৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলাফল বৈষম্যের শিকার: আঁচল ফাউন্ডেশন

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫:১৫আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫:১৫

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে নানাভাবে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। এর প্রভাবে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলাফল বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী।

শনিবার (৩০ আগস্ট) ‘বৈষম্যের শিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে এসব তথ্য জানায় আঁচল ফাউন্ডেশন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের সম্যক অবস্থা বুঝতে আঁচল ফাউন্ডেশন একটি জরিপ করে। রিসার্চ টিমের সদস্যরা গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জরিপ চালায়। সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা অনলাইন ফর্ম পূরণের মাধ্যমে জরিপে অংশ নেন এবং তাদের মতামত জানান।

জরিপের ফলাফল বলছে, অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মাঝে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাদের নানাভাবে এবং বিভিন্ন ধরণের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তাদের মাঝে ৫১ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৪৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা, যা প্রায় ৪০ শতাংশ করে। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন। প্রায় ১৯ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী মেডিক্যাল কলেজের রয়েছেন। জরিপে দেখা যাচ্ছে, বৈষম্যের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী শিক্ষার্থী উভয়ের অবস্থানই কাছাকাছি।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস জীবনে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হন প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। শারীরিক অক্ষমতার জন্য বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এছাড়া জাতিগত পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। ভিন্ন জাতির হওয়ায় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে প্রায় ২৩ শতাংশ, শারীরিক অবয়বের কারণে ২৯ শতাংশ এবং রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছেন।

সমীক্ষার তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, যা মোট হিসেবের ৬০ শতাংশ। ১৯ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা ডর্মিটরিতে এবং ৩৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইভেন্টে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডায় তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন প্রায় ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর। এর বাইরে লাইব্রেরি, ক্যাফে, পরীক্ষার হলেও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষার্থী।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পুরুষ শিক্ষার্থী ৫০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

সমীক্ষার তথ্য বলছে, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন সহপাঠিদের দ্বারা; যা প্রায় ৫৮ শতাংশ। শিক্ষক কর্তৃক এ ধরণের আচরণের শিকার হতে হয়েছে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে। ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বৈষম্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হওয়ার পরে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়েছে। বৈষম্যের শিকার শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। তাদের মাঝে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন এ ধরণের আচরণের প্রভাব তাদের ওপর গুরুতরভাবে পড়েছে, মোটামুটি প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন কোনও প্রভাব পড়েনি।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের মাঝে মানসিক সমস্যার বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা গেছে। ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষণ্ণতার লক্ষণ অনুভব করছেন, উদ্বিগ্নতা অনুভব করেছেন ৪৯ শতাংশ, ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে ৩০ শতাংশের মাঝে। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের মাঝে প্যানিক অ্যাটাকের তীব্রতা বেড়েছে, স্ট্রেস বা চাপ অনুভব করছেন ৪৭ শতাংশ। ৪৩ শতাংশ একাকিত্ব অনুভব করেছেন এবং ৪১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান তারা হীনমন্যতায় ভুগছেন। 

মানসিক সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে ক্লাস ও পড়াশুনার মনোযোগেও ব্যাঘাত ঘটছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তারা ঠিকমতো ক্লাসে যোগ দিতে ব্যর্থ হোন। ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও প্রায়ই পড়াশুনায় মনোযোগ থাকে না তাদের।

মানসিক সমস্যা তৈরি হলেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রতি শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উদাসীন থাকেন বলে সমীক্ষার তথ্য বলছে। বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষার্থীদের মাঝে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, যেমন-কাউন্সেলিং, থেরাপি ইত্যাদির শরণাপন্ন হয়েছেন। অবশিষ্ট ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই কোনও ধরনের সেবা গ্রহণ করেননি। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের পর তাদের সমস্যা দূর হয়েছে বলে জানিয়েছেন ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ না করার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থীরা। ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তারা মানসিক সেবা সম্পর্কে ঠিকমতো ধারণা রাখেন না। সামাজিক ট্যাবু বা লজ্জার কারণ ভেবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। সেবা কোথা থেকে নিতে পারবে সে বিষয়ে জানেন না বলে জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে সেবা গ্রহণ করেননি ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। 

শিক্ষার্থীদের মতে, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ততা নেই। মাত্র ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সেবা নেই।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সাতটি প্রস্তাবনা তুলে ধরে আঁচল ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো– শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মেন্টরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, ছয় মাস পর পর শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং করা, বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে মনিটরিং টিম গঠন ও কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রতিটি বিভাগে অভিযোগ বক্স রাখা ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কমপ্লেইন সেল গঠন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনায় ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টার চালু এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা।

সংবাদ সম্মেলনে ছিলেন– বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট সায়েদুল ইসলাম সাঈদ, আইনজীবী হাবিবুর রহমান, আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ।

/এসও/আরকে/
সম্পর্কিত
আদাবরে ঢাবি শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনায় গ্রেফতার ৯
কেনিয়ায় বালিকা বিদ্যালয়ের হোস্টেলে আগুন, ১৬ ছাত্রীর মৃত্যু
শিক্ষার্থীর আত্মহত্যাহামলার শিকার ব্রাইট স্কুলের চেয়ারম্যান, ঢামেকে ভর্তি
সর্বশেষ খবর
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি