মাদ্রাসার পরিচালকের বিশ্রামাগারে পাওয়া গেছে কাওসারের লাশ, শিক্ষক পলাতক

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ২২:৪৩, আগস্ট ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:৫৩, আগস্ট ০৮, ২০১৭

মাদ্রাসাছাত্র কাওসারবাথরুমে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও নয় বছরের কিশোর মাদ্রাসাছাত্র হাফিজুর রহমান কাওসারের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে পরিচালকের বিশ্রামাগার থেকে। বিশ্রামাগারে তার লাশ রেখে অন্য কক্ষগুলোয় চলছিল বাকি ছাত্রদের শিক্ষাদান। এমনকি কাওসারের মৃত্যুর খবরটি তার পরিবারকেও জানায়নি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। পরিচালক তার নিজের কক্ষে কাওসারের লাশ নিয়ে বসে ছিলেন। ঘটনার পর পালিয়েছেন ওই মাদ্রাসার এক শিক্ষক।  মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাকালে এমন তথ্য জানা গেছে। 

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানের সময় জানা গেছে, কাওসারকে গত ২২ জুলাই পল্লবীর ৫ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলায় মারকাযু তারতীলিল কুরআন মাদ্রাসার নুরানি বিভাগে ভর্তি করা হয়। এটি আবাসিক মাদ্রাসা। কাওসারকেও আবাসিক হিসেবে ভর্তি করা হয়েছিল। তাকে ভর্তির মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ওই মাদ্রাসা থেকে কাওসারের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা গেছে, ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার তিনটি ফ্ল্যাটেই তালা দেওয়া। সিঁড়িতে এক কিশোরের সঙ্গে দেখা হলে সে জানায়, ‘এখানে মাদ্রাসা ছিল। তারা তালা মেরে কোথায় যেন গেছে। পুরো বাড়িটিতে সিসি ক্যামেরায় ঘেরা। একই ভবনে কসমো স্কুল রয়েছে। ওই স্কুলটিও আবাসিক। স্কুলটির নিরাপত্তাকর্মী জানায়, তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। অল্প কয়েকদিন তিনি এখানে চাকরি করেন। মাদ্রাসায় একটি ছেলে মারা গেছে। সোমবার মাদ্রাসা থেকে পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে। তবে বাড়ির মালিক ও অন্যরা ভাড়াটিয়ারা এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হয়নি।’

মাদ্রাসার একটি ব্যানার থাকলেও ঘটনার পর তা দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ ওই মাদ্রাসা থেকে বিভিন্ন তথ্য ও আলামত সংগ্রহ করেছে।

মাদ্রাসা

মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে পল্লবীর ৪ নম্বর সড়কের ৬৭/৫ বাসায় গিয়ে দেখা যায় কাওসারদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় তার বাবা-মায়ের আহাজারি। কাওসারের বাবা দুলাল খান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগের একটি মাদ্রাসায় ছয়মাস কাওসার পড়ছিল। কিন্তু সেখানে অন্য ছাত্ররা তার জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যেত। তাই সে ওই মাদ্রাসায় থাকতে চাইতো না। এরপর এই মাদ্র্রাসায় ভর্তি করি। কিন্তু ছেলেটাকে এখানেই মেরে ফেলা হলো!’ তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকালে বাসায় আসে। রাতে বাসায় ছিল। শুক্রবার সকালে বাজারে যায় মায়ের সঙ্গে। এরপর শুক্রবার বিকালে আবার মাদ্রাসায় যায়।’

দুলাল খান বলেন, ‘আমাদের পরিচিত এক হুজুর আছেন। তার নাম আল আমিন। তাকে দিয়ে মাদ্রাসায় খোঁজ-খবর নিতাম। তিনি দুই/একদিন পরপর ওই মাদ্রাসায় যেতেন, তার কাছেই ছেলের খবর পেতাম। আমরা গেলে ছেলে চলে আসতে চাইতো মাদ্রাসা থেকে। তাই আল আমিন হুজুরকে বলতাম প্রতিদিন। রবিবার রাতেও তাকে বলছিলাম। এরপর তিনি সোমবার সকালে ওই মাদ্রাসায় গিয়ে খোঁজ নেন। তখন দেখেন, আমার ছেলেকে ফ্লরে শুইয়ে রেখেছে। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়নি। তার আগেই তাকে মারা হয়েছে।’

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন দুলাল। তিনি বলেন, ‘এরপর আল আমিন হুজুর এসে আমাকে খবর দেন। আমিও গিয়ে দেখি ছেলে আর নেই। তখন আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।’

আল আমিন হুজুরের সঙ্গে কথা এই প্রতিবেদকের। মাদ্রাসায় গিয়ে তিনি কী দেখেছিলেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে আল আমিন বলেন, ‘কাওসারের বাবা আমার পূর্বপরিচিত। আমাকে প্রায়ই ছেলের খোঁজ নিতে বলেন। রবিবার রাতেও বলেছেন। এরপর আমি সোমবার ওই মাদ্রাসার দিকে যাই।’

