অটোরিকশার পেছনে হর্নের মিছিল, অতিষ্ঠ নগরবাসী

সঞ্চিতা সীতু
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হর্নের ব্যবহার ও শব্দদূষণ। হঠাৎ সামনে চলে আসা, এক লেন থেকে অন্য লেনে ঢুকে পড়া এবং যেখানে-সেখানে থামার কারণে পেছনের বাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালকদেরও বারবার হর্ন দিতে হচ্ছে। যানজটের মধ্যে একসঙ্গে অসংখ্য গাড়ির হর্নে ব্যস্ত সড়কগুলোতে তৈরি হচ্ছে তীব্র শব্দদূষণ, যার ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।

এক অটোরিকশা, পেছনে একের পর এক হর্ন

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের এক লেন থেকে আরেক লেনে ঢুকে পড়ছে অটোরিকশা। কোথাও আবার যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। পেছনে থাকা গাড়িগুলোকে গতি কমাতে হচ্ছে, কেউ কেউ হর্ন দিয়ে সামনে থাকা অটোরিকশাকে সরানোর চেষ্টা করছেন।

রবিবার রাত ৮টা থেকে ৮টা ৭ মিনিট পর্যন্ত সিগন্যালে অপেক্ষার সময় দুই পাশের সিগনাল খোলা থাকলেও এক সেকেন্ডের জন্যও হর্নের শব্দ থামেনি। এরপর ওই পাশের সিগনাল ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় হর্নের প্রতিযোগিতা। মনে হচ্ছিল, হর্ন দিলেই আগে চলে যাওয়া যাবে।

সিএনজিচালক খালেক হোসেন বলেন, অটোরিকশা সামনে ঢুকে যায়, তখন হর্ন না দিলে সরেও না। একটা-দুইটা হলে সমস্যা হয় না, কিন্তু একটার পর একটা অটোরিকশা থাকলে সারাক্ষণই হর্ন দিতে হয়।

অন্যদিকে অটোরিকশাচালকদের কেউ কেউ বলছেন, অনেক সময় বাস, প্রাইভেটকার কিংবা মোটরসাইকেল খুব কাছাকাছি চলে আসে। তখন দুর্ঘটনা এড়াতেও হর্ন দিতে হয়। আবার যাত্রী ওঠানো-নামানোর সময় পেছনের গাড়িকে সতর্ক করতেও হর্ন ব্যবহার করেন তারা।

সকাল থেকে রাত, শুধু হর্ন আর হর্ন

অটোরিকশার পাশাপাশি বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের হর্নও রাজধানীর শব্দদূষণের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কারও সামনে সামান্য জায়গা তৈরি হলেই দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় হর্ন।

শ্যামল দাস শান্তিনগর এলাকায় রিকশা চালান। তিনি বলেন, এখন শহরে রিকশা বেশি, সবাই চড়ে। কিন্তু গাড়ি বা সিএনজিচালকরা অনেক সময় রিকশা সহ্য করতে পারেন না। রাস্তায় এক গাড়ি আরেক গাড়ির পেছনে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রিকশার পেছনে পড়লেই হর্ন দিয়ে কান ঝালাপালা করে ফেলে।

বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা অয়ন সরকার বলেন, আগে বনশ্রীর মূল সড়কে এত হর্ন শুনতেন না। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু হর্ন আর হর্ন। যানজট হলে তো কথাই নেই। কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই মাথা ধরে যায়।

রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী, মগবাজার, বিজয় সরণি, মতিঝিলসহ অন্যান্য ব্যস্ত সড়কেও যানবাহনের চাপের সঙ্গে হর্নের শব্দ বাড়ছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে অটোরিকশা নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জাতীয় সংসদকে জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি প্রতিদিন আরও প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত এই বিস্তার যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’

শব্দের মাত্রারও নির্দিষ্ট সীমা আছে

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ২০২৫ সালের নতুন বিধিমালা করেছে। এতে এলাকাভেদে শব্দের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনের সীমা ৪৫ থেকে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতের ৪০ ডেসিবেল। আবাসিক এলাকায় দিনের ৫৫ ও রাতের ৪৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় ৬০ ও ৫০ ডেসিবেল এবং বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ও ৬০ ডেসিবেল।

নীরব এলাকার মধ্যে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালতসহ নির্ধারিত স্থাপনার আশপাশের এলাকা রয়েছে। এসব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে।

পরিবেশ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, নীরব এলাকা ঘোষণা করা জায়গাগুলোতে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে সেটি পর্যাপ্ত নয়। তারা মূলত জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করেন, জরিমানা করেন এবং লিফলেট বিতরণ করেন। কিন্তু মানুষ এখনো সচেতন হয়ে ওঠেনি।

অপ্রয়োজনীয় হর্নেও বাড়ছে শব্দদূষণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যানবাহনের সংখ্যা নয়, চালকদের অপ্রয়োজনীয় হর্ন দেওয়ার অভ্যাসও শব্দদূষণ বাড়াচ্ছে। যানজটের মধ্যে এক গাড়ির হর্নের পর আরেক গাড়ির হর্ন বাজতে থাকলে পুরো সড়কই শব্দের উৎসে পরিণত হয়।

বিশেষ করে অটোরিকশা হঠাৎ লেন পরিবর্তন করলে বা সামনে এসে থামলে পেছনের চালক হর্ন দেন। এরপর একই পরিস্থিতিতে অন্য গাড়িও হর্ন দিতে থাকে। ফলে একটি ছোট যানবাহনের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি মুহূর্তেই বহু গাড়ির সম্মিলিত শব্দে পরিণত হয়।

উবারচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, অটোরিকশাগুলো হুট করেই সামনে চলে আসে। এরপর গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়। বাধ্য হয়েই আগের চেয়ে বেশি হর্ন দিতে হয়। আগে একটি হর্ন দিয়ে প্রায় এক বছর চলতো, এখন দুই-তিন মাস পরপর হর্ন পরিবর্তন করতে হয়।

বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি শব্দদূষিত এলাকার মধ্যে রয়েছে জিরো পয়েন্ট, পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, কাকরাইল, শান্তিনগর, বেইলি রোড, মৌচাক, মগবাজার, মিরপুর-১০, গুলশান-১ ও গুলশান-২।

শব্দদূষণ নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপস জানায়, এসব এলাকায় আগে ১৩ ঘণ্টার মধ্যে ৭০ ঘণ্টা ধরে চরম শব্দদূষণ চলতো, এখন তা বেড়ে ১৪ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে।

সরকারের অভিযান

পরিবেশ অধিদফতরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখা জানায়, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত শব্দদূষণ প্রতিরোধে সারাদেশে ৫৬৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এসব কোর্টের মাধ্যমে এক হাজার ৮১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং ৩১ লাখ ৪২ হাজার ৩৫০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযানের সময় দুই হাজার ৬২৭টি হর্ন জব্দ করা হয়।

পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) সৈয়দ আহম্মদ কবীর বলেন, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের পাশাপাশি এখন ট্রাফিক পুলিশও জরিমানা করছে। তবে শুধু জরিমানা করে এই দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিজেদের সচেতন হওয়াও জরুরি।

আইন আছে, প্রয়োগ কতটা

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালায় অনুমোদিত মাত্রার বাইরে শব্দ করা এবং নির্ধারিত সীমার বেশি শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাইড্রোলিক, মাল্টি-টোনসহ অনুমোদনহীন বা অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী হর্নের ব্যবহারও নিষিদ্ধ। এর আগে মোটরযান আইনের অধীনেও নিষিদ্ধ হর্ন বা শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান ছিল।

অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে বলে সোমবার সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নাম্বার প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা, রুট ও চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যত্রতত্র থামানো, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, অবৈধ পার্কিং এবং যানজট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে হর্নের ব্যবহার কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা মো. কামরুজ্জামান মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অভিযান, জরিমানা, পোস্টার ও লিফলেট দিয়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য আইন করে হর্নের ব্যবহার কমাতে হবে।

তিনি বলেন, শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী ৭৫ ডেসিবেলের বেশি মাত্রায় হর্ন বাজানো যাবে না। কিন্তু দেশে যে হর্ন আমদানি করা হয়, তার মাত্রা প্রায় ১২৫ ডেসিবেল। এটি একটি অদ্ভুত বিষয়।

তার মতে, বিষয়টি শুধু শব্দদূষণ আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে শব্দদূষণ বিধিমালায় নির্ধারিত ৭৫ ডেসিবেলের বাইরে হর্ন আমদানি করা না যায়। কারণ একটি অটোরিকশা সামনে ঢুকে পড়া থেকে শুরু হওয়া হর্নের শব্দ শেষ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সড়কে। যানজট, বিশৃঙ্খল চলাচল আর হর্নের এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সড়কের পাশে থাকা মানুষ ও পথচারীরা। রাজধানীর শব্দদূষণ কমাতে তাই শুধু হর্নের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নয়, সড়কে যানবাহনের চলাচলও শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি।

/ইউএস/এমওএফ/
সম্পর্কিত
ত্রিভূজ প্রেমের বলি সিফাত, দুই আসামি গ্রেফতারের পর চঞ্চল্যকর তথ্য 
ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসককে মারধর: গ্রেফতার দুই আসামি রিমান্ডে
অটোরিকশায় বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যবহারকারীকে মুক্তির পরিকল্পনা অস্ট্রেলিয়ার
অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণ থেকে ব্যবহারকারীকে মুক্তির পরিকল্পনা অস্ট্রেলিয়ার
১৪২ পদে নিয়োগ দেবে সমরাস্ত্র কারখানা, আজ থেকে আবেদন শুরু 
১৪২ পদে নিয়োগ দেবে সমরাস্ত্র কারখানা, আজ থেকে আবেদন শুরু 
গরমে ঝটপট বানিয়ে ফেলুন রাজমা-আলুর মজাদার সালাদ
গরমে ঝটপট বানিয়ে ফেলুন রাজমা-আলুর মজাদার সালাদ
বাঁহাতি তো অনেক, কিন্তু পুরোপুরি বাঁহাতি কতজন?
বাঁহাতি তো অনেক, কিন্তু পুরোপুরি বাঁহাতি কতজন?
সর্বাধিক পঠিত
শিশু কোলে ছবি দিয়ে পরীমণি বললেন ‘তিন নম্বর জন ডান’
শিশু কোলে ছবি দিয়ে পরীমণি বললেন ‘তিন নম্বর জন ডান’
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
৪০০ হিট, ৫০ ব্লকবাস্টার: অমিতাভ-শাহরুখ-রজনীকান্তকে পেছনে ফেলা ভারতের সবচেয়ে সফল অভিনেতা
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
হিজড়া ‘গুরুমাকে’ হত্যা করে আরেক নেত্রীর ঘরে আশ্রয়, জানালেন খুনের কারণ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
স্রোতে ভেসে যাওয়া ফেরি ফিরলো পাটুরিয়া ঘাটে
স্রোতে ভেসে যাওয়া ফেরি ফিরলো পাটুরিয়া ঘাটে