‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই পালিত হচ্ছে এবারের ‘জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস’। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণ এবং নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর এ দিবসটি পালন করা হয়।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একজন নাগরিকের আইনগত পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একটি শিশুর জন্মের পর তার জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নথিতে তার অস্তিত্ব ও পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়। একইভাবে কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পর মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে তার মৃত্যুর তথ্য সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জন্য জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের গুরুত্ব অপরিসীম।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ধারা ১৮ অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত জন্ম ও মৃত্যু সনদ কোনও ব্যক্তির বয়স, জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য প্রমাণে আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব দাফতরিক কাজে আইনগত সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
আইন অনুযায়ী, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সব নথি ও নিবন্ধন বহি পাবলিক ডকুমেন্ট (সাধারণ দলিল) হিসেবে গণ্য হবে।
এই আইনে আরও বলা হয়, অন্য কোনও আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, পাসপোর্ট ইস্যু, বিবাহ নিবন্ধন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জমি রেজিস্ট্রেশন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসিসহ বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের জন্য জন্ম সনদ ব্যবহার করতে হবে।
জন্ম নিবন্ধনের গুরুত্ব নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক আবু হাসানাত মোহাম্মদ কিশোয়ার হোসেন বলেন, ‘জন্ম নিবন্ধন রাষ্ট্রের কাছে একজন শিশুর আইনি অস্তিত্বের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। জন্ম নিবন্ধন একটি শিশুর প্রথম আইনি পরিচয়। এটি না থাকলে বিভিন্ন মৌলিক অধিকার ও সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, আইন অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন না থাকলে প্রায় ১৫-২০ ধরনের, এমনকি আরও অনেক সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আইনে বিবাহ নিবন্ধন, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে টিকাদান, স্কুলে ভর্তি এবং শিশুদের জন্য অন্যান্য অনেক সেবার ক্ষেত্রেও জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব আরও বাড়ছে এবং বিভিন্ন নতুন সেবার ক্ষেত্রেও এটি বাধ্যতামূলক হচ্ছে।
তারা আরও জানান, শিশুদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে টিকাদান ও বিদ্যালয়ে ভর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রেই জন্মনিবন্ধন প্রথমেই প্রয়োজন হয়।
সেক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শিশুর নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, বাবা-মায়ের নামসহ অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। ভুল বা অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য দিয়ে জন্ম নিবন্ধন করা হলে পরবর্তী সময়ে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদসহ বিভিন্ন সরকারি নথিতে তথ্যের অমিল দেখা দিতে পারে। এতে নাগরিকদের প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি সময় ও অর্থের অপচয়ের মুখে পড়তে হয়। তাই জন্ম নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করে নির্ভুলভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অপরদিকে মৃত্যু নিবন্ধনও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত না হলে পরবর্তী সময়ে তার সম্পদ, উত্তরাধিকার, পারিবারিক অধিকার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সঠিকভাবে মৃত্যু নিবন্ধন করা হলে মৃত ব্যক্তির সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করার পাশাপাশি উত্তরাধিকারী ও পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করাও সহজ হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু দিবস পালন নয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস উপলক্ষে আজ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হওয়ার কথা রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা, নাগরিক জীবনে এর ব্যবহার এবং সঠিক তথ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।