মাদ্রাসায় প্রবেশ করে কী দেখলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনটি ফ্ল্যাটের একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন মাদ্রাসার পরিচালক মো. জুনাইদ বিন ইসহাক (২৯)। একটিতে ছাত্ররা, অন্য ফ্ল্যাটে শিক্ষক ও পরিচালকের বিশ্রামাগার। আমি গিয়ে দেখি পরিচালক জুনাইদ তার বিশ্রামাগারে মড়ার ওপর বসে আছেন, তার সামনে ফ্লরে পাঞ্জাবি-পাজামা পরা শুয়ে আছে একটি ছেলে। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, এই ছাত্র এখানে কেন? ঘুমাচ্ছে, নাকি শরীর খারাপ? তখন জুনাইদ বলেন, ও মারা গেছে, আত্মহত্যা করছে। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনি কী বলেন? কাছে এগিয়ে দেখলাম ঠিকই। তখন আমি ফের প্রশ্ন করলাম, এমন হলে ওকে হাসপাতালে নিতেন, ওর বাবা মাকে কি জানিয়েছেন? তখন বলে, না। এ সময় অন্য কক্ষে ছাত্ররা পড়ছিল। সবই স্বাভাবিক ছিল।’

আল আমিন বলেন, ‘এমন ঘটনা দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। এরপর আমি দৌড়ে মাদ্রাসা থেকে বের হই। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। দৌড়ে এসে ওর বাবাকে খবর দেই। ওর বাবা দ্রুত আসেন। তিনি মাদ্রাসায় ছেলের লাশ দেখে পাগলের মতো আবার দৌড়াতে ছিল। আমি তাকে মেইনরোডে গিয়ে ধরে বাসায় নিয়ে যাই।’

কাওসারের মা

এদিকে ঘটনার পর থেকে কাওসারের মা ফাতেমা বেগম বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। সোমবার তাদের বাসায় গিয়ে দেখা গেছেন ছেলে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র হাতে নিয়ে কান্না করছেন।

বিলাপ করে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সারারাত আমার ডানহাতের ওপর ছেলে ঘুমিয়েছিল। শুক্রবার সারাদিন আমার সঙ্গেই ছিল। সকালে বাজারে গেছে। আমি বার্গার কিনে দিছি এরপর রাতে মাদ্রাসায় দিয়ে আসি।’

কাওসারের বাবা মো. দুলাল খাঁন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলেকে শখ করে মাদ্রাসায় দিয়েছি। ছেলেকে হাফেজ বানাব। ছেলে হজ্ব করবে আমি শুনব। কিন্তু আমার সব শেষ।’ তিনি বলেন, ‘ছেলেটা আমাকে একবার বলছিল, মাদ্রাসায় ওকে মারধর করা হয়। হাঁটুতে একবার মারছিল, আমাকে দেখিয়েছিল। ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ছেলেকে রাতে মারধর করা হয়েছে। এরপর সে মরে যায় কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। ওই বাড়িওয়ালা জানিয়েছেন, রাতে তার বাচ্চাদের কান্নার শব্দ পেয়েছিল।’

ঘটনার পর মাদ্রাসার পরিচালক জুনাইদ বিন ইসহাক দাবি করেন, ‘কাওসার বাথরুমে ঢুকে গলায় গামছা পেচিয়ে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’ তবে দরজার সিটকিরি এতই নিচে যার সঙ্গে আত্মহত্যা করা সম্ভব না। এছাড়া ৯ বছরের একটি ছেলে কিভাবে আত্মহত্যা করে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে সবাই।

নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিচালকের শয়নকক্ষের ফ্লরে চিৎ হয়ে শোয়ানো ছিল কাওসারের লাশ। তার মাথায় একাধিক জায়গায় ফোল, একজায়গা কাটাও রয়েছে। তার পরনে পাঞ্জাবি ও পাজামা ছিল।

সোমবার লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। মিরপুর ১০ নম্বর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে কাওসারের লাশ। 

এই ঘটনায় কাওসারের বাবা দুলাল মিয়া পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মাদ্রাসার পরিচালক জুনাইদ বিন ইসহাক (২৯), তার স্ত্রী সুমাই খাতুন (২০), তার ভাই মো. ইয়াহিয়া (৪২) ও মাদ্রাসার শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান (২৫)। এছাড়া আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামিরা সোমবার সকালে কোরআন শিক্ষার সময় মারধর করে কাওসারকে হত্যা করেছে। প্রায়ই তাকে তারা  মারধর করতো।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখনও পাইনি। রিপোর্ট আসলে জানা যাবে তার প্রকৃত মৃত্যুর কারণ। তবে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দাগ রয়েছে। আমরা এ জন্য তার বাবার অভিযোগ নিয়েছি।’

আরও পড়ুন: মাদ্রাসা ছাত্র কাওসারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন 

/এমএনএইচ/

 

 

লাইভ

টপ