অনেক ‘উদ্যোগ’, তারপরও পাসপোর্ট জমা দিতে চরম দুর্ভোগ

ইমরান আলী 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০০ আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০০

একসময় পাসপোর্ট অফিস একটি থাকলেও সেবা নিশ্চিত করতে রাজধানীতে একে একে আরও ৫টি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস খোলা হয়। দালালের উৎপাত ঠেকাতে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। আগারগাঁও অফিসে সেবা প্রত্যাশীরা দীর্ঘ লাইন, দফায় দফায় লাইনে দাঁড়ানো, কয়েক ঘণ্টা সময় ব‍্যয় করে তবেই জমা দিতে পারছেন আবেদন। তবে সেবা প্রত্যাশীরা যতই অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আনেন না কেন, জনবল সংকটের কথা বলে সেসবকে খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে না কর্তৃপক্ষ।

পাসপোর্টের ঢাকা বিভাগীয় আগারগাঁও কার্যালয়ে নবায়নের জন্য গিয়েছিলেন এক পাসপোর্ট প্রত্যাশী। কাগজপত্র জমা দেওয়ার লাইন থেকে শুরু করে আঙুলের ছাপ দেওয়া পর্যন্ত যেতে ৫ ঘণ্টার একটি বিবরণ তুলে ধরেন তিনি।

ওই পাসপোর্ট প্রত্যাশী বলছেন, ‘সকাল ৯টায় ঢুকে বসার লাইনে বসে অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে একবারে ১০ জন করে সিরিয়াল দেয়। প্রথমে এনআইডি ভেরিফিকেশন করে সিরিয়াল নিতে হয়। তারপর সিরিয়াল অনুযায়ী কাগজপত্র চেক। এরপর ছবি তোলা, বায়োমেট্রিক আর আইরিশ স্ক্যান। অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করলে এনআইডি নম্বর দিতে হয়, সেখান থেকে অটোমেটিক এনআইডি সার্ভার থেকে তথ্য যুক্ত হয়ে যায়, সেটা এডিট করার সুযোগ নাই। তারপরও এনআইডি ভেরিফিকেশন করা লাগে। সেটা করে ১১০ নম্বর সিরিয়াল নিয়ে বসলাম সকাল ১০টায়। কারণ ফাইল চেক করবে, কাগজপত্র সব ঠিক আছে কিনা। এখানেও এনআইডি দেখাতে হয়। সব কাগজ দেখে সিল-সই দিয়ে ওকে করতে সাড়ে ১২টা বাজে। গেলাম বায়োমেট্রিক দিতে। সেখানে সবে ৭৩ সিরিয়াল চলে। বসলাম আরও দেড় ঘণ্টার মতো।’

একই বিষয় তুলে ধরেন নবায়নকৃত আরেক পাসপোর্ট প্রত্যাশী। তিনি বলেন, ‘তিন দফা লাইনে দাঁড় হয়ে কাজটা করা বেশ সময়সাপেক্ষ। এটা আরও কম সময়ে কীভাবে করা সম্ভব সেটা তাদের বের করতে হবে।’ তিনি তার শিশুকে নিয়ে পাসপোর্ট করাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বসার জায়গা অপ্রতুল, লাইনে দাঁড়াতে হয় অপরিচ্ছন্ন টয়লেটের সামনে, এখনকার সময়ে এসে এ ধরনের বিষয়গুলো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন ওই নবায়নকৃত পাসপোর্ট প্রত্যাশী। 

তবে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের দাবি, আগের চেয়ে সময় কম লাগছে। পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নূরুল আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে, যা সাধারণ মানুষ জানেন না। আর সময় আগের চেয়ে এখন কম লাগার কথা। কারণ অফিস আরও করা হয়েছে। লোকজন সেখানেও যাচ্ছেন। সুতরাং আগারগাঁওয়ের ওপর আগে যে প্রেসার ছিল, সেটি নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জনবলের ঘাটতি রয়েছে, তবে এর জন্য যে পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ এমনটা নয়। পুলিশ ভেরিফিকেশন উঠিয়ে দেওয়ার কারণে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। এর সুফল জনগণ ভোগও করছে। প্রয়োজনীয় জনবল এলে এই সেক্টরে সর্বোচ্চ সেবাই নিশ্চিত করা হবে।’

এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তো আছে, সরকারের জনবল ঘাটতি থাকতেই পারে। তাতে সেবা পেতে বিলম্ব হতে পারে, কিন্তু তাই বলে অভিযোগ আমলে না নেওয়ার সুযোগ নেই।’

উল্লেখ্য, পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন এক দুর্ভোগ থাকলেও বর্তমান সরকার সেটি উঠিয়ে দেওয়ার পর পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে রাজধানীতে আরও বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক অফিস করার কারণে আগারগাঁও অফিসে চাপ কমেছে। আগে ২৭টি থানা এলাকার জন্য এই অফিসে আসা লাগলেও বর্তমানে ১১টি থানা এলাকার বাসিন্দারা এখান থেকে পাসপোর্ট করেন। এই অফিসে আগে প্রতিদিন ১২০০ আবেদন এলেও সেটি এখন অর্ধেকে কমে এসেছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে ৫শ’ থেকে ৬০০ পাসপোর্টের আবেদন আসে।

কর্মকর্তারা জানান, একজন পাসপোর্ট প্রত্যাশী আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ অন্যান্য কাজ সম্পাদন করে পাসপোর্ট হাতে পেতে সাধারণের ক্ষেত্রে দুই মাসেরও বেশি সময় লাগতো। আর আবেদন করে অফিসে এসে ছবি ও ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য এক মাসের বেশি সময় লাগতো। এখন সেটি হয় না। পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়ার ফলে সাধারণ পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ দিন সময় লাগে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, অফিসে এসে পাসপোর্টের সমস্ত কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগার কারণ জনবল সংকট। দেখা যাচ্ছে, সরকার আমাদের ল্যাপটপ বা কম্পিউটার জনবল অনুযায়ী দিয়েছে; কিন্তু জনবল নাই। সেক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহারের লোক নেই। অনেক সময় সেবা প্রত্যাশীরা সেগুলো দেখে বিরূপ কিছু ভাবতে পারেন। দুই বছর আগে ৪ হাজারের বেশি জনবলের চাহিদা দেওয়া হলেও সেটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখানে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের সেবার জন্য নতুন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। টোকেন গ্রহণ করার পর কারও যাতে অপেক্ষা করতে না হয় সে জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যানও দেওয়া হয়েছে। ১৬ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন লিফটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে কিন্তু এটি ছিল না। অনেক সময় পায়ে হেঁটেই উঠতে হতো। আমরা দালালদের চিহ্নিত করে ছবি টানিয়েছি। প্রতিনিয়ত আনসার সদস্যরা মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করছেন। এরপরও কিছু লোক বাইরে ঘোরাঘুরি করে। আমাদের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে র‌্যাবকে জানালে তারা অভিযান পরিচালনা করেন। আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

/আরআইজে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
পাসপোর্টের ৭ ‘দালালকে’ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা
হাজিরা দিয়ে উধাও রংপুর প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা
সাজেক সড়কে পাল্টাপাল্টি অবরোধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
সর্বশেষ খবর
রফতানি ব্যাহত, কারখানায় আগুন: কতটা ক্ষতির মুখে পোশাকশিল্প?
রফতানি ব্যাহত, কারখানায় আগুন: কতটা ক্ষতির মুখে পোশাকশিল্প?
হামের টিকা কেনায় বিলম্ব ও অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন
হামের টিকা কেনায় বিলম্ব ও অনিয়ম তদন্তে কমিশন গঠন
এনসিপি-জামায়াত জোটে ভাঙনের সুর: গুঞ্জন নাকি সত্য?
এনসিপি-জামায়াত জোটে ভাঙনের সুর: গুঞ্জন নাকি সত্য?
কেন হারলো ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা: ভ্যান্স বললেন, ‘ইরান যুদ্ধের কারণে’
কেন হারলো ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা: ভ্যান্স বললেন, ‘ইরান যুদ্ধের কারণে’
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
নতুন দায়িত্বে ইশরাক হোসেন
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
আগস্টের পর একের পর এক পদোন্নতি, এবার ডিআইজি হলেন আশরাফ আলী
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
‘আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো’: ট্রাম্প
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হাদিসের’ সঙ্গে তুলনা করা সেই কর্মকর্তা পদ হারালেন
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘হাদিসের’ সঙ্গে তুলনা করা সেই কর্মকর্তা পদ হারালেন
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি
৭ নভেম্বর ঘিরে সরকারের ব্যাপক কর্মসূচি, থাকছে সাধারণ ছুটি