নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানির উদ্যোগ বিফলে গেলো কেন?

আতিক হাসান শুভ
১৬ জুন ২০২৪, ১০:০০আপডেট : ১৬ জুন ২০২৪, ১০:০০

একটি নির্দিষ্ট স্থানে যাতে এলাকার সবার পশু কোরবানি করা যায়, ২০১৫ সালে সেই উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বর্জ্য অপসারণের সুবিধার্থে ও পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পশু কোরবানির জন্য ১১৬৩টি (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬২০টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৪৩টি) জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মূল কারণ সাধারণ মানুষের অনাগ্রহ। ঢাকাবাসী চায় না তাদের বাসাবাড়ির সামনে থেকে দূরে অন্য কোথাও গিয়ে কোরবানি দিতে।

নির্দিষ্ট এলাকায় কোরবানির জন্য দুই সিটি করপোরেশন মোটাদাগে অর্থ খরচ করে বেশ তোড়জোড় চালায়, কিন্তু মানুষের অনাগ্রহের কারণে ওই উদ্যোগ বিফলে যায়। নগরবাসী মনে করেন, বংশ পরম্পরায় বাসাবাড়ির আঙিনায় গরু জবাই করা হতো। সেই ধারার বাইরে যেতে ইচ্ছে করে না। এছাড়া দূরে গিয়ে পশু কোরবানি করে মাংস টেনে নিয়ে আসাও ঝামেলার। তাই নির্ধারিত জায়গায় কোরবানির জন্য যেতে আগ্রহ নেই বলে উল্লেখ করছেন অনেকে। এ জন্য বরাবরের মতো বাসার সামনে খালি জায়গায়, রাস্তায় কিংবা গলিতে পশু কোরবানি দিচ্ছেন তারা।

নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি না দেওয়ার বিষয়ে পুরান ঢাকার বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জন্মের পর থেকেই আমি দেখে আসছি আমার বাপ-দাদা আমাদের বাসার সামনে কোরবানি দিয়েছেন। আমরা চাচা-ভাতিজা সবাই মিলে সেই কোরবানিতে অংশ নিতাম। একেকজন একেক কাজ করতেন। কেউ গরুর মাংস কাটতেন, কেউ মাংস থেকে হাড় আলাদা করে দিতেন, কেউ গরুর নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করতেন। এর মাঝে নানা ধরনের গল্প হতো। এই ধারা এখনও চলমান আছে। নিজের বাসার সামনে কোরবানি দেওয়ার যে আনন্দ তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এটা একটা উৎসবের মতো। অন্য জায়গায় কোরবানি দিলে এই আনন্দ পাওয়া যাবে না। মনে হবে দোকান থেকে মাংস কিনে বাসায় এনেছি।

পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা হাজী নান্টু মিয়া বলেন, সিটি করপোরেশন যে উদ্যোগ নিয়েছিল তা আসলে আমাদের নগরীকে দুর্গন্ধমুক্ত ও পরিষ্কার রাখার জন্য ছিল। সেই উদ্যোগের বিপক্ষে আমরা ছিলাম না। কিন্তু সেখানে আমরা কোরবানির আসল মজা মিস করছিলাম। নিজ বাড়ির আঙিনায় যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কোরবানি দিতে পারি সেখানে সেই সুযোগ ছিল না। তাছাড়া গরু নিয়ে আরেক জায়গায় যাওয়া, তারপর কোরবানি শেষ করে সেই গরুর মাংস ক্যারি করে বাসায় আনা, এটা একটা ঝামেলা ছিল। যদি আশপাশে হতো তাহলে হয়তো আমরা সেখানে কোরবানি দিতাম। কিন্তু সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট সেই জায়গাটা ছিল আমার বাসা থেকে অনেক দূরে।

সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগের বিষয়ে বংশালের বাসিন্দা গোলাম সারওয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল ওয়ার্ডভিত্তিক বা পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা মিটিং করে স্থানীয়দের মতামত নেওয়া। কিন্তু সিটি করপোরেশন তা করেনি। কেউ তো চাইবে না তাদের বাসা থেকে দূরে গিয়ে কোরবানি দিতে। তাছাড়া যাতায়াতের একটা বিষয় আছে, সেটা বাড়তি আরেকটা খরচ। এর জন্যই আসলে এই উদ্যোগ মানুষ আমলে নেয়নি।

নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানির বিষয়ে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় খরচ অনেক কমে যেত। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, বাড়ির আঙিনায় বা বাসার পাশে কোরবানি দেওয়া মানুষের একটা ঐতিহ্য। সিটি করপোরেশন চাইলেই হুট করে এই সিদ্ধান্ত বদল করতে পারবে না। এই উদ্যোগ নেওয়ার আগে তাদের জনমত নেওয়া উচিত ছিল। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি। নিশ্চয়ই এই প্রকল্পে সিটি করপোরেশন অনেক টাকা ব্যয় করেছে। এটা যদি আগে জনমত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে করতো তাহলে এই টাকা অপচয় হতো না।

নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি দেওয়ার প্রকল্পে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ছাড়াও সরকারি উদ্যোগে দেশের ১১টি সিটি করপোরেশনে মোট ২ হাজার ৯৩৬টি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। মানুষের অনীহার কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানির প্রকল্পটি অকার্যকর হওয়ার বিষয়ে তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, উন্মুক্ত স্থানে পশু কোরবানি না করার বিষয়ে যেহেতু কোনও আইন নেই যে খোলা স্থানে কোরবানি করলে সাজার নিয়ম আছে, তাই এটা কার্যকর হয়নি। আর ধর্মীয় বিষয়েও এসব জোরজবরদস্তি করতে গেলে মানুষের মাঝে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ বিফলে যাওয়ার কারণ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সিটি করপোরেশন কোরবানির জন্য যে জায়গাগুলো নির্দিষ্ট করেছেন সেখানে মানুষ কোরবানি দিতে আসে না। সাধারণ মানুষ তাদের নিজ বাড়িতে কোরবানি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, উৎসব অনুভব করেন। তারপর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বরত সবাই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই উদ্যোগটি বাদ দিয়ে দিয়েছেন। কারণ এটা একটা অর্থের অপচয়।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগ নেওয়ার আসল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা আমরা এখনও করতে সক্ষম হয়েছি। প্রতি বছর আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করতাম। এবার তা মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করার পরিকল্পনা নিয়েছি। সুতরাং এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলেও তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। আমাদের আসল যেই উদ্দেশ্য ছিল তা কিন্তু বাস্তবায়িত হচ্ছে।

/এফএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ঈদের ছুটিতে মেট্রোরেলে দিনে দেড় লাখের বেশি যাত্রী
পরিবহনে পাঁচ দিন পর্যন্ত অগ্রিম বুকিং, অর্ধেক খালি যাচ্ছে লঞ্চপটুয়াখালীতে বাসে সিট সংকট, যাত্রীশূন্য লঞ্চ
ঈদের ছুটিতে হাম ও উপসর্গে মারা গেলো যতজন
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম