ২২ এপ্রিল আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।

মামলার নথী সূত্রে জানা যায়, আসামির পক্ষে আইনজীবীরা মামলাটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন থেকে তুলে নিয়ে কয়েকজন সাক্ষীকে জেরা করার আবেদন করেন। মুফতি আবদুল হাই গ্রেফতার হওয়ার পর তার আইনজীবী ইদি আমিন ৫ সাক্ষীকে পুনরায় জেরার আবেদন করেন। যদিও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। এরপর আসামিপক্ষ বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে উচ্চ আদালতে যান। পরে মামলাটি যুক্তিতর্ক থেকে আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানির পর্যায়ে আসে।

বিস্ফোরক আইনের মামলাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু জানান, মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। আসামিপক্ষের কাল ক্ষেপণের কারণে মামলার বিচার  শেষ হচ্ছে না। তারা কালক্ষেপণ না করলে মামলাটির বিচার এতদিন শেষ হয়ে যেতো। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহবুবুর রহমান জানান, পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে। কোনোভাবেই এদিনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেশের মানুষের কাম্য নয়। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রত্যাশা করছি। মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। আসামিদের আদালতে হাজির করা মাত্রই মামলাটির বিচার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইদি আমিন বলেন, আসামিরা ন্যায়বিচার পায়নি। এই মামলার বিলম্বের হওয়ার পেছনে আসামিদের কোনও দোষ নেই। এটা রাষ্ট্রপক্ষের কারণে বিলম্ব হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। আসামিদের নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আদালতে আনা হচ্ছে না। এর ফলে আরও বিলম্বিত হচ্ছে বিচারকার্য। মামলায় যে সাজা হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি সময় কারাগারে আটক রয়েছেন আসামিরা। রায়ে আমরা ন্যায়বিচার চাই। আসামিরা এই মামলা থেকে খালাস পাবেন বলে আশা করেন এই আইনজীবী। 

বিস্ফোরক আইনের মামলার আসামিরা হলেন—আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই।

আসামিদের মধ্যে মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই পলাতক রয়েছেন। অপর সাত আসামি জেল হাজতে আটক রয়েছেন।

রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে গেছে এবং সাজাপ্রাপ্তরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। তবে এখনও এটি শুনানিতেই আটকে আছে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রুহুল আমিন বোমা হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলে- মুফতি আবদুল হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মাওলানা আবদুল হাই ও মাওলানা শফিকুর রহমান।

এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামি হলেন- শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা সাব্বির, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা ইয়াহিয়া ও মাওলানা আবু তাহের। দণ্ড পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণে বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় ঘটনাস্থলেই ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যায় আরও একজন। এ ঘটনায় রাজধানীর নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন।

ঘটনার প্রায় ৮ বছর পর ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বারবার পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল, বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসার কারণে বিচার শুরু হতে দেরি হয়। ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর মামলার অষ্টম তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ মামলা দু'টির চার্জশিট আদালতে দাখিল করেন।

২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি বিচারের জন্য মামলা দুটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায়। ওই আদালতে একই বছরের ১৬ এপ্রিল পৃথক মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ বিচারের জন্য পাঠানো হয়। বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনও বিচারিক আদালতেই আছে।

আরও পড়ুন- হাইকোর্টের শুনানিতেই আটকে আছে রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলা

/এফএস/
সম্পর্কিত
৩০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতারসেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সংঘর্ষে কিশোর নিহত: আরও ২ আসামি রিমান্ডে
ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় শিশুকে হত্যা: ৬ বছর পর আসামির যাবজ্জীবন
সর্বশেষ খবর
সৎমায়ের ঘর থেকে বস্তায় মোড়ানো শিশুর মরদেহ উদ্ধার
সৎমায়ের ঘর থেকে বস্তায় মোড়ানো শিশুর মরদেহ উদ্ধার
দেড় বছর কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৩ নারী
দেড় বছর কারাভোগ শেষে দেশে ফিরলেন ৩ নারী
সেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
৩০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতারসেই শিক্ষকের ‘ওপরের চেহারা’ বিভ্রান্ত করেছে সহকর্মীদেরও
টিভিতে আজকের খেলা (২৩ মে, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (২৩ মে, ২০২৪)
সর্বাধিক পঠিত
যেভাবে এমপি আনোয়ারুল আজিমকে হত্যা করা হয়
যেভাবে এমপি আনোয়ারুল আজিমকে হত্যা করা হয়
‘খুন’ কিন্তু ‘লাশ নেই’: যা জানা গেলো এমপি আজিমকে নিয়ে
‘খুন’ কিন্তু ‘লাশ নেই’: যা জানা গেলো এমপি আজিমকে নিয়ে
১২০ টাকায় উঠলো ডলারের দাম
১২০ টাকায় উঠলো ডলারের দাম
এমপি আনোয়ারুল আজিম হত্যা নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে যা জানা গেলো
এমপি আনোয়ারুল আজিম হত্যা নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে যা জানা গেলো
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অস্ত্র’ দুর্নীতি
সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাযুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অস্ত্র’ দুর্নীতি