রাশিয়া-তুরস্ক সম্পর্ক: কার লাভ কতটুকু

Send
সাদিকুর সাত্তার আকন্দ
প্রকাশিত : ১৬:৩৯, আগস্ট ২১, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৮, আগস্ট ২১, ২০১৬

সাদিকুর সাত্তার আকন্দবিশ্ব রাজনীতিতে আলোচিত রাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠার জন্য করণীয় প্রথম ধাপ সম্পন্ন করেছে আরেক আলোচিত রাষ্ট্র তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। সম্প্রতি এরদোয়ানের রাশিয়া সফরটি বেশ আলোচনায় ছিল ইউরোপ, এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোতে। বিশ্ব রাজনীতিতে বর্তমানে দুটি দিক পরিলক্ষিত হয়। এক- উদারপন্থী রাজনীতি ও দুই- কট্টরপন্থী রাজনীতি। মুসলিম দেশ হিসেবে হিসেবে তুরস্কের রাজনীতি অনেকটাই উদারপন্থী। তবে ইউরোপ তথা পশ্চিমাদের প্রতি এরদোয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব বন্ধুসুলভ নয় এটা তার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান অবলোকন করলে সহজেই বোধগম্য।
দেশীয় রাজনীতি, সংস্কৃতিতে অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিমা আচরণ, আবার রাজনৈতিক চিন্তা ও পদক্ষেপের ক্ষেত্রে একরোখা আচরণের কারণে এরদোয়ান পশ্চিমা দরবারে সমালোচিত অনেক বেশি। মূলত বহুমুখী এ আচরণই এরদোয়ানের সফরকে বহুমাত্রিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে বিশ্ব দরবারে। গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে তুরস্কে ক্ষমতায় রয়েছে এরদোয়ানের দল। কখনও প্রধানমন্ত্রী আবার কখনও প্রেসিডেন্ট হয়ে সরকার পরিচালনা করে আসছেন এরদোয়ান। ক্ষমতায় আসার শুরু থেকে গত ৮ আগস্ট-এর পূর্ব পর্যন্ত কখনই রাশিয়ার সঙ্গে গলায় গলায় সম্পর্ক হয়নি তুরস্কের। বরং ২০১২ সালে থেকে সিরিয়া ইস্যুতে মস্কো-আনকারার সম্পর্ক দিন দিন তলানিতে নামে।
১৫-১৬ জুলাই তুরস্কের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর অনেকটা নড়েচড়ে বসে তুরস্ক সরকার। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটু বেপরোয়া ভাব লক্ষ্য করা যায় এরদোয়ানের মধ্যে। এরদোয়ান হয়তবা কখনই ভাবেনি যে তার নিয়ন্ত্রণাধীন অনেক কিছুই তার বিপক্ষে চলে গেছে। ক্ষমতাশীন হয়ে বিশ্ব রাজনীতির অনেক বিষয়েই নাক গলিয়েছেন এরদোয়ান। তার কথা বার্তায় বুঝা গেছে যে, তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমের অনেক দেশকেই গুরুত্ব দেননি। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতিতে নাক-গলানোর জন্য যে শিষ্টাচার ও নমনীয়তা প্রয়োজন, এরদোয়ানের বক্তব্যে তা খুব কমই পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হওয়া মানেই তার সকল মন্তব্য ও বক্তব্য ভূ-রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হবে এমন ধারণা পোষণ করা যে আদৌ ঠিক নয় তা হয়ত সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এরদোয়ান আন্দাজ করতে পারছেন। সেজন্যই হয়ত, ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের পর স্বদেশকে ভালোভাবে না গুছিয়ে বিদেশ সফর শুরু করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে নামার পেছনে এরদোয়ানের বিভিন্ন মন্তব্য ও বক্তব্য ইন্ধনের কাজ করেছে।
রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলে কার লাভ কতটুকু; এমন সমীকরণ সামনে আসতেই পারে। তবে খোলা চোখে দেখে মনে হচ্ছে লাভের পাল্লা রাশিয়ারই ভারি। কিন্তু তুরস্কের পাল্লা একেবারে খালি বিষয়টি এমনও নয়। রাশিয়া সফরের মাধ্যমে এরদোয়ান তথা তুরস্কের দুই ধরনের পরাজয় ঘটল। এক- এতদিন যাবৎ সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার প্রতি যে ক্ষোভ ও অভিযোগ এরদোয়ান ব্যক্ত করেছিল প্রত্যেকটাই অসার হয়ে বালির চরে মুখ থুবড়ে পড়ল এবং ভবিষ্যতে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে এরদোয়ানের বাক্য বান কয়েক ধাপ শ্লথ হওয়ার পরিবেশ কায়েম হলো।

দুই- সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া যে মন্তব্য করে আসছে ও যে পদক্ষেপ নিয়েছে প্রত্যেকটাই সঠিক ছিল এবং আছে এমনটাই প্রমাণ হলো। সাথে সাথে সিরিয়া তথা বিশ্বের অন্য কোনও দেশের সাথে যদি রাশিয়া যথাযথ ও ইতিবাচক আচরণ নাও করে সেক্ষেত্রে তুরস্কের ভালো-মন্দ কোনও মন্তব্য করার সাহস থাকল না। এরদোয়ান স্বীকার করুক আর নাইবা করুক এটা একটা যুক্তিযুক্ত অনুমান যে, রাশিয়া সফরের মাধ্যমে এরদোয়ান ও তুরস্কের মাথা নতজানু হয়েছে অর্থাৎ এরদোয়ানের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে।

শুধু রাশিয়া নয়, এশিয়ার অনেক দেশ নিয়েও এরদোয়ান বিতর্কিত মন্তব্য করেছে। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির বিষয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে জড়িয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছে এরদোয়ান। তুরস্কের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও সেটা এখন আর বজায় থাকার কথা না। কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এরদোয়ান মোটেও শিষ্টাচারের পরিচয় দেননি। এতে এরদোয়ানের দুটি দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এক-বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা। দুই-পশ্চিমা দেশগুলোকে জড়িয়ে মন্তব্য করার কারণে পশ্চিমারা এরদোয়ানের ওপর আরেক দফা বিরক্ত হলো। বিশ্ব রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে শিষ্টাচারের কোনও বিকল্প নেই। গ্রামগঞ্জে একটা প্রবাদ আছে, ‘ক্ষেত আর আইল এক ভাবা ঠিক নয়’। কথাটি মনে হয়, শিষ্টাচার ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে অনেক বেশি উপযোগী।

লেখক: শিক্ষার্থী, এমবিএ প্রোগ্রাম, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পর্কিত

 
 
 
 

লাইভ

টপ