প্লাস্টিক কারখানায় আগুনআইসিইউয়ের সামনে দুঃসংবাদের আশঙ্কায় আঁতকে উঠছেন স্বজনরা

Send
সাদ্দিফ অভি
প্রকাশিত : ১৮:০০, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

BT New Temp 1কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানার আগুনে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। তাদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুর পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাকিরা। আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আছেন ১০ জন। তাদের মধ্যে শতভাগ পোড়া রোগীও রয়েছেন। তাদের স্বজনরা আইসিইউয়ের সামনে অপেক্ষা করছেন। যখনই আইসিইউয়ের দরজা খোলা হচ্ছে তখনই আঁতকে উঠছেন তারা।

শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন জানান, সেখানে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকা এমন পোড়া রোগী রয়েছে যাদের মুখ চেনা যাচ্ছে না। শ্বাসনালীও খুব খারাপভাবে পুড়ে গেছে। এই ১০ রোগীর মধ্যে ৯ জনের ৬০ থেকে ৮০ ভাগ এবং আবদুর রাজ্জাক নামে একজনের শতভাগ পোড়া।

তবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ভর্তি ২২ রোগী সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত বলে তিনি জানান। তাদের শরীরের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পুড়েছে।

শুক্রবার সকাল থেকেই সরেজমিন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউয়ের সামনে স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। পুরো করিডোর জুড়েই স্বজনদের অপেক্ষা। আবার কেউ একপাশে নির্জন জায়গায় গিয়ে বসে আহাজারি করছেন, কেউ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন।

আইসিইউয়ের দরজার পাশেই একটা অন্ধকার ছোট ঘর আছে। সেখানে অপেক্ষমাণ আছেন কিছু স্বজন। আবার আইসিউর সামনে বসার জায়গায় তিল ধারণের জায়গা নেই। সেখানেও রোগীর স্বজনদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। আইসিইউয়ের দরজা খুললেই সবার দৃষ্টি সেদিকে। ভাবনা, ‘এই বুঝি মৃত্যুর খবর এলো।’

আইসিইউয়ের পাশেই মেঝেতে বসে আহাজারি করছিলেন মারাত্মক দগ্ধ সোহানের (১৯) মা। আহাজারি করছেন, কাঁদছেন, আবার কিছুক্ষণ দুই হাত তুলে দোয়া করছেন তিনি। পাশে আছে আরেক ছেলে চেষ্টা করছেন সান্ত্বনা দেওয়ার। আইসিইউয়ের দরজার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে আঁতকে উঠছিলেন সোহানের মা।

BT New Tempদরজার সামনে অপেক্ষমাণ শতভাগ পুড়ে যাওয়া রোগী আবদুর রাজ্জাকের শ্যালক ওয়াহিদ জানান, রাজ্জাকের ১৩ বছরের একটি মেয়ে আছে। নাম টুম্পা। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত পরিবার। শোকার্ত বোনকে খুব কষ্ট করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। রাজ্জাকের স্ত্রীও সেখানে অপেক্ষা করছেন। দরজা খুললেই তাকিয়ে থাকছেন সেদিকে। পাশেই বিষণ্ন দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছেন তার ছোট বোন।

ওয়াহিদ আরও বলেন, ‘যেকোনও সময় মৃত্যুর খবর আসতে পারে। শতভাগ পোড়া রোগী নাকি বাঁচে না। গতকাল একজন পোড়া রোগী দেখেছিলাম। তার কান পুড়ে শক্ত হয়ে গেছে। অক্সিজেন মাস্কের ফিতা লাগিয়ে রাখলেও তা বারবার পড়ে যাচ্ছিল।’

দগ্ধদের প্রসঙ্গে সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘লাইফ সাপোর্টে থাকা প্রত্যেকেরই শ্বাসতন্ত্র পোড়া (ইনহ্যালেশন বার্ন)। এমনভাবে পুড়েছে যেখান থেকে সুস্থ হওয়া দুরূহ ব্যাপার। অবস্থা এমন যে, গত ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় এত ভয়াবহ রোগী আমি দেখিনি। গতকাল এখানে একজন মারা গেছে যাকে তার স্ত্রী চিনতে পারেনি। মুখমণ্ডল এমনভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। পরে তার হাতের কাটা দেখে শনাক্ত করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শতভাগ পুড়ে যাওয়া আবদুর রাজ্জাক অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছেন। যেকোনও সময় তার অবস্থার অবনতি হতে পারে। বিশ্বের কোথাও শতভাগ পোড়া রোগী বাঁচানো সাধারণত সম্ভব হয় না। আমরা চেষ্টা করছি, বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।’

ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ১০০ ভাগ পোড়া।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে হতাহতদের চিকিৎসার ব্যয় সরকার বহন করবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

প্রসঙ্গত, ঢাকার কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় অবস্থিত প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্লাস্টিকসামগ্রী তৈরির কারখানায় বুধবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঘটনার সময় শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। তখন হঠাৎই গ্যাসরুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

 

/এসও/এমএএ/

লাইভ

টপ