শিশুরা কোন বয়সে কোন শব্দ শিখবে?

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১১:০০, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৮, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১৯

 

বয়স বিবেচনায় রেখে শিশুদের শব্দ শেখানো উচিত

শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন নতুন শব্দের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বড়দের জগতের মধ্যে একটি শিশু যখন বেড়ে ওঠে, তখন কোন বয়সে কোন শব্দ তার ভান্ডারে যুক্ত হবে, সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা জটিল। শিশুবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, বড়দের পত্রিকা টেলিভিশন জীবনযাপন কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শিশু তার বয়সের আগেই নানা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠছে। সেটি যতটা সাবধানতার সঙ্গে করা যায়, তাতেই মঙ্গল। তবে সবাই বলছেন, এক্ষেত্রে প্যারেন্টিংটাই মুখ্য। যে বয়সেই সে যে শব্দেরই মুখোমুখি হোক না কেন, ব্যাখ্যাটা অভিভাবক যেন দেন বয়স বিবেচনায় রেখেই।

ছয় বছর বয়সী নোমান বাবার হাতের পত্রিকা থেকে বের করে ‘মাদক’ ‘ধর্ষণ’ ‘পরকীয়া’ মদ এর মতো শব্দগুলো। এই বয়সেই সে এসব শব্দের অর্থ জানতে চায়। সতর্ক প্যারেন্টিং করতে আগ্রহী সায়মা-সাঈদ দম্পতি ছেলের আগ্রহের বিষয়গুলো থেকে জানতে পারেন, আসলে তারা সতর্ক থাকতে পারেননি। ছয় বছরের শিশুর এসব শব্দের সঙ্গে পরিচয় হওয়ারই কথা না। কিন্তু যেহেতু তারা বড়দের পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠে এবং এসব সামনে দেখতে পায় সেহেতু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান হলো ধৈর্য নিয়ে ব্যাখ্যা দেবেন বয়স উপযোগী করে।

তিন বছরের মধ্যে শিশুকে ছেলে বা মেয়ে উভয়েরই বডি-পার্ট বিষয়ে শিশুর মতো করেই বুঝিয়ে বলতে হবে এবং যৌনাঙ্গও যে চোখ কান নাকের মতোই একটি বডিপার্ট মাত্র সেটি শেখাতে হবে। এবং এটির সংবেদনশীলতা বিষয়ে জানাতে হবে বলে মনে করেন শিক্ষাবিষয়ক গবেষক ও প্রাক-শৈশব প্রশিক্ষক ফারহানা মান্নান। তিনি বলেন, যে কোনও শিশু তার চারপাশে যে শব্দগুলো বয়সের আগেই ঘোরে সেগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়, পড়ে। অথবা পড়ার পাশাপাশি টিভিতে এসব শব্দ শোনে, অভিভাবকদের কথোপকথনেও শোনে।

আট বছরের আগে তার পক্ষে ইতিবাচক-নেতিবাচক পৃথক করতে পারা কঠিন। এ কারণে তার কৌতুহল মেটাতে তার বয়সের উপযোগী করে শব্দগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হবে বাবা-মা বা অভিভাবককে। এই গবেষক বলেন, এই শিশুর সামনে কথা বলা কিংবা তাকে গণমাধ্যমের সামনে বসানোর বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরও বলেন, মানুষ হিসেবে মানুষের সীমানা আছে। কারও সীমানা অতিক্রম করা ঠিক কাজ নয় এটি শিশুকে শেখাতে হবে। শিশু নিজে থেকে কোনও শব্দ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে অন্য কোনও অস্বাভাবিকতা হিসেবে না দেখে বয়স অনুপাতে তাকে বিষয়টি বোঝাতে হবে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, শিশু তার ৫ বছর বয়স থেকে বাইরের নানা শব্দের প্রতি কৌতুহল বোধ করতে থাকে। এসময় সে যেন এমন কোনও শব্দের মুখোমুখি না হয় যেগুলোর ব্যাখ্যা সে বুঝবে না। এ বিষয়ে অভিভাবককে  সাবধান থাকতে হবে। এসময় খেলার মাঠে বা বড়দের মুখ থেকে গালি শুনে সেগুলোও রপ্ত করার প্রবণতা থাকে শিশুর। সে কারণে এসব ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন যেমন জরুরি তেমনই শিশুকে কোনও নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভাষাগত সতর্কতা দরকার।

বাইরে বয়সভিত্তিক বই রচনা করা, বয়সভিত্তিক পত্রিকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে উল্লেখ করে শিশু অধিকারকর্মী নঈম গওহার ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এখানে শিশুরা বড়দের উপযোগী পরিবেশে বেড়ে ওঠে। মুশকিল হলো,  বড়দের পত্রিকার ভেতরে শিশুদের একটি পাতা রাখা হয়। ওপরে যদি কঁচিকাচার মেলা পাতা থাকে তো নিচে দেখা যাবে সিনেমার ছবি বা বিজ্ঞাপন। ফলে শিশু কেবল বয়স অনুযায়ী শব্দভাণ্ডার নিয়ে বেড়ে উঠবে সে সুযোগ নেই বললেই চলে। করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তাহলে আমরা যেমন ক্ষতিকর বোতল-শিশি শিশুর আওতার বাইরে রাখি তেমনই আমাদের সংবাদপত্র টেলিভিশন এর সার্বিক উপস্থাপনা থেকে তাকে বাইরে রাখতে হবে। কেননা সেসব জায়গায় যা দেখানো হয় তা ১৮ বছরের আগে দেখার উপযোগী নয়। প্যারেন্টিং এর গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমরা কথা বলার সময় সামনে থাকা শিশুটিকে বিবেচনায় না নিয়ে আলাপ করি এবং সে সেই বিষয়ে জানতে আগ্রহী হলে তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিই। সেটিও তার জন্য ক্ষতিকর।

পত্রিকা-টেলিভিশনে শিশু বিষয়ক ও শিশু সম্পৃক্ত সংবাদে নীতি মেনে শব্দ ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা গত সাত বছর ধরে তা পর্যবেক্ষণে রেখেছে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশুর সামনে যে ধরনের ভাষা-ছবি-পরিস্থিতি আমরা প্রতিনিয়ত হাজির হতে দেখি সেগুলোর জন্য বয়স অনুপাতে শিশু প্রস্তুত কিনা সেসব নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যম পর্যালোচনা করছি। আমরা একটি গাইডলাইন করেছি এবং বেশকিছু গণমাধ্যম সেগুলো গ্রহণও করেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় খুবই ধীর। ফলে বৃহৎ অর্থে শিশুর সামনে তার বয়সের অনুপযোগী শব্দ হরহামেশাই হাজির হয়। কাটতির জায়গা না ভেবে শিশুর দিকটি ভাবা খুব জরুরি।

/টিএন/

লাইভ

টপ