বিভিন্ন খাল-প্রণালি ঘিরে কী হচ্ছে দুনিয়াজুড়ে?

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১৬ মে ২০২৬, ১৮:২২ আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১৮:২২

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফেরার পর বিশ্বরাজনীতিতে পুরোনো এক বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে—বাণিজ্যপথ মানেই এখন কেবল অর্থনীতি নয়, ক্ষমতা ও প্রভাবের লড়াইও। বিশেষ করে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ খাল ও প্রণালিগুলোকে ঘিরে কূটনৈতিক চাপ, সামরিক উত্তেজনা এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা দ্রুত বেড়েছে। পানামা খাল থেকে হরমুজ প্রণালি, মালাক্কা প্রণালি থেকে লোহিত সাগর—বিশ্ব বাণিজ্যের এই সংকীর্ণ পথগুলো এখন বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

বিশ্ব বাণিজ্যের বড় অংশ এখনও সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। আর এই বাণিজ্যের সিংহভাগ নির্ভর করে কয়েকটি ‘চোকপয়েন্ট’-এর ওপর। কোনও একটি পথ বন্ধ বা অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়ে জ্বালানি, খাদ্য, প্রযুক্তিপণ্য এমনকি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও।

পানামা খাল: ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন উত্তেজনা

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে আসার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল পানামা খাল নিয়ে তার অবস্থান। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে “অন্যায্যভাবে” খাল ব্যবহারে চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং ওয়াশিংটনের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি তিনি “পানামা খাল ফিরিয়ে নেওয়া” নিয়েও মন্তব্য করেন।

এর জবাবে পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো স্পষ্ট ভাষায় বলেন, খাল পুরোপুরি পানামার নিয়ন্ত্রণে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এমন বক্তব্য তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূল উদ্বেগ কেবল খাল নয়; বরং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। পানামা খালের প্রবেশমুখে চীনা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বন্দর পরিচালনা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প প্রশাসন সেই উদ্বেগকে আরও প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মকভাবে সামনে আনছে।

হরমুজ প্রণালি: জ্বালানি যুদ্ধের কেন্দ্র

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আবারও এই অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান হরমুজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান আরও জোরালো করেছে। এমনকি দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রণালীর ভৌগোলিক সীমা আরও বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করার কথাও বলেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা বলছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হবে। হরমুজ ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়েছে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং ইউরোপের স্বার্থসংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

মালাক্কা প্রণালি: চীনের ‘মালাক্কা ডিলেমা’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বাণিজ্যপথগুলোর একটি। চীনের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি এই পথ দিয়ে আসে। ফলে এই প্রণালীতে কোনও সংকট তৈরি হলে বেইজিং বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে।

চীনের কৌশলগত মহলে বহু বছর ধরেই “মালাক্কা ডিলেমা” শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, এই সংকীর্ণ পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা চীনের দুর্বলতা তৈরি করছে। তাই বেইজিং বিকল্প রুট, বন্দর এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।

অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নৌ উপস্থিতি জোরদার করছে। ফলে মালাক্কা প্রণালী ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

লোহিত সাগর ও সুয়েজ: আরেক চাপের কেন্দ্র

যদিও আলোচনায় বেশি আসে হরমুজ বা মালাক্কা, বাস্তবে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালও এখন বড় অনিশ্চয়তার জায়গা। ইয়েমেনের হুতি হামলা, পশ্চিমা সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং জাহাজে আক্রমণের কারণে বহু কোম্পানি সুয়েজ এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করছে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ দুই-ই বেড়েছে।

বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার চাপের পেছনে এই রুটের অস্থিতিশীলতাও বড় কারণ হয়ে উঠছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিগুলো?

ভূরাজনীতিতে এসব পথকে শুধু বাণিজ্যিক করিডর হিসেবে দেখা হয় না। এগুলো সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক।

হরমুজ নিয়ন্ত্রণ মানে জ্বালানি প্রবাহে প্রভাব; মালাক্কা মানে এশীয় বাণিজ্যের প্রাণরেখা; পানামা খাল মানে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ; সুয়েজ মানে ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের দ্রুততম পথ।

ফলে এসব অঞ্চলে প্রভাব বাড়ানো মানে বৈশ্বিক রাজনীতিতে কৌশলগত সুবিধা অর্জন।

নতুন বাস্তবতা: সমুদ্রপথ এখন ক্ষমতার মানচিত্র

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব এখন নতুন ধরনের ভূরাজনীতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ সবসময় সরাসরি সীমান্তে নাও হতে পারে; বরং বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠতে পারে প্রধান অস্ত্র।

ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র আরও প্রকাশ্যভাবে কৌশলগত পথগুলোর প্রশ্ন তুলছে। একই সময়ে চীন নিজের বিকল্প বাণিজ্যপথ ও সামুদ্রিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে। ইরান, রাশিয়া, উপসাগরীয় রাষ্ট্র ও ইউরোপও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

ফলে বিশ্বজুড়ে খাল ও প্রণালীগুলো এখন আর শুধু মানচিত্রের জলপথ নয়; বরং এগুলো হয়ে উঠছে আগামী বৈশ্বিক শক্তি-সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।

/এম/
সম্পর্কিত
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে ৯ দেশে আঘাতের হুমকি ইরানের
প্যারিস দ্রুতই মুসলিমদের শহরে পরিণত হবে, ম্যাক্রোঁর সমালোচনায় ট্রাম্প
চীনে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন পুতিন, ট্রাম্প ও শি
সর্বশেষ খবর
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
রোনালদোর ২৫৫ ইউরো জরিমানা, যা আয় করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে!
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
ভুটান থেকে ঢাকায় এসে কী বললেন ফিফা সভাপতি 
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
দলের সঙ্গে যারা মুনাফিকি করবেন তারেক রহমান তাদের ক্ষমা করবেন না: আইনমন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
এসসিও বৈঠকে ইসহাক দারের উপস্থিতিতে যা বললেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